আমায় মেরে তো শেষ হবে না কিছুই।
বলেছিলেন,
যখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল
ঢাকার কোনো অচেনা গলি ধরে
অন্ধকার ভ্যানে।
চারদিকে ঘন কুয়াশা,
শীত জমে ছিল রাইফেলের নলে।
আকাশ ছিল নির্বাক,
আর রাত?
সে যেন রাষ্ট্রের কুৎসিত মুখোশ পরে
নেমে এসেছিল চোখ বেঁধে।
জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে
নির্বিচারে পেটানো শরীরটা
যখন রক্ত মেখে নরম হয়ে এলো,
তখনও ঠোঁটে সেই এক অদ্ভুত মুচকি হাসি!
যেন কিছুই হয়নি।
যেন কিছুই ঘটছে না।
যেন আদর্শের সামনে মৃত্যু
শুধু সময়ের ক্ষুদ্রতম বিন্দু।
তোমরা জানো না,
আমি মরে গেলে
কতটুকু জায়গা নেবে এই দেশ?
বলেছিলেন তিনি।
আর সেই বাক্য
চুপিসারে দেয়ালের গায়ে ছাপ রেখে গিয়েছিল।
তার হাতের হাতকড়ায় বন্দী ছিলো রাষ্ট্রের বিবেক।
যখন গুলি চলল,
একটা… দুইটা… তারপর আর গোনা গেল না।
অন্ধকার রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা হলো তার দেহ,
বলে দেওয়া হলো,
"বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু,"
যেভাবে ইতিহাসকে লেখা হয় প্রেস রিলিজে।
কিন্তু সেই রাত জানে,
মাটির নিচে কেঁপে উঠেছিল শিকড়,
আর তার রক্তে চুঁইয়ে পড়েছিল
স্বপ্ন, সংগঠন, প্রতিজ্ঞা এবং আদর্শের বীজ।
আজও কোনো সন্ধ্যায়,
জেলেপাড়ার ঘোলাটে চায়ের দোকানে
কোনো বৃদ্ধ বামপন্থী বলে ওঠেন,
"তখন ছিল সিরাজ…
যে চোখে চোখ রেখে বলত সত্য,
যার কণ্ঠে ছিল বিদ্রোহের সুর,
যার হাত ধরে আমরা শিখেছিলাম
রাষ্ট্র মানেই শোষণ নয়,
মানুষই রাষ্ট্রের মূল।"
সে কথারা মরে না।
সে বিশ্বাসে মৃত্যু নেই।
যতবার তাকে গুলি করা হয়েছে,
ততবারই তিনি ফিরেছেন,
কখনো কোনো ছাত্রের বুকে লাল ব্যাজ হয়ে,
কখনো কোনো মিছিলের অঙ্গীকারে,
কখনো কোনো কবির কলমে
অক্ষয় এক বিস্ফোরণ হয়ে।
তাকে মেরে শেষ হয়নি কিছুই।
বরং মুচকি হেসে,
তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন
সময়ের রক্তমাখা প্রান্তে,
পেছনে অজস্র ছায়া;
যারা এখনও চিৎকার করে বলেন:
স্বপ্নকে গুলি করা যায় না।
(কবিতাটি আমার লেখা নিষিদ্ধ হয়েছিল আমার বন্ধু নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া)