Story

বোধনের আলো

October 9, 2026

81 views

বোধনের আলো

আদিত্য ভৌমিক

ঠাকুরদালানের সামনে ঢাকের প্রথম বোল উঠতেই বুড়ো পুরোহিতের হাতটা একটু কেঁপে গেল। বিয়াল্লিশ বছর ধরে তিনি এই বাড়ির পুজোয় বসছেন, তবু প্রতি বছর ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বুকের ভেতরটা ঠিক এভাবেই কাঁপে। সামনে মা দুর্গার মুখ, আলতা রাঙা চোখে সেই চেনা করুণা। যেন বলছেন, এসেছি রে, তোরা সবাই ভালো আছিস তো?

লাল থামের বিশাল সেই বাড়িটা আজ আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সারা বছর জানালার খড়খড়িগুলো বন্ধ থাকে, ঝাড়বাতিতে ধুলো জমে, দালানে শুধু পায়রার ডানা ঝাপটানোর শব্দ। অথচ আশ্বিনের এই কটা দিন বাড়িটা যেন দীর্ঘ ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। গাঁদা আর শ্বেতকরবীর মালায় থামগুলো সেজেছে, আমপাতার তোরণে সকালের রোদ এসে পড়েছে, আর বারান্দা জুড়ে ছোটদের কলরব।

দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন মিনুপিসি। লালপাড় সাদা শাড়ির আঁচল কাঁধে ফেলে তিনি শাঁখে ফুঁ দিচ্ছিলেন। সত্তর ছুঁইছুঁই বয়স, তবু ফুসফুসের জোর এতটুকু কমেনি। শাঁখের সুর ছড়িয়ে পড়ল উঠোন পেরিয়ে গলির মোড় পর্যন্ত। নিচে ঢাকিরা মুখ তুলে তাকাল, আর তাদের কাঠির তাল আরও জোরালো হয়ে উঠল। এই শাঁখ আর এই ঢাক যেন বহু যুগের পুরোনো এক কথোপকথন, যার মানে শুধু এই বাড়ির মানুষেরাই বোঝে।

দোতলার মাঝের ঘরটায় তখন হইহই কাণ্ড। বাচ্চারা সব রেলিংয়ে ঝুঁকে নিচের ভিড় দেখছে। ছোট্ট রিয়া নতুন লাল ফ্রকের ঘের ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার দাদা বাবলু চোখ বড় বড় করে জানতে চাইল, "ঠাম্মি, মা কি আজই সত্যি সত্যি আমাদের বাড়িতে চলে এলেন?" ঠাম্মি হেসে নাতির মাথায় হাত রাখলেন। "এসেছেন বৈকি দাদুভাই। সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন যে, কবে তাঁর বাপের বাড়ি যাওয়ার ডাক আসবে।"

ঘরের কোণে এক তরুণী দেয়ালের ফ্রেমে একটা পুরোনো ছবি সোজা করে টাঙাচ্ছিল। ছবিতে এক সৌম্য প্রৌঢ়, গলায় গাঁদার মালা। তিনি এই বাড়ির কর্তা, যিনি তিন বছর আগে শরতের এক ভোরে চলে গেছেন। তরুণীর নাম অনন্যা, তাঁর একমাত্র নাতনি। ছবির কাচে আঙুল বুলিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, "দাদু, দেখো, সব ঠিক আগের মতোই আছে। তোমার সেই ঝাড়বাতিও জ্বলছে।"

কথাটা বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এল। এই দালানের প্রতিটি কোণ যে তাঁর স্মৃতিতে ভরা। দাদুর কাঁধে চড়ে প্রথম প্রতিমা দেখা, তাঁর হাত ধরে অঞ্জলি দেওয়া, দশমীর রাতে তাঁর বুকে মুখ গুঁজে কান্না। প্রতি বছর বিসর্জনের দিন দাদু বলতেন, "কাঁদিস না রে পাগলি, মা তো আবার আসবেন।" সেই আশ্বাসের জোরেই কত বিদায় সহ্য করা গেছে। আজ দাদু নেই, কিন্তু তাঁর কথাটা বাতাসে মিশে আছে।

নিচে উঠোনে ততক্ষণে ভিড় জমেছে। কেউ এসেছে দূর শহর থেকে, কেউ সাত সমুদ্র পেরিয়ে। কারও চুলে রুপোলি ছোঁয়া, কারও কোলে সদ্য হাঁটতে শেখা শিশু। কত বছর পর দেখা হলে মানুষ প্রথমে কিছু বলতে পারে না, শুধু হাসে আর চোখ ভিজে আসে। জেঠিমা এসে ধরলেন ছোট কাকিমাকে। দুজনের মধ্যে একদা কী এক তিক্ততা হয়েছিল, কেউ আজ আর মনে রাখেনি। পুজোর আলোয় পুরোনো অভিমান গলে জল হয়ে যায়, এটাই বুঝি এই উৎসবের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক।

ঠাকুরদালানের চৌকাঠের কাছে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরা মেয়েরা সার বেঁধে দাঁড়িয়েছে, খোঁপায় বেলফুলের গুচ্ছ। তাদের পাশে ধুতি পাঞ্জাবি পরা পুরুষেরা করজোড়ে মায়ের দিকে চেয়ে আছেন। সবার চোখে একই আলো, একই প্রার্থনা। আরতির প্রদীপের শিখা কাঁপছে, ধুনোর ধোঁয়া পাক খেয়ে উঠছে ঝাড়বাতির দিকে, আর ঢাকের বোল হৃদয়ের স্পন্দনের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

মা দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র, পায়ের নিচে মহিষাসুর, পাশে লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ। কিন্তু বহু বছর ধরে এই প্রতিমার দিকে তাকিয়ে পুরোহিত মশাই একটা কথাই ভেবে এসেছেন। অস্ত্রের ওপরে মায়ের মুখে যে স্নিগ্ধতা, সেটাই আসল শক্তি। যে মা শত্রু বিনাশ করেন, তিনিই তো সন্তানের চোখের জল মুছিয়ে দেন। সংসারের সব লড়াইয়ে আমরা হেরে গেলেও এই একটা জায়গায় এসে দাঁড়ালে মনে হয়, কেউ একজন আছেন যিনি ফেরার পথ চেয়ে বসে থাকেন।

সন্ধ্যা নামল। উঠোনের আলপনায় প্রদীপের আলো পড়ে সোনালি আভা ছড়াল। ঢাকি দলের কিশোর ছেলেটা, যে এ বছর প্রথম বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ঢাক বাজাচ্ছে, তার কপালে ঘাম, কিন্তু চোখে অদ্ভুত গর্বের ঝিলিক। তার বাবা আড়চোখে ছেলেকে দেখলেন, আর কিছু না বলে শুধু তালটা একটু ধীর করে দিলেন, যাতে ছেলে সঙ্গ রাখতে পারে। কোনো কথা হল না, তবু এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মের হাতে নিঃশব্দে উত্তরাধিকার তুলে দিল।

অনেক রাতে যখন ভিড় পাতলা হয়ে এল, অনন্যা একা ঠাকুরদালানের সামনে এসে বসল। প্রদীপের আলোয় মায়ের মুখটা যেন জীবন্ত। সে চোখ বুজে মনে মনে বলল, "মা, দাদু তো তোমার কাছেই আছেন। তাঁকে বোলো, আমরা সবাই এখনও এক ছাদের নিচে জড়ো হই। বাড়িটা এখনও জেগে ওঠে। তাঁর শেখানো সবটুকু আমরা আঁকড়ে ধরে আছি।"

হঠাৎ ঝাড়বাতির আলোটা একবার কেঁপে উঠল। হয়তো হাওয়া, হয়তো আর কিছু। অনন্যার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটল, চোখের কোণে এক ফোঁটা জল গড়াল। সে জানে, ভালোবাসা কখনও হারায় না। সে শুধু রূপ বদলে ফিরে আসে, ঠিক যেমন মা ফিরে আসেন প্রতি শরতে।

বাইরে তখনও দূরে কোথাও ঢাকের শব্দ বাজছিল, আর আকাশে ভাসছিল শিউলির মৃদু গন্ধ। বিসর্জনের বিষাদ আসবে চার দিন পর, সবাই জানে। তবু আজ এই রাতে কেউ সেই কথা ভাবল না। কারণ কিছু মুহূর্ত হিসেব করে বাঁচার জন্য নয়, শুধু বুক ভরে অনুভব করার জন্য। আর সেই অনুভবের নামই বুঝি দুর্গাপুজো।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Borhan Mahmud 3 weeks ago

    অনুভূতির নিখুঁত ছোঁয়ায় লেখা চমৎকার গল্পটি দুর্গাপুজোর আবহ ও পারিবারিক বন্ধনের এক আবেগঘন, জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। দারুণ লিখেছেন।