ফলের রাজা আম নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আবেগের শেষ নেই। এটি একটি ফলের গাছের সাথে একটি ঐতিহ্যের রক্ষকও বটে। গ্রামাঞ্চলে এখনও প্রত্যেকটি বাড়িতে আম গাছ সৌন্দর্য, প্রশান্তি ও ফলের ধারক-বাহক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এছাড়াও শহুরে এলাকার ছাদে অন্তত একটি আম গাছহীন বাগান খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল হবে।
আমের রয়েছে ইতিহাস, সাহিত্য, সুর, নিজস্ব রস-স্বাদ, অর্থনীতি, বাণিজ্য, ইন্ডাস্ট্রি আরও কত কি! একটি ফলকে কেন্দ্র করে এত কিছুর আয়োজন তো আর এমনি এমনি হয়নি; শুরু থেকেই মানুষের আস্থার এক বিশেষ প্রকোষ্ঠ জয় করেছে আম।
মানুষ থেকে সমাজ, সমাজ থেকে দেশ, দেশ থেকে পুরো বিশ্বব্যাপী আমের বিচরণে মানুষ এতটা আকৃষ্ট যে, আজ আমরা বাড়ির উঠোনেই এশিয়ান, ইউরোপিয়ান কিংবা আমেরিকান আমের চারা লাগিয়ে ভিনজাতীয় আম খেতে পারি।
এভাবেই ধীরে ধীরে আম উৎপাদনে এখন আমাদের দেশ বিশ্বে সপ্তম স্থানে রয়েছে। কিন্তু যেভাবে আমরা ভিনদেশী আম আমাদের বাজারে দেখতে পাই, কিংবা চারা থেকেই সংগ্রহ করে থাকি, দুঃখের বিষয় হলো, সেরূপে আমাদের দেশীয় জাতের আম অন্যান্য দেশের বাজারে দেখা যায় না। কারণ বহির্বিশ্ব থেকে আম আমদানির তুলনায় রপ্তানির রেটিও খুবই নগণ্য।
কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২ লাখ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন আম উৎপাদন হয়। এবং ঐ বছর তা রপ্তানি হয় যথাক্রমে ২২ টি দেশে মোট ১৭৫৭ টন। রপ্তানির এই সংখ্যাটি উৎপাদনের তুলনায় অতি সামান্য। উল্লেখ্য অর্থবছরে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ডের মতো দেশ আম কিনেছে আমাদের কাছ থেকে। এখন পর্যন্ত আমের বাজারে বাংলাদেশি আমের ক্রেতা প্রবাসী বাঙালিরা।
এই বাজার প্রসারিত করে সর্বশ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো আম আমাদের দেশে উৎপাদিত হয়। সম্মিলিত উদ্যোগের অভাবেই বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদন হওয়ার পরও আমরা রপ্তানিতে অনেক পিছিয়ে এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন পাকিস্তান, থাইল্যান্ড অন্যদিকে ম্যাক্সিকোর মতো দেশে বাংলাদেশের চেয়ে কম আম উৎপাদন করার পরও আমাদের চেয়ে রপ্তানিতে এগিয়ে।
আমের রপ্তানি বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২১-২০২৭ সালের মেয়াদে ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ১৫ জেলার ৪৬ টি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে “রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প” এর যাত্রা শুরু করে। সরকারের এই অগ্রযাত্রায় পরবর্তী বছরগুলোতে আম চাষিদের আরও বেশি সুযোগের আওতায় এনে বাগান সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
একবছরে যে পরিমাণ আম উৎপাদন হয় তার মাত্র ৬৫-৭০ শতাংশ কঞ্জুমার এর কাছে পৌঁছায় বাকি ৩০-৩৫ শতাংশ আম নষ্ট হয়ে যায়। পচন, আঘাত, ট্রান্সপোর্টের খরচ ও সময়সাকুল্যতা, দক্ষ জনবলের অভাব, আম সংগ্রহের সময় অসচেতনতা কিংবা আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক সময়ে আম সংগ্রহ না করা, আম বহনকারী পাত্রের ব্যয় ও অপর্যাপ্ততা, অনিয়ন্ত্রিত আম সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির কারণে প্রাকৃতিক এই সম্পদগুলো নষ্ট না হয়ে যদি আমাদের জিডিপিতে ভূমিকা রাখত অর্থনৈতিক মন্দার দিনে এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে! এই আনন্দকে বন্দি করার লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে সরকার।
উত্তম কৃষি চর্চা (গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস- গ্যাপ) এর সনদ প্রাপ্তির জন্য যেসব নির্দেশনাবলি মেনে আম চাষ করা প্রয়োজন সেসবই এই প্রকল্পের বিশেষ অংশ। আমরা জানি গ্যাপ এর সনদ পেলে বহির্বিশ্বে ফল ও শাকসবজি রপ্তানির দুয়ার আগের তুলনায় অধিক উন্মোচিত হবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সরকারের এই প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে। উদ্যোগ মহৎ হলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও শক্ত মনোবলের এক কেন্দ্রিক মানবশক্তি। কিন্তু সরেজমিনে প্রকল্পের ‘পেস্ট রিস্ক এনালাইসিস-পিআরএ’ করতে গিয়ে লক্ষ্য করি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই কাজের দায়ভার দিয়েছেন ইউনিয়নভিত্তিক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের যারা কি না ইউনিয়নের অন্যান্য সেবাগুলোই সঠিক ভাবে নিশ্চিত করতে পারছেন না।
মিটিং, মিছিল, মেলা আর অন্যান্য কার্যক্রম দিয়েই নাকানিচুবানি খাচ্ছে প্রতিনিয়ত, এর মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে তাদের জড়িত হওয়া প্রকল্পের জন্য সুফল বয়ে আনবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। এমনকি তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ যেমন- কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার এবং উপজেলা কৃষি অফিসাররাও বেশ উদাসীনতার চোখেই দেখে আসছেন বিষয়টিকে।
অধিকাংশ কৃষকের প্রকল্প নিয়ে তেমন কোনো জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা কিছুই নেই; রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পে তারা কেন জড়িত, সে বিষয়ে প্রশ্নের জবাবেও অধিকাংশই মনে করেন, “এই প্রকল্প শুধুই বাজারে বেশি দাম পাবার উদ্দেশ্যে অথবা সরকারের কাছে অধিক মূল্যে আম বিক্রির উদ্দেশ্যে”; ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তা প্রদানে এখন পর্যন্ত কেউ চিন্তিত নয়। নিয়মিত অভিজ্ঞ কৃষি কর্মকর্তার পরিদর্শনের অভাবে কিংবা একাধিক পেশায় জড়িত কৃষককে প্রকল্পের অংশীদার করে মূল উদ্দেশ্য সাধনে বাধাগ্রস্ত হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
যেখানে ২০২৭ সাল নাগাদ প্রদর্শনী প্লটের সংখ্যা বাড়িয়ে ৮ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সেখানে সচেতন, পরিশ্রমী, পেশাদার, সৎ, দক্ষ ও বিচক্ষণ কৃষককে বেঁছে সৃজন আম বাগানের ব্যবস্থা করা উচিত। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখন অব্দি রপ্তানিযোগ্য সৃজন আম বাগানের সংখ্যা ২ হাজার ৩শ; সামনে বছরে এর সংখ্যা আরও বাড়বে।
উক্ত বাগানগুলোতে বিদেশী জাতের আমের চারার পাশাপাশি বাংলাদেশের ‘জিআই’ নির্দেশিত যেসব জাত রয়েছে যেমন- ফজলী, ক্ষীরশাপাতি ও অন্যান্য জনপ্রিয় জাতের মধ্যে গোপালভোগ, ল্যাংড়া, হারিভাঙ্গা ইত্যাদির মাধ্যমেও আম রপ্তানির একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব। বাইরের দেশে বসবাসকারী বাঙালি প্রবাসীসহ অন্যান্য আম প্রিয় মানুষের কাছে বরাবরই বাংলাদেশি জাতগুলো সুনাম কুড়িয়ে আসছে।
উপর্যুক্ত আবহাওয়া, জলবায়ু, মাটি ও অতি সহজলভ্য শ্রমবাজারের প্রাচুর্যতায় উৎকৃষ্ট মানের আম উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ অত্যন্ত উপযোগী। সম্ভাবনাময় এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পণ্য, ইন্সট্রুমেন্টস ইত্যাদি সবকিছুকে কৃষকের জন্য এবং রপ্তানিকারকের জন্য সহজ করে দেওয়াই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
কৃষকদের জন্য কৃষি উৎপাদন সামগ্রী যেমন- প্যাকজিং দ্রব্যাদি, সারের দাম কমিয়ে আনা সহ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির প্রতি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানো, সরকারী কৃষি পণ্যের অনুদান কৃষকের হাতে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা প্রদান ইত্যাদি আম চাষিদের আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করে তুলতে পারে।
পাশাপাশি শুল্কমুক্ত আম রপ্তানির পথ সুগম করাও সরকারের দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম। এই ডলার সংকটের দিনে ফলের রাজা আম হতে পারে সরকারের অন্যতম সেরা হাতিয়ার। সোনালি আঁশের ফসল পাটের ন্যায় আম হতে পারে “সোনালি ফল”। কৃষিই হতে পারে অর্থনীতির মূল।
#হাবিব_রহমান
লেখাটি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।