ফাল্গুনের শেষ বিকেলের রক্তিম সূর্যটা যখন কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টের দিগন্তজোড়া জলরাশির ওপর হেলে পড়ছিল, তখন চারপাশের বাতাসে লোনা জলের গন্ধ আর ঢেউয়ের অবিরাম গর্জন এক আশ্চর্য মাদকতা ছড়াচ্ছিল। বেলাভূমির আর্দ্র বালুর ওপর আছড়ে পড়া ফেনিল ঢেউগুলো যেন প্রতিবার ফিরে যাওয়ার সময় রেখে যাচ্ছিল এক জীবনের না-বলা দীর্ঘশ্বাস। সেই দীর্ঘ বালুকাময় সৈকতের এক নির্জন কোণে, যেখানে সারিবদ্ধ ঝাউবনের ছায়া এসে বালিয়াড়িতে মিশেছে, সেখানে কাঠের একটা ভাঙা বেঞ্চে বসে ছিল অরণ্য। তার কোলের ওপর খোলা একটা বড় স্কেচবুক, হাতে টু-বি পেনসিল। পেনসিলের ডগা দিয়ে সে ক্ষিপ্র হাতে আঁকছিল সমুদ্রের ওপর উড়ে চলা একঝাঁক গাঙচিল আর দূরে ভাসমান ঐতিহ্যবাহী সাম্পান নৌকার অবয়ব। কিন্তু তার আঙুলগুলো হঠাৎ করেই স্থির হয়ে গেল, যখন তার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে হেঁটে আসা একটি অবয়বের ওপর ।
অনন্ত জলরাশির পটভূমিতে হেঁটে আসছিল একটি মেয়ে। পরনে হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি, বাতাসে তার আঁচলটা ডানা মেলার মতো উড়ছিল। মেয়েটির চুলে কোনো কৃত্রিমতার সাজ ছিল না, ছিল না শহরের চেনা ব্যস্ততার কোনো ছাপ। তার হাতে ধরা ছিল সদ্য ফোটা একটি তাজা লাল গোলাপ। এই লোনা জলের বালুকাবেলায় একটি রক্তিম গোলাপের উপস্থিতি যেন পুরো ক্যানভাসে এক অলৌকিক বৈপরীত্য তৈরি করেছিল। মেয়েটির মুখাবয়বে এমন এক শান্ত, নির্লিপ্ত মায়াময়তা ছিল, যা কক্সবাজারের এই প্রমত্ত সমুদ্রের উত্তালতার মাঝেও এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিচ্ছিল। তার বড় বড় চোখ দুটো যেন সাগরের মতোই গভীর ও অতলস্পর্শী। অরণ্যের বুকটা এক অজানা আলোড়নে কেঁপে উঠল। তার মনে হলো, এই ধূলিমলিন পৃথিবীর ব্যস্ত কোলাহলে কিছু মানুষ আসে, যারা কোনো এক অদ্ভুত ঐশ্বরিক বার্তা নিয়ে পথ চলে।
মেয়েটি যখন অরণ্যের বেঞ্চের পাশ দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিল, বাতাসে ছড়িয়ে গেল এক অসম্ভব স্নিগ্ধ সুরভিত সুবাস,ঠিক যেমন ভোরের প্রথম শিশিরে ভেজা টাটকা গোলাপের শরীর থেকে ভেসে আসে। মেয়েটি একবারও অরণ্যের দিকে তাকাল না, নিজের খেয়ালে ঢেউয়ের সীমানা ধরে হেঁটে চলে গেল ঝাউবনের দিকে। কিন্তু অরণ্যের স্কেচবুকের পাতার পাখির ছবিটা আর শেষ হলো না। সেই সাদা পৃষ্ঠায় পেনসিলের দ্রুত আঁচড়ে জেগে উঠতে লাগল অচেনা সেই মুখের মায়াবী অবয়ব, যার এক হাতে ধরা সাগরের লোনা জল আর অন্য হাতে একাকী এক ফোটা গোলাপ।
সেই মেয়েটির নাম ছিল মৃত্তিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী, যে তার অসুস্থতার খবর পাওয়ার পর নিজেকে একটু আড়াল করতে, জীবনের শেষ কিছু মুহূর্তকে প্রকৃতির মাঝে খুঁজে নিতে চলে এসেছিল এই সমুদ্রের শহরে।আর অরণ্য ছিল চারুকলার শেষ বর্ষের ছাত্র, যে তার এক চিত্র প্রদর্শনীর প্রস্তুতির জন্য সমুদ্রের নানা রূপ ক্যানভাসে ধরতে কক্সবাজারের এই নির্জন সৈকতকে বেছে নিয়েছিল।
কারুকার্যময় সেই গোধূলির পর অরণ্যের চোখ দুটো যেন অজান্তেই প্রতিদিন সেই দীর্ঘ বালিয়াড়িতে একটি নির্দিষ্ট শাড়ি আর লাল গোলাপের খোঁজে ব্যাকুল হয়ে উঠল। লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা কিংবা দূরবর্তী কলাতলী সৈকতের নির্জনতা সে যেন কেবল একটি মায়াবী অবয়বের অপেক্ষাতেই দিন কাটাতে লাগল।
দেখা হলো প্রায় এক সপ্তাহ পর। সেদিন ছিল মেঘলা এক দুপুর। ইনানী সৈকতের পাথুরে কিনারায় হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামল। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো তখন পাথরে আছড়ে পড়ে গর্জন করছিল। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ঝাউবনের ধারের এক পরিত্যক্ত ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়েছিল মৃত্তিকা। তার ছাতাটা ছিল না, ভিজে যাওয়া শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে সে একপাশে দাঁড়িয়ে সাগরের ওপর বৃষ্টির পতন দেখছিল।
অরণ্য তখন তার জলরঙের ড্রইং বোর্ডটা জ্যাকেটের নিচে আগলে নিয়ে সেই ছাউনির দিকেই ছুটে আসছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল সেই চেনা রূপ। কোনো দ্বিধা বা হিসাব-নিকাশের সুযোগ না দিয়ে তার পা দুটো এগিয়ে গেল মৃত্তিকার দিকে।
"আপনার নিশ্চয়ই খুব ঠান্ডা লাগছে?"
অরণ্যের ধীর ও মার্জিত কণ্ঠস্বরে চমকে মুখ তুলে তাকাল মৃত্তিকা। তার বড় বড় শান্ত চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে গেল।
অরণ্য তার কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা ফোল্ডিং ছাতা বের করে এগিয়ে দিল। "বৃষ্টিটা সহসা থামবে বলে মনে হয় না। আপনি চাইলে এটা নিতে পারেন।"
মৃত্তিকা এক পলক ছাতাটার দিকে তাকাল, তারপর অরণ্যের চোখের দিকে। সেই চোখে কোনো চটুলতা ছিল না, ছিল কেবল এক নিষ্কলুষ আর্দ্রতা। মৃত্তিকা মৃদু হাসল,যে হাসির তুলনা হতে পারে প্রথম ভোরের আলোয় সাগরের বুকে সূর্য ওঠার দৃশ্যের সাথে।
"ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি ভিজবেন কীভাবে?" মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করল, তার গলাটা ছিল তরঙ্গের মতো মিষ্টি।
"আমি শিল্পী মানুষ," অরণ্য এক চিলতে হেসে বলল, "বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিলে হয়তো রঙের ভাবটা আরও ভালো জমে।"
মৃত্তিকা আর কোনো আপত্তি করল না। ছাতাটা হাতে নিয়ে সে বলল, "আমি মৃত্তিকা।"
"আমি অরণ্য।"
সেই বৃষ্টিভেজা দুপুর থেকেই দুটি অচেনা নদী যেন এক মোহনার দিকে বইতে শুরু করল। প্রেমের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না, ছিল না কোনো নাটকীয় অঙ্গীকার। প্রেম এলো ঠিক যেমন করে সাগরে জোয়ার আসে,চুপিসারে, অথচ যার টানকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারও থাকে না।
পরের কয়েকটা সপ্তাহ ছিল এক স্বপ্নের মতো সময়। প্রতিদিন বিকেলে তারা দেখা করত হিমছড়ির পাহাড়ি পথ ধরে, কখনো বা বালিয়াড়ির কোনো নির্জন কোনায়। মৃত্তিকা কবিতা পড়ত,জীবনানন্দ দাশের সাগরের রূপ আর ভালোবাসার পঙক্তিগুলো তার কণ্ঠে যেন নতুন অর্থ খুঁজে পেত। আর অরণ্য বসে বসে সেই কবিতার ভাবকে তার তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে রূপ দিত।
একদিন অপরাহ্ণে ঝাউবনের নরম ছায়ায় বসে মৃত্তিকা হঠাৎ অরণ্যকে জিজ্ঞেস করল, "অরণ্য, তুমি আমাকে আঁকো না কেন? চারপাশের এই পাহাড়, সমুদ্রের ঢেউ, নৌকা,সবই তো তোমার খাতায় জায়গা পায়। আমি কি তোমার চোখে কোনো ছবি হতে পারি না?"
অরণ্য কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল। তার চোখে ফুটে উঠল গভীর এক আত্মমগ্নতা। সে মৃত্তিকার হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল, "যে সৌন্দর্যকে শুধু চোখ দিয়ে দেখা যায়, তাকে তুলিতে আঁকা যায় মৃত্তিকা। কিন্তু যে সৌন্দর্য অন্তরে এসে সুবাস ছড়ায়, তাকে ক্যানভাসে বাঁধতে গেলে তার অপমান হয়। তুমি তো কোনো রং বা রেখা নও... গোলাপের মত তুমি। দূর থেকে যাকে দেখলে চোখ জুড়ায়, পাশে থাকলে যার পবিত্র সুবাসে মন শান্ত হয়। কিন্তু তার প্রতিটি পাপড়ির ভেতরে এক স্পর্শাতীত পবিত্রতা লুকিয়ে থাকে।"
মৃত্তিকা স্তব্ধ হয়ে অরণ্যের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো যেন এক মুহূর্তে জলে ভরে এলো। সে ধীরে ধীরে অরণ্যের হাতের তালুতে নিজের আঙুলগুলো রাখল। আজকের এই দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে যেখানে ভালোবাসার অর্থ শরীর আর মোহের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ, সেখানে অরণ্যের এই নিষ্কাম, নিখাদ ভালোলাগা মৃত্তিকার হৃদয়ের গভীরে এক পরম মন্দিরের রূপ নিয়েছিল।
কিন্তু বিধাতা হয়তো নিখাদ ভালোবাসার গভীরতা মাপার জন্য সবসময় এক অদৃশ্য কঠিন কষ্টিপাথর সাজিয়ে রাখেন। চৈত্র মাস আসতে না আসতেই মৃত্তিকার হাসির পেছনে একটা চাপা ক্লান্তি ভর করতে শুরু করল। প্রায়ই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যেত, সামান্য হাঁটলেই সে হাঁপিয়ে উঠত। অরণ্য বারবার জানতে চাইত, কিন্তু মৃত্তিকা এক মিষ্টি হাসিতে তা উড়িয়ে দিয়ে বলত, "সমুদ্রের হাওয়া তো, একটু ক্লান্তি লাগে।"
কিন্তু সত্য বেশিদিন লুকিয়ে রইল না।
এক বিকেলে অরণ্য কলাতলী পয়েন্টে বসে ছিল প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে। মৃত্তিকা আসেনি। কোনোদিন এমন হয়নি যে সে না জানিয়ে দেরি করেছে। এক অজানা আতঙ্কে অরণ্যের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ছুটে গেল মৃত্তিকার খোঁজ নিতে তাদের থাকার গেস্ট হাউসে।
সেখানে গিয়ে অরণ্য যে সত্য জানতে পারল, তাতে তার পায়ের তলার বালি যেন এক মুহূর্তে সাগরের জোয়ারে ধুয়ে গেল। মৃত্তিকা এক জটিল ও অগ্রসর পর্যায়ের রক্তের ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার শরীর ধীরে ধীরে জীবনশক্তি হারিয়ে ফেলছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কোনো চিকিৎসাতেই আর খুব বেশি সময় হাতে নেই। সে এসেছে এই সমুদ্রের টানে, জীবনের শেষ দিনগুলো এই অনন্ত জলরাশির পাশে কাটিয়ে যেতে।
অরণ্য কোনো কথা বলতে পারল না। তার কণ্ঠরোধ হয়ে এলো। সে ধীর পায়ে এসে মৃত্তিকার বিছানার পাশে বসল। মৃত্তিকা চোখ খুলে তাকাল। অরণ্যকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুর্বল হাসিটি ফুটে উঠল।
"তুমি জেনে গেলে, তাই না?" মৃত্তিকা খুব ক্ষীণ স্বরে বলল।
"তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন? কেন আমার থেকে লুকোলে এই সত্য?" অরণ্য ওর হাতটা ধরল, যা বরফের মতো ঠান্ডা ছিল।
মৃত্তিকা অরণ্যের চোখের জল মুছে দেওয়ার চেষ্টা করল তার দুর্বল আঙুল দিয়ে। "আমি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে একজন পরিপূর্ণ, সুন্দর মানুষ হিসেবে মনে রাখো। অরণ্য, গোলাপের সৌন্দর্য কি শুধু তার প্রস্ফুটিত রূপেই সীমাবদ্ধ? ঝরে পড়ার মুহূর্তেও কি তার সৌরভ হারিয়ে যায়?"
অরণ্য আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না। সে মৃত্তিকার হাতের ওপর নিজের মাথা নামিয়ে রেখে এক শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। "না মৃত্তিকা! তুমি আমার কাছে শুধু এক বসন্তের ফুল নও। তুমি আমার পুরো জীবনের আলো।"
সেই দিনটির পর থেকে অরণ্যের পুরো পৃথিবী বদলে গেল। তার জীবনের একমাত্র সাধনা হয়ে দাঁড়াল একটি নাম,মৃত্তিকা। প্রতিদিন সকালে সে সমুদ্রের পাড় থেকে নিয়ে আসত একগুচ্ছ লাল তাজা গোলাপ। ফুলগুলো সাজিয়ে রাখত মৃত্তিকার বিছানার পাশের ছোট কাচের ফুলদানিতে। মৃত্তিকার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু অরণ্যের উপস্থিতি তার মনের ভেতর এক অলৌকিক শান্তির জন্ম দিয়েছিল। যন্ত্রণা যখন তার শরীরে কাঁটার মতো বিঁধত, অরণ্য তার মাথায় হাত বুলিয়ে শোনাত সমুদ্রের ঢেউয়ের গল্প আর জীবনানন্দের কবিতার সুর। সে কোনো সান্ত্বনার মিথ্যে আশ্বাস দিত না। সে জানত, সত্য অনিবার্য। কিন্তু মৃত্যুর চেয়েও যে ভালোবাসার শক্তি অনেক বেশি অসীম, সে তা তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে মৃত্তিকাকে অনুভব করাত। একদিন গভীর রাতে, যখন চারপাশের সাগরের গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না, মৃত্তিকা চোখ মেলল।
"অরণ্য..." মৃত্তিকা ডাকল।
"আমি এখানেই আছি মৃত্তিকা। বলো।"
"তুমি জানো," মৃত্তিকা খুব আস্তে আস্তে বলল, "লোকে বলে গোলাপ খুব ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু তুমি আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছ, তাতে আমার মনে হয় আমি এক জনম নয়, এক সহস্র বছর বেঁচে নিয়েছি তোমার হৃদয়ে।"
অরণ্য তার চোখের জল আড়াল করে শক্ত হাসল। "তুমি বাঁচবে মৃত্তিকা। আমার প্রতিটি তুলির আঁচড়ে, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে তুমি থাকবে।"
মৃত্তিকা ফুলদানির সেই লাল গোলাপটির দিকে তাকাল। গোলাপের একটি পাপড়ি আলতো করে খসে পড়েছিল টেবিলের ওপর।
"অরণ্য, আমার মৃত্যুর পর তুমি কাঁদবে না। তোমার ক্যানভাস যেন কোনোদিন আঁধারে ঢেকে না যায়। তুমি ছবি আঁকবে। সেখানে কোনো শোক থাকবে না, কেবল থাকবে ভালোবাসা আর সুবাস। গোলাপের মত তুমি আমাকে মনে রেখো,যার কাঁটার ব্যথা নয়, শুধু ভালোবাসার সুরভিটুকুই মানুষ আজীবন বুকে ধরে রাখে।"
মৃত্তিকা চোখ বন্ধ করল। তার মুখে নেমে এলো এক অপার্থিব, নির্মল প্রশান্তি। তার মুখের সেই স্মিত হাসিটি যেন অনন্তকালের জন্য স্থির হয়ে গেল। বাইরে তখন সাগরের জলরাশি চাঁদের আলোয় রূপালী রঙের মতো জ্বলজ্বল করছিল, আর ঘরের ভেতর নিভে গেল এক মায়াবী প্রদীপের শেষ শিখা।
মৃত্তিকার চলে যাওয়ার পর পুরো একটা বছর কেটে গেল।
অরণ্য কোনোদিন ভেঙে পড়েনি। সে কোনোদিন অঝোরে মানুষের সামনে বিলাপ করেনি। তার শোকের রূপ ছিল এক গভীর তপস্যার মতো। সে নিজেকে বন্দি করে নিয়েছিল তার চারুকলার স্টুডিওর চারদেয়ালে। দিনরাত এক করে সে কাজ করে গেছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সৃষ্টি নিয়ে।
এক বছর পর, জাতীয় চিত্রশালায় চারুকলার বার্ষিক একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয়েছিল: "গোলাপের মত তুমি"।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী সন্ধ্যায় শত শত দর্শনার্থী ভিড় জমিয়েছিল গ্যালারিতে। কিন্তু গ্যালারির মূল আকর্ষণ ছিল সেন্ট্রাল হলে টাঙানো বিশালাকার এক ক্যানভাস। সেটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে জল, মুখে স্তব্ধতা। ছবিটিতে কোনো বিষাদের অন্ধকার নেই। আছে সোনালি রোদে মাখা এক বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত। সেই বালুকাবেলার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নীল শাড়ি পরা এক অপরূপা নারী,মৃত্তিকা। তার মুখে কোনো অসুস্থতার ছাপ নেই, আছে সেই চিরন্তন স্বর্গের আলো। আর তার চারপাশে আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে সহস্র কোটি লাল গোলাপের পাপড়ি। সেই পাপড়িগুলো সাগরের ফেনিল জলে মিশে যাচ্ছে না, বরং যেন রূপান্তরিত হচ্ছে ভালোবাসার এক অনন্ত আলোককণিকায়।
ছবির নিচে এক টুকরো ব্রোঞ্জের ফলকে অরণ্যের নিজের হাতে লেখা ছিল কয়েকটি চরণ:
"গোলাপের মত তুমি ফোটেছিলে আমার নির্জন বনে, পাপড়ি ঝরে গেছে কালের নিয়মে, কিন্তু সুবাস রয়ে গেছে মনে। দেহ তো কেবল মাটির খাঁচা, প্রেম তো আত্মায় মেশে, তুমি রয়ে যাবে চির অমর হয়ে, আমার এই ক্যানভাসে।"
প্রদর্শনীর কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকে, কিন্তু অরণ্য ভিড়ের মাঝে ছিল না।
সে তখন দাঁড়িয়ে ছিল কক্সবাজারের সেই লাল সূর্য ডোবার সৈকতে, তাদের সেই পুরোনো ঝাউবনের কোণায়। পৌষের সেই বিকেলটার মতোই আজও সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিমে। লোনা বাতাসে উড়ছে তার চুল।
অরণ্যের হাতে ছিল একটি সদ্য ফোটা তাজা লাল গোলাপ। সে ফুলটিকে আলতো করে সৈকতের বালুর ওপর রেখে দিল। বাতাসে ছড়িয়ে গেল সেই চেনা, পবিত্র সুবাস।
অরণ্য আকাশের দিকে তাকাল। দূর দিগন্তে তখন অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলো মেঘের গায়ে এঁকে দিয়েছে গোলাপের মতো এক কোমল লালিমা। অরণ্যের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক পরম প্রশান্তির হাসি। সে অনুভব করতে পারল,মৃত্তিকা কোথাও হারিয়ে যায়নি। যে প্রেম দেহাতীত, যে প্রেম কোনো প্রাপ্তির শর্তে বাঁধা পড়ে না, তা চিরকাল বেঁচে থাকে হৃদয়ের গোপন প্রকোষ্ঠে এক অমলিন গোলাপের সুবাস হয়ে।
সাগরের ঢেউগুলো এসে ফুলটিকে ছুঁয়ে গেল, যেন এক দূরদেশ থেকে ফিসফিস করে বলে গেল,ভালোবাসা কখনো মরে না; সে শুধু রূপ বদলে এক অনন্ত সৌন্দর্যের অংশ হয়ে যায়।