প্রথম ছায়াপথ ও প্রাচীন মহাজাগতিক কাঠামো: কীভাবে অন্ধকার থেকে জন্ম নিল নক্ষত্রনগরী
মহাবিশ্বের ইতিহাসে প্রথম নক্ষত্রের জন্ম ছিল এক বিরাট পরিবর্তনের সূচনা, কিন্তু সেই পরিবর্তনের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। প্রথম নক্ষত্রগুলো বিচ্ছিন্নভাবে আলো ছড়াতে শুরু করার পর মহাবিশ্বে ধীরে ধীরে এমন বৃহত্তর কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে, যেখানে অসংখ্য নক্ষত্র, গ্যাস, ধূলিকণা এবং অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার একসঙ্গে অবস্থান করতে পারে। এই বিশাল মহাজাগতিক কাঠামোগুলোকেই আমরা ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি বলি। আজকের মহাবিশ্বে ছায়াপথের মধ্যে রয়েছে সর্পিল বাহু, উজ্জ্বল নক্ষত্রগুচ্ছ, গ্যাসের মেঘ, অন্ধকার ধূলিময় অঞ্চল এবং কেন্দ্রে কখনো কখনো বিপুল ভরবিশিষ্ট কৃষ্ণগহ্বর। কিন্তু প্রথম ছায়াপথগুলো দেখতে এমন ছিল না। তাদের গঠন ছিল অপেক্ষাকৃত অনিয়মিত, অনেকগুলো ছিল ক্ষুদ্র ও গ্যাসসমৃদ্ধ, আর তাদের নক্ষত্রের জন্ম ও বিবর্তন ঘটত অত্যন্ত পরিবর্তনশীল পরিবেশে। কীভাবে বিগ ব্যাংয়ের পর প্রায় একরূপ পদার্থের মহাবিশ্ব থেকে এমন নক্ষত্রনগরীর জন্ম হলো, সেটিই আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব প্রসারিত ও শীতল হতে থাকলে পদার্থের ঘনত্বে থাকা ক্ষুদ্র পার্থক্যগুলো ধীরে ধীরে মহাকর্ষীয় বিবর্তনের মাধ্যমে বড় হতে থাকে। মহাজাগতিক ক্ষুদ্রতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণের তাপমাত্রায় যে অতি ক্ষুদ্র পার্থক্য আমরা আজ পর্যবেক্ষণ করি, সেগুলো প্রাথমিক মহাবিশ্বে পদার্থ ও শক্তির বণ্টনের অসমতার গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। এসব পার্থক্য থেকেই পরবর্তী সময়ে গ্যালাক্সি ও বৃহত্তর কাঠামোর বীজ তৈরি হয়েছিল। কোনো অঞ্চলে পদার্থের ঘনত্ব সামান্য বেশি হলে সেখানে মহাকর্ষীয় আকর্ষণও তুলনামূলক বেশি হয়। ফলে আশপাশের পদার্থ ধীরে ধীরে সেই অঞ্চলের দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে ঘনত্ব আরও বাড়ে, আর কাঠামো ক্রমশ বড় হয়। এই প্রক্রিয়া একদিনে ঘটেনি; মহাবিশ্বের প্রসারণ, পদার্থের গতি এবং মহাকর্ষের পারস্পরিক প্রভাবের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে এটি চলেছে।
এই গঠনপ্রক্রিয়ায় ডার্ক ম্যাটার একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। ডার্ক ম্যাটার সাধারণ পদার্থের মতো আলো শোষণ বা নির্গত করে না বলে সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে এর উপস্থিতি অনুমান করা যায়। বিগ ব্যাংয়ের পর সাধারণ পদার্থের তুলনায় ডার্ক ম্যাটার দ্রুত মহাকর্ষীয় কাঠামো গঠনের সুযোগ পেয়েছিল, কারণ সাধারণ পদার্থ প্রথমদিকে বিকিরণের সঙ্গে শক্তভাবে সম্পর্কিত ছিল। পরমাণু গঠনের পর সাধারণ গ্যাস ডার্ক ম্যাটারের তৈরি মহাকর্ষীয় কূপে জমা হতে শুরু করে। এই বিশাল অদৃশ্য কাঠামোগুলোকে বলা হয় ডার্ক ম্যাটার হ্যালো বা dark matter halo। এগুলো অনেকটা এমন মহাকর্ষীয় ভিত্তি, যার মধ্যে গ্যাস জমা হয়ে ঠান্ডা হতে পারে, ঘন হতে পারে এবং উপযুক্ত অবস্থায় নক্ষত্র গঠন করতে পারে। তবে ছায়াপথ গঠনের পুরো প্রক্রিয়া কেবল ডার্ক ম্যাটারের ওপর নির্ভর করে না; গ্যাসের তাপমাত্রা, চাপ, বিকিরণ, নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু এবং কৃষ্ণগহ্বরের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম ছায়াপথ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট ছোট ডার্ক ম্যাটার হ্যালোর মধ্যে গ্যাস জমা হতে থাকে। গ্যাস যথেষ্ট ঘন হয়ে শীতল হলে তার কিছু অংশ ভেঙে ছোট ছোট গ্যাসমেঘ তৈরি করে, আর সেসব মেঘে জন্ম নিতে পারে নক্ষত্র। প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রগুলো তাদের চারপাশে শক্তিশালী বিকিরণ ছড়িয়ে গ্যাসের তাপমাত্রা ও আয়নীকরণের অবস্থা বদলে দেয়। কোনো কোনো নক্ষত্রের জীবন শেষ হলে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যা গ্যাসকে উত্তপ্ত করে এবং ভারী মৌল মহাশূন্যে ছড়িয়ে দেয়। এই বিস্ফোরণ নতুন নক্ষত্র গঠনের গ্যাসকে একদিকে ছড়িয়ে দিতে পারে, অন্যদিকে সংকুচিত গ্যাসমেঘ তৈরি করেও নক্ষত্র গঠনে সাহায্য করতে পারে। অর্থাৎ প্রথম ছায়াপথের বিবর্তন ছিল এক জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে নক্ষত্রের জন্ম নিজেই পরবর্তী নক্ষত্রের জন্মের পরিবেশকে পরিবর্তন করত।
প্রথম ছায়াপথগুলো কখন গঠিত হয়েছিল, তা নির্ধারণ করতে বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করেন। বর্তমান গবেষণায় ধারণা করা হয়, বিগ ব্যাংয়ের কয়েকশ মিলিয়ন বছর পর থেকেই প্রাথমিক ছায়াপথের অস্তিত্ব ছিল। তবে প্রথম ছায়াপথের সুনির্দিষ্ট জন্মমুহূর্ত জানা যায়নি। কারণ গ্যালাক্সি কোনো এক মুহূর্তে সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে যায় না; গ্যাস জমা হওয়া, নক্ষত্রের জন্ম, ছোট কাঠামোর একীভবন এবং বৃহত্তর কাঠামো গড়ে ওঠা দীর্ঘ সময় ধরে চলে। তাই ‘প্রথম ছায়াপথ’ বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট বস্তু বোঝানো কঠিন। বরং এটি এমন একটি সময়কালকে বোঝায়, যখন ক্ষুদ্র নক্ষত্রগঠনকারী কাঠামো ধীরে ধীরে গ্যালাক্সির বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে শুরু করে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও তাত্ত্বিক মডেল এই সময় সম্পর্কে ধারণা দেয়, কিন্তু নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা আরও পরিমার্জিত হচ্ছে।
প্রথম ছায়াপথগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের অনিয়মিত আকৃতি। আজকের মিল্কিওয়ে বা অ্যান্ড্রোমিডার মতো বৃহৎ সর্পিল ছায়াপথে নক্ষত্র, গ্যাস ও ধূলিকণা একটি নির্দিষ্ট ঘূর্ণনগত কাঠামোর মধ্যে সাজানো থাকে। কিন্তু প্রাথমিক মহাবিশ্বে ছোট গ্যাসসমৃদ্ধ কাঠামো একে অপরের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষ ও একীভূত হচ্ছিল। গ্যাসের প্রবাহ সব সময় স্থির ছিল না, নক্ষত্রের জন্মও ছিল বিচ্ছিন্ন ও পরিবর্তনশীল। ফলে অনেক প্রাচীন ছায়াপথ ছিল ছোট, গুচ্ছাকৃতির এবং অনিয়মিত। কিছু ছায়াপথে খুব অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক নক্ষত্র তৈরি হতে পারে, আবার কিছু ছায়াপথে নক্ষত্র গঠন তুলনামূলক ধীর ছিল। এসব পার্থক্য নির্ভর করত গ্যাসের সরবরাহ, মহাকর্ষীয় পরিবেশ, নক্ষত্রের বিকিরণ এবং অতীতের সংঘর্ষের ওপর।
ছায়াপথ গঠনের ইতিহাসে একীভবন বা galaxy merger একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। মহাবিশ্বে ছোট কাঠামো আগে গঠিত হয়ে পরে একত্রিত হয়ে বড় কাঠামো তৈরি করতে পারে। দুটি গ্যাসসমৃদ্ধ ছায়াপথ কাছাকাছি এলে তাদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র একে অপরকে প্রভাবিত করে। তাদের আকৃতি বিকৃত হতে পারে, গ্যাসের প্রবাহ বদলে যেতে পারে এবং সংঘর্ষের ফলে গ্যাসের কিছু অংশ সংকুচিত হয়ে দ্রুত নক্ষত্র গঠন শুরু করতে পারে। তবে ছায়াপথের একীভবন মানেই প্রতিটি নক্ষত্রের সরাসরি সংঘর্ষ নয়। নক্ষত্রগুলোর মধ্যে বিশাল দূরত্ব থাকার কারণে নক্ষত্র-নক্ষত্র সংঘর্ষ বিরল; বরং গ্যাসমেঘ, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এবং কক্ষপথের পরিবর্তন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একীভবনের ফলে কোনো সর্পিল ছায়াপথের গঠন বদলে যেতে পারে, নতুন নক্ষত্র জন্মাতে পারে, আবার দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে নক্ষত্র গঠনের হারও কমে যেতে পারে।
প্রথম ছায়াপথের নক্ষত্রগুলো ছিল মহাবিশ্বের রাসায়নিক বিবর্তনের অন্যতম চালিকা শক্তি। প্রথম নক্ষত্রগুলো মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে গঠিত হলেও তাদের অভ্যন্তরে নিউক্লীয় সংযোজনের মাধ্যমে নতুন মৌল তৈরি হতে শুরু করে। নক্ষত্রের ভর ও বিবর্তনের পর্যায় অনুযায়ী কার্বন, অক্সিজেন, নিয়ন, সিলিকন এবং অন্যান্য মৌল তৈরি হতে পারে। কিছু নক্ষত্রের মৃত্যুর সময় এসব উপাদান মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভারী মৌলসমৃদ্ধ গ্যাস থেকে পরবর্তী প্রজন্মের নক্ষত্র জন্মায়। ধীরে ধীরে মহাবিশ্বের গ্যাসে ভারী মৌলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই পরিবর্তনকে ধাতবতা বা metallicity বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়। ‘ধাতবতা’ বলতে শুধু লোহা বা তামার মতো ধাতু বোঝায় না; জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া অন্য মৌলগুলোর মোট পরিমাণকেও এই ধারণার মাধ্যমে বোঝানো হয়।
এই রাসায়নিক বিবর্তন ভবিষ্যতে গ্রহ গঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নক্ষত্রের চারপাশে গ্যাস ও ধূলিকণার চাকতি তৈরি হলে সেই চাকতির পদার্থ থেকে গ্রহের জন্ম হতে পারে। পাথুরে গ্রহ গঠনের জন্য সিলিকেট, লোহা এবং অন্যান্য ভারী মৌল প্রয়োজন। পানি ও জৈব রসায়নের জন্যও অক্সিজেন, কার্বন, নাইট্রোজেনসহ বিভিন্ন মৌল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ছায়াপথের নক্ষত্রগুলো এই উপাদানগুলোর সূচনা ও বিস্তারে ভূমিকা রাখে। তবে প্রথম ছায়াপথেই পৃথিবীর মতো গ্রহ তৈরি হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। মহাবিশ্বে ভারী মৌলের পরিমাণ ও ধূলিকণার পরিবেশ যথেষ্ট উন্নত হতে সময় লেগেছে। তাই প্রথম নক্ষত্র ও ছায়াপথের জন্ম থেকে গ্রহসমৃদ্ধ নক্ষত্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার ইতিহাস একটি দীর্ঘ বিবর্তনীয় ধারার অংশ।
প্রথম ছায়াপথের বিবর্তনে কৃষ্ণগহ্বরও ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। কিছু ছায়াপথের কেন্দ্রে গ্যাস জমা হয়ে কৃষ্ণগহ্বরে পতিত হতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে উত্তপ্ত গ্যাসের চাকতি তৈরি হলে তা বিপুল বিকিরণ নির্গত করতে পারে। এমন সক্রিয় কেন্দ্রকে বলা হয় সক্রিয় গ্যালাক্টিক নিউক্লিয়াস বা Active Galactic Nucleus (AGN)। অত্যন্ত উজ্জ্বল সক্রিয় কেন্দ্রের একটি শ্রেণি হলো কোয়াসার। প্রাচীন মহাবিশ্বে ইতিমধ্যে বিশাল কৃষ্ণগহ্বরবিশিষ্ট উজ্জ্বল কোয়াসারের অস্তিত্ব দেখা যায়, যা একটি বিস্ময়কর বিষয়। মহাবিশ্বের তুলনামূলক অল্প বয়সের মধ্যে এসব কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে এত বিশাল হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি। কৃষ্ণগহ্বরের দ্রুত বৃদ্ধি, বড় বীজ-কৃষ্ণগহ্বরের প্রাথমিক গঠন এবং গ্যাসের সরবরাহ—এসব সম্ভাব্য ব্যাখ্যা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে প্রতিটি প্রাচীন ছায়াপথের কেন্দ্রে তখনই বিশাল কৃষ্ণগহ্বর ছিল, এমন ধরে নেওয়া যায় না।
ছায়াপথের গঠন কেবল নক্ষত্রের সংখ্যা বা আকার দিয়ে বোঝা যায় না; তাদের চারপাশে গ্যাস কীভাবে চলাচল করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ছায়াপথের ভেতরে গ্যাস ঠান্ডা হয়ে নক্ষত্র তৈরি করতে পারে, আবার নক্ষত্রের বিকিরণ ও সুপারনোভা বিস্ফোরণে গ্যাস উত্তপ্ত হয়ে ছায়াপথের বাইরে ছিটকে যেতে পারে। এই প্রবাহকে কখনো galactic wind বলা হয়। অন্যদিকে ছায়াপথের চারপাশের পরিবেশ থেকে নতুন গ্যাস প্রবেশ করে নক্ষত্র গঠনের জন্য জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে। এসব প্রক্রিয়ার ভারসাম্য ছায়াপথের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কোনো ছায়াপথে পর্যাপ্ত ঠান্ডা গ্যাস থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে নক্ষত্র তৈরি হতে পারে; কিন্তু গ্যাস উত্তপ্ত হয়ে গেলে বা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে নক্ষত্র গঠনের হার কমে যেতে পারে। তাই ছায়াপথকে স্থির বস্তু হিসেবে দেখা ভুল; এগুলো ক্রমাগত পদার্থ গ্রহণ, পদার্থ হারানো, নক্ষত্র তৈরি এবং কাঠামো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়।
মহাবিশ্বের বৃহত্তর কাঠামো বোঝার জন্য ছায়াপথগুলোর পারস্পরিক বিন্যাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছায়াপথগুলো সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। তারা গুচ্ছ, সুপারক্লাস্টার এবং বিশাল ফিলামেন্টের মতো কাঠামো তৈরি করে, আর এসব কাঠামোর মাঝখানে থাকে তুলনামূলক কম ঘনত্বের বিশাল অঞ্চল, যেগুলোকে মহাজাগতিক শূন্যস্থান বা cosmic voids বলা হয়। সামগ্রিকভাবে এই বিন্যাসকে মহাজাগতিক জালিকা বা cosmic web বলা হয়। ডার্ক ম্যাটার ও সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষীয় বিবর্তনের মাধ্যমে এই জালিকা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র ঘনত্ব-পার্থক্য সময়ের সঙ্গে বড় কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়েছে। ছায়াপথগুলো এই জালিকার ফিলামেন্ট বরাবর বেশি ঘনভাবে থাকতে পারে, আর বিশাল শূন্যস্থানগুলোতে তুলনামূলক কম ছায়াপথ দেখা যায়। এই কাঠামো পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে পদার্থের বণ্টন, ডার্ক ম্যাটারের ভূমিকা এবং মহাজাগতিক প্রসারণের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পান।
প্রাচীন ছায়াপথ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর অবলোহিত যন্ত্র এমন আলো শনাক্ত করতে পারে, যা মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে দীর্ঘতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সরে গেছে। দূরবর্তী ছায়াপথের আলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা তাদের লোহিত সরণ, আনুমানিক দূরত্ব, নক্ষত্র গঠনের হার এবং গ্যাসের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে কোনো দূরবর্তী বস্তুকে প্রাথমিক মহাবিশ্বের বলে শনাক্ত করার পরও তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে সতর্ক বিশ্লেষণ দরকার। আলো থেকে দূরত্ব নির্ণয়, ছায়াপথের উজ্জ্বলতা, নক্ষত্রের বয়স এবং রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে অনুমান সব সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। কখনো প্রাথমিক হিসাব পরিবর্তিত হয়, নতুন পর্যবেক্ষণে আগের ব্যাখ্যা সংশোধিত হয়। এটাই বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া—নতুন প্রমাণের আলোকে পুরোনো ধারণাকে পরীক্ষা করা।
প্রথম ছায়াপথের জন্ম সম্পর্কে গবেষণা আমাদের আরেকটি গভীর সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে: মহাবিশ্বের জটিলতা একবারে তৈরি হয়নি। বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন। পরে তা প্রসারিত হয়ে শীতল হয়, পরমাণু গঠিত হয়, অন্ধকার যুগ আসে, প্রথম নক্ষত্র জ্বলে ওঠে এবং প্রাচীন ছায়াপথ গঠিত হয়। নক্ষত্রের মৃত্যু মহাবিশ্বে নতুন মৌল ছড়িয়ে দেয়, আর পরবর্তী প্রজন্মের নক্ষত্র ও গ্রহের জন্মের জন্য নতুন উপাদান তৈরি হয়। ছোট কাঠামো একত্রিত হয়ে বৃহত্তর কাঠামো তৈরি করে। বহু কোটি বছরের এই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের ছায়াপথ, নক্ষত্রসমৃদ্ধ অঞ্চল এবং গ্রহব্যবস্থার জন্ম হয়েছে। আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথও এই দীর্ঘ মহাজাগতিক ইতিহাসের ফল। সূর্য ও পৃথিবী এই ইতিহাসের একেবারে প্রথম অধ্যায়ে জন্মায়নি; তারা তৈরি হয়েছে বহু প্রজন্মের নক্ষত্রের বিবর্তন ও মহাজাগতিক পদার্থের পুনর্ব্যবহারের পর।
শেষ পর্যন্ত, প্রথম ছায়াপথের কাহিনি হলো মহাকর্ষ, আলো, গ্যাস, ডার্ক ম্যাটার এবং নক্ষত্রের সম্মিলিত কর্মযজ্ঞের গল্প। যে মহাবিশ্ব একসময় প্রায় সমসত্ত্ব গ্যাস ও অদৃশ্য কাঠামোর বিস্তীর্ণ জগৎ ছিল, সেখানে সময়ের সঙ্গে জন্ম নিয়েছে কোটি কোটি নক্ষত্রের নগরী। তাদের মধ্যে কিছু ছায়াপথ একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ করেছে, কিছু নতুন নক্ষত্রের জন্ম দিয়েছে, কিছু তাদের গ্যাস হারিয়ে শান্ত হয়েছে, আবার কিছুতে কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরের শক্তিশালী প্রভাব কাজ করেছে। আজ আমরা দূরবীক্ষণযন্ত্রের সাহায্যে যখন প্রাচীন ছায়াপথের আলো দেখি, তখন আসলে মহাবিশ্বের শৈশবের একটি দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করি। সেই আলো আমাদের জানায়, বর্তমান মহাবিশ্বের বিশাল কাঠামো কীভাবে গড়ে উঠেছে এবং কীভাবে অতি সরল প্রাথমিক অবস্থা থেকে ক্রমে জটিল মহাজাগতিক জগৎ তৈরি হয়েছে।