উপন্যাস একটি সময়ের সাক্ষী হতে পারে। অমরাবতী সাক্ষী দিচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ও যুদ্ধকালীন সময়কে। “অমরাবতীর” মাধ্যমে ভিন্নধর্মী একটি বাস্তবতার মুখোমুখি করেছেন ঔপন্যাসিক রাসেল রায়হান। উপন্যাসটির মূল উপজীব্য মুক্তিযুদ্ধ হলেও গল্পের শুরুটা হয়েছিল উনিশ’শ আটষট্টি সালের কনকনে নভেম্বরকে দিয়ে। যেখানে লেখক নভেম্বরকে ভোরের শিশিরাপাতে শোভিত ঢাকার স্টেডিয়ামকে ঘিরে বাদল আর নিখিলের ঘূর্ণিঝড়ের বেগে উদ্ধত ব্যাট চালনা দেখে ঈর্ষা করছেন।
এরপরে গল্প বাঁক নিয়েছে নানান শাখা-প্রশাখায়। প্রথমত এইযে দুইজন ক্রিকেটারের উন্মাদনা, তাঁদের ঘনিষ্টতা, আবেগ, স্বপ্ন, এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা, চেষ্টার শিখরে পৌঁছে জয়ী হবার তৃষ্ণা; আবার সাম্প্রদায়িকতার শীলপাটায় ডলা খেয়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ার করুণ বর্ণনা সবকিছুকেই লেখক কিভাবে যেন একটি সুতোয় বেঁধেছেন সুদৃঢ়ভাবে। এছাড়াও উপন্যাসে আরও অনেক গল্পের পরিচয় মেলে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি বিশেষ অঙ্গের দেখা পাওয়া যাবে, ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক কোনোদিক থেকেই শূন্যতার অনুভব হয়নি, যেন আমি সচল যুদ্ধের বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখছি।
গল্পের মাঝে গল্পের বীজ বুনে লেখক যেভাবে উপন্যাসটিকে সার্বক্ষণিক জীবিত করে রেখেছিলেন তাতে একটা মুহূর্তও অবসন্নতা আক্রমন করেনি, বরং প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে যে অপূর্ণতা রেখে তিনি অন্যান্য দৃশ্যে/ঘটনাকে টেনেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এক দমে পড়ে ফেলার মতো উপন্যাস “অমরাবতী”; এই এক নিঃশ্বাসে পড়ার বিষয়টা আসলে লেখকের লেখার মুন্সিয়ানার নির্দেশক, তিনি পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সফল।
হরিপদের অলঙ্কারের ব্যবসা থেকে, বিন্দুর সন্তান নেওয়ার আকুলতা, জামিলের সততা, বাদলের প্রতি কান্তা নামের এক রহস্যময়ী নারীর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বিশ্বাস, মিনহাজ ভাইয়ের নিখিলের প্রতি অন্ধ প্রত্যশা, রোজগারের তাগিদায় হিন্দুর মুসলমানে বেশ ধরা আর মুসলিমের হিন্দু, ওবায়েদ, ফরিদ, মনির, আজম ও সুলতানের পশ্চিম পাকিস্তানের মিলিটারিতে থেকে জীবনের বাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার স্বার্থে উজাড় করে দেওয়া, ভয়ানক মিশমিশে রাতের বিবরণ, জ্যোৎস্না তখন হতভাগ্যের প্রতীক, মুক্তিযোদ্ধা বাদলের বাবার রাজকার হিসেবে আবর্তন ও তা নিয়ে স্ত্রী সুফিয়ার স্বামীকে হত্যা করে পাপ মুক্তির চার-চক্রান্ত ইত্যাদি ভীষণ প্রাসঙ্গিক বিষয়াদির বুনিয়াদ ছিল “অমরাবতী”। কোনো বাহুল্য চরিত্র কিংবা বর্ণনার আশ্রয় নিতে হয়নি লেখককে; যেন শরতের নদীর মতো খুবই স্বাভাবিক বেগে গল্পকে বাবুইয়ের ঠোঁট দিয়ে নিখুঁতভাবে গড়েছেন, যেখানে কোন ছেদ চিহ্ন নেই!
একজন গল্পকার ও ঔপন্যাসিক যে গল্প তুলে ধরেন তার অস্তিত্ব একসাথে পুরোটা কারও মাঝে না পাওয়া গেলেও খণ্ড খণ্ড অংশে অবশ্যই আমাদের আশেপাশের মানবকূলের মাঝে পাওয়া যাবে। একটা বাস্তব উদাহরণ দিয়েই নাহয় বিষয়টি তুলে ধরি যেটা সম্পর্কে সকলে অবগত- উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বাদল একটি ক্রিকেট ম্যাচে খেলতে নেমে লক্ষ্য করে সে গার্ড পড়তে ভুলে গেছে, কয়েকটি বল খেলে নেবার পরে তার বোধ হয় এত রিস্ক নিয়ে খেলা ঠিক হবে না, খেলার মাঝখানে গার্ড পরতে চাইবেন কি না এই দোলাচল ভাবনায় আরও বেশ কয়েকটি বল খেললেও এর ফলাফল সুখকর হয়নি। ঠিক তেমনি আমরা সেদিন বাংলাদেশ-আফগানিস্তানের বিশ্বকাপ ম্যাচে মুজিব-উর-রহমানকে দেখি গার্ড না পরেই তিনি ভুলে খেলতে নেমেছেন, এর পরে মাঠ সহযোগীকে ডেকে গার্ড পরে নেন।
এই ঘটনার প্রাসঙ্গিকতায় বাংলাদেশের টেস্ট খেলোয়াড় আবু জায়েদ রনি তার ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন তিনি ঘরোয়া লীগে ভুল করে গার্ড ছাড়াই খেলতে নেমে প্রায় ২ ওভার খেলে ফেলেছিলেন এর পরে তিনি ব্যবস্থা নেন। এরূপ অসংখ্য কাকতালীয় ঘটনায় আমাদের জীবনের সাথে উপন্যাসের লেখাকে কানেক্ট করে ফেলি; আর এই দেখে আমরা উজ্জীবিত হই, বিস্মিত হই, আমোদিত হই। এমন অসংখ্য ছোট ছোট ঘটনা, বিবরণ ও গল্পের পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ হলো উপন্যাস। যার কোন ক্ষুদ্র অংশ আমাদের জীবনের সাথেও মিলে যেতে পারে, আসলে মিলে যায়। একারণেই জীবন দেখতে হলে, জানতে হলে পাঠকরা উপন্যাসকেই পছন্দের প্রথম সারিতে রাখেন।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোর মাঝে যে দৃশ্য আমরা সচরাচর দেখতে পাই তার থেকে একটু ভিন্ন ধরনের, অপ্রত্যাশিত ভাবে ইউনিক গল্প ঔপন্যাসিক রাসেল রায়হান তার “অমরাবতী” উপন্যাসের মাধ্যমে আমাদের সামনে পেশ করেছেন। তিনি এমন কিছু দেখিয়েছেন যা আগে কখনও কেউ দেখায়নি, কিংবা আমরা সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে যার অস্তিত্ব পাইনি, যদিও আমাদের নতুন প্রজন্ম আর ইতিহাস চর্চার মধ্যে নেই। যেটুকু জানা ছিল, শোনা ছিল, যা দেখিয়েছিল আমাদের গুরুজনরা তার থেকে অন্য এক মাত্রার দেখা মিলল রাসেল রায়হানের অমরাবতীতে।
ঔপন্যাসিক রাসেল রায়হান কে “অমরাবতী” পড়ার আগে গল্পকার হিসেবে চিনতাম। প্রথম আলোর সাপ্তাহিক পাতা “অন্য আলো”তে অনেক গুলো গল্প পড়েছি এর আগে, গল্প পড়ার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মূলত এই অমরাবতীর দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়া। আমার পূর্বের অভিজ্ঞতাকে তাসের ঘরের মতো বাতাসেই চুরমার করে যে অসম্ভব আকুলতা, বিস্ময়, অবাক ও কৌতূহল করে তুলবে তা আসলে মেঘ ছাড়াই বৃষ্টি পাওয়ার সমান।
অধ্যায় থেকে অধ্যায় পেরিয়ে গল্প জানতে চাইবার যে ব্যাকুলতা নিউরনজুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল তা শেষ অব্দি রয়েই গেছে, বেশ বুদ্ধিমান লেখক রাসেল রায়হান। উপন্যাসের একেবারেই শেষ লাইনে এসে যে বিস্ময়কর ঘটনার ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছেন, একজন পাঠক হিসেবে প্রত্যাশা রাখতেই পারি পরবর্তী কোন গল্পে অথবা উপন্যাসে তিনি যুদ্ধ বিগ্রহ শেষ করে বাংলাদেশের বিজয় দেখাবেন। একজন পাঠক হিসেবে রাসেল রায়হানের লেখায় বাংলাদেশের বিজয় দেখার এক প্রবল বাসনা থেকে যাবে।
#হাবিব_রহমান #