Story

মেয়ে ময় মায়া

October 16, 2026

55 views

একটা মেয়ে যখন নতুন সংসার শুরু করে; তখন সে শুধু নতুন মানুষ গুলোকেই আস্তে আস্তে আপন করেনা। ঘরের প্রতিটা ইঞ্চির সাথে তাঁর একটা আত্মীয়তা গড়ে উঠে। রান্নাঘরের প্রতিটা হাড়িপাতিল তাঁকে চিনে। ঘরের পর্দা, সোফার কাভার, টেবিলক্লথ, ঝুলঝাড়ু সবাই চিনে ফেলে। সব কিছুর সাথেই একটা মায়ায় জড়িয়ে যায়। একটা কাঁচের বয়াম হাত থেকে পরে ভেঙ্গে গেলে সে সেই বয়ামটা ফেলতে কষ্ট পায়।

একটা মেয়ে শুধু একটা সংসারে মানুষকেই মায়া দিয়ে বাঁধে না। ঘরের সবকিছুকে সে মায়া দিয়ে নিজের করে নেয়। এই জন্যই পৃথিবীতে সংসার গুলো টিকে থাকে। নইলে সে কবেই একটা ঘরে সব মানুষ গুলো একেকটা দ্বিপ হয়ে যেতো। চাকরিজীবী বিবাহিতা মেয়েরা হয়তো আরো বেশি মায়ায় থাকে। তারা অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত হলেও সে যে তাঁর নিজের সাজানো সংসারে সারাদিনের ধকল শেষে ফিরে এসেছে এটাতেই সে শান্তি পায়। মাথার উপরে সিলিং ফ্যানটা তখন বাতাসের সাথে মায়াও ঢেলে দেয় যেন। রান্নাঘরের হাড়িপাতিল গুলো যেন বলে, "থাক একটু বসে জিরিয়ে নাও, রান্নাবান্না আজ চুলোয় যাক।"

আমার তো মনে হয় মেয়েরা ঘরের প্রতিটা জিনিসের সাথেই মনে মনে কথা বলে। তাদের সাথে গল্প করে। খোঁজ খবর নেয় কে কেমন আছে। আবার ঝগড়াঝাঁটিও করে। মেয়েটা অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে ফ্যান ছেড়ে বিশ্রাম নিতে নিতে শুরু হয়ে যায় খুনসুটি।

"কিরে গাণ্ডু এতো আস্তে ঘুরছিস কেন। একটু জোড়ে ঘুর না বাপ। দেখছিস না সারা শরীর ঘামে চিটচিট করছে।"

বলতে বলতে মেয়েটা ঘাড়ের উপর থেকে চুল তুলে শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে নেয়।

"ঘুরছি তো ম্যাডাম। আগে একটু শান্ত হয়ে বসুন তো।"

"তোদের স্যার কখন বেড় হয়েছে রে?"

"আমি জানি না ম্যাডাম। আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম আপনি যাওয়ার পরেই। পানির গ্লাস বলতে পারবে।"

মেয়েটা সোফায় সারা শরীর ছেড়ে দিয়ে ডাইনিং টেবিলে থাকা পানির গ্লাসকে জিজ্ঞাস করলো, "তোদের স্যার কখন বেড় হয়েছে। সব ঠিক মতো খেয়েছে?"

"আজকেও লেট ম্যাডাম। সাড়ে নয়টায় বের হয়েছে। দেখছেন না আমাকেও কেমন আধাআধি করে রেখে গেছে। রান্নাঘরের বেসিনে গেলে আপনার মাথা নষ্ট হয়ে যাবে।"

"উফফফ! মানুষটাকে নিয়ে আর পারলাম নারে। সব তো গুছিয়ে দিয়ে গেলাম। তাও লেট। কি পরিমাণ যে ঘুমুতে পারে!"

"ঘুম থেকে ঠিক মতো উঠেছে তো ম্যাডাম। মোজা খুঁজে পাচ্ছিলো না।"

"মোজা তো আমি জুতোর পাশেই রেখেছিলাম তাও পায়নি!"

"স্যার তো জুতোর কাছে গিয়েও খেয়াল করেনি। সারা ঘর খুঁজে যখন ভাবলো মোজা ছাড়াই জুতো পরে যাবে তখন গিয়ে দেখে জুতোর পাশে মোজা। হিহিহি!"

"এই লোকটা এতো বেখেয়ালি। দেখিস আমি যদি মরে যাই তোদের স্যার একটা দিনও চলতে পারবে না। বিয়ে তো করি নাই মনে হয় একটা বুড়ো বাচ্চা দত্তক নিয়েছি।"

"ম্যাডাম আপনি না থাকলে শুধু স্যার না আমরাও একটা দিন চলতে পারবো না।"

মেয়েটা মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। হতাশার না। প্রচণ্ড ভালবাসার দীর্ঘশ্বাস। নিজের হাতে গড়া এই সাজানো সংসার ছেড়ে সে কিছুতেই মরতে পারবে না। মানুষ গুলো, ঘরের প্রতিটা কোন কত আপন।

যখন বাসা বদলে নতুন বাসায় যায় বারবার ফিরে সারা রুমে চোখ বুলায় মেয়েটা। কি যেন খুঁজে। মনেহয় যেন কিছু ফেলে যাচ্ছে। চারদেয়াল মৌনতায় মেয়েটাকে ডাকে। ওরা কাঁদে নিঃশব্দে। ওদের এতো প্রিয় মানুষটা ওদের ছেড়ে যাচ্ছে। ওরা কি করে ভালো থাকবে। জানালার গ্রিল গুলো ইচ্ছে করেই তাড়াতাড়ি ময়লা হয়ে যেতো। যেন মেয়েটা দুই দিন পর পর গ্রিলে হাত বুলায়। খুব মায়া সেই হাতে। সোফা গুলো দেয়ালের কোণ গুলো মাকড়শাকে বলে জাল বুনে তাড়াতাড়ি ময়লা জমাতো। যেন মেয়েটা দেয়ালের একটু যত্ন নেয়।

মানুষ যেমন প্রচণ্ড ভালবাসার কাঙ্গাল। ঘরের সবকিছুও তেমন ভালবাসা চায়। এটা সেই মেয়েটা খুব করে টের পায়। ঘর বদলাবার আগের প্রতিটা দিন যেন তাঁর বুকে একেকটা তীর ঢুকায়। এই ঘরে সে আর থাকবে না। এই জানালার গ্রিলে হাত রেখে বৃষ্টি দেখবে না। জোছনা দেখবে না। এটা ভাবতে তার বুকে চিন চিন ব্যাথা করে।

দরজার ভেঙ্গে যাওয়া ছিটকানিটাও তার কত কত আপন। অথচ এসব ছেড়ে তাকে একেবারে চলে যেতে হবে। ভাড়া বাসা ছেড়ে একবার অন্য বাসায় গেলে আরতো ফেরা হবে না কোনদিনই। এসব ভেবে মাঝেমাঝে সে নিজের উপরেই বিরক্ত হয়- তার এতো মায়া কেন লাগে সবকিছুর জন্য। আর যদি সেই ঘরটা হয় মেয়েটার বিয়ের পরে প্রথম ঘর। যে ঘরে তাঁর বাসর হয়েছে। সেই ঘর ছেড়ে যেতে মেয়েটার কেমন লাগে সে কথা তোলা থাক।

অফিস থেকে ফিরে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে রান্না ঘরের বেসিনে পরে থাকা থালা বাটির স্তুপ দেখে আরো ক্লান্ত হয়ে যায় মেয়েটা। গ্যাসের চুলা তখন হাহাহা করে হেসে থালা বাটি গুলোকে বলে, "এখন তোদের ডলে ডলে গোসল করাবে। ছাল তুলে ফেলবে দেখিস।"

"মজা নিও না মিয়া ভাই। ম্যাডাম স্যারের মতো আছড়াই আছড়াই আমাদের গোসল করায় না। অনেক আলতো করে গোসল করায়।"

মেয়েটা যখন ফ্রিজ খুলে তখন মাছ মাংস সবজি সবই একসাথে চিৎকার করতে থাকে, "ম্যাডাম আমাকে রান্না করেন। অনেক দিন হয়ে গেছে আমি ফ্রিজে পরে আছি। আজ আমাকে রান্না করেন। নাহলে দুই দিন পরে আর মজা পাবেন না।"

মেয়েটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে তাকায় কি রান্না করা যায়। একবার মনে হয় মাছ। আরেকবার মনে হয় মাংস। আবার মনে হয় সবজি। গতকাল খিচুড়ি খেয়েছে ডিম ভাজি দিয়ে। এই যে মেয়েটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে ভেবে পায় না সে কি করবে। এর পিছনেও আছে প্রচুর মায়া। সে কাকে রেখে কাকে রান্না করবে তাই বুঝে উঠতে পারে না। পারলে সব গুলোই এক সাথে রান্না করতো।

এমনকি মেয়েটা যখন ওয়ারড্রব খুলে তখন বুঝেই উঠতে পারে না সে কি পরবে। সব ড্রেস শাড়ি এক সাথে চিৎকার করে কান ঝালাপালা করে দেয়, "ম্যাডাম আমাকে পরেন। ম্যাডাম আমাকে পরেন।" অনেকের তো খুব প্রচণ্ড অভিমান। ওরা বলে, "ম্যাডাম সেই কবে আমাকে বানিয়ে এনেছেন। পরা তো দূরে থাক একবার ছুঁয়েও দেখলেন না।"

বাইরে থেকে ফিরে মেয়েটা কপালের টিপটা আয়নায় লাগিয়ে রাখার সময়ও খুব মায়া দিয়ে লাগাই। অতোটা মায়া দিয়ে সে নিজের কপালেও টিপ পরে না। এই যে এতো এতো মায়া যে মেয়েটা ধারণ করে আছে সে হয়তো নিজেও জানে না তার কাছে কত কত মায়া।

মেয়েটাকে যদি হঠাৎ প্রশ্ন করে তাঁর হাসবেন্ড, মেয়েটা কতটা ভালবাসে তাঁকে। তখন কিন্ত মেয়েটার মনে একটা তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। প্রথমে মেয়েটা ভাবে সে তো অনেক ভালবাসে এটা আবার বলবার কি আছে। আর সে তো জানেই যে ভালবাসে তাঁকে। তারপরে ভাবে কিভাবে বলবে কতটা ভালবাসে। মনে মনে মেয়েটা শব্দ খুঁজে যায়। খুঁজে পায় না। ঠিক যেমন ভেনেটি ব্যাগে কিছু খোঁজার সময় সারা ব্যাগ খুঁজেও যা খুঁজছে তা পায় না; তেমন মেয়েটা মাথার ভিতর কথা খুঁজেও কথা পায় না। নিজের উপরে তখন রাগ বাড়ে। কারণ মেয়েটা তখন প্রচণ্ড মায়া অনুভব করে মানুষটার প্রতি। মেয়েটা চায় এমন কিছু বলতে যেটা সত্যি মানুষটার মন ভরে দিবে। কিন্তু নিজের রাগটা তখন মেয়েটা মানুষটার উপরে ঝেড়ে এক কথায় জবাব দেয়- জানি না।

এই যে মেয়েরা তার সঙ্গির সাথে অকারণে রেগে যায়। ঝগড়া করে। কিংবা অহেতুক দোষ চাপায় এর পিছনেও আছে প্রচন্ড মায়া। মেয়েটা তার অনুভূতি প্রকাশ করতে চায় না। মেয়েটা চায় না ওকে কেউ পড়ে ফেলুক। কিন্তু মানুষটা যখন বুঝে যায় মেয়েটা কেমন কি চায়; তখন মেয়েটা মানুষটার কাছে তা স্বীকার না করে উল্টো ঝগড়া শুরু করে দেয়। নিজের কাছে নিজে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। এমন একটু অগোছালো আর বিভ্রান্ত থাকে বলেই মেয়েদের বেশি মায়াবী লাগে।

আজ আপনাদের কোন গল্প আসলে বলছি না। আজ বললাম গল্পের এক চরিত্র "সেই তুমি" নিয়ে। একটা মেয়েকে নিয়ে আমরা গল্প লিখি। কিন্তু মেয়েটা কেমন আজ সেই গল্পের কিছুটা আপনাদের বললাম। আর আমিও একটু অগোছালো ভাবেই গল্পটা শেষ করলাম। একটা পরিবারের একেকটা মানুষকে যদি আমরা দ্বিপ কল্পনা করি তাহলে মেয়েটা হলো সব দ্বিপের সাথে যোগাযোগ হওয়ার সেতু। পরিবার গুলো গড়েই উঠে মেয়েটার হাতে। টিকেও থাকে। এটা সেই সেতুর গল্প।

আজ গল্পটা পৃথিবীর সব মায়াবতী'কে উৎসর্গ করলাম। মেয়ে মানেই মায়া। শুধু "একার" এবং "আকার" পাল্টে দিলেই হয়ে যায়। আর যদি "একার" এবং "আকার" একেবারে সরিয়ে ফেলেন দেখেন কি হয়- মেয়ে ময় মায়া।

Picked up where you left off

Comments

Rejaka lispa was this story’s first reader

+25 XP

    Please login to post comment. Login

  • Rejaka lispa 1 week ago First reader

    দারুণ গল্প টা, একটা পুরুষ কি আসলেই বোঝে নারীকে ছাড়া তারা কতটা অসহায়।

    • Shakil Rony 1 week ago

      একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, একজন আরেকজনের পরিপূরক। নারী একটা বাসা কে ঘর বানাতে পারে। কিন্তু নারী কি সেই ঘরে একা থাকতে চায়? পৃথিবীতে দু'জনেরই দু'জনাকে খুব করে প্রয়োজন।

  • দারুণ লাগল। পাঠমুগ্ধ ।

    • Shakil Rony 1 week ago

      অনেক শুকরিয়া ভাই