গুলশান দুইয়ের বহুতল কাঁচঘেরা টাওয়ারের তেরো তলায় যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের একটানা মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো আওয়াজ থাকে না, তখন বুঝতে হয় ঘড়িতে রাত আটটা বেজে গেছে। ফ্লোরজুড়ে সারিবদ্ধ গ্লাস-পার্টিশন আর অ্যালুমিনিয়ামের কিউবিকলগুলো ফাঁকা। অধিকাংশ কর্মীই ট্রাফিকের ভয়ে সন্ধ্যার আগেই ল্যাপটপ বন্ধ করে নিচে নেমে গেছে। শুধু নর্থ-উইংসের এক কোণে ‘সলিউশনস আর্কিটেক্ট’ কিউবিকলটিতে তখনও মনিটরের নীলচে আলো জ্বলছিল। আবির চোখের ওপর থেকে অ্যান্টি-গ্লেয়ার চশমাটা খুলে টেবিলে রাখল। দুই আঙুল দিয়ে নাকের ডগা আর ভ্রুর খাঁজে সামান্য চাপ দিল সে। টানা ছয় ঘণ্টা ধরে ফিনটেক ক্লায়েন্টের কোর ট্রানজ্যাকশন ইঞ্জিনের ডাটাবেস আর্কিটেকচার আর কোরি রিফ্যাক্টরিং নিয়ে মাথা গুঁজে থাকতে থাকতে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো টান টান হয়ে আছে। টেবিলে রাখা সাদা সিরামিকের কফি মগটা সম্পূর্ণ খালি, তলানিতে কালচে দাগ শুকিয়ে গেছে। আবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেলান দিল রিভলভিং চেয়ারে। ঠিক তখনই পেছনের কাঁচের দরজায় দুটো আলতো টোকা পড়ল,'টক, টক'।
আবির ঘুরে তাকাল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা। পরনে অফ-হোয়াইট রঙের ফর্মাল শার্ট আর গাঢ় ধূসর ট্রাউজার্স। কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা সিল্কি চুলগুলো একটা সাধারণ মেটাল ক্লিপ দিয়ে পেছনে আটকানো, যার দু-এক গোছা ক্লান্ত ভঙ্গিতে কানের পাশে নেমে এসেছে। হাতে ধোঁয়া ওঠা কাগজের দুটো ডিসপোজেবল কাপ। মেঘলা এই বহুজাতিক সফটওয়্যার কোম্পানির সিনিয়র প্রোডাক্ট ম্যানেজার। অফিসে সে পরিচিত তার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, যুক্তিবাদী স্বভাব আর বরফশীতল পেশাদারিত্বের জন্য। ক্লায়েন্ট ডেমোতে যখন বাঘা বাঘা ডেভেলপারদের হাত কাঁপে, মেঘলা তখন স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
"ভেতরে আসব আর্কিটেক্ট সাহেব, নাকি এখনও কোডের সাথে যুদ্ধ চলছে?" মেঘলার কণ্ঠে অফিসের ফর্মাল ধারালো ভাবটা নেই; বরং তাতে মিশে আছে দিনের শেষ প্রান্তের এক নরম ক্লান্তি।
আবিরের ঠোঁটের কোণে নিঃশব্দ এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। "যুদ্ধ তো বিরতিহীন। তবে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব যদি এক কাপ গরম চা হয়, তবে প্রত্যাখ্যান করার উপায় নেই।"
মেঘলা ভেতরে এসে আবিরের মনিটরের ঠিক পাশের ফাঁকা জায়গাটিতে একটি কাপ রাখল। "চা নয়, ক্যাপুচিনো। সাততলার প্যান্ট্রি থেকে নিজের হাতে বানিয়ে আনলাম। এক চামচ চিনি, ডাবল শট এসপ্রেসো,ঠিক যেমনটা তোমার সিস্টেমে রান করে।"
আবির কাপটা হাতে তুলে নিল। কাগজের কাপের ভেতর দিয়ে হাতের তালুতে উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়তেই সে মেঘলার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো অতিরিক্ত প্রসাধন নেই, ক্লান্তি আছে, কিন্তু তার গভীরে এমন এক শান্ত স্নিগ্ধতা আছে যা এই কৃত্রিম কাঁচ আর ধাতুর তৈরি কর্পোরেট খাঁচায় বড় অচেনা।
"তোমার আজ এত দেরি কেন মেঘলা? অডিটোরিয়ামের প্রজেক্ট সাইন-অফ তো চারটার মধ্যেই হয়ে গিয়েছিল।" আবির চুমুক দিল কফিতে।
মেঘলা সামনের রিভলভিং স্টুলটা টেনে নিয়ে বসল। নিজের কফির কাপে দুই হাত জড়িয়ে ধরে সে বলল, "ইউজার একসেপ্টেন্স টেস্টের ফিডব্যাকগুলো গোছাচ্ছিলাম। ক্লায়েন্ট চাইছে রিলিজ ডেট আরও দশ দিন এগিয়ে আনতে। ওদের বোঝাচ্ছিলাম, কোড কোনো ভোজবাজি নয় যে আঙুলের তুড়িতে কম্পাইল হয়ে যাবে। এর পেছনে রক্ত-মাংসের মানুষের মেধা আর শ্রম থাকে।"
আবির হাসল। "তুমি সবসময় আমাদের মতো ব্যাক-এন্ডের ঘরকুনোদের পক্ষ নিয়ে ম্যানেজমেন্টের সাথে লড়াই করো, তাই না?"
"পক্ষ নিই না, সত্যটা বলি," মেঘলা আবিরের মনিটরে ভেসে থাকা জটিল ডাটাবেস স্কিমার দিকে চোখ বোলাল। "কারণ আমি জানি, এই স্ক্রিনের জটিল লজিকগুলোর পেছনে কতটা নিঃশব্দ ত্যাগ লুকিয়ে থাকে। একটা ফাংশনের একটা ভুল কমা যেমন পুরো সিস্টেম ক্র্যাশ করাতে পারে, তেমনি একটা সঠিক সাপোর্ট পুরো প্রজেক্টকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।"
ঘরের ভেতর এক নিবিড় নীরবতা নেমে এলো। কাঁচের বিশাল জানালার বাইরে রাতের ঢাকা তখন হেডলাইটের লাল-হলুদ আলোর নদীতে ভাসছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ঠান্ডা বাতাসকে তুচ্ছ করে দিয়ে সেই ছোট কিউবিকলটিতে দুটি কফির কাপ থেকে ওঠা বাষ্পের সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়ল এক অলৌকিক উষ্ণতা। তারা কেউ কোনো ব্যক্তিগত কথা বলল না। কোনো আবেগঘন সংলাপ নয়। অথচ এই একটানা নীরবতায়, এই রাতের আটটায় এক কাপ কফি ভাগ করে নেওয়ার সামান্য মুহূর্তে আবির অনুভব করল,কর্পোরেট ডেডলাইনের কর্কশ পৃথিবীর বাইরেও বুকের ভেতর একটু একটু করে জমছে এক অচেনা অনুভূতির নদী। ঠিক যেন বিন্দু বিন্দু জল জমে তৈরি হওয়া কোনো শান্ত জলাশয়।
একই অফিসে কাজ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা যেমন প্রতিদিন প্রিয় মুখটি চোখের সামনে থাকা, তেমনি সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে হাজারটা মুখোশের আড়ালে আটকে রাখা।
কোম্পানির অলিখিত পলিসি স্পষ্ট,একই প্রজেক্টের কোর টিমে ইন্টার-অফিস রোম্যান্স কাজের পরিবেশ ও পেশাদারিত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই অফিসের ফ্লোরে আবির শুধুই ‘মিস্টার আবির,সলিউশনস আর্কিটেক্ট’, আর মেঘলা শুধুই ‘মেঘলা আপু,পিএম’। তাদের যোগাযোগ সীমাবদ্ধ থাকে স্ল্যাক মেসেঞ্জার, অফিসিয়াল জিমেইল আর কনফারেন্স রুমের প্রজেক্টরের পর্দায়।
কিন্তু ভালোবাসা তো আর কোনো এইচআর পলিসির শর্ত মেনে চলে না। দিনটা ছিল এক বৃষ্টির মঙ্গলবার। সকাল থেকেই ঢাকার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছিল। কাঁচের দেওয়ালে জলের ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ে গড়িয়ে নামছিল নিচে। কনফারেন্স রুম 'সিন্ধিয়া'তে তখন ইউকে-র ক্লায়েন্টের সাথে স্প্রিন্ট প্ল্যানিং মিটিং চলছে। বড় স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিল মেঘলা। আচমকা এসির তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় এবং সকাল থেকে বৃষ্টিতে ভেজার কারণে মেঘলা মৃদু কাশল। একবার, দুবার। তার গলার আওয়াজ ভেঙে আসছিল। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল।
কনফারেন্স টেবিলের শেষ মাথায় ল্যাপটপ নিয়ে বসেছিল আবির। সে স্ক্রিনে চোখ রেখেও সবকিছু লক্ষ্য করছিল। মিটিং থামল না। কিন্তু দশ মিনিটের মাথায় দরজায় মৃদু নক করে অফিসের পিয়ন একটি কাঁচের গ্লাসে গরম পানি, লবঙ্গ আর এক টুকরো আদা নিয়ে কনফারেন্স রুমে ঢুকল। ট্রে-টা সরাসরি গিয়ে ঠেকল মেঘলার পোডিয়ামের পাশে।
পিয়ন নিচু স্বরে বলল, "আবির ভাই দিতে বললেন আপা।"
মেঘলা এক সেকেন্ডের জন্য কথা থামাল। সে স্লাইডের ওপর থেকে চোখ তুলে সরাসরি তাকাল কনফারেন্স টেবিলের একদম শেষ মাথায় বসা আবিরের দিকে। আবির তখন ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালাচ্ছে, মুখ নিচু করা। যেন সে কিছুই জানে না, যেন এইমাত্র কোনো কোডের বাগ ফিক্স করতে সে সম্পূর্ণ মগ্ন। কিন্তু তার ডান চোখের কোণে খুব সূক্ষ্ম এক চিলতে স্বস্তি আর সতর্কতা ফুটে উঠেছিল।
মেঘলা কাঁচের গ্লাসটা হাতে তুলে নিল। গরম পানির এক চুমুক তার গলার ক্ষতটাকে যেমন ভিজিয়ে দিল, তেমনি তার বুকের ভেতরের সমস্ত দেয়াল ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত মায়া। পুরো মিটিং রুমভর্তি মানুষ দেখল একজন প্রোডাক্ট ম্যানেজার এক গ্লাস গরম পানি খেয়ে প্রেজেন্টেশন চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মেঘলা জানল,এই ভিড়ের ভেতর, শত শত চোখের আড়ালে কেউ একজন নিঃশব্দে তাকে আগলে রেখেছে। কেউ একজন তাকে দেখছে কেবল একজন সফল কর্মী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে।
মিটিং শেষে সবাই যখন ফাইলপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেল, মেঘলা ধীরে ধীরে আবিরের কিউবিকলের সামনে এসে দাঁড়াল। আবির ল্যাপটপ ব্যাগে ভরছিল। মেঘলাকে দেখে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। "গলা এখন ঠিক আছে?"
মেঘলা কোনো উত্তর দিল না। সে নিজের হাতব্যাগ থেকে একটা ছোট কাঁচের শিশি বের করে আবিরের টেবিলের ওপর রাখল।
"এটা কী?" আবির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"তুমি গত তিন দিন ধরে রাতে ঘুমাচ্ছ না। চোখের নিচে কালি পড়েছে। এটা খাঁটি ইউক্যালিপটাস তেল। রাতে ঘুমানোর আগে বালিশে দুই ফোঁটা দিয়ে ঘুমাবে, নিঃশ্বাস নিতে আরাম হবে আর মাথা ধরা কমবে।" মেঘলার কণ্ঠস্বর খুব নিচু, কিন্তু ভারী।
আবির শিশিটার দিকে তাকাল, তারপর তাকাল মেঘলার চোখের দিকে।
"মেঘলা..."
"আমরা কি শুধু প্রজেক্টের কোড আর স্প্রিন্ট নিয়েই কথা বলব আবির?" মেঘলা প্রথমবারের মতো তার পেশাদারিত্বের শক্ত খোলসটা খুলে ফেলল। তার চোখে তখন জমে উঠেছে একরাশ গোপন অভিমান। "তুমি এত নিখুঁতভাবে খেয়াল রাখো, অথচ একটা বারের জন্যও নিজের কথা বলো না কেন? কেন সবসময় এত দূরত্ব বজায় রেখে চলো?"
আবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে এক পা এগিয়ে এলো। কিউবিকলের পার্টিশনের আড়ালে তাদের দুজনের মাঝে দূরত্ব রইল মাত্র কয়েক ইঞ্চির। "কারণ আমি ভয় পাই মেঘলা," আবির খুব শান্ত স্বরে বলল। "আমি এই কর্পোরেট দুনিয়ায় হাজারটা সম্পর্ককে তুচ্ছ কারণে ভাঙতে দেখেছি। আমি চাইনি আমার কারণে তোমার ক্যারিয়ারে কোনো দাগ লাগুক। আমি চাইনি অফিসের মানুষ আমাদের নিয়ে ফিসফিস করুক। তুমি আমার কাছে কোনো ক্ষণস্থায়ী আবেগ নও। তুমি আমার সেই অভ্যাস, যা ছাড়া আমি আমার একটা দিনও ভাবতে পারি না।"
মেঘলার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে নিজের হাতটি টেবিলের ওপর রাখা আবিরের হাতের কাছে এগিয়ে নিল। তাদের আঙুলগুলো একে অপরকে স্পর্শ করল না, কিন্তু সেই কয়েক মিলিমিটারের শূন্যতার ভেতর দিয়ে বয়ে গেল এক তীব্র বৈদ্যুতিক প্রবাহ।
"তুমি সিস্টেম আর্কিটেক্ট আবির," মেঘলা মৃদু হাসল, তার চোখে জল চিকচিক করছিল। "তুমি সিস্টেমের ত্রুটি ঠিক করতে জানো, কিন্তু মানুষের মন বুঝতে এত ভুল করো কেন? তুমি ভেবেছ আমি ক্যারিয়ারের ভয়ে তোমাকে দূরে রাখব? যে মানুষটা আমার সামান্য কাশির শব্দে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তার চেয়ে বড় কোনো নিরাপত্তা আমার জীবনে আর কিছু হতে পারে?"
আবির তার হাতটি সামান্য বাড়িয়ে মেঘলার ঠান্ডা আঙুলের ডগাগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
সেই প্রথম স্পর্শ। অফিসের এসির যান্ত্রিক শীতলতা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল।
তারা দাঁড়িয়ে রইল কিউবিকলের আলো-আঁধারিতে। কোনো নাটকীয় অঙ্গীকার নেই, কোনো প্রথাগত প্রেমের ঘোষণা নেই। শুধু দুটি পরিপক্ক, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ নিঃশব্দে একে অপরকে জানিয়ে দিল,তারা আর একা নয়।
বসন্তের শুরুতেই কোম্পানিতে এলো এক বড় দুর্যোগ। সিঙ্গাপুরের প্রধান ক্লায়েন্টের লাইভ প্রোডাকশন সিস্টেমে গভীর রাতে এক মারাত্মক সিকিউরিটি ব্রিচ ধরা পড়ল। রাত তিনটায় ইমার্জেন্সি কল বেজে উঠল পুরো টেক টিমের। ভোরের আলো ফোটার আগেই আবির, মেঘলা এবং প্রধান ইঞ্জিনিয়াররা অফিসে এসে হাজির হলো। পুরো ফ্লোরে তখন তীব্র উত্তেজনা। ম্যানেজমেন্টের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জুম কলে চিৎকার করছেন। ক্লায়েন্ট হুমকি দিচ্ছে কন্ট্রাক্ট বাতিল করার। কোটি টাকার ক্ষতি আর কোম্পানির সুনামের প্রশ্ন।
আবিরের হাত কাঁপছিল না, কিন্তু তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। সে সার্ভারের লগ ফাইলগুলো একের পর এক বিশ্লেষণ করছিল। টানা বারো ঘণ্টা কোনো খাওয়া নেই, কোনো বিশ্রাম নেই। সমস্যাটা ছিল একটি জটিল মেমোরি লিক আর এনক্রিপশন প্রোটোকলের অসামঞ্জস্যতা। ক্লায়েন্ট আলটিমেটাম দিল,বিকেল পাঁচটার মধ্যে প্যাচ রিলিজ না হলে তারা সার্ভিস বন্ধ করে দেবে। বিকেল চারটা বেজে কুড়ি মিনিট। পুরো টিম যখন হতাশায় ভেঙে পড়ার উপক্রম, ম্যানেজমেন্ট যখন হাল ছেড়ে দিয়েছে, আবির তখন নিঃশব্দে কোড লিখে চলেছে। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডে ঝড়ের গতিতে চলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘলা এসে দাঁড়াল আবিরের চেয়ারের পেছনে।
সে কোনো কথা বলল না। কোনো সান্ত্বনা দিল না। সে শুধু তার ডান হাতটি খুব আলতো করে, পরম নির্ভরতায় আবিরের শক্ত হয়ে থাকা কাঁধের ওপর রাখল।
সেই স্পর্শে এমন এক অপার্থিব শক্তি ছিল, যা কেবল ভালোবাসার মানুষই জোগাতে পারে। আবির এক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করল। সে অনুভব করল,পুরো পৃথিবী একদিকে আর এই মানুষটি তার পেছনে পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ওপর মেঘলার এই অটুট বিশ্বাসই ছিল তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আবির চোখ খুলল। শেষ এন্টার কি-টি চাপল।
বিল্ড সাকসেসফুল। ডিপ্লয়মেন্ট কমপ্লিট।
পাঁচ মিনিটের মাথায় মনিটরে সবুজ সংকেত জ্বলে উঠল। ক্লায়েন্টের সিস্টেম স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
কনফারেন্স রুমে উল্লাসের রোল উঠল। সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরল, হাততালি দিল। ম্যানেজমেন্ট আবিরকে অভিবাদন জানাতে ছুটে এলো।
কিন্তু সেই তুমুল কোলাহল আর করতালির মাঝে আবিরের চোখ শুধু খুঁজছিল একজনকে। ফ্লোরের কাঁচের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা। তার মুখে কোনো অহংকার নেই, কোনো বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই। তার ক্লান্ত মুখের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে এক অনাবিল, গর্বিত হাসি। আর তার চোখ দুটো তখন অশ্রুর জলে ভিজে চিকচিক করছে। আবির ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। সে কারও পরোয়া করল না। কোনো সহকর্মীর কৌতুহলী চাহনি, কোনো এইচআরের নিয়ম,কোনো কিছুই আর তাদের মাঝে দাঁড়াতে পারল না। আবির গিয়ে দাঁড়াল মেঘলার ঠিক সামনে। "তুমি বিশ্বাস করেছিলে?" আবিরের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ।
মেঘলা তার চোখের কোণের জলটুকু মুছে মৃদু হাসল। "আমি জানতাম তুমি পারবে। কারণ যে মানুষটা বিন্দু বিন্দু যত্ন দিয়ে ভালোবাসতে জানে, সে নিজের সৃষ্টিকে কোনোদিন ব্যর্থ হতে দেয় না।"
সেদিন অফিস শেষ হতে হতে রাত দশটা বেজে গেল। কোম্পানি পুরো টিমকে ডিনারের অফার দিয়েছিল, কিন্তু আবির আর মেঘলা দুজনেই বিনীতভাবে তা এড়িয়ে গেল। শহরের রাজপথে তখন ট্রাফিকের চাপ কমে এসেছে। ফাল্গুনের রাতের বাতাসটা ছিল অদ্ভুত রকমের মিষ্টি। গুলশানের লেকপাড়ের ফুটপাত ধরে তারা পাশাপাশি হাঁটছিল।
এবার আর কোনো কিউবিকলের পার্টিশন নেই, কোনো কাঁচের দেয়াল নেই। আবিরের পরনে ছিল সাধারণ কালো টি-শার্ট আর জিন্স, কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। মেঘলা তার ফর্মাল ব্লেজারটা খুলে হাতে ঝুলিয়ে নিয়েছিল।
"অফিসে কিন্তু সবাই টের পেয়ে গেছে আবির," মেঘলা ফুটপাতের রেলিং ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল। তার কণ্ঠে কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক ধরণের মুক্ত আনন্দের রেশ।
আবির তার দিকে তাকাল। "কী টের পেয়েছে?"
"ওই যে... সলিউশনস আর্কিটেক্ট আর প্রোডাক্ট ম্যানেজারের মাঝে শুধু প্রজেক্টের সম্পর্ক নয়, আরও বড় কোনো কোড রান করছে।" মেঘলা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দ রাতের নির্জন লেকের জলে সুর তুলে ছড়িয়ে পড়ল। আবির হাসল। সে থেমে দাঁড়াল। মেঘলাও থামল। লেকের ওপর তখন শহরের নিয়ন আলোর প্রতিবিম্ব কাঁপছে।
আবির খুব ধীরভঙ্গিতে মেঘলার সামনে এসে দাঁড়াল। সে তার পকেট থেকে কোনো ভারী উপহার বা দামি রিং বের করল না। সে শুধু তার হাতটি বাড়িয়ে মেঘলার হাতের নরম তালুটি নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় তুলে নিল। এবার আর কোনো কাজের ছলে নয়। প্রকাশ্যে, এই মুক্ত আকাশের নিচে, নিজের সমস্ত অধিকার আর ভালোবাসায় সে মেঘলার আঙুলগুলোকে নিজের আঙুলে জড়িয়ে নিল।
"মেঘলা," আবির গভীর চোখে তাকাল। "আমাদের সম্পর্কটা কোনো একদিনের তুমুল আবেগ দিয়ে শুরু হয়নি। প্রতিদিন সকালে তোমার একটা নিঃশব্দ হাসিতে, দুপুরে একটা চেনা চাহনিতে, আর রাতে এই এক কাপ কফির ভাগাভাগিতে... একটু একটু করে গড়ে উঠেছে। এ যেন বিন্দু বিন্দু অনুরাগে তৈরি হওয়া এক মহাসমুদ্র।"
মেঘলা তার অন্য হাতটি দিয়ে আবিরের হাতটি জড়িয়ে ধরল। সে নিজের কপালটি আলতো করে ঠেকিয়ে দিল আবিরের চওড়া কাঁধে।
"আমি এই সমুদ্রেই ডুবে থাকতে চাই আবির," মেঘলা ফিসফিস করে বলল। "যেখানে কোনো মেকি শব্দ নেই, কোনো শর্ত নেই। শুধু আছে দুটি মানুষের একে অপরকে নিঃশর্তভাবে চিনে নেওয়ার তৃপ্তি।"
দূরে গুলশানের আকাশচুম্বী টাওয়ারগুলোর কাঁচের দেওয়ালে তখন শহরের নিয়ন বাতিগুলো নিভে আসছিল। কিন্তু সেই রাতের নিস্তব্ধতায়, ফুটপাতের এক চিলতে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষের বুকের ভেতর জ্বলতে লাগল এক অমর, অপার্থিব আলো, যা কোনো যান্ত্রিক নিয়মে বাঁধা যায় না, যা শুধু দুটি আত্মাকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে চিরন্তন করে রাখে।