Post

মিস্টার পারফেক্ট ৪- বিবাহে রাজি তো কেয়া কারেগা কাজী

October 12, 2026

11 views

৪.

রাত তখন পৌনে দুইটা। ঘরের এক কোণে টেবিল ল্যাম্পের ফিকে আলোয় আমি একমনে মহাবিশ্বের এনট্রপি আর মানুষের অনিদ্রার মধ্যে গাণিতিক সম্পর্ক দাঁড় করানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম। হুট করে আমার টেবিলের ওপর রাখা পুরানো ফোনটা থরথর করে কেঁপে উঠলো।

ডিসপ্লেতে ভেসে উঠেছে—'Unknown Number'।

আমার প্রসেসর বা মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে তিনটে সম্ভাবনার কথা ভেবে ফেললো। প্রথমত, কোনো রং নম্বর; দ্বিতীয়ত, দুর্ধর্ষ কোনো হ্যাকার; আর তৃতীয়ত, ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড বিক্রির কোনো অতি-উৎসাহী প্রতিনিধি।

ফোনটা কানে তুলেই অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক কায়দায় গম্ভীর গলায় বললাম, "হ্যালো। শোনো, তুমি যদি কোনো টেলিকম কোম্পানির লোক হয়ে থাকো, তবে জেনে রাখো—রাত ১২টার পর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মতো অবিন্যস্ত কল দেওয়া আমার বায়োরিদমের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।"

ওপাশ থেকে কোনো গালিগালাজ এলো না। এলো একটা হালকা, রিনিঝিনি হাসির শব্দ। শব্দটা শুনে মনে হলো, যেন কাচের পাত্রে একগুচ্ছ মার্বেল গড়িয়ে দেওয়া হলো।

"ডক্টর নিয়াজ মোর্শেদ," একটা অদ্ভুত, মখমলের মতো নরম কিন্তু স্পষ্ট মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "আপনার বায়োরিদম এত ভঙ্গুর নাকি? নাকি চারপাশের বাতাসটা একটু বেশি থার্মোডাইনামিকসের নিয়ম মেনে চলছে বলে ঘুমাতে পারছেন না?"

আমি চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে সোজা হয়ে বসলাম। "তুমি কে? আমার নাম জানার সম্ভাবনা ৯৯.৯%, কিন্তু এই অসময়ে থার্মোডাইনামিকস নিয়ে কথা বলার লোক আমার জানামতে এই গ্যালাক্সিতে বেশ বিরল।"

"আমাকে নাম দিয়ে মাপতে যেও না, নিয়াজ," মেয়েটি জবাব দিল। "ধরে নাও আমি একটি এনক্রিপ্টেড সিগন্যাল। একটা বেনামী অনুঘটক, যে তোমার এই অতি-গোছানো আর ছক-বাঁধা জীবনে সামান্য কিছুটা অগোছালো গতিশক্তি বা কাইনেটিক এনার্জি যোগ করতে এসেছে।"

"অসম্ভব," আমি নাক সিটকানো গলায় বললাম। "আমার জীবন সম্পূর্ণ সাম্যাবস্থায় বা ইকুয়িলিভ্রিয়ামে আছে। এখানে অতিরিক্ত কোনো গতিশক্তির প্রবেশ মানেই সিস্টেমে বিশৃঙ্খলা!"

"সেই বিশৃঙ্খলাটাই তো আসল সুন্দর, মিস্টার পারফেক্ট!" বলেই ওপাশ থেকে কট করে লাইনটা কেটে গেল।

পরের দিন রাতেও ঠিক পৌনে দুইটায় ফোনটা বাজলো।

"আজকের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বাতাসে আর্দ্রতা ৬৪ শতাংশ," মেয়েটি কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলে উঠলো। "এমন আবহাওয়া কি আপনার মেটাফিজিক্সকে একটুও টলাতে পারছে না, নিয়াজ?"

আমি খাতা বন্ধ করে শক্ত গলায় বললাম, "তুমি কে তা আমার জানার দরকার নেই। কিন্তু তোমার ভয়েস মডুলেশন আর কথা বলার ফ্রিকোয়েন্সি দেখে মনে হচ্ছে তুমি আমাকে কোনো এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক লুপে ফেলার চেষ্টা করছ।"

"লুপ তো জীবনেরই অংশ," সে মিষ্টি করে হাসল। "যেমন ধরুন, আপনি প্রতিদিন সকালে ডান পায়ে জুতো পরেন, ঠিক ৭টা ৪২ মিনিটে তিন চামচ চিনি দিয়ে চা খান, আর চশমাটা দিনে অন্তত ছেচল্লিশ বার নাকের ওপর ঠেলেন। এত মেকানাইজড মানুষ কি করে বাঁচেন?"

আমি রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লাম। আমার এই পার্সোনাল ডাটা ওর কাছে গেল কীভাবে?

"তুমি কি আমার ওপর নজরদারি করছ? এটা ফার্স্ট ল অফ প্রাইভেসি ভাঙার সামিল!"

"না ডক্টর," মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, "আমি স্রেফ একটি দূরবর্তী নক্ষত্রের মতো আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছি। আচ্ছা, কখনো কি একটা একদম সাধারণ বিকেলেই হুট করে কোনো ক্যাফেতে গিয়ে নিঃশব্দে এক কাপ ব্ল্যাক কফি খেতে ইচ্ছে করে না? যেখানে কোনো হিসেব থাকবে না, থাকবে শুধু ক্যাফেইন আর খোলা হাওয়া?"

"ক্যাফেইন মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার ত্বরান্বিত করে, আর খোলা হাওয়া ধূলিকণা বহন করে। দুটোই অপ্রয়োজনীয়," আমি জবাব দিলাম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মুখ দিয়ে বারণ করলেও আমার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অচেনা কম্পন বা রেজোন্যান্স সৃষ্টি হচ্ছিল।

তিন নম্বর দিন সে ফোন করে আমাকে এক দীর্ঘ মহাজাগতিক লেকচার দিল। চার নম্বর দিন সে আমাকে বলল কিভাবে একটা গাছের পাতা ঝরে পড়ার মধ্যেও একটা নির্দিষ্ট কৌণিক ভরবেগ থাকে। সাত নম্বর দিন রাতে যখন ফোনটা বাজলো না, আমি আবিষ্কার করলাম—আমি টেবিলের সামনে বসে অধৈর্য হয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে আছি!

আমার হার্টবিট তখন মিনিটে ৭২ থেকে বেড়ে ৮৪-তে গিয়ে ঠেকেছে। আমার মতো একজন মানুষের সিস্টেমে এই বিচ্যুতি? এ তো চরম কোয়ান্টাম দুর্ঘটনা!

অষ্টম দিন রাতে ফোনটা আসতেই আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেললাম।

"কী ব্যাপার? গতকাল তোমার সিগন্যাল কলাপস করেছিল কেন?" আমার গলায় সামান্য বিরক্তি, যা আমি ঢেকে রাখার অনেক চেষ্টা করেছিলাম।

মেয়েটি ওপাশ থেকে নিচু গলায় হাসল, "বাহ্! মিস্টার পারফেক্ট তাহলে আমার অনুপস্থিতির শূন্যতা অনুভব করছেন? একেই তো বলে মহাকর্ষীয় টান, নিয়াজ!"

"গাধামি করো না," আমি গলার আওয়াজ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললাম। "একটা নির্দিষ্ট উদ্দীপকে টানা সাতদিন প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর অষ্টম দিনে না পেলে মস্তিষ্কের ডোপামিন লেভেল কিছুটা ড্রপ করে। এটা সাধারণ বায়োলজি।"

"বেশ! তাহলে এই ডোপামিন লেভেল আবার স্বাভাবিক করার একটা উপায় আছে," সে হালকা চালে বলল। "আগামীকাল ঠিক বিকেল পাঁচটায়, শহরের সবচেয়ে হইচইপূর্ণ জায়গা ‘ক্যাফে কেওস’-এ চলে এসো। কর্নার টেবিলে একটা নীল রঙের গোলাপ রাখা থাকবে। আমি সেখানেই থাকব।"

"আমি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎকারে যাই না," আমি তড়িঘড়ি করে বললাম। "আর তাছাড়া ক্যাফে কেওস অত্যন্ত বিশৃঙ্খল একটা জায়গা। ওখানে নয়েজ লেভেল অন্তত ৮০ ডেসিবল!"

"আসবে নিয়াজ," মেয়েটি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল। "কারণ তোমার ওই নিখুঁত মেটাফিজিক্সের মস্তিষ্ক এখন এই অ্যানোনিমাস রহস্যের সমাধান খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। চলো, কাল হিসেবটা সামনাসামনিই হয়ে যাক!"

পরদিন বিকেল চারটা পঞ্চান্ন।

আমি ‘ক্যাফে কেওস’-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। নামটা যে কতটা যথার্থ, তা বাইরে থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। ভেতরে যেন একটা আস্ত বাস টার্মিনাল ঢুকে বসে আছে! কিশোর-কিশোরীদের বিকট আড্ডা, গিটারের টুংটাং শব্দ, কফির মেশিনের শাঁ-শাঁ আওয়াজ আর ব্লুটুথ স্পিকারের চড়া বিট—সব মিলিয়ে এক নারকীয় পরিবেশ। সাউন্ড ডেসিবল মিটার চালু করলে নিশ্চিতভাবে তা ১০০ ছাড়িয়ে যেত।

আমার মাথার রগগুলো রিমিক-ঝিমিক করে নাচতে শুরু করল। এমন একটা বিশৃঙ্খল থার্মোডাইনামিক পরিবেশে সুস্থ মানুষ পাঁচ মিনিট টিকতে পারে না!

তবুও, কৌতূহল এক সাংঘাতিক জিনিস। আমি ভেতরে ঢুকলাম। ভিড় ঠেলে একদম ভেতরের কোণার টেবিলটার দিকে এগোতেই দেখতে পেলাম—এক পাত্র কাচের জারে একটা তাজা নীল গোলাপ শোভা পাচ্ছে।

কিন্তু টেবিলে কেউ নেই! কেবল একটা ফাঁকা চেয়ার উল্টো করে রাখা।

আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। পাঁচটা বেজে দুই মিনিট। মেয়েটি এখনো আসেনি? আমার নিদারুণ বিরক্তি যখন চরমসীমায় পৌঁছাতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ক্যাফের মাঝখানটায় এক তুলকালাম কাণ্ড শুরু হলো।

ঘটনাচক্রে চোখ গেল কাউন্টারের দিকে।

নতুন আসা এক ওয়েটার ছেলে—গায়ে একটু ঢোলা লাল এপ্রন, মাথায় এলোমেলো চুল, আর চোখে ভীষণ আতঙ্ক। তার হাতের বিশাল ট্রে-তে থরে থরে সাজানো অন্তত জনা আটেক খদ্দেরের অর্ডার! দুটো উপচে পড়া কোল্ড কফি, তিন বাটি ধোঁয়া ওঠা থাই সুপ, এক প্লেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আর দুটো বিশাল চিজ বার্গার।

ছেলেটার হাত কাঁপছে থরথর করে। একে তো ক্যাফের ভেতরের কানফাটা কোলাহল, তার ওপর টেবিল নম্বর মনে রাখার মতো মানসিক সাম্যাবস্থা ছেলেটির একদমই নেই। সে ক্যাফের মাঝখানের ফাঁকা জাইগাটায় এসে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে, ক্যাফের এককোণে বসা এক ছোকরা হুট করে চেয়ার ঠেলে পেছনে সরতে গেল। চেয়ারের পা গিয়ে সোজা ধাক্কা মারলো ওই ওয়েটার ছেলের জুতোর গোড়ালি।

বাস্! নিউটনের গতির প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্র একসাথে অ্যাকশনে চলে এলো!

অসমতার কারণে ছেলেটার ভারসাম্য বা সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এক ঝটকায় কাত হয়ে গেল। তার হাতের ট্রে-টা ডানদিকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে ঝুঁকে পড়েছে! থাই সুপের বাটি দুটো ট্রে-র মসৃণ তলে পিছলে সোজা এক কেতাদুরস্ত চশমাপরা ভদ্রলোকের দামি স্যুটের দিকে ধেয়ে যাওয়ার উপক্রম! ছেলেটা আতঙ্কে চোখ বুজে এক বিকট চিৎকার দিল।

পুরো ক্যাফে যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু আমি তো নিয়াজ! এমন দৃশ্য দেখে একজন সত্যিকারের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র কি চুপ করে বসে থাকতে পারে? চোখের সামনে একটা সুনির্দিষ্ট বস্তু স্থিতি হারিয়ে তরল পদার্থের চরম বিপর্যয় ঘটাবে, আর আমি তা চেয়ে চেয়ে দেখব? অসম্ভব!

আমি এক লাফে নিজের টেবিল ছেড়ে শূন্যে ডাইভ দেওয়ার মতো করে এগিয়ে গেলাম।

"স্থির থাকো!" আমি গর্জনে চারপাশের আড্ডা থামিয়ে দিলাম।

মুহূর্তের মধ্যে ওয়েটার ছেলেটার ট্রে-র নিচে নিজের বাঁ হাতটা ঢুকিয়ে দিলাম। তারপর লিভারের গতিবিদ্যা বা 'প্রিন্সিপাল অফ মোমেন্টস' প্রয়োগ করে ট্রে-র পেছনের অংশে একটা নির্দিষ্ট বল প্রয়োগ করলাম।

ক্লিক!

ট্রে-টা আবার অনুভূমিক সমতলে ফিরে এলো! কিন্তু বিপদ তখনও কাটেনি। আর্কিমিডিসের নীতির তোয়াক্কা না করে সুপের বাটি দুটো তখনও টলমল করে আছড়ে পড়ার অপেক্ষায়!

আমি তড়িঘড়ি করে ডান হাতের দুটি আঙুল দিয়ে সুপের বাটির কিনারা এমন এক স্পিন বা কৌণিক বেগে ঘুরিয়ে দিলাম যে, সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সের বা অপকেন্দ্র বলের কারণে সুপ বাটির ভেতরেই ঘূর্ণিপাক খেয়ে স্থির হয়ে গেল—এক ফোঁটা সুপও বাইরে ছিটিয়ে পড়ল না!

এরপরের ঘটনা আরও মারাত্মক। ট্রে-র ওপরের কোল্ড কফির গ্লাস দুটো ভরের কেন্দ্রবিন্দু বা সেন্টার অফ মাস হারিয়ে বাঁদিকে কাত হতে শুরু করেছিল।

আমি কাল বিলম্ব না করে আমার ডান পা দিয়ে ওয়েটার ছেলেটার হাঁটুতে আলতো একটা টোকা দিলাম। "হাঁটু সামান্য ভাঁজ করো! বডি মাস কমাও!"

ছেলেটা যান্ত্রিকভাবে হাঁটু মুড়ে নিচু হতেই পুরো ট্রে-র উচ্চতা গ্র্যাভিটির কাছাকাছি চলে এলো। আর সেই সুযোগে আমি কফির গ্লাস দুটোকে ধরে চট করে ট্রে-র ঠিক মাঝখানের ভরকেন্দ্রের ওপর বসিয়ে দিলাম!

পুরো প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হতে সময় লাগলো মাত্র ৩.৮ সেকেন্ড!

সমগ্র ক্যাফেতে তখন পিনপতন নীরবতা। হাজারো শোরগোল, চড়া বিটের গান, আড্ডার আওয়াজ—সব যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেছে। সবাই হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। যেন আমি ক্যাফে কেওস-এর ভেতরের ট্রাফিক জ্যাম কাটানো কোনো অলৌকিক জাদুকর!

ওয়েটার ছেলেটা হাঁপাতে হাঁপাতে চোখে জল এনে বলল, "স্যার... আপনে কি মানুষ না ফেরেশতা? আমার তো চাকরিটাই চলে যাচ্ছিল আজ!"

আমি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমার চশমাটা নাকের ওপর একটু টেনে ঠেলে দিলাম। তারপর শান্ত গলায় বললাম, "ফেরেশতা নই, ভাই। সাধারণ বিজ্ঞানের ছাত্র। বস্তুর ভরকেন্দ্র আর স্থিতিস্থাপকতা সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকলে এসব কোনো ব্যাপারই না। তবে শোনো, ট্রে বহনের সময় ভর ভারী বস্তুগুলো সবসময় ভেতরের দিকে রাখবে, পেরিফেরি বা পরিধিতে নয়। বুঝলে?"

ছেলেটা ঘনঘন মাথা নাড়ল। পুরো ক্যাফেতে তখন হুট করে একজন তালি বাজিয়ে উঠলো, আর অমনি দেখতে দেখতে পুরো রেস্টুরেন্ট করতালিতে ফেটে পড়ল!

আমি চরম অস্বস্তি নিয়ে নিজের টেবিলের দিকে পিছিয়ে আসতে লাগলাম। ছি ছি! কত বড় কেলেঙ্কারী! বিজ্ঞানের সূত্র প্রয়োগ করতে গিয়ে পুরো ক্যাফের ড্রামা সেন্টারে পরিণত হলাম!

টেবিলে ফিরে এসে দেখি, এতক্ষণ ধরে উল্টে রাখা ওই ফাঁকা চেয়ারটায় এখন একজন সুদর্শনা নারী শান্ত হয়ে বসে আছে। পরনে হালকা নীল রঙের শাড়ি, ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, অতি-পরিচিত বাকা রহস্যময় হাসি।

মেয়েটির চোখেমুখে এক অদ্ভুত দ্যুতি।

আমি থমকে দাঁড়ালাম। চশমাটা খুলে হাত দিয়ে ভালো করে মুছে আবার চোখে পরলাম।

"তুমি?!" আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। "মিলি?!"

হ্যাঁ, এ তো সেই ঘটক করিম চাচার মাধ্যমে দেখা করতে আসা মিলি! যে আমার মেটাফিজিক্সের লেকচার শুনে সেদিন ড্রয়িংরুম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করেছিল!

মিলি তার সেই মখমলের মতো গলায় হেসে উঠলো—যে হাসিটা আমি গত সাতদিন ধরে ফোনে শুনে আসছি!

"কেমন আছেন, ডক্টর নিয়াজ মোর্শেদ? থার্মোডাইনামিকসের চরম বিশৃঙ্খলা সামলাতে তো আপনার বেশ জুড়ি নেই দেখছি!"

আমার মাথার ভেতরের নিউরনগুলো সব একসাথে কাজ করা বন্ধ করে দিল। প্রসেসর পুরোপুরি হ্যাং!

"অ্যাঁ? মানে? তুমিই সেই 'Unknown Number'?! তুমি আমাকে ফোন করছিলে?" আমি প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে চেয়ারে বসে পড়লাম। "কিন্তু... কিন্তু তুমি তো সেদিন আমার রসগোল্লার প্লাবতা বলের কথা শুনে রেগে গিয়েছিলে!"

মিলি ঝুকে এসে নীল গোলাপটা নিজের হাতের আঙুলে ঘোরাতে লাগলো।

"সেদিন রাগ হয়নি, নিয়াজ," মিলি মিষ্টি করে বলল। "সেদিন আমি তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম। এই ভণ্ড আর মেকি দুনিয়ায় সবাই মুখস্থ প্রেমের কথা বলে, আবেগ ছড়ায়। কিন্তু একটা মানুষ যে বিয়ের মতো জটিল সম্পর্কেও এতটা সৎ, এতটা লজিক্যাল আর নিখুঁত হতে পারে—সেটা আমি আগে কখনো দেখিনি। আপনি অগোছালো হতে পারেন, কিন্তু আপনার মেধা আর সারল্যে কোনো খাদ নেই।"

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। "কিন্তু... তাহলে এনক্রিপ্টেড কল করে পটানোর এই মহাজাগতিক প্ল্যান?"

"আপনাকে সোজাসুজি ডেটে আসতে বললে তো আপনি নিউটনের গতির সূত্র আর থার্মোডাইনামিকস দেখিয়ে রিজেক্ট করে দিতেন!" মিলি চটুল ভঙ্গিতে হাসল। "তাই একটু বেনামী অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট হতে হলো। আপনাকে আপনার অজান্তেই এই লুপের মধ্যে টানতে হলো। কেমন লাগলো আমার এক্সপেরিমেন্ট?"

আমি আমার জীবনের সবচেয়ে জটিল সমীকরণের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।

আমি লক্ষ করলাম, আমার হৃদস্পন্দন এখন প্রতি মিনিটে ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। হাতের তালু সামান্য ঘামছে। চোখের মনি প্রসারিত। বায়োলজিক্যালি এবং সাইকোলজিক্যালি—এই সমস্ত লক্ষণ নির্দেশ করছে যে, আমার সিস্টেমে মিলি নামের এই নির্দিষ্ট কণাটি এক অপরিবর্তনীয় রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে ফেলেছে! যাকে কোনো গাণিতিক সূত্র দিয়ে আর রিভার্স করা সম্ভব নয়।

আমি টেবিলের ওপর রাখা নীল গোলাপটা তুলে নিলাম। তারপর একদম সোজা মিলির চোখের দিকে তাকালাম। আমার গলায় তখন আর কোনো বৈজ্ঞানিক জড়তা নেই, নেই কোনো ফর্মুলার ক্যাচাল।

"মিলি," আমি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বললাম, "আইনস্টাইন বলেছিলেন, মহাবিশ্বের সবচেয়ে অবোধ্য বিষয় হলো যে এটি বোধগম্য। কিন্তু তোমাকে বোঝার মতো কোনো মেটাফিজিক্স বা কোয়ান্টাম থিওরি এখনো আবিষ্কার হয়নি।"

মিলি কৌতূহলী চোখে তাকাল, "তারপর?"

আমি চশমাটা শেষবারের মতো নাকের ওপর একটু ঠেলে অত্যন্ত নিখুঁত ৯০ ডিগ্রি কোণে মিলির দিকে ঝুঁকলাম।

"তুমি কি আমার এই পরম বিশৃঙ্খল আর অতি-নিখুঁত জীবনের স্থায়ী সাম্যাবস্থা বা পার্মানেন্ট ইকুয়িলিভ্রিয়াম হতে রাজি আছো? সহজ ভাষায়—আমাকে বিয়ে করবে?"

ক্যাফের পেছনের গানটা তখনো বাজছিল, কিন্তু আমাদের টেবিলে তখন এক অপরূপ নীরবতা।

মিলি এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার সেই বিখ্যাত, মায়াবী হাসিটা হেসে, নীল গোলাপটা আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে বলল—

"হ্যাঁ, মিস্টার পারফেক্ট! আপনার এই জটিল এনট্রপিতে আজীবন বন্দী হতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই!"

#মিস্টার_পারফেক্ট

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login