গত বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য হাঙ্গেরিয়ান লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই ছিলেন এক ‘স্বাভাবিক’ পছন্দ। তবে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ২০২৬ সালের নোবেল বিজয়ী লেখককের নাম ঘোষণার আগে সুইডিশ একাডেমি কী ভাবছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এবার কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সুইডিশ সাংবাদিক, সাহিত্য সমালোচক এবং লেখক লিনা কালমটেগ এর মতে, এ বছরের নির্বাচনটি বেশ অপ্রত্যাশিত ও চমকপ্রদও হতে পারে।
সুইডেনের গোথেনবার্গ বইমেলায় সংস্কৃতি বিষয়ক বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের কাছে চলতি বছরের সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ী লেখকের নাম জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তারা প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। এবার কারও কাছেই যেন কোনো চটজলদি উত্তর নেই। আর ‘সভেনস্কা দাগব্লাদেত’ এর সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক ইদা ওলমেদাল যখন ইমেইলের মাধ্যমে প্রশ্নটির উত্তর দেন, তখন তার জবাবটি হয় সংক্ষিপ্ত। তিনি বলেন, আমি বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ভেবেছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এ বছর আমার কাছে কোনো ভালো ভবিষ্যদ্বাণী নেই। তবে সাধারণ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবার নারীদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে হচ্ছে।
২০১৮ সালে পোলিশ লেখক ওলগা তোকারচুক নোবেল পাওয়ার পর থেকে সুইডিশ একাডেমি নারী ও পুরুষের পর্যায়ক্রমিক নির্বাচনের নীতি অনুসরণ করে আসছে। আর এই ধারা অব্যাহত থাকলে ক্রাসনাহোরকাই এর পর একজন নারী লেখকেরই বিজয়ী হওয়া উচিত বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে লিনা কালমটেগ বলেন, 'মাঝে মাঝে মনে হয়, একাডেমির নতুন সদস্যদের মধ্যে হয়তো এমন কোনো সমঝোতা রয়েছে যে—ঠিক আছে, আপনারা মধ্য ইউরোপের এই পুরুষটিকে নিন, আর বিনিময়ে আগামী বছর আমরা একজন নারীকে বেছে নেব। তাই আমার মনে হচ্ছে, এ বছর শ্বেতাঙ্গ মধ্য ইউরোপীয় কোনো পুরুষের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা নেই।'
এবারের নোবেল পুরস্কারটি যদি ইউরোপে না যায়, তবে তা কোথায় যাবে? এই বিষয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক সাংবাদিক উলরিকা নুটসন অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে বাজি ধরছেন। সেখানে জেরাল্ড মুর্নেন ও অ্যালেক্সিস রাইট জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী। অপরদিকে সুইডিশ সংবাদমাধ্যম আরবেটেট এর সংস্কৃতি সম্পাদক জোহানেস ক্লেনেল মনে করেন, এবারের নোবেল পুরস্কার দক্ষিণ আমেরিকায় যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এদিকে সুইডিশ সাংবাদিক এরিক হেলমারসনের মতে, স্বাভাবিক নিয়মে এবার নারীদের পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু যদি এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে, তবে দক্ষিণ আমেরিকার কোনো পুরুষকে বেছে নেওয়াটা একটা গ্রহণযোগ্য সমঝোতা হতে পারে। সেক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার সিজার আইরা বেশ চমৎকার পছন্দ হতেন বলে তিনি মনে করেন।
লিনা কালমটেগের সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় ৭৭ বছর বয়সী সিজার আইরাও রয়েছেন। তবে তিনি অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কোনো নারীকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চান। সেক্ষেত্রে আর্জেন্টিনারই ৪৮ বছর বয়সী সামান্তা শোয়েবলিনকে তিনি এ বছরের নোবেল বিজয়ী হিসেবে দেখতে পছন্দ করবেন বলে জানান।
কালমটেগ বলেন, 'নোবেল পুরস্কারের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে, নতুন লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের নারী লেখকরা অত্যন্ত কম বয়সী। আমরা আশা করতে পারি যে, তাদেরই কেউ হয়তো এখনই এই পুরস্কারটি পেয়ে যাবেন। তবে এক্ষেত্রে বয়সের বিষয়টি একটি বড় বাধা। তবে হান কাং যখন পুরস্কারটি পেয়েছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ৫৩ বছর। আর সেই সময়েও তাকে বেশ কম বয়সী বলেই মনে করা হয়েছিল।'
এবারের সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় এমন সব লেখকের নামও রয়েছে যারা দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্যচর্চা করে আসছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন, ডন ডিলিও, টমাস পিনচন এবং মার্গারেট অ্যাটউড। তাদের সবার বয়সই ৮৫ বছরের বেশি। তবে তারা যদি কখনও পুরস্কারটি পেতে চান,সেক্ষেত্রে তাদের সময় ফুরিয়ে আসছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
গত বছর ক্রাসনাহোরকাই পুরস্কার পাওয়ার পর কেউ একজন বলেছিলেন যে, তিনি এতটাই নিখুঁত ছিলেন যে মনে হতো যেন একাডেমি নিজেই তাকে সৃষ্টি করেছে। লিনা কালমটেগ বলেন, 'আমার মনে হয় না একাডেমি গত বছরের মতোই কোনো প্রথাগত বা পরিচিত ধাঁচের সিদ্ধান্ত আবারও নেবে।'
ইতালিয়ান লেখক ভিনসেঞ্জো লাত্রোনিকো, জাপানি লেখক মিনায়ে মিজুমুরাকে এবারের নোবেল বিজয়ী হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, 'মিজুমুরা এক কথায় অসাধারণ প্রতিভাধর। তিনি বেশ কিছু কথাসাহিত্য রচনা করেছেন যা অত্যন্ত পরীক্ষাধর্মী। কারণ এগুলোতে জাপানি ও পশ্চিমা সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটেছে। একই সঙ্গে তার লেখাগুলো যেমন হাস্যরসাত্মক, তেমনি গভীর বেদনাবোধেও পূর্ণ।'
সুইডিশ লেখক ও সাংবাদিক উলরিকা নুটসন বলেন, 'ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দের তালিকায় হয়তো লুদমিলা উলিৎস্কায়া আছেন,তবে আমার মনে হয় না শেষ পর্যন্ত তিনিই পুরস্কারটি পাবেন। আমার ধারণা, জেরাল্ড মুর্নেন কিংবা অ্যালেক্সিস রাইট—এদের মধ্যে কেউ একজনই বিজয়ী হবেন। দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার এবং দুজনেই এই পুরস্কারের যোগ্য।'
এদিকে বাজিকরদের তালিকায় ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ের দৌড়ে এগিয়ে আছেন কানাডার কবি অ্যান কারসন এবং চীনা পরীক্ষামূলক ধারার লেখক কান শুয়ে। তবে এই তালিকায় হারুকি মুরাকামি, জেরাল্ড মুর্নেন এবং মার্গারেট অ্যাটউডও রয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ কে পাবে তা নিয়ে এরকম হাজারটা মতভেদ আছে, প্রত্যাশা আছে, ভবিষ্যদ্বানী আছে। তবে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টার আগে এই ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে কিছুই বলা যাবে না।