গ্রামের অনেকেই মজা করে ২০২০ কে বিশ বিশ বলছে। যেটাকে উচ্চারণের ভিত্তিতে তুলনা করলে “বিষ” এর মতো শোনায়। অর্থাৎ তাঁদের ভাষ্যমতে, এই বছরটিতে দুবার বিশ শব্দটি উচ্চারিত বলে যত আপদ ২০২০ এ মিলছে। যুক্তি হাস্যকর হলেও সাময়িক প্রশান্তির জন্য যথেষ্ট। কারণ, বছরটির শেষের দিকে সকলের মনে উঁকি দিচ্ছে ২০২১ সাল কেমন যাবে? অনেকের আত্মবিশ্বাস উত্তুঙ্গে- ২০২১ এ সব মসিবত দূর হবে।
আমরা দেখেছি ২০২০ এ অনেক বিশিষ্ট এবং আলোচিত ব্যক্তিবর্গরা ইন্তেকাল করেছেন। ৩৬৫ দিনে এত মানুষের মৃত্যুর সংবাদ কর্ণকুহরে পৌঁছাবে কেউ হয়ত আন্দাজ করতে পারেনি। ইতিহাসের পাতায় আরো একটি বিষাদকাল যুক্ত হলো। যেমনটি হয়েছিল “ভুলে যাওয়া মহামারি” স্প্যানিশ ফ্লু’র সময়। শতাব্দী পূর্বে এই ভাইরাসটি যে পরিমাণ তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে, ইতিহাস এটিকে সবচেয়ে ক্ষতিকর ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করে।
লোমহর্ষক এই ইনফ্লুয়েঞ্জাঘটিত ভাইরাসটি ১৯১৮-১৯২০ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে প্রায় ৫ শতাংশ লোকক্ষয় ঘটায়। উনবিংশ শতাব্দীর চেয়ে বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব সর্বখাতে বেশ এগিয়ে। তারপরও এই অদৃশ্য শক্তিকে ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে আধুনিক সমাজ।
শতাব্দীর এই সন্ধিক্ষণে টিকা নিয়ে শুরু হয়েছে লঙ্কাকাণ্ড। আমরা মনুষ্য জাতি কি কখনই শুধরাবার নই? কোভিড-১৯ আমাদের বৈষম্যহীনতা শেখালো, যখনই টিকার সম্ভাব্যতা পাওয়া গেল; আবারও শুরু হলো বৈষম্য আর ক্ষমতা দেখানোর খেলা। এদেশে তো করোনা মহামারির কঠিন সময়েও দুর্নীতি বন্ধ থাকেনি। গরীব মানুষের ত্রাণ সামগ্রী পর্যন্ত চুরি করতে আমাদের বিবেকে বাধেনি।
করোনা আমাদের আত্ম-কেন্দ্রিকতা দূর করতে শিখিয়েছে, উদার হতে শিখিয়েছে। পরিবার গড়তে শিখিয়েছে, সামাজিক সম্পর্কগুলোর মাঝে দূরত্ব কমিয়েছে। একটি দেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে পরিবারের ভূমিকাই মুখ্য। এত কিছু জানা এবং শেখার মাঝে কিছু উপলব্ধিও রয়েছে। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যখাত প্রচন্ড নড়-বড়ে। শুধু ডাক্তারদের দোষারোপ করা কুপ্রথার অবসান জরুরি মহামারি তা বুঝিয়ে দিয়েছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত রাষ্ট্রগুলোর টনক নড়েছে এই মহাকালে। ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা সামগ্রী এমনকি পরিমিত ধারণক্ষমতারও ঘাটতি ছিল ঢের বেশি। সমালোচনাকে সমাধানে বাস্তবায়ন করতে চীন ১০ দিনে হাসপাতাল গড়েছে। পাল্টা সমালোচনায় উন্নয়নের ধারা বইতে পারে না।
একটি দেশের অর্থনীতি স্বাস্থ্যের ওপর কতটা নির্ভরশীল সেটা বোঝা গেল, কারণ- নাগরিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়; দক্ষতার পাশাপাশি সুস্বাস্থ্যও প্রয়োজন। আশা করি দেশের কারখানা মালিকেরা এবার বিষয়টি উপলব্ধির পাশাপাশি কর্মীদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিবেন।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো- প্রযুক্তির অনভ্যস্ততার অযুহাত দিয়ে বাংলাদেশ এখনও প্রযুক্তি খাতে অনেক পিছিয়ে। ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটছে এটাই আশার বাণী। প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিটিং, ক্লাস, আলোচনা, সভা ইত্যাদির উদ্বোধন হয়েছে। যা নিঃসন্দেহে আমাদের রাজধানীর মতো অতিরিক্ত ট্রাফিক জ্যামের শহরের জন্য অত্যন্ত যুগোপযোগী।
২০২০ আমাদের কাছ থেকে শুধু সময় কেড়ে নেয়নি; অতি-বাস্তবতার সম্মুখীন করে নিজেকে আপগ্রেড হতে শিখিয়েছে। কোভিড-১৯ আমাদের অন্যতম প্রধান মৌলিক চাহিদা “খাদ্যে” আঘাত হেনেছে। আমরা শহুরে এবং পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিতে এতটাই নিমজ্জিত ছিলাম যে, গ্রাম্য সংস্কৃতি ও কৃষি খাতের গুরুত্বই কমে গিয়েছিল!
খাদ্যের জোগান যে কৃষি হতে আসে সেটা আমরা ভুলতে বসেছিলাম হয়ত! মহামারীর মাঝে আর্থিক অসচ্ছলতায় বুভুক্ষুদের যখন ভিড় লেগে গিয়েছিল, তখন কৃষকরা একেকজন বীর যোদ্ধা বেশে লড়েছেন মানুষের ক্ষুধা নিবারণের তাগিদায়। ২০২০ শিক্ষা দিয়েছে- কৃষক কোনো নিম্নবর্গীয় সমাজ নয়। তাঁরা সার্বজনীন যোদ্ধা। যারা লড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে, আসমান, মাটি, রোগবালাই, কীট-পতঙ্গ এবং সূর্যের সাথে।
আফসোস! যাঁদের পদক মানায়, তাঁরা পদক পান না। অন্তর ক্ষুধায় বেঁচে থাকা যায়, পেটের ক্ষুধায় যায়না। এতকাল ধরে যারা পেটের খিদা মিটাচ্ছে তাঁদের পদক দিন, অনুপ্রেরণা জোগান, মূল্যায়ন করুন। তাঁরাই বাংলাদেশকে একদিন উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করবে।
এছাড়াও করোনাকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এক ঘোষণায় অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তার বিকাশ ঘটেছে। যাঁরা এই মহামারীর মধ্যেই নিজেদের প্রয়াস ধরতে পেরেছে, পরিস্থিতিকে জয় করতে পেরেছে।
আমার ক্লাসের ভালো বক্তৃতা দেওয়া মেয়েটা এখন নিজের অনলাইন ব্যবসায় মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট সামলাচ্ছে, ল্যাব-রিপোর্টে সুন্দর হাতের লেখার মেয়েটি এখন ক্যালিগ্রাফি করে আর ক্যানভাসে নিত্যনতুন রঙ লাগিয়ে শত-শত মানুষের দেয়াল জয় করে নিয়েছে; সারাদিন কম্পিউটারে গেম খেলা বন্ধুটি ফ্রি-ল্যান্সিং করে দৈনন্দিন দেশ-বিদেশে ক্লায়েন্টের সাথে চুক্তিভিত্তিক কাজে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করছে, কথায় কথায় কবিতা ছোড়া বন্ধুটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য অনুসারীর চাহিদায় নতুন বই বেরোচ্ছে! ক্যারিয়ার সচেতন বন্ধুটির চাকরির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন!
এত সফলতার গল্পের মাঝে কোভিড-১৯ তাঁদের জন্য অভিশপ্ত, যাঁদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, দিনমজুরের কাজ করে, যারা দিনে আনে দিনে খায়। তাঁদের কেউ কেউ হয়ত তিনবেলা খাবারের লক্ষ্যে ছুটে, কেউবা একবেলা পায়, আরেক বেলার জন্য উন্মুখ থাকে। খাবার জোটানোই যাঁদের জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল! আর যাই হোক, ক্ষুধার্ত পেট হতে কখনও অভিনব পরিকল্পনা কিংবা উদ্যোগ বের হবেনা। সফল হতে গেলেও মৌলিক অধিকারে স্বয়ংসম্পূর্ণতা প্রয়োজন।
২০২১ এও করোনার আঁচ থাকবে। তবু শুকরিয়া যে, কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই বিজ্ঞানীদের কঠোর পরিশ্রমে টিকা এখন মানুষের শরীরে। অতীতে কোনো ভাইরাসের বেলায় এত তাড়াতাড়ি টিকা বেরোয়নি। এটি বিশ্ববাসীর জন্য নিঃসন্দেহে একটি সুসংবাদ কিন্তু দুঃসংবাদ হলো, ইতোমধ্যে করোনার নতুন স্ট্রেইনে মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২১ সহ সামনের বছরগুলো আমাদের কিরকম কাটবে তা নির্ভর করছে বর্তমানকে আমরা কিভাবে ব্যবহার করব! এই মহামারিতে প্রযুক্তিগত জিনিসপত্রের চাহিদা বেড়েছে।
দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রযুক্তিগত জিনিসপত্রের অধিকাংশই আমাদের আমদানি করতে হয়। কেন আমাদের দেশেই এসব উৎপাদন সম্ভব নয়? আমরা যুক্তরাষ্ট্রসহ সারাপৃথিবীর ১ম সারির ধনীদের দিকে তাকালে দেখতে পাবো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোই ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য মোতাবেক, তাঁদের সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত বাড়-বাড়ন্ত সেদেশের অর্থনীতিতে আঁচড়টুকুও লাগতে দেয়নি। অন্যান্য খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে যখন গোড়াপত্তনের লহরি বইছে, তখন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজার অবিশ্বাস্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
করোনা আমাদের অর্থনীতির দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়েছে, এককেন্দ্রিক ব্যবসায় কখনও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সম্ভব নয়। দেশ শুধু পোষাক শিল্প দিয়ে চলতে পারেনা। পোষাক শিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পেও আমাদের মজবুত ভিত্তি গড়তে হবে। বিনিয়োগ বাড়িয়ে এবং দেশীয় মেধাকে কাজে লাগিয়ে বহুমাত্রিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে; যেটা দিয়ে কৃষিতেও লাভবান হওয়া যায়, যেখানে অসংখ্য মেধাবীর স্বপ্নের কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে। এজন্য দরকার সরকারি এবং বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সহজ বিপণন নীতি।
জনগণের সহযোগিতা ছাড়া সরকার চাইলেও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেনা। আইন প্রণয়ন-ই যথেষ্ট নয়, আইনকে শ্রদ্ধা করে, একের লাঠি দশের বোঝা বয়ে এগিয়ে চলাই আমাদের প্রত্যয় হওয়া উচিত।
#প্রবন্ধ #হাবিব_রহমান
লেখাটি মানবকন্ঠ পত্রিকার উপ সম্পাদকীয় পাতায় ছাপানো হয়েছিল।