Story

মাস্তান ভূতের কাণ্ড

October 10, 2026

15 views

রাত তখন আড়াইটা কি পৌনে তিনটা। পুরোনো ঢাকার নারিন্দার গলিপথগুলোতে এমনিতেই দিনের বেলাতেও রোদ ঠিকমতো পৌঁছায় না, আর গভীর রাতে সেখানে নেমে আসে আদিম কোনো নিস্তব্ধতা। আশপাশের প্রাচীন দোতলা-তেতলা বাড়িগুলো যেন একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। কেবল দূরবর্তী কোনো ছাদ থেকে নিশাচর বিড়ালের তীব্র ঝগড়া কিংবা মেইন রোডের কোনো একাকী ট্রাকের ভোঁতা হর্নের শব্দে মাঝেমধ্যে সেই নিস্তব্ধতা কেঁপে ওঠে। জাবির ঘুমিয়েছিল মাহিনদের পুরোনো পৈতৃক বাড়ির দোতলার দক্ষিণ কোণের অতিথি কক্ষে। খাটটা সেগুন কাঠের, সম্ভবত মাহিনের দাদার আমলের। পায়াগুলোতে সূক্ষ্ম লতাপাতার খোদাই করা কাজ, আর মাথার দিকের কাঠের ফ্রেমে খোদাই করা একটি ময়ূর যেন অন্ধকারের ভেতরেও ডানা মেলে বসে আছে। জাবিরের ঘুমের ঘোরটা হঠাৎ আলগা হয়ে এলো এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে।

বাতাসে চেনা কোনো গন্ধ নেই। নারিন্দার যে চেনা নোনা ড্যাম্প দেওয়ালের সোঁদা ঘ্রাণ থাকে, তার বদলে হঠাৎ একরাশ কড়া জর্দা দেওয়া খয়েরি পানের সুবাস আর সস্তা কোনো ক্যামেলিয়া হেয়ার অয়েলের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ঘরের ভেতরে পাক খেতে লাগল। সেই গন্ধটা এতটাই কড়া যে জাবিরের নাক জ্বালা করে উঠল।

আর ঠিক তখনই শব্দটা শুরু হলো।

প্রথমে মনে হচ্ছিল কোনো ইঁদুর হয়তো মেঝের ওপর পড়ে থাকা চিপসের খালি প্যাকেট টানাটানি করছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জাবিরের তন্দ্রাচ্ছন্ন মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠল—না, এটা কোনো ইঁদুরের কাজ নয়।

খটাস... খটাস... খটাং!

শব্দটা ভারী কোনো কাঠের বা ধাতুর তৈরি জিনিসের। যেন কেউ খুব আয়েশ করে একটা ভারী খড়ম বা কাঠের চটি পরে ঘরের মোজাইক করা মেঝের ওপর পায়চারি করছে। পায়ের আওয়াজটা স্থির নয়; জানালার পাশ থেকে শুরু হয়ে খাটের পায়ার দিকে আসে, তারপর আবার থেমে যায়। জাবিরের শিরদাঁড়া বেয়ে এক অচেনা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। সে কম্বলের নিচেই শরীর শক্ত করে কান খাড়া করল।

ক্লিক-ক্ল্যাক... ক্লিক-ক্ল্যাক!

এবার শব্দটা একদম বদলে গেল। স্পষ্ট চেনা একটি ধাতব শব্দ। কেউ একজন খুব দ্রুত একটা রামপুরি ফোল্ডিং চাকুর লক খুলছে আর বন্ধ করছে! ধাতব স্প্রিংয়ের সেই কর্কশ শব্দের পরপরই ঘরের ঠিক মাঝখান থেকে খুব নিচু, ভাঙা এবং খসখসে এক কণ্ঠের চাপা স্বগতোক্তি ভেসে এলো:

"কিরে ভাতিজা! ঘুমাইতে আইছস না মশার কামড় খাইতে আইছস? ঠ্যাং দুইডা একটু বাঁকা কইরা শো, নইলে কিন্তু সাইজ কইরা দিমু!"

জাবিরের নিঃশ্বাস এক লহমায় বন্ধ হয়ে গেল। তার হাত-পা জমে বরফ। সে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র, বিজ্ঞান ক্লাবের সদস্য, যুক্তিবাদী হিসেবে তার সুনাম আছে। ভূত-প্রেত, জিন-পরী নিয়ে বন্ধুদের গালগল্পকে সে সবসময় সস্তা কুসংস্কার বলেই উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, মাঝরাতে, সম্পূর্ণ অচেনা একটি ঘরে নিজের খাটের ঠিক তিন হাত দূরে এমন জলজ্যান্ত ঢাকাইয়া ভাষার মাস্তানি ডায়লগ শুনে তার বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্কের যাবতীয় নিউরন যেন শর্টসার্কিট খেয়ে গেল! সে কম্বলের ফাঁক দিয়ে সন্তর্পণে চোখের পাতা সামান্য ফাঁক করল। ঘরের জানালার ভারী নীল পর্দাটা সামান্য সরে আছে। সেই ফাঁক গলে রাস্তার সোডিয়াম বাতির এক চিলতে হলদে আলো এসে পড়েছে ঘরের মেঝের ঠিক মাঝখানে।

আর সেই আলোর ঠিক বৃত্তটিতে দাঁড়িয়ে আছে এক মূর্তি!মূর্তিটি সাধারণ কোনো ছায়া নয়, আবার সম্পূর্ণ নিরেট কোনো মানুষও নয়। তার দেহের সীমানাটা যেন হালকা ধোঁয়াটে বাষ্পের মতো কাঁপছে। উচ্চতা খুব বেশি হলে পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। পরনে ঘন খয়েরি রঙের সিল্কের লুঙ্গি, যা হাঁটুর ওপরে মালকোঁচা মেরে পরা। গায়ে একটা পুরোনো আমলের ফিনফিনে সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি, যার বুকপকেটে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা গোল লাল রঙের প্যাকেটের রূপরেখা, সম্ভবত 'ফাইভ ফিফটি ফাইভ' বা 'গোল্ডফ্লেক' সিগারেটের প্যাকেট। গলায় একটা মোটা পেঁচানো সোনার চেইনের মতো চকচকে ধাতব শিকল। আর লোকটার ডান কান দিয়ে পেছনে গোঁজা রয়েছে আস্ত একটা আধপোড়া বিড়ি!

সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তার বসার ভঙ্গি। ঘরের বাতাসেই, মেঝে থেকে প্রায় এক হাত শূন্যে, লোকটা যেন কোনো অদৃশ্য টুলের ওপর এক পা তুলে দিয়ে আরাম করে বসে আছে! তার বাঁ হাতে একটা চকচকে স্টিলের ফোল্ডিং চাকু, যা সে এক আঙুলের টোকায় অনবরত ঘোরাচ্ছে আর ক্যাঁচ-ক্লিক শব্দে বন্ধ করছে।

"কী রে? চোখ মিটমিট করোস ক্যান? দিলি তো মেজাজটা খিঁচড়ায়া!" মূর্তিটি এবার সরাসরি জাবিরের খাটের দিকে মুখ ঘোরাল।

মুখের ওপর আলো পড়তেই জাবিরের রক্ত হিম হয়ে গেল। লোকটার বাঁ গালে কান থেকে থুতনি পর্যন্ত গভীর এক কাটা দাগ, পুরোনো কোনো ক্ষুর বা ব্লেডের জখম। তবে তার চোখ দুটো লাল টকটকে, ঠিক যেন জ্বলন্ত কয়লার দুটি টুকরো। আর তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে লালচে পানের পিক যেন টপকে পড়ার উপক্রম, কিন্তু মেঝেতে পড়ার আগেই বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। জাবির আর সহ্য করতে পারল না। তার বুক চিরে এক অমানুষিক আর্তনাদ বের হয়ে এলো-"মাহিনরেএএএ!"

 

সে এক লাফে কম্বল ছুড়ে ফেলে খাটের বিপরীত প্রান্ত দিয়ে মাটিতে পা রাখল। কিন্তু মেঝেতে পা রাখা মাত্রই তার মনে হলো ঘরের তাপমাত্রা মাইনাস দশ ডিগ্রিতে নেমে গেছে। বরফের মতো ঠান্ডা মেঝের স্পর্শে তার পা অবশ হয়ে গেল। সে কোনোমতে দরজা হাতড়ে ছিটকিনি টেনে এক ঝটকায় খুলে করিডোরে বেরিয়ে এলো।

পেছন থেকে সেই খসখসে কণ্ঠের এক ব্যঙ্গাত্মক অট্টহাসি ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেতে লাগল—

"হা হা হা! ডরাইলি? ভাগলি কেন মামু? চায়ের কাপটা তো খালি পইড়া রইল!"

সকালের নরম রোদ যখন নারিন্দার পুরোনো গলিপথ দিয়ে মাহিনদের বাড়ির খাওয়ার ঘরে এসে পড়ল, তখনো জাবিরের হাত থেকে ভোরের কাঁপুনি পুরোপুরি থামেনি। টেবিলে ধোঁয়া ওঠা পরোটা, ডিম ভাজি আর ঘন দুধের চা রাখা। কিন্তু জাবির এক লোকমাও মুখে তুলতে পারেনি। তার চোখের নিচে কালচে ছোপ, চুলগুলো উসকোখুসকো। তার উল্টো পাশে বসে আয়েশ করে পরোটায় ডিম মুড়ে খাচ্ছিল মাহিন। মাহিন জাবিরের স্কুলের সবচেয়ে পুরোনো বন্ধু। স্বাস্থ্যটা গোলগাল, কথায় কোনো রাখঢাক নেই, আর তার চেয়েও বড় কথা দুনিয়ার কোনো বিষয়কেই সে সহজে সিরিয়াসলি নেয় না।

"তুই আমাকে সত্যি বলছিস না মাহিন," জাবির চায়ের কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে প্রায় ফিসফিস করে বলল। "কাল রাতে ওই ঘরে কেউ একজন ছিল। কোনো চোর বা রক্ত-মাংসের মানুষ নয়। সে... সে শূন্যে বসে ছিল! তার গায়ে খয়েরি লুঙ্গি আর মুখে কাটা দাগ!"

মাহিন পরোটা চিবানো থামিয়ে এক মুহূর্ত জাবিরের চোখের দিকে তাকাল। তারপর তার গোলগাল মুখে এক অদ্ভুত দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল।

"ওহ্! তার মানে কাল রাতে তোকে 'লালু ভাই' রিসিভ করেছে?" মাহিন খুব নির্লিপ্ত গলায় বলল, যেন সে কোনো সাধারণ গৃহশিক্ষক বা বাড়ির কাজের লোকের কথা বলছে।

জাবির বিষম খেল। "কী বললি? লালু ভাই? তুই জানিস ওটা কে?"

মাহিন চায়ের কাপে এক লম্বা চুমুক দিয়ে আরামের শব্দ করল। "আরে ধুর, জানব না মানে? লালু ভাই তো আমাদের এই বাড়ির নন-পেয়িং পার্মানেন্ট গেস্ট! প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই ঘরেই থাকেন। তবে তুই এত ভয় পেয়েছিস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। আমি ভাবলাম তোরা রেসিডেনসিয়ালের সায়েন্স ক্লাবের ছেলেরা ভূত-টুত মানিস না!"

"ফাজলামি রাখ মাহিন!" জাবিরের মেজাজ এবার চড়ে গেল। "আমি কাল রাতে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছি। লোকটার হাতে রামপুরি চাকু ছিল! সে আমার দিকে তাকিয়ে বলছে 'সাইজ কইরা দিমু!' এটা তোর কাছে রসিকতা মনে হচ্ছে?"

এই সময় খাওয়ার ঘরে ঢুকলেন মাহিনের দাদি, রাবেয়া খাতুন। বয়স আশি ছুঁইছুঁই, কিন্তু শরীর এখনো টানটান। সাদা থান পরা, চোখে রূপালী ফ্রেমের পুরোনো চশমা। হাতে একটা পানের বাটা।

তিনি জাবিরের সামনে এক বাটি পায়েস এগিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "দাদুভাই, তোমার কোনো দোষ নাই। বাইরের মানুষ ওই ঘরে শুইলে লালু একটু ফুটানি দেখায়। ওর স্বভাবটাই ওইরকম ছিল জীবদ্দশায়, মরার পরেও সেই তেজ যায় নাই।"

জাবির হতবাক হয়ে দাদির মুখের দিকে তাকাল। "দাদু, আপনিও জানেন? উনি কে আসলে?"

দাদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঠের চেয়ারে বসলেন। পানের বাটা থেকে একটা সুপারি নিয়ে যাঁতি দিয়ে কুচাতে কুচাতে বলতে শুরু করলেন এক বিস্মৃত সময়ের গল্প।

"তখন উনিশশো আশির দশকের মাঝামাঝি সময়। এই নারিন্দা, দয়াগঞ্জ আর সূত্রাপুর কাঁপিয়ে বেড়াত লালু। পুরো নাম ছিল লাল মিয়া, কিন্তু সবাই ডাকত 'টেরা লালু' বা 'লালু মাস্তান'। দেখতে যেমন বাঘের মতো তেজ, মেজাজটাও ছিল খাণ্ডার। কিন্তু একটা গুণ ছিল ওর—গরিব-দুখীর গায়ে কোনোদিন হাত তুলত না। মহল্লার বিচার-আচার, মা-বোনদের ইজ্জত বাঁচানো, আর বড় বড় গুন্ডাদের সাইজ করা, এই ছিল ওর কাজ। আমার মরহুম শ্বশুরমশাইকে লালু নিজের বাপের মতো ভক্তি করত।"

দাদি থামলেন, সুপারিটা পানের ভেতর মুড়ে গালে দিয়ে বললেন, "তখন আমাদের এই বাড়িটা নতুন দোতলা হচ্ছে। একদিন রাতে সূত্রাপুরের কালা চান আর তার গ্যাং এই এলাকায় হানা দেয় এক জমি দখলের জন্য। লালু একাই তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কালা চানের পুরো দলকে রামপুরি চাকু দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু শেষমেশ পেছন থেকে কালা চানের এক শাগরেদ ওর পেটে পাইপগান দিয়ে গুলি করে। রক্তাক্ত লালু কোনোমতে দৌড়ে আমাদের এই বাড়ির দোতলার ওই দক্ষিণ কোণের ঘরে এসে লুটিয়ে পড়ে। আমার শ্বশুর ওর মাথায় পানি ঢালতে ঢালতেই ও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মরার আগে বলে গেছিল—'চৌধুরী সাব, এই বাড়ি ছাইড়া আমি কোনোদিন যামু না। এই বাড়ির পাহারা আমি মরলেও দিমু।' সেই থেকে লালু ওই ঘরের মায়া কাটাতে পারেনি। ওর শরীরটা কবরস্থানে গেছে ঠিকই, কিন্তু ওর মাস্তানিটা ওই ঘরেই রয়ে গেছে।"

জাবির চুপ করে শুনছিল। সকালের নরম আলোতেও গল্পটা শুনে তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। "কিন্তু দাদু, উনি আমার সাথে মাস্তানি করলেন কেন? আমি তো এই বাড়ির কোনো ক্ষতি করতে আসিনি!"

মাহিন এবার হেসে উঠল। "আরে লালু ভাইয়ের একটা নিয়ম আছে জাবির। ওই ঘরে যে-ই শোয়, তাকে প্রথমে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে। যদি ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়, তবে লালু ভাই খুব খুশি হয়, ভাবে তার মাস্তানি এখনো অটুট আছে। আর যদি কেউ তাকে পাত্তাই না দেয়, তবে সে নানাভাবে ঘাড় ত্যাড়ামি শুরু করে।"

"তাহলে উপায়?" জাবির কপালে হাত দিয়ে বসল। "আজ রাতেও তো আমাকে ওই ঘরেই ঘুমাতে হবে। পাশের ঘরে তো তোদের আত্মীয়রা এসেছে!" মাহিন জাবিরের কাঁধে একটা চাপড় মারল। "উপায় একটাই দোস্ত। লালু ভাইয়ের সাথে সমঝোতায় আসা! তোকে আজ রাতে ওই মাস্তান ভূতের মন জয় করতে হবে। নইলে পুরো তিন দিন তোকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হবে!"

"ভূতের মন জয়?" জাবির চোখ কপালে তুলল। "কী দিয়ে? কোরআন খতম দিয়ে, নাকি ভূত তাড়ানোর ওঝা ডেকে?"

মাহিন চোখ টিপল। "ওঝা ডাকলে লালু ভাই ওঝার লুঙ্গি খুলে নিয়ে দৌড়ানি দেবে! মাস্তানকে বশ করতে হয় মাস্তানি টেকনিকে। আজ বিকেলে তোকে নিয়ে দয়াগঞ্জ যাব। লালু ভাইয়ের পছন্দের ভেট জোগাড় করতে হবে!"

বিকেলবেলা নারিন্দার বাতাসে যখন কাচ্চি বিরিয়ানির সুবাস আর বাকরখানির তন্দুরের মিষ্টি ধোঁয়া উড়ছিল, তখন মাহিন জাবিরকে টেনে নিয়ে গেল দয়াগঞ্জের পুরোনো বাজারের এক ঘিঞ্জি গলিতে। সেখানে এক চিলতে ভাঙা কাঠের দোকানে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। সাদা দাড়ি, চোখে ছানি পড়া, কিন্তু হাতে পানের খিলি বানানোর নিখুঁত গতি। দোকানের নাম 'হাজী মহিউদ্দিনের আসল শাহি পান'। মাহিন দোকানে গিয়ে খুব গম্ভীর মুখে বলল, "চাচা, খাঁটি শাহি মসলা দিয়ে চারটা পান বানান তো। চুনের পরিমাণ একদম কম, খয়ের বেশি, আর ওপরে দিবেন আসল 'বাবা জর্দা'। এমন ঝাঁঝ যেন মুখে দিলেই কান দিয়ে ধোঁয়া বের হয়!"

দোকানি ফিক করে হেসে বললেন, "কার জন্য নিচ্ছিস মিয়া ভাই? লালু ভাইয়ের জন্য নাকি?"

জাবির চমকে মাহিনের দিকে তাকাল। দোকানদারও জানে?

মাহিন মুচকি হেসে টাকা মিটিয়ে দিল। "হ্যাঁ চাচা, মেহমান আসছে তো, একটু খাতির-যত্ন করা দরকার।"

পান নিয়ে তারা গেল পাশের এক পুরোনো আমলের চায়ের স্টলে। সেখান থেকে কেনা হলো এক প্যাকেট আসল গোল্ডফ্লেক সিগারেট এবং একটা দামি কাঠের দিয়াশলাই। সবশেষে মাহিন জাবিরকে নিয়ে গেল দয়াগঞ্জের মোড়ের সেই বিখ্যাত 'হালিম মিয়ার বিরিয়ানি হাউজে'। সেখান থেকে কেনা হলো শালপাতায় মোড়ানো গরম খাসির তেহারি যার থেকে ছড়ানো খাঁটি সরিষার তেলের ঝাঁঝালো সুবাস যেকোনো ভোজনরসিকের জিভে জল এনে দিতে বাধ্য।

ঘরে ফিরে জাবির তার সায়েন্স ক্লাবের মনস্তত্ত্ব ঝেড়ে ফেলে পুরোপুরি বাস্তববাদী রণকৌশলে নামল। সে বুঝতে পারল, অলৌকিক হোক বা মানসিক বিভ্রম আজ রাতের এই সংকটটি তাকে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে। রাত এগারোটা। পুরো বাড়ি আবার নিঝুম হয়ে গেল। মাহিন জাবিরকে দক্ষিণ কোণের সেই অতিথি কক্ষে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে বলল, "দোস্ত, অল দ্য বেস্ট! মনে রাখিস, আত্মবিশ্বাসই আসল। গলা কাঁপলে কিন্তু লালু ভাই তোকে ডিশ বানিয়ে খাবে!"

দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জাবির ঘরের মাঝখানে রাখা পুরোনো মেহগনি কাঠের গোল টেবিলটার দিকে এগোল। সে খুব যত্ন করে টেবিলের মাঝখানে শালপাতায় মোড়ানো গরম তেহারির প্যাকেটটা খুলে রাখল। তার পাশে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল হাজী চাচার সেই চারটা স্পেশাল বাবা জর্দার পান, এক প্যাকেট গোল্ডফ্লেক সিগারেট এবং খোলা একটা দিয়াশলাইয়ের বাক্স, যার একটা কাঠি সামান্য বের করে রাখা।

তারপর জাবির নিজে গিয়ে খাটের ওপর বসল। সে কম্বল গায়ে দিল না, কোনো গুটিসুটি মেরে বসল না। পরনে তার জিন্স আর টি-শার্ট। সে খাটের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে সোজা হয়ে বসে রইল।

দেওয়ালঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা ছুঁইছুঁই। ঘরের বাতাস আবার ভারী হতে শুরু করল। সেই পরিচিত নোনা গন্ধ ছাপিয়ে ঘরের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ল তীব্র এক বরফশীতল বাষ্প। জানালার ভারী পর্দাটা কোনো বাতাস ছাড়াই দুলতে লাগল—ফরফর... ফরফর! আর টেবিলের ঠিক ওপরের সিলিং ফ্যানটা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও অদ্ভুত এক ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ধীরে ধীরে উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। খটাস... খটাস... খটাং!

সেই খড়মের আওয়াজ। কিন্তু এবার শব্দটা দরজার দিক থেকে এলো না। শব্দটা এলো ঠিক জাবিরের মাথার ওপরের সিলিং থেকে! যেন কেউ সিলিংয়ের ওপর উল্টো হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে! জাবিরের হৃৎপিণ্ড ড্রামের মতো বাজতে লাগল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু সে মনে মনে আওড়াতে লাগল—আমি ভয় পাব না। ভয় পেলেই খেলা শেষ।

হঠাৎ এক তীব্র বাতাসের দমকা ঘরের ভেতরে পাক খেয়ে টেবিলের ওপর আছড়ে পড়ল। আর টেবিলের পেছনের শূন্যতা চিরে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠল লালু মাস্তান! কাল রাতের চেয়েও আজ তাকে আরও ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। তার চোখের কয়লার মতো লাল আলোটা যেন আরও উজ্জ্বল। তবে আজ তার হাতে রামপুরি চাকু ছিল না; আজ তার হাতে ছিল চকচকে স্টিলের একটি সাইকেলের চেইন-যা সে অনবরত হাতের কবজিতে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে শব্দ করছিল। ঝনঝন... খটাশ!

"কিরে পুঁচকে!" লালুর সেই খসখসে, গম্ভীর আওয়াজ ঘরের বাতাসে যেন ড্রিল মেশিনের মতো বিঁধল। "কাল রাতে তো জানের ভয়ে জানালার পর্দা ছিঁড়া ভাগছিলি! আজ আবার এই ঘরে আইছস কোন সাহসে? কলিজা কি লোহার বানাইছস?"

লালু শূন্য থেকে নেমে মেঝের ওপর দাঁড়াল। তার পায়ের চাপে মেঝের ঠান্ডা মোজাইকে যেন অদৃশ্য বরফ জমে উঠল। সে ধীরপায়ে জাবিরের খাটের দিকে এক পা বাড়াল। জাবির এবার নিজের পুরো মানসিক শক্তি একত্র করল। সে কোনো কাঁপুনি ছাড়া, অত্যন্ত স্পষ্ট এবং দৃঢ় গলায় বলে উঠল:

"কলিজা লোহার কি না জানি না লালু ভাই, তবে মেহমানদারির নিয়ম আমি জানি। আপনি তো এই এলাকার মুরব্বি, আপনার সামনে কি খালি হাতে বসা যায়?"

লালু থেমে গেল। তার চোখের লাল আলোটা এক মুহূর্তের জন্য যেন কেঁপে উঠল। তার ভ্রু দুটো কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। সম্ভবত গত তিরিশ-চল্লিশ বছরে এই ঘরে ঢোকা কোনো মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে স্বাভাবিক গলায় কথা বলেনি। সবাই হয় অজ্ঞান হয়েছে, নয়তো 'মা গো বাবা গো' বলে দৌড়ে পালিয়েছে।

"কী কলি? মুরব্বি?" লালু তার হাতের সাইকেলের চেইনটা সামান্য আলগা করল। "তুই আমারে চিনিস?"

"নারিন্দার বাঘ, কালা চানের জম, টেরা লালু ভাইকে এই এলাকায় কে না চেনে?" জাবির সোজা টেবিলের দিকে আঙুল নির্দেশ করল। "দয়াগঞ্জের হালিম ভাইয়ের স্পেশাল খাসির তেহারি, হাজী চাচার বাবা জর্দার খাস পান, আর গোল্ডফ্লেক। সবই আপনার জন্য সাজিয়ে রেখেছি। মাস্তানি তো অনেক করলেন ভাই, এবার একটু মেহমানদারি গ্রহণ করেন।"

লালু মাস্তানের মুখাবয়বে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। তার সেই বীভৎস রাগ আর হিংস্রতার আড়ালে যেন এক শতাব্দীর পুরোনো ক্ষুধার্ত, নিঃসঙ্গ এক ঢাকাইয়া যুবকের ছায়া ভেসে উঠল। সে ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগোল। শালপাতায় মোড়ানো তেহারির গন্ধটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই লালু এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। ভূত হওয়ার কারণে সে হয়তো রক্ত-মাংসের মানুষের মতো খেতে পারবে না, কিন্তু খাবারের গন্ধ আর নির্যাস গ্রহণ করার যে অতিলৌকিক ক্ষমতা প্রেতাত্মাদের থাকে, তা তার চেহারার অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

"হালিম্যার তেহারি?" লালুর গলায় এবার মাস্তানির বদলে খাঁটি পুরান ঢাকার রসিকতা ফুটে উঠল। "আরে ব্যাটা! হালিম্যার বাপ যখন মোড়ের মাথায় ডেকচি বসাইত, আমি তখন দিনে দুই বেলা মাগনা খাইতাম! ব্যাটা আমারে ডরাইয়া ডাবল খাসির গোশত দিত!"

লালু টেবিলের সামনের শূন্যে আবার সেই অদৃশ্য টুলের ওপর বসে পড়ল। সে হাত বাড়াল—তার ধোঁয়াটে আঙুলগুলো যখন শালপাতার ওপর দিয়ে বুলিয়ে গেল, জাবির দেখতে পেল প্লেটের ওপরের গরম ধোঁয়াগুলো যেন এক অদৃশ্য টানে সরাসরি লালুর মুখের ভেতর টেনে নেওয়া হচ্ছে! সেকেন্ডের মধ্যে সেই তাজা বিরিয়ানির সুবাস ফিকে হয়ে এলো, যেন তার সমস্ত প্রাণরস নিংড়ে নেওয়া হয়েছে। তারপর লালু হাত বাড়াল সিগারেটের প্যাকেটের দিকে। সে খুব কায়দা করে একটা সিগারেট তুলে ঠোঁটের ফাঁকে রাখল। কিন্তু দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতে পারছিল না, তার ধোঁয়াটে হাত শক্ত কাঠে স্পর্শ পাচ্ছিল না।

জাবির এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। তারপর সে খাট থেকে নেমে ধীরপায়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল। সে নিজের হাতে দিয়াশলাইয়ের কাঠি ঠুকে আগুন জ্বালাল।"লালু ভাই, ধরেন।"

জাবির জ্বলন্ত কাঠিটা লালুর মুখের সামনে তুলে ধরল। লালু জাবিরের চোখের দিকে তাকাল। সেই কয়লার মতো লাল চোখে এবার ভয়ের বদলে ফুটে উঠল এক গভীর কৌতূহল। লালু তার মুখটা সামান্য এগিয়ে দিল। জাবির অনুভব করল, তার হাতের কাঠির আগুনের শিখাটা স্বাভাবিক হলুদ থেকে হঠাৎ নীলচে বর্ণ ধারণ করল এবং এক ফুঁয়ে সিগারেটটির অগ্রভাগ লাল হয়ে উঠল।হুউউউশ...

এক রাশ নীলচে ধোঁয়া ঘরের সিলিংয়ের দিকে উড়িয়ে দিয়ে লালু মাস্তান আয়েশ করে তার লুঙ্গির মালকোঁচাটা সামান্য ঢিলা করল। "সাবাশ পোলা!" লালু একগাল হেসে উঠল, যা দেখে তার মুখের সেই পুরোনো কাটা দাগটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। "কলিজা আছে তোর! বাপের ব্যাটা! চৌধুরী সাবের নাতিরে কইস, মেহমান পাঠাইলে যেন তোর মতো পোলাপান পাঠায়। ওই ভীতুগুলার চিল্লাচিল্লিতে আমার কানের পর্দা ফাইটা যায়!"

জাবির স্বস্তির এক নিঃশ্বাস ফেলল। বরফ গলেছে। মাস্তান ভূত এবার লাইনে এসেছে।
রাত দুটো থেকে সাড়ে তিনটা, এই দেড় ঘণ্টা সময় জাবিরের জীবনের সবচেয়ে পরাবাস্তব এবং অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা হিসেবে খোদাই হয়ে রইল। জাবির বসে আছে খাটের কিনারায়, আর তার ঠিক তিন হাত দূরে টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে বসে অবিরাম বিড়ি ফুঁকছে এবং পানের গন্ধ শুকছে এক কুখ্যাত মাস্তানের ভূত!

"বুঝলি জাবির," লালু তার হাতের ফোল্ডিং চাকু দিয়ে বাতাসে কাল্পনিক নক্সা কাটতে কাটতে বলতে লাগল, "আমারে সবাই মাস্তান কইত ঠিকই, কিন্তু আমরা ছিলাম নিয়মের মাস্তান। এলাকার মা-বোনেরা যখন গলি দিয়া যাইত, আমরা রাস্তার মোড়ে পিঠ ফিরায়া দাঁড়াইতাম। কোনো ছ্যাঁচড়া পকেটমার বা মাস্তান যদি গরিবের রিকশার ভাড়া মারত, ধইরা ডাইরেক্ট বুড়িগঙ্গার পাড়ে নিয়া চুবাইতাম! আর এখনকার মাস্তানগুলারে দেখছস? চারআনার মুরোদ নাই, পকেটে চাইনিজ কুড়াল নিয়া টিকটক বানায়! মেজাজটা এমন গরম হয় না!"

জাবির সাহস পেয়ে জিজ্ঞেস করল, "লালু ভাই, আপনি তো চল্লিশ বছর আগে মারা গেছেন। এতদিন ধরে এই ঘরে কেন আটকে আছেন? ওপারে যাননি কেন?"

লালুর চোখের আলোটা এবার একটু ম্রিয়মাণ হয়ে এলো। সে তার হাতের চাকুটা বন্ধ করে বুকপকেটে রাখল।

"ওপারে যাওন কি এত সোজা রে ভাই?" লালু এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যার সাথে ঘরের পর্দাগুলো কেঁপে উঠল। "মরণের সময় আমার বুকের ভেতর এক মণ রাগ আর জিদ জমা ছিল। কালা চানের ওই বেইমানিটা আমি ভুলতে পারি নাই। ও আমারে পেছন দিয়া গুলি করছিল! ওই রাগটাই আমারে এই দুনিয়ায় বাইন্ধা রাখছে। তাছাড়া... এই বাড়িটার মায়া আমি ছাড়তে পারি না। চৌধুরী সাব আমারে নিজের পোলাপানের মতো দেখতেন। আমার তো নিজের কেউ ছিল না। এই বাড়িটাই আমার সংসার।"

"কিন্তু কালা চানের কী হলো?" জাবির জানতে চাইল।

লালুর মুখে এক পৈশাচিক বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। "কী আবার হইব? আমি মরণের ঠিক সাত দিনের মাথায় কালা চান যখন রাতবিরেতে এই নারিন্দার পুল পার হইতেছিল, আমি তারে এমন এক তাড়া দিছিলাম যে ব্যাটা দৌড়াইতে গিয়া সোজা নর্দমায় পইড়া নিজের পিস্তলের গুলিতেই নিজের ভবলীলা সাঙ্গ করছিল! হাহাহা! লালুর লগে বেইমানি কইরা কেউ বাঁচে?"

জাবিরের শিরদাঁড়া দিয়ে আবার মৃদু কাঁপুনি বয়ে গেল। লোকটা ভূত হওয়ার পরেও শত্রু নিকেশ করেছে!

"তবে শোন জাবির," লালু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। তার লাল চোখ দুটো জানালার দিকে ঘুরে গেল। "আজ রাইতে কিন্তু একটা গ্যাঞ্জাম লাগব।"

জাবির সোজা হয়ে বসল। "গ্যাঞ্জাম মানে? কীসের গ্যাঞ্জাম?"

"ওই যে পুরান ঢাকার পোড়া কালামের নাম শুনছস? সূত্রাপুরের কালাম গ্যাং?" লালুর গলায় আবার মাস্তানির ধার ফিরে এলো। "গত কয়েকদিন ধইরা দেখতেছি কালামের চার-পাঁচটা ছোকরা এই চৌধুরী সাবের বাড়ির ওপর নজর রাখতাছে। এই বাড়ির পেছনের যে পুরোনো গ্যারেজ আর খালি জায়গাটা আছে, ওইটা দখল দেওয়ার পাঁয়তারা করতাছে। আজ অমাবস্যার রাত, বাড়ি একদম শুনশান। খবর পাইছি, আজ শেষ রাতে ওরা পেছনের দেওয়াল টপকায়া ঢুকব। ভাবছে চৌধুরী সাবের পোলাপানরা তো নিরীহ, ভয় দেখাইয়া স্ট্যাম্পে সই নিয়া নিব।"

জাবির আঁতকে উঠল। "বলেন কী লালু ভাই! মাহিনদের জমি দখল করতে আসবে? পুলিশে খবর দেব?"

লালু এক তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করল। "পুলিশ? আরে পুলিশ আইতে আইতে তো ওরা কাম সাইরা ভাগব! পুলিশ ডাকন লাগব না। তুই খালি চুপচাপ খাটে বইসা তামাশা দেখবি। লালু মাস্তান জ্যান্ত থাকতেও এই বাড়ির একটা ইট কেউ খসাইতে পারে নাই, মরণের পরেও পারব না! আজ ওই ছোকরাগুলারে এমন শিক্ষা দিমু, বাপের জন্মে আর নারিন্দামুখী হইব না!"

হঠাৎ ঘড়ির কাঁটা রাত পৌনে চারটা ছুঁল। আর ঠিক তখনই বাড়ির পেছনের আমগাছের দিক থেকে খুব মৃদু একটা খসখস শব্দ ভেসে এলো। তারপরই শোনা গেল পুরোনো ইটের দেওয়াল বেয়ে ভারী বুটের শব্দ আর লোহার রডের চাপা ঠোকাঠুকি! লালু মাস্তানের চোখ দুটো এক লহমায় গনগনে আগুনের গোলার মতো জ্বলে উঠল। তার শরীরের ধোঁয়াটে বাষ্পটা দ্বিগুণ আকার ধারণ করল।

"আইয়া পড়ছে শুয়োরের বাচ্চারা!" লালু এক লাফে ঘরের সিলিং ছুঁয়ে ফেলল। "জাবির! জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া খালি শিস দিবি, বাকিটা আমি বুঝতাছি!"
রাত চারটা। কুয়াশায় ঢাকা বাড়ির পেছনের উঠোনটা তখন একদম অন্ধকার। দেওয়াল টপকে ভেতরে ঢুকল চারজন লোক। তাদের প্রত্যেকের মুখে কালো কাপড়ের মুখোশ, পরনে জিন্স আর জ্যাকেট। একজনের হাতে চকচকে চাইনিজ কুড়াল, দুজনের হাতে লোহার শাবল ও পাইপ, আর দলের পাণ্ডা-যার নাম রতন, কালামের ডান হাত,তার কোমরে গোঁজা দেশি পিস্তল।

"তাড়াতাড়ি কর," রতন ফিসফিস করে নির্দেশ দিল। "গ্যারেজের তালার মধ্যে অ্যাসিড ঢাল। আর ওই দোতলার পোলাপান যদি আওয়াজ পায়, ডাইরেক্ট হাত-পা ভাইঙা দিবি!"

তারা যখন পা টিপে টিপে গ্যারেজের মরচে ধরা কলাপসিবল গেটের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই দোতলার দক্ষিণ কোণের জানালাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল।

রতনরা চমকে মুখ তুলে তাকাল।দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে আছে একটি কিশোর—জাবির। তার মুখে  কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই। সে খুব আয়েশ করে একটা আঙুল ঠোঁটে দিয়ে এক তীব্র স্কাউট শিস বাজাল—ফিইইইইট!

"ওই ব্যাটা কে রে? পিস্তল বের কর!" রতন চেঁচিয়ে উঠল।

কিন্তু রতনের হাত কোমরের পিস্তল পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই পুরো উঠোনের তাপমাত্রা হঠাৎ বরফের মতো জমে গেল।ভননননন... ঝনঝনঝন!

কোনো ঝড় নেই, কিন্তু উঠোনের বিশালাকার পুরোনো আমগাছটা এমনভাবে দুলতে শুরু করল যেন এখনই শিকড় উপড়ে ভেঙে পড়বে! গাছের শত শত শুকনো ডালপালা আর কাঁচা আমপাতা একযোগে ঝরে পড়তে লাগল গুন্ডাদের মাথার ওপর। আর তার ঠিক পরেই শুরু হলো আসল তাণ্ডব। গ্যারেজের পাশে স্তূপ করে রাখা প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটা পুরোনো পোড়ামাটির ইট নিজে থেকেই শূন্যে ভেসে উঠল! কোনো অদৃশ্য জাদুকর যেন ইটগুলোকে বাতাসে এক নিখুঁত সামরিক ড্রোন বাহিনীর মতো সাজিয়ে রেখেছে!

"ওরে বাবারে! এ কী রে!" চাইনিজ কুড়ালধারী ছোকরাটির হাত থেকে কুড়াল খসে মাটিতে পড়ল।

বাতাসের বুক চিরে এক কান ফাটানো, অমানুষিক অট্টহাসি ফেটে পড়ল পুরো উঠোন জুড়ে—

"কিরে কালামের কুকুরেরা! লালুর এলাকায় আইসা মাস্তানি? আজ তোদের চামড়া তুইলা ডুগডুগি বাজামু

অন্ধকার চিরে শূন্য থেকে নেমে এলো এক দশ ফুট দীর্ঘ দানবীয় অবয়ব! লালু মাস্তান এবার আর তার শান্ত চেহারায় নেই। তার খয়েরি লুঙ্গি বাতাসে ঝড়ের মতো উড়ছে, তার মুখ দিয়ে আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে, আর তার দুই হাতে বনবন করে ঘুরছে বিশালাকার দুটি লোহার সাইকেলের চেইন!

খটাশ! সপাং!

প্রথম আঘাতটা পড়ল রতনের পিঠের ওপর। কোনো দৃশ্যমান মানুষ নেই, কিন্তু বাতাসের মধ্য থেকে যেন এক অদৃশ্য লোহার চাবুক এসে আছড়ে পড়ল তার মেরুদণ্ডে! রতন এক তীব্র চিৎকার দিয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল।

"ভূত! ওরে মা রে, জ্যান্ত ভূত!" বাকি তিনজন তাদের শাবল আর রড ফেলে পেছনের দেওয়ালের দিকে উল্টো দৌড় দিল। কিন্তু দেওয়ালের কাছে পৌঁছানোর আগেই শূন্যে ভাসমান সেই ইটগুলো বুলেটের গতিতে ধেয়ে এলো তাদের দিকে!

ঠাস! ধপাস! ঠং!

ইটগুলো কারও মাথায় নয়, নিখুঁত নিশানায় তাদের হাঁটুতে, পিঠে আর পায়ে গিয়ে আঘাত করতে লাগল। গুন্ডাগুলো উঠোনের কাদার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল।লালু তখন শূন্যে ভাসতে ভাসতে নেমে এলো রতনের ঠিক বুকের ওপর। তার ধোঁয়াটে, বরফশীতল পা দুটি রতনের গলার ওপর চেপে বসল। রতনের চোখ দুটো কোটর থেকে ঠিকরে বের হয়ে আসার উপক্রম। সে শ্বাস নিতে পারছে না, তার সারা শরীর ঠান্ডায় নীল হয়ে গেছে। লালু তার মুখের সেই জ্বলন্ত চুরুটের মতো লাল চোখ রতনের চোখের ঠিক দুই ইঞ্চি সামনে এনে খসখসে গলায় গর্জে উঠল:

"কালামরে গিয়া কবি, নারিন্দার এই বাড়িতে লালু মাস্তান পাহারা দেয়! এরপর যদি এই গলির মুখে কোনোদিন কালামের কোনো কুত্তা পা দেয়, তবে হাত-পা ভাঙুম না, ডাইরেক্ট ঘাড় মটকা দিয়া বুড়িগঙ্গার তলায় পুঁইতা থুমু! কথা বুঝছস, না বুঝায় দিমু?"

রতন আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে হাতজোড় করল। তার প্যান্ট ততক্ষণে ভয়ে ভিজে একাকার। "ব-বুঝছি ভাই! মাফ কইরা দেন ভাই! জীবনেও আর আমু না!"

"ভাগ! শুয়োরের দল!"

লালু এক প্রচণ্ড লাথি মারল। অদৃশ্য এক ধাক্কায় রতন প্রায় দশ হাত দূরে দেওয়ালের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। চারজন গুন্ডা যে যেভাবে পারল, দেওয়াল টপকে, কাঁটাতার ছিঁড়ে, গায়ের কাপড় ফেলে, উন্মত্তের মতো চিৎকার করতে করতে নারিন্দার অন্ধ গলিপথ ধরে দিগ্বিদিক দৌড়ে পালিয়ে গেল। তাদের সেই ভয়ার্ত চিৎকারে আশপাশের বাড়ির কুকুরগুলো সমস্বরে ডেকে উঠল। দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে জাবির পুরো দৃশ্যটা দেখল। তার গায়ে এখনো কাঁটা দিচ্ছে, কিন্তু একই সাথে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত বিজয়ী হাসি।

লালু মাস্তান উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার লুঙ্গির মালকোঁচাটা ঠিক করল। তারপর মুখ তুলে দোতলার জানালার দিকে তাকাল। সে এক হাত তুলে জাবিরের উদ্দেশ্যে স্যালুট দেওয়ার মতো এক ভঙ্গি করল। তার মুখে সেই চিরচেনা ঢাকাইয়া পান খাওয়া লালচে হাসি।

"কেমন দিলি মামু? লালুর পাঞ্চ দেখছস? জীবনেও আর এই বাড়ির ত্রিসীমানায় আইব না!"


ভোরের আযানের সুরে যখন নারিন্দার আকাশ ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল, তখন বাড়ির সবাই পেছনের উঠোনে এসে ভিড় জমিয়েছে। মাহিনের বাবা, চাচা, আর মাহিন নিজে হতবাক হয়ে দেখছিল উঠোনের অবস্থা। মেঝেতে পড়ে আছে ফেলে যাওয়া চাইনিজ কুড়াল, শাবল, রক্তমাখা কালো মুখোশ আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইট। দেওয়ালের এক জায়গায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গুন্ডাদের পালানোর সময় ফেলে যাওয়া এক পাটি জুতো। মাহিনের বাবা কপালে হাত দিয়ে বললেন, "সর্বনাশ! কালামের গুন্ডারা রাতে এসেছিল নির্ঘাত! কিন্তু... কিন্তু এদের এমন অবস্থা করল কে? সব অস্ত্র ফেলে পালিয়ে গেল কেন?"

মাহিন পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছিল। সে আড়চোখে তাকাল দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা জাবিরের দিকে। জাবির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। তার চোখে এখন আর কোনো ক্লান্তি নেই; তার শরীর একদম ঝরঝরে। দাদি রাবেয়া খাতুন উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি মাহিনের বাবার কাঁধে হাত রেখে বললেন, "তোরা বুঝবি না খোকা। এই বাড়ির পাহারা কে দেয়, তা তোরা ভুলে গেলেও সে ভোলে নাই। লালু তার জবান রেখেছে।"

মাহিন জাবিরের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, "দোস্ত, কাল রাতে তুই ঠিক কী করলি বল তো? সকালে দেখি তুই একদম বীরপুরুষের মতো হেঁটে বেড়াচ্ছিস!"

জাবির পকেট থেকে সেই খালি দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা বের করে মাহিনের হাতে দিল।

"আমি কিছু করিনি মাহিন। আসল কাজ করেছে তোর বাড়ির সেই নন-পেয়িং পার্মানেন্ট গেস্ট। তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে—পুরান ঢাকার মানুষ হোক কিংবা ভূত, তাদের দিলে ভালোবাসা আর খাতির-যত্ন দিলে তারা নিজের জান দিয়েও সেই ঋণ শোধ করে।"

মাহিন হেসে জাবিরের পিঠ চাপড়ে দিল। "চল, আজ তোকে লালু ভাইয়ের নামে স্পেশাল বাকরখানি আর নেহারি খাওয়াব!" সবাই যখন হাসাহাসি করতে করতে ঘরের ভেতরে ঢুকছিল, জাবির একবার শেষবারের মতো দোতলার সেই দক্ষিণ কোণের জানালার দিকে মুখ তুলে তাকাল। সকালের নরম সোনালি রোদে জানালার ভারী নীল পর্দাটা শান্তভাবে ঝুলছিল। কিন্তু জাবিরের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে গেল না—পর্দার ঠিক পেছনে, জানালার কাচে জমে থাকা হালকা ভোরের বাষ্পের ওপর কেউ যেন আঙুল দিয়ে খুব কাঁচা হাতে লিখে রেখেছে তিনটি স্পষ্ট শব্দ:"ভাতিজা, আবার আইস! 

আর সেই লেখার নিচ থেকে বাতাসে ভেসে এলো এক চিলতে কড়া জর্দার পানের সুবাস এবং অতি ক্ষীণ এক ধাতব চাকুর পরিচিত ক্লিক শব্দ। জাবির মুচকি হাসল। হাত নেড়ে মনে মনে বলল—"নিশ্চয়ই আসব, লালু ভাই। আপনার জন্য এবার এক ডাব্বা খাঁটি বাবা জর্দা নিয়ে আসব!"

নারিন্দার সেই প্রাচীন বাড়ির ওপর দিয়ে সকালের একঝাঁক পায়রা ডানা মেলে উড়ে গেল নীল আকাশের পানে। আর সেই শতবর্ষী বাড়ির ছায়ায় এক মাস্তান ভূত তখন পরম শান্তিতে তার অনন্ত পাহারায় গা এলিয়ে দিল।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • Borhan mahmud 1 day ago

    খুব ভালো লিখেছেন।

    • Kabir Al Mamun 1 day ago

      Thank you Bhai. Got inspiration from you.