মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
কোনো শিশুকে দেখতে সুন্দর লাগল। কেউ তার প্রশংসা করলেন। এরপর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। পরিবারের কেউ বললেন, বদনজর লেগেছে। আবার কারও ব্যবসা ভালো চলছিল। হঠাৎ বিক্রি কমে গেল। তখন কেউ কেউ ভাবলেন, নিশ্চয়ই কারও নজর লেগেছে। আমাদের সমাজে এমন ধারণা প্রচলিত। কিন্তু বদনজর সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? সত্যিই কি বদনজর লাগে? এর নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ আছে? বদনজর থেকে বাঁচার উপায় কী? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে কোরআন ও হাদিসের বক্তব্য বুঝতে হবে।
বদনজর কী? কী লক্ষণ দেখলে বুঝবেন?
ইসলামি পরিভাষায় বদনজরকে আরবি ভাষায় ‘আল-আইন’ বলা হয়। সাধারণভাবে কারও দৃষ্টির কারণে অন্য ব্যক্তির ক্ষতি হওয়ার বিষয়টিকে বদনজর বলা হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বদনজরের প্রভাব বাস্তব।’ সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৭।
তবে বদনজরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার জন্য কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণতালিকা নেই, যা দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, তিনি বদনজরের শিকার হয়েছেন।
হঠাৎ অসুস্থ হওয়া, শিশুর কান্নাকাটি, ঘুমের সমস্যা কিংবা ব্যবসায় লোকসান—এসবের কোনোটি এককভাবে বদনজরের প্রমাণ নয়। এসব সমস্যার বাস্তব কারণও থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও বাস্তব কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।
বদনজরের ঘটনা: সাহাবি সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)
বদনজর সম্পর্কে সাহাবিদের জীবনের একটি ঘটনা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.) একবার গোসল করছিলেন। তাঁর শরীর দেখে আমির ইবনে রাবিয়া (রা.) প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেন। এরপর সাহল (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ঘটনাটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হলে তিনি সাহল (রা.)-এর কাছে আসেন। বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ কেন তার ভাইকে হত্যা করার মতো কাজ করে? তুমি বরকতের দোয়া করলে না কেন?’ এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বদনজরের প্রতিকার হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অজু করতে নির্দেশ দেন। সেই অজুর পানি সাহল (রা.)-এর শরীরে ঢালার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সূত্র: মুয়াত্তা ইমাম মালিক, কিতাবুল আইন; সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৫০৯।
ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়, অন্যের ভালো কিছু দেখে প্রশংসা করার সময় তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। তবে শুধু প্রশংসার পর কেউ অসুস্থ হলেই তাকে বদনজরের শিকার বলে নিশ্চিত করা যাবে না।
বদনজর সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে কী বলা হয়েছে?
পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ফালাকের পঞ্চম আয়াতে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে। সূত্র: সুরা আল-ফালাক, আয়াত ৫। অন্যদিকে, সহিহ মুসলিমের ২১৮৭ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বদনজরের প্রভাব বাস্তব বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া সহিহ বুখারির ৫৭৩৮ নম্বর হাদিসে আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বদনজরের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭৩৮।
কারও প্রশংসা করলে কি বদনজর লাগে?
কারও সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ বা সাফল্যের প্রশংসা করলেই বদনজর লাগে, এমন কথা বলা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও ছবি দেখে প্রশংসা করলেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে অন্যের ভালো কিছু দেখে তার জন্য বরকতের দোয়া করা উত্তম। যেমন, বলা যায়, ‘আল্লাহ বরকত দিন।’ সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-এর ঘটনাতেও রাসুলুল্লাহ (সা.) বরকতের দোয়া করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
বদনজর থেকে বাঁচতে কী করবেন?
বদনজর থেকে সুরক্ষা চাওয়ার জন্য কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত আমল করা যায়। সুরা আল-ফালাক ও সুরা আন-নাস পড়ুন। এই দুই সুরায় আল্লাহর কাছে বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা রয়েছে। আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় সুরা ইখলাস, সুরা আল-ফালাক ও সুরা আন-নাস পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিতেন। এরপর শরীরের যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নিতেন। সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭৪৮। পাশাপাশি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে, দোয়া করতে হবে এবং অন্যের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকতে হবে।
বদনজর লাগলে কী করবেন?
বদনজরের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ করার নির্দেশ সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে রয়েছে। রুকইয়াহ বলতে কোরআনের আয়াত ও শরিয়তসম্মত দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়াকে বোঝানো হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে বদনজরের ঘটনায় অজুর পানি ব্যবহারের নির্দেশও বর্ণিত হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি অসুস্থতার ক্ষেত্রে কাউকে সন্দেহ করে তার অজুর পানি সংগ্রহ করতে হবে।
কাউকে বদনজরের জন্য দায়ী করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করা উচিত নয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শও নিতে হবে।
শিশুর কপালে কালো টিপ দিলে কি বদনজর কাটে?
অনেক পরিবার শিশুর কপালে কালো টিপ দেয়। তাদের ধারণা, এতে বদনজর থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু কালো টিপ দিলেই বদনজর কেটে যায়—এমন দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বদনজর থেকে সুরক্ষা চাওয়ার ক্ষেত্রে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও শরিয়তসম্মত রুকইয়াহর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বদনজর ও জাদু কি এক?
না, বদনজর ও জাদু এক বিষয় নয়। হাদিসে বদনজরের প্রভাব স্বীকৃত হয়েছে। অন্যদিকে, কোরআনের সুরা আল-ফালাকের চতুর্থ আয়াতে গ্রন্থিতে ফুঁ দেওয়া ব্যক্তিদের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে। সূত্র: সুরা আল-ফালাক, আয়াত ৪।
ইসলামে বদনজরের অস্তিত্ব স্বীকৃত। কিন্তু বদনজরে আক্রান্ত হওয়ার নির্দিষ্ট লক্ষণতালিকা নেই। তাই কোনো সমস্যা হলেই বদনজরকে দায়ী করা উচিত নয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে হবে। ব্যবসায় ক্ষতি হলে বাস্তব কারণ খুঁজতে হবে। পাশাপাশি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে, কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত আমল করতে হবে এবং অন্যের ভালো কিছু দেখে তার জন্য বরকতের দোয়া করতে হবে। বদনজর সম্পর্কে ইসলামি শিক্ষা জানার পাশাপাশি প্রমাণ ছাড়া কাউকে সন্দেহ না করাও গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক-ইসলামী গবেষক