আমাদের যে বন্ধুটার মুখে শব্দ জাগতো না,
চোখে মুখে ঘুমহীন নদীর মতো গাঢ় নির্লিপ্তি,
তাকে আমরা ডাকতাম চাপা কবি,
বলে হাসতাম, ও বোধহয় স্বপ্ন দেখে সারাক্ষণ।
সে কিছু বলতো না, শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে
মাথা নিচু করে প্রতিদিন একই বাক্য খাতায় লিখতো,
রুটির জন্য আগুনে হাত রাখা যায়।
তার বাবা ছিলেন ভাঙা চশমার এক প্রাথমিক শিক্ষক,
জমির দলিল হারিয়ে একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন,
ছেলে, সত্যকে কী বলে প্রমাণ করবো?
বছর পাঁচেক ঘুরেছিলেন পেনশনের জন্য,
ঘুষ দেয়ার সামর্থ হয়নি তার কোনোদিন।
তার বিধবা বোন, এক সন্ধ্যায় গলায় দড়ি দিয়েছিলো।
সেদিন সে আমাকে বলেছিল,
গরীবেরা পোকামাকড়ের মতো। তাদের মৃত্যুতে
পৃথিবীর কিছুই আসে যায় না।
সে শহর ছেড়েছিলো, যেমন বিষ ছাড়ে ধমনী।
ফিরেছিলো পলাতক ছায়ার মতো,
চোখে জ্বলছিলো ভূমিহীন কৃষকের দাবির মশাল।
আমি কোনো দলে ঢুকিনি, আমি স্বেচ্ছায় আগুনে নেমেছি।
এ রাষ্ট্র তো নিজের নাগরিক খায়,
আমি তাদের দাঁত ভাঙতে এসেছি,
বলেছিলো, এক রাতে দেখা করতে এসে,
আমার ঘরের জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে,
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে মুচকি হাসছিলো।
তার ঠোঁটের কোণে বিদ্রোহের পঙক্তি।
যাবার সময় আমাকে বলেছিলোম
নির্যাতনই যদি নিয়ম হয়,
তবে প্রতিরোধ হবে ধর্ম।
যেদিন খবর এলো,
জঙ্গলঘেরা এক পাহাড়ি গ্রামে অভিযান চলেছিলো।
গণমাধ্যম বললো: সরকারের সাফল্য! নিষিদ্ধ দলের নেতা নিহত।
তিনটি লাশের মধ্যে সেও শুয়েছিলো।
পাশে পড়ে ছিলো এক ছেঁড়া খাতা,
আর একটি লাল রুমাল,
সেটি যেন প্রশ্ন করছিলো,
আমার বিশ্বাসকে দাফন করবে কেমন করে?
আমরা জানলাম, আমাদের সেই চাপা বন্ধু
আজ রাষ্ট্রের জয়ে পরিণত এক পরাজিত নাম।
তার মুখ ছিলো বিকৃত, চোখ ফোলা, দাঁত ভাঙা।
কিন্তু ঠোঁটে তখনো কিছু লেখা ছিলো,
কেউ একজন পড়েছিলো পরে,
এ লোক শুধু গুলি খেয়েছে, এরা মরে না। আবার আসবে।
আমরা আজও তার নাম নিই না জোরে,
কারণ দেয়ালের কান আছে।
সরকার সাফল্য খোঁজে সারাক্ষণ।
আমরা রাষ্ট্রের সাফল্য হতে চাই না।
তবু কোনো এক রাতে,
আকাশ যদি লাল হয়,
আমি জানি, জানালার বাইরে সে আসবে।
চোখে আগুন, হাতে খাতা,
আর বলবে,
রুটির জন্য আগুনে হাত রাখা যায়।
আমি এও জানি, তখন খুব বৃষ্টি হতে থাকবে।
(এ কবিতাটি আমার লেখা নিষিদ্ধ হয়েছিলো আমার বন্ধু কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া)