প্রথম পর্ব: ঘুম ভাঙানো নোবেল পুরস্কার
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যজগতে একধরনের আহাজারি শুরু হয়। নিয়মিত। দুই বাংলাতেই। প্রশ্ন ওঠে, আমাদের কেন একজন নোবেল পাওয়ার যোগ্য সাহিত্যিক নেই? কোথায় আমাদের ঘাটতি? কেন বাংলা সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের দরবারে প্রত্যাশিত স্বীকৃতি পাচ্ছে না?
প্রশ্নগুলো অযৌক্তিক নয়। নিজের ভাষার সাহিত্য বিশ্বপরিসরে স্বীকৃতি পাক, এমন আকাঙ্ক্ষা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকে যায়: নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগে আমরা কি নিয়মিত বিশ্বসাহিত্যের খবর রাখি? যে লেখককে নিয়ে আজ আমাদের এত আগ্রহ, তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে গত বছর আমরা কতটা জানতাম? কিংবা বিশ্বসাহিত্যের অন্য গুরুত্বপূর্ণ লেখকদেরই বা কতজনকে চিনি?
প্রতি বছর পুরস্কার ঘোষণার পর পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখককে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়। তাঁর বইয়ের নাম জানা যায়, দ্রুত অনুবাদ হতে থাকে—যার অনেকগুলোর অনুবাদমান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। সাক্ষাৎকার ভাগাভাগি হয়, তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্ব নিয়ে তর্কবিতর্ক চলে। তারপর ধীরে ধীরে আগ্রহ কমে আসে। বাংলা সাহিত্যের নিজস্ব ব্যস্ততা আবার আমাদের গ্রাস করে। পরের বছর নতুন নোবেলজয়ীর নাম ঘোষিত হলে সেই ঘুম ভাঙে আবার।
এই পুনরাবৃত্তি আমাকে কিছু মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি সত্যিই বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপে আগ্রহী? নাকি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আলোয় নিজেদের সাহিত্যিক অবস্থান একবার যাচাই করেই আত্মতৃপ্ত হতে চাই? নোবেলজয়ী লেখকদের সাহিত্যকর্মের সাফল্যের পেছনে থাকা নন্দনতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করতেও কি আমরা আগ্রহী?
প্রশ্নগুলো জরুরি, আমাদের সাহিত্যচর্চার দিকে তাকানোর জন্য। কারণ কোনো সাহিত্যিকের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং সেই স্বীকৃতির উপযোগী সাহিত্যিক পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা এক জিনিস নয়।
একটি ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মের জন্মের পেছনে থাকে লেখকের প্রতিভা ও শ্রম, গভীর পাঠাভ্যাস, ভাষার ওপর অধিকার, নান্দনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সাহিত্য-সমালোচনা, অনুবাদের পরিসর এবং একটি সচল সাহিত্যিক সংস্কৃতি। এই উপাদানগুলোর কোনটি আমাদের আছে, কোনটি দুর্বল, আর কোনটি নিয়ে আমরা যথেষ্ট ভাবি না—সেই প্রশ্নগুলো কি নোবেল ঘোষণার পর আমাদের আলোচনায় আসে?
আমি এই ধারাবাহিকে সেই প্রশ্নগুলোই তুলতে চাই। বাংলা সাহিত্যকে হেয় করার জন্য নয়, তার সম্ভাবনাকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য। নোবেল পুরস্কার পাওয়া বা না-পাওয়ার হিসাবের বাইরে গিয়ে দেখতে চাই, আমাদের সাহিত্যিক সংস্কৃতি কীভাবে কাজ করে, কোন অভ্যাস তাকে এগিয়ে নেয়, কোন আত্মতুষ্টি তাকে সীমাবদ্ধ করে এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কতটা গভীর।
হয়তো এই অনুসন্ধানের শেষে নোবেল পুরস্কার নিয়ে আমাদের আহাজারির প্রকৃতিটাই বদলে যাবে। আমরা আর শুধু জানতে চাইব না, আমাদের কেউ নোবেল পান না কেন। জানতে চাইব, এমন কী সাহিত্যিক পরিবেশ আমরা গড়ে তুলছি, যেখানে নতুন, গভীর, নিরীক্ষাপ্রবণ এবং বিশ্বমানের সাহিত্যকর্মের জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমাগত বাড়তে পারে?
(দ্বিতীয় পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইলো, যেখানে আমরা প্রতিভা ও অনুশীলনের সম্পর্ক পরিক্ষা করবো, প্রথমে জানতে চাইবো লেখক কি জন্মান, নাকি তৈরি হন?)