Story

নীল আকাশ

October 13, 2026

4 views

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের আফসোস থাকে যে প্রিয় মানুষটার সাথে বিয়ে হলো না কেন? এই গল্পে আয়ান ও লিলি। দুজনে প্রেম করে বিয়ে করে। এখন তাদের জীবন কি সুখের হয়েছিল?

আয়ান ঘুমাচ্ছিল। লিলি এসে তার ওপর এক বালটি জল ঢেলে দিল। আয়ান হুরমুড় করে উঠে বসলো।

লিলির হাতে লাঠি। সে আয়ানকে বলছে, বিয়ের আগে তো বলছিলা যে কোন কষ্ট করতে হবে না। আর এখন তুমি সারাদিন ঘুমাও। আমি কেন মেয়ে মানুষ হয়ে কাজ করে সংসার চালাবো?

আয়ান কোন রিয়েক্ট করে না। তার কাছে এসব ব্যপার এখন সয়ে গেছে কথা আর গায়ে লাগে না। আয়ান উঠে শার্ট পড়ে আর ঘর থেকে বের হওয়ার সময়। আয়ান বলে, তোমার কাছে ১০টা টাকা হবে বিড়ি খাবো?

লিলি এবার আরো রেগে যায়। সে আয়ানকে দৌড়ে মারতে আসে আর আয়ান ও পালিয়ে যায়। আজ শুক্রবার বলে তার বউ লিলি ঘরেই আসে। চায়ের দোকানে আসতেই আয়ান আলিফকে দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে যায়।

আলিফ আয়ানকে দেখে বলে, দেখ দোস্ত।টাকা পয়সা নাই। চা খেলে সিগারেট খেতে পারবি না। আবার সিগারেট খেলে চা খেতে পারবি না। যেকোন একটা চুজ কর।

আয়ান বলে, চা ও খাবো সিগারেট ও খাবো।আজ বউয়ের ব্যাগ থেকে ৫০০টাকা চুরি করেছি। পার্টি হবে দোস্ত।

এদিকে লিলি যখন বাজার করার জন্য তার ব্যাগে হাত দেয়। তখন দেখে যে টাকা টা নেই।আর বুঝে ফেলে আয়ান চুরি করেছে। যার কারনে আজ তার বাজার করা হয় না। ২টা ডিম বাকি নিয়ে আসে দোকান থেকে।

এদিকে আয়ান টাস খেলতে বসে পড়ে তার বন্ধুদের সাথে। ঠোটের কোনায় সিগারেট টানতে টানতে সে টাস এর চাল দেয়। আর তার টাকা দ্বিগুন হয়। মানে এখন তার কাছে ১হাজার টাকা হয়ে যায়। কিছুক্ষন পর ই সে আবার হারতে হারতে শুন্যপকেটে বাসায় ফিরে আসে।

বাসায় এসে দেখে লিলি কেমন রেগে আছে তার ওপর আর লিলি বলে, তুৃই কেন ব্যাগের থেকে টাকা চুরি করলি? আজকে না খেয়ে থাক। তোর জন্য আমার লাইফটা আজকে এরকম। ( আয়ান এসব কথা বন্ধ করার জন্য লিলিকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে ঠোট রেখে কিস করে। আর লিলিও কিছুক্ষন পর শান্ত হয়ে যায়।)

লিলি টেবিলের ওপর একটা কাগজ রেখে বলল, এখানে সই করে দাও।

আয়ান বলল, এটা কিসের কাগজ?

লিলি বলল, ডিভোর্স প্যাপার।

আয়ানের হঠাৎ দম বন্ধ হওয়ার মতো হলো। তার বুকে কে যেন মুচড়ে দিল।

আয়ান বলল, তুমি ফাজলামি করছো? তাই

না?

লিলি বলল, না.।আমি তোমার ছন্নছাড়া জীবনে বিরক্তি হয়ে গেছি। তুমি কি ছিলে? এখন কি হয়ে গেলে? আমি ভেবেছিলাম বিয়ের পর তুমি ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বিয়েরপর তোমার পাগলামি আরো বেড়ে গেছে। আমি আর তোমার সাথে থাকতে পারবো না। হয়তো তুমি নিজেকে বদলাও নয়তো ডিভোর্স প্যাপারে সাইন করো।

আয়ান কাদো কাদো গলায় বলল, দেখো। আমার আর এমন হবে না। আমি ভালো হয়ে যাবো বিশ্বাস করো।আমি কোন নেশাও করবো না। আর সংসারও আমি চালাবো।

লিলি বলল, এরকম কথা তুমি আমাকে আরো ১০বার বলেছো। প্রথম দুই একদিন কথা মতো চলো।তারপর আবার আগের মতো। আমি আর এখন তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি বাবার বাড়ি চলে যাচ্ছি চিরকালের জন্য। তুমি অন্যকারো সঙ্গে বেধো ঘর।

লিলি চলে যাচ্ছে। আয়ান তাকিয়ে দেখছে লিলির চলে যাওয়া। কিন্তু তাকে আটকানোর কোন চেষ্টা করছে না। কারন আয়ান ভাবছে লিলি তাকে ছাড়া বাসতে পারবে না। সে ২দিন পর ই আবার ফিরে আসবে। এটা ভেবে আয়ান একটা সিগারেট ধরালো।

লিলির সাথে আয়ানের পরিচয় গ্রামে। যখন আয়ান তার মামার বাড়ি ঘুরতে যায়। তখন সে লিলিকে দেখে মুগ্ধ হয়। লিলিকে সে প্রপোজ করলে লিলি বলে তার বাবা মাকে কনভেন্স করতে। তাই আয়ান কিছুদিন লিলির বাবার পাশে কিছুদিন একসাথে নামাজ পড়ে আর লিলির বাবা আয়ানকে পছন্দ করতে শুরু করে। একদিন আয়ান তার বাবাকে নামাজ শেষ হওয়ার পর বলে, আংকেল। আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করতে চাই। তারপর তাদের দুজনের বিয়ে হয়।

প্রথম এক মাস আয়ান ঠিক মতো কাজ করে আর সংসার চালায়। কিন্তু তারপর ই তার এসবে একঘেয়ামি চলে আসে। সে লিলির প্রতি বিরক্ত হয়ে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে। একদিন তো লিলিকে কথা কাটাকাটি হলে সে লিলির ওপর হাত তুলে।

লিলি তার গ্রামের বাসায় এসে পৌছালো দুপুরবেলা। সবাই তাকে দেখে অবাক। সে হঠাৎ উপস্থিত হয়েছে।

সন্ধাবেলা লিলি পুকুর পাড়ে তার মামীকে সব খুলে বলছে। লিলি বলল, মামী আয়ান ভালো ছেলে না, ও এখন নেশা করে আর ভবঘুরে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে রাত ২টায় ঘরে আসে। আমার আর ওর সাথে সংসার করা সম্ভব না।

লিলির মামির নাম হাফসা। হাফসা তাকে বললেন, দেখ। কষ্ট করেই সংসার করতে হয়। আমরা সংসার করছি না। আর ও তো ভালো ছেলে। তোর বাবাই তো বিয়েটা দিল।

লিলি বলে, বিয়ের আগে ও ভালোই ছিল। কিন্তু বিয়ের পর যে কেন এমন হয়ে গেল? জানি না।

হাফসা বললেন, তুই যে বেচারাকে রেখে এসেছিছ। ও কি রাধতে পারে? ব্যপারে খাবে কি?

লিলির মনে পড়লো যে আয়ান রান্না করতে পারে না। একটা ডিমও ঠিকমতো ভাজতে পারে না। এটা ভেবে লিলি চিন্তিত হয়ে গেল। সে তার মামীকে বলল, আসলেই তো? এখন বেচারা কি করছে কে জানে? হয়তো খুদার জ্বালায় না খেয়ে আছে।

এদিকে আয়ান লিলি চলে যাওয়ার পরই খুশিতে নাচতে থাকে। তার বন্ধু রবিকে কল করে বলে, দোস্ত। ঘরে বউ নাই, প্যারাও নাই। আজ সারারাত আমার ঘর খালি পার্টি হবে।

সন্ধাবেলাই আয়ানের বন্ধুরা ঘরে আসতে থাকে। তাদের সাথে কোলাকোলা চিপস আর সিগারেট ছিল। আয়ান বলে, আজ কোন তাস খেলা হবে না। আজ আমরা সবাই মিলে ভুতের ছবি দেখবো। বলেই চিল্লায়ে উঠে ওখানে থাকা সবাই। হুরররে.....

সকাল ভোর হতেই লিলি বাসে করে রওনা দেয় ঢাকা তে। তার খুব চিন্তিত হচ্ছিল আয়ানের জন্য। আয়ানের যদি কিছু হয়ে যায়। তাহলে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।

ঘরে ঢুকতেই লিলি দেখে আয়ান ঘুমিয়ে আছে। সারাঘর নোংরা হয়ে আছে। আয়ান ঘুমের ঘোরে বলল, দোস্ত। একটা সিগারেট দে না।

লিলি প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে আয়ানের ঠোটে দিল। আয়ান এখনও চোখ খুলেনি। সে ঘুমের ঘোরে সিগারেট খাবে। তারপর সিগারেট শেষ করে চোখ খুলবে। তাই সে চোখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই বলল, কেউ একটু আগুন দে।

লিলি লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালালো সিগারেটে। তারপর দুরের সোফায় বসলো।

আয়ান ভাবছে তার বন্ধু বোধ হয় সিগারেট ধরিয়ে দিয়েছে।

সিগারেট শেষে যখন আয়ান চোখ খুললো। তখন দেখলো লিলি সোফায় বসে আছে। আয়ান প্রথমে ভাবলো সে কি স্বপ্ন দেখছে?

লিলি তার সামনে বসে আছে। আয়ান ভয়ে উঠে বসে জানালা দিয়ে সিগারেট ফেলে দিল। আর ভদ্র সাজার অভিনয় করছে।

লিলি বলল, আমি একদিন মাত্র ঘরে ছিলাম না আর ঘরটাকে কি করে ফেলেছো? এভাবে কি জিবন চলবে? কোন কাজ তো করতে হবে?

আয়ান রেগে বলল, কি কাজ করবো বলো?

লিলিও রেগে বলল, যে কাজ ই দেই। সে কাজেই তুৃমি ব্যর্থ। দুইজন কাজ করো। তারপর মালিকের সাথে ঝগড়া করে কাজ ছেড়ে এসে পড়ো।

আয়ান বলল, তো, মালিক উল্টা পাল্টা কথা বললে তো ঝগড়া হবেই।

লিলি বলল, তোমার সমস্যা কী জানো?

আয়ান বলল, কী?

লিলি বলল, তুমি বেকার। তোমার জন্য আমাকে কথা শুনতে হয়। বাইরে মেয়েদের কাজ করলে যে কি পরিমাণ হ্যারেজমেন্ট হতে হয়। তা তুমি কিভাবে বুঝবে?

আয়ান এবার লিলির এসে লিলির হাত দুটো চেপে বলল, এবার থেকে তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আমি বাইক চালাবো। আর ডেলিভারী ম্যানের কাজ করবো। তুমি তোমার বাবার বাড়ির থেকে টাকা এনে দাও বাইক কেনার জন্য।

লিলি খুশি হয়ে বলল, সত্যি তুমি কাজ করবে?

এটা বলে আয়ানকে জড়িয়ে ধরে। আয়ানও তাকে জড়িয়ে ধরে।

লিলি তার মাকে ফোন করলো।

_আম্মি আমার কিছু টাকা লাগবে

_কত?

_৫০ হাজার।

_ এতো টাকা দিয়ে কি করবি?

_ এতো কৈফিয়ত দিতে পারব না। দিবে কিনা সেটা বলো।

_এতো টাকা আমি কই পাবো?

লিলি ফোন কেটে দেয়।

এদিকে চায়ের দোকানে আয়ান মন খারাপ করে বসে থাকে। আয়ান চাওয়ালা কে বলে, মামা। চা দাও।

চাওয়ালা বলে, চা নাই। আগের বাকির টাকা দে। তারপর চা পাবি।

এমনি সময় ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল এক অন্ধবুড়ো ভিক্ষুক। আয়ান সেখানে দৌড়ে গিয়ে ভিক্ষুকের বাটি থেকে ২০টাকা তুলে নেয়। তারপর বুড়ো ভিক্ষুক কে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার চলে আসে চায়ের দোকানে।

লিলি কিস্তি অফিসে আসে। বাইকের ব্যপারে কথা বলতে। তারা সবকিছু বুঝিয়ে দেয়। কিস্তিতে বাইক নিলে কিভাবে পরিষধ করতে হবে। সব কিছু ডিটেলসে বলে। লিলি কাগজে সই করে দেয়।

এসবের পর লিলি তার অফিসে যায় বসের সাথে কথা বলতে। যে সে আর কাজ করবে না। লিলি একটা ব্যাংকে কাজ করতো। তবে এই ব্যাংকের স্যালারী খুব কম। তবুও সংসার চলে যায়। লিলি তার বসকে বলে, সে আর এই কাজটা করবে না। বলে চলে আসে।

তারপর লিলি দারাজ অফিসে দেখা করতে যায়। যে এখানে কোন ডেলিভারী বয় লাগবে কিনা? দারাজ বলে, না। তাদের লাগবে না।

তারপর সে অন্য একটা কম্পানিতে যায়। এটাও দারাজের মতো। তবে এতো নাম করা না। এখানে আবার লোকের দরকার ছিল। তাই তারা লিলিকে হ্যা বলে দেয়। লিলি খুশি হয়ে বাড়িতে ফিরে।

আয়ান রাতে মদ খেয়ে বাসায় ফিরছিল। এমন সময় তাকে দুজন পুলিশ ধরে। পুলিশ বলে, দাড়া তোকে চেক করবো?

আয়ান খুব ভয় পেয়ে যায়। এটা ভেবে যে সে মনে হয় ধরা পড়বে।

এদিকে লিলি তার জন্য বাসায় অপেক্ষা করছে। আয়ানকে সে সারপ্রাইজ দিবে। বাড়ির নিচে আয়ানের কালো বাইক রাখা আছে। কিন্তু আয়ান যে এখনো বাসায় ফিরলো না।

আয়ান রাতে মদ খেয়ে বাসায় ফিরছিল। তার সাথে ছিল তার বন্ধু আলিফ।

আলিফ: দোস্ত! আমার জানি কেমন লাগছে। পেটে মোচড় দিচ্ছে। বমি আসতেছে।

আয়ান: মদ খেয়েছিছ। বমি তো আসবেই।

আলিফ: আমার কেন জানি খুব পেটে ব্যথা করছে।

আলিফ পেটে হাত দিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আয়ান একটা রিক্সা ঠিক করে।

রিক্সায় আলিফ অনেকবার বমি করেছে। কিন্তু সেখানে বমি ছিল রক্তের। সে রক্ত বমি করেছে। তার অবস্থা খুব খারাপ। রিক্সায় আয়ান আলিফের হাত শক্ত করে ধরে।

আলিফ: আমি মনে হয় আর বাচবো না দোস্ত। আমার পেটে পাথর হয়েছে।

আয়ান: আরে। তোর কিছু হবে না। আমি আছি তো।

অবশেষে রিক্সা থামলো মির্ডফোর্ট হাসপাতালের সামনে। কিন্তু ততোক্ষণে খুব দেরী হয়ে গেছে।

আলিফ মারা গেছে। ডাক্তার রাও তাই বলেছে। অতিরিক্ত মদ্যপান, নেশা করার কারনে সে মারা গেছে।

আলিফের লাশ পড়ে আছে। তার পরিবারের কেউ আসেনি। কারন আলিফ নেশা করে। এটা ওর পরিবারের সবাই জানতো।

আয়ান ও তার কিছু বন্ধুরা মিলে গোসল করিয়ে আজিমপুরে কবর দেয়।

এই ঘটনা আয়ানের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দেয়। সে বুঝতে পারে খারাপ হয়ে মারা গেলে কোন দাম নেই। আলিফের জন্য তার কোন বন্ধু কাদেনি। উল্টো হাসাহাসি করেছে। খারাপ মানুষকে কেউ পছন্দ করে না।

আয়ান ভাবে সেও যদি মারা যায়। তাহলে ও কি কেউ কাদবে না? সবাই উল্টো খুশি হবে। আয়ান ভাবে সে মারা যাওয়ার আগে ভালো হয়ে মারা যাবে। যাতে মানুষ তার জন্য কাদে।

এদিকে লিলি তার জন্য বাসায় অপেক্ষা করছে। আয়ানকে সে সারপ্রাইজ দিবে। বাড়ির নিচে আয়ানের কালো বাইক রাখা আছে। কিন্তু আয়ান যে এখনো বাসায় ফিরলো না। রাত ৩ টায় আয়ান মন খারাপ করে বাসায় ফিরে।

আয়ান: লিলি। ভাত খেয়েছো? নিচে দেখলাম একটা বাইক এটা কার?

লিলি: আমি তোমার জন্য বাইক নিয়ে এসেছি।

আয়ান লিলিকে জড়িয়ে ধরে কাদছে।

লিলি: আজকে তোমার কি হলো? মন খারাপ কেন?

আয়ান: আমার প্রিয় বন্ধু আলিফ মারা গেল।

লিলি: ইন্নানিল্লাহে ওয়া নিল্লাহির রাজিউন।

( সমাপ্ত)

গল্প: নীল আকাশ

লেখক: রুদ্র সিয়াম

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login