Critic

সায়ানাইড ফুলের জাদুকর মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

October 14, 2026

66 views

সায়ানাইড ফুল উপন্যাসটি বাস্তব ঘটনা থেকে এগিয়ে পরাবাস্তব বা জাদুময় দুনিয়ার দিকে ধাবিত হয়েছে। যেখানে মূল জাদুকর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে গল্পের অতি রহস্যজনক চরিত্র রিশাদ ভাইয়া। যেই ব্যক্তির রয়েছে প্যারালাল জগতের সাথে কানেকশন। বৈচিত্রময়তাই যেখানে অতি স্বাভাবিক।

কথোপকথনের শুরুটাই কেমন উদ্ভট কাল্পনিক সব কথা দিয়ে। যেখানে সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত হয়েছে ফ্রি আর ফ্রিদা নাম দুটো। মেনে নিলাম ফ্রিদা কাহলো লেখকের প্রিয় আর্টিস্ট; তাই বলে এই দুটো নাম উচ্চারণ করতে করতে নামের খিচুড়ি পাকিয়ে ফেলবে এটা অপ্রত্যাশিত ছিল। চরিত্রের নাম সিলেকশনে লেখক আসলে কি পন্থা বেছে নিয়েছে জানি না, প্রায় প্রতিটি নামের মধ্যেই তিনি যুক্ত বর্ণ ব্যবহার করে কি মেসেজ দেবার চেষ্টা করেছেন বোধগম্য হয়নি।

বইটিকে একক কোনো জনরায় তাক করে তুলে রাখতে পারছি না। কারণ, এখানে সামাজিকতা আছে, বাস্তবতা-কাল্পনিকতা, দর্শন, সায়েন্স ও শৈল্পিকতার এক নিবিড় মিশ্রণ রয়েছে। যেহেতু গল্পের মেইন থিম মৃত্যুকেন্দ্রিক তাই লেখক জীবন ও মৃত্যু নিয়ে বেশ কিছু সুন্দর আত্ম উপলব্ধি ফ্রিদা চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। সবগুলো বললে লেখা অনেক বড় যাবে, তাই দুয়েকটা আমি উল্লেখ করবো।

গল্পের প্রায় পুরোটাই আত্ম-কথন। ফ্রিদা নামের এক নারী চরিত্রকে লেখক ব্যবহার করেছেন কিন্তু তিনি কি আসলেই এমন একটি চরিত্রকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন? সে বিষয়ে আমার নিজের মনের কোণেই মাঝে মাঝে প্রশ্ন লুকোচুরি খেলে। কিসের প্রয়োজনে জানি না তিনি এই চরিত্রকে কখনও পাগল বানিয়েছেন, কখনও স্বাভাবিক রেখেছেন, কখনও তার মাঝে দিয়েছেন গভীর প্রেমের অনুভূতি, কখনও ভালবাসতে শিখিয়েছেন হাতে ধরে আবার আছাড় মেরে ফেলে রেখেছেন রোগের স্তুপে, মাতলামিতেও মন ভরেনি তখন বানিয়ে দিলেন লেসবিয়ান, আত্মগ্লানির ছিটেফোটা এলেই শুরু করে দেন মৃত্যুর অজুহাত।

এই উপন্যাসটি নিয়ে আমার হাজার খানেক আভিযোগ রয়েছে বটে, কিন্তু তাই বলে কি এতোক্ষনের পাঠযাত্রায় ভালোলাগার কিছুই নেই! আছে। সহস্রাধিক বক্তব্যের মাঝে একটি কথা আমার কাছে বেশি আপন মনে হয়েছে- “লোনলিনেসের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। ওই শব্দ শুনে ফেললে হাজার মানুষের ভিড়েও নিমিষেই একা হয়ে যাওয়া যায়!” হতে পারে এই গল্প আমাকে একাকী বানিয়ে এমন একটি নিস্তব্ধময় বাক্যকে নিজের করে নিতে শক্তির যোগান দিয়েছে। গল্পের স্রোতে হারিয়ে আমি কখনও পদ্য খুঁজে পেয়েছি। কি এক চৌকশ শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন লেখক রিশাদ!

বইটির তিন চতুর্থাংশের সমবেগে অনুগমনটা বেশ সুখপাঠ্য ছিল। ঝরঝরে লেখনী আর সাথে দুয়েকটা দর্শনধারী বাক্যের সংমিশ্রণ সবমিলিয়ে বইটি প্রিয় হবার কাতারে চলে যাচ্ছিল। এর পরে লেখকের ইউথ্যানশিয়া আর মৃত্যু নিয়ে মাদকতার মাত্রা বেড়ে চূড়ান্ত হলো যে আমার মনে হচ্ছিল, তিনি নিজেও জানেন না গল্প কোনদিকে আগাচ্ছে, কেন আগাচ্ছে, কিভাবে আগাচ্ছে!

একশত তেত্রিশ পাতার পরে আসলে সবটাই নীরস লেগেছে। যদিও রসিকতার মাত্রা ছিল সামান্য; এরপরেও সায়ানাইড ফুলের শুরুটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের ছিল। গল্পের ভেতরে লেখকের জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি বইয়ের প্রমোশন করে দেয়া এবং দ্বিতীয়বার জোর করে ভিন্ন বইয়ের সাথে এই উপন্যাসের যোগসূত্র স্থাপন করবার মতো ব্যর্থ যে চেষ্টা চালানো হয়েছে এটাই ছিল শত লিটার দুধে এক ফোটা লেবুর রস ফেলে দেবার সমান।

লেখক হয়ত ভুলে গিয়েছিলেন সায়ানাইড ফুল মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের কোনো কমিক বুক নয়। এটি বাংলাদেশের সায়েন্স ফিকশন, সামাজিক, দর্শনধারী, অতিপ্রাকৃত উপন্যাস যেখানে তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে টাইম ট্রাভেল, মাল্টিডাইমেনশন, আর মেডিক্যাল সায়েন্সের অদ্রবীভূত মিশ্রণ তৈরি করেছেন।

গল্পের সাথে পুস্তকের নাম রুপক অর্থে সার্থক হলেও বিষয়বস্তুর সাথে অসামঞ্জস্যতাই উপন্যাসটিকে করুণ পরিণতির দিকে ধাবিত করেছে। যেহেতু একটা ব্যাতিক্রমী জনরাকে সঙ্গে নিয়ে লেখক লেখালেখির জগতে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং পথটা দুরুহ আর এই লেখার মধ্যে আমার ভালোলাগার অংশ গড়ে উঠেছিল, তাই আশা রাখতেই পারি সামনে ভালো কিছু পাবো।

#হাবিব_রহমান

 

Picked up where you left off

Comments

Sadia Shobnam was this story’s first reader

+40 XP

    Please login to post comment. Login

  • Sadia Shobnam 2 weeks ago First reader

    আপনার লেখা দেখে মনে হলো বইটি পড়ে আপনার অনুভুতি খুব একটা ভালো নেই। জাদু বাস্তবতা নিয়ে আমাদের দেশের লেখকদের অভিজ্ঞতা বেশ সীমিত। গুরুত্ব বিষয় লেখায় উঠে এসেছে।

    • Habib Rahman 2 weeks ago

      আপনার গঠনমূলক মন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।