জিন হল আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি। আল্লাহপাক মানুষ ও জিনদের সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদাত বন্দেগী করার জন্য। আল্লাহ বলেন- আমি আমি জিন ও মানুষকে কেবলমাত্র আমার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছি। ( সুরা আয যারিয়াত ,আয়াত-৫৬) । জিন শব্দের অর্থ গুপ্ত,লুকায়িত,অদৃশ্য,গোপন। জিনরা অদৃশ্য। মানুষ এদেরকে দেখতে পায় না। জিনরা মানুষদের দেখতে পায়। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে - নিশ্চয় সে ও তার দলবল তোমাদের কে দেখে,যেখানে তোমরা তাদেরকে দেখনা (সুরা আরাফ ,আয়াত-২৭) । তবে কিছু প্রাণী জিনদের দেখতে পায়। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- যখন তোমরা গাধার চিৎকার শুনতে পাও, তখন আল্লাহর কাছে শয়তানের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর, কারণ শয়তানকে দেখতে পাবার কারণেই তারা চিৎকার করে( বুখারী ৬/৩৫০,মুসলিম ১৭/৪৭)। আল্লাহ তায়ালা জিন জাতি ও শয়তানের সম্নন্ধযুক্ত করেছেন, ওই অর্থে যে অর্থে মানুষকে সম্পৃক্ত করেছেন কাদামাটি ও শুকনো ঝনঝনে মাটির সাথে। অর্থ্যা মানুষ সৃষ্টির মুল উপাদান কাদামাটি হলে মানুষ প্রকৃতপক্ষে কাদামাটি নয়। রাসুল (সাঃ) একদা উল্লেখ করেছিলেন শয়তান বলে একটি জিন একদা নামাজের সময় তাঁর সাথে মোকাবেলা করতে এলে তিনি ঐ জিনকে গলা টিপে ধরলে,সেইক্ষনে জিনের থুথুতে শীতলতা অনুভব করেছিলেন (সুরা সাদ -৩৫-৩৮)। তাই বলা যায় জিনেরা পুরোপুরি দাহ্য না।
মানুষ সৃষ্টির প্রায় ২০০০ বছর আগে থেকে জিনরা পৃথিবীতে আছে বলে জানা যায়। জিনদের আদি পিতা সামুম। জিন তৈরী করে আল্লাহ সামুম কে জিজ্ঞাস করেছিলেন তুমি আমার কাছে কিছু কামনা করো। সামুম ২টি বিষয় কামনা করেছিলেন। এক. জিন মানুষকে দেখতে পাবে কিন্তু মানুষ জিনকে দেখতে পারবে না। দুই. জিনেরা বৃদ্ব বয়সে যুবক হয়ে মৃত্যু বরণ করবে। আল্লাহ পাক সামুমের দুটি চাওয়া পূরণ করেন। জিনদের কিছু বৈশিষ্ঠ হলো, এক.জিন অদৃশ্য এবং খুব দ্রত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে। দুই.পৃথিবী বাদে অন্য সব গ্রহ নক্ষেত্রে জিনরা চলাফেরা করতে সক্ষম।তিন.যে কোন প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে। চার. জিনরা অন্ধকারে থাকতে পছন্দ করে। মানুষের চেয়ে জ্বিনেরা অনেক বেশিদিন বাচে। কারো কারো মতে প্রায় ৫০০ বছর। তবে ৩০০ বছর বয়সে তারা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়।
জিনদের মধ্যে মহিলা জাতি রয়েছে। যাদেরকে পরী বলা হয়ে থাকে। জিনদের মধ্যে মহিলা থাকার সপক্ষে নিন্মের হাদীসটি উল্লেখ করা যায়। জায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- এই জায়গাগুলোতে (টয়লেট এবং প্রস্রাব করার জায়গা) জিন এবং শয়তানরা অবাধে বিচরণ করে। তোমাদের মধ্যে যেই এই স্থানগুলোতে যাবে, সে যেন বলে আমি আল্লাহর কাছে পুরুষ এবং মহিলা শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (আহমেদ ইবনে হাম্বল,পবিত্রতা খন্ড ৪/৩৬৯)। মহানবী (সা.) বলেছেন তিন ধরনের জিন রয়েছে। একদল যারা সর্বদা আকাশে উড়ে বেড়ায়। আরেক দল যারা সাপ ও কুকুরের আকার ধারণ করে থাকে এবং তৃতীয় দল পৃথিবীবাসী যারা কোন এক স্থানে বাস করে বা ঘুরে বেড়ায়। ( বায়হাকি ও তাবরানী)।
জ্বিনরা যে কোন স্তান্যপায়ী প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে। মানুষের রূপ ধরে মানুষের মধ্যে বসাবাস করতে পারে। মানুষের সাথে এক সাথে খাওয়া দাওয়া ও করতে পারে। সাধারণত খারাপ জিনরা কালো কুচকুচে সাপ বা কুকুরের রূপ ধারণ করে থাকে । পবিত্র কোরআনের ৭২ তম সুরা আল জিন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) কয়েকজন সাহাবীকে সাথে নিয়ে উকাযের বাজারে যাচ্ছিলেন। পথে নাখাল নামক স্থানে তিনি ফজরের নামাজের ইমামতি করেন। সে সময় একদল জিন ওই স্থান অতিক্রম করছিলো। কুরআন তেলওয়াতের শব্দ শুনে তারা থেমে যায়। গভীর মনযোগ সহকারে কুরআন শোনে। মানুষের মত জিনেরা খাওয়া দাওয়া করে। জিনেরা মানুষের মত চিবিয়ে খায়।
কাজী আবু আয়ালা (রহঃ) বলেছেন যে, জিন মানুষের ন্যায় খাওয়া দাওয়া করে। এরা চিবিয়ে ও গিলে খায়। অনেক সময় মানুষের সাথে বশে খায়। ভালো জিনেরা মানুষের উপকার করে থাকে। নবী করীম সা. বলেছেন তোমরা দুটি জিনিস অর্থ্যা হাড় গোবর দিয়ে ইসতেনজা করো না। কেননা ওগুলো তোমাদের জিন ভাইদের খাদ্যে।(তিরমিযি শরীফ)। ভাল জিনেরা নির্জন স্থানে থাকতে পছন্দ করে। বিশেষকরে পাহাড়,পর্বত এমন স্থানে। মানুষের কোন ক্ষতি তারা করে না।
খারাপ জ্বিনেরা থাকে ময়লা আর্বজনা, গোসলখানা,পায়খানা ইত্যাদি স্থানে। বাথরুমে যাবার পূর্বে দোয়া পড়ে যাওয়া উত্তম। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে জানা যায়, জিনরা নোংরা ও গন্ধময় জায়গায় থাকতে পছন্দ করে যেখানে মানুষের ময়লা এবং খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশ ফেলে রাখে। হযরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ রা. কেউ প্রশ্ন করল যে, জিনেরা কি পানাহার ও বিয়েশাদী করে মারা যায়? জবাবে তিনি বলেন তারা কয়েক প্রকার। এদের কেউ কেউ বাতাসের ন্যায়। জিনেরা পরস্পর বিয়ে শাদী করে এবং তাদের সন্ততি ও জন্মায়। ছেলে মেয়ে মানুষের চেয়ে সংখ্যায় বেশি হয়ে থাকে।
কুরআনের কিছু আয়াত,শব্দ ব্যবহার করে জিন বশ করা হয়। জিনের দ্বারা কাজ করানো হয়। তবে এই মাধ্যমগুলেরা বেশিরভাগ ই নিশিব্দ। ঘরে নামায,কুরআন তেলওয়াত করলে সে ঘরে দুষ্ট জ্বিন প্রবেশ করতে পারে না। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিনত করো না। যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয় সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।(সহিহ মুসলিম ৭৮০)।
বাংলাদেশে জিন নিয়ে কিছু ফকির ওঝারা একটি রমরমা ব্যবসা পরিচালনা করে। তারা সাধারণত গ্রামের মানুষদের সহজলভ্য অবস্থা কাজে লাগিয়ে, প্রতারণার মাধ্যমে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। এই ধরনের ওঝারা জিন হাজির করার দাবি করে এবং জিনের স্বরে কথা বলে প্রতারণা চালায়। এমন ঘটনা বহুবার ধরা পড়েছে। কেউ কেউ এমনও বলেন যে, “জিনের বাদশাহ ফোন করেছেন,” এবং বিশেষভাবে নিরীহ গৃহবধুদের সঙ্গে ধূর্তভাবে যোগাযোগ করে অর্থ হাতিয়ে নেয়।
তবে মনে রাখতে হবে, জিনদের বশ করা বা তাদের দ্বারা কাজ করানো ইসলামে সমর্থিত নয়। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে:
“আর এই যে মানুষের মধ্যে কিছু লোক জিন জাতির আশ্রয় নিত, ফলে ওরা তাদের পাপাচার বাড়িয়ে দিত।” (সুরা জিন, আয়াত ৬) .অতএব, এই ধরনের প্রতারণা ও জিনের ওপর অবাঞ্ছিত নির্ভরতা ইসলামের দৃষ্টিতে তুচ্ছ ও অনুমোদনযোগ্য নয়।
জিনের সাথে মানুষের এবং মানুষের সাথে জিনের বিয়ে শাদী হতে পারে। উভয় জাতের মিলনে সন্তান ও হতে পারে। রানী বিলকিসের পিতা মাতার একজন জ্বিন ছিলো। কথিত আছে যে, বিলকিসের পায়ের অগ্রভাবে চতুস্পদ জন্তুর মতো ছিলো। আর তার পায়ের গোছতে পশম ছিলো। হযরত সুলাইমান (আঃ) তাকে বিয়ে করে জ্বিনকে আদেশ করেছিলেন পায়ের এই অবস্থা স্বাভাবিক করে দিতে। আল্লামা সুয়তী র. বলেন হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত নবী করীম করীস (সাঃ). এরশাদ ফরমান, বিলকিসের পিতামাতা যে কোন একজন জ্বিন ছিল। হযরত যুবাইর ইবনে মুহাম্মদ রা. বলেন বিলকিসের মা ফারিয়াহ জিন। হযরত কাতাদাহ ও হাসান রা. মতে জ্বিনের সাথে মানুষের বিয়ে মাকরূহ। হানাফী মাযহাব মতে জ্বিনদের সাথে বিয়েশাদী জায়েহ নাই। ইমাম সাআলাবী রহঃ বলেছেন মানুষের বিয়ে এবং গর্ভ হওয়া জ্বিন ও মানুষের উভয়ের মধ্যে ঘটতে পারে। আল্লামা সাআলাবী রহঃ বলেছেন মানুষ ও জ্বিনেরা যৌথ মিলনজাত বাচ্চাকে বলা হয় খুন্নাস। জিনেরা গায়েবের খবর জানে না। ভবিষ্যত জানে না। কোনভাবেই মানুষের চেয়ে জিন জাতি শ্রেষ্ঠ নয়।
মানুষ আল্লাহর সেরা সৃষ্টি। আশরাফুল মাখলুকাত। মানুষকে আল্লাহ শ্রেষ্ঠত্ব¡ দান করেছেন সকল জীবের মধ্যে। বনী ইসরাইলের ৭০ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।( সূরা বনী ইসরাইল)
তবুও কিছু বেকুব মানুষ জিনদের সরনাপন্ন্ হয়। ভাবিষ্যত জানতে চায়। এটা শুধু একটা ভুল নয়। শিরক এর মত জঘন্য গুনাহ। জিনদের বুদ্বিমাত্রা কতটুকু। তারা ভবিষ্যত জানে কিনা। আমরা তার প্রমান পাই হযরত সুলাইমান (আঃ) এর মৃত্যুর ঘটনার পরে। পবিত্র কোরআনে সুরা সাবার ১৪ নম্বার আয়াতে বলা হয়েছে, যখন আমি সুলাইমান এর মৃত্যু ঘটালাম তখন জ্বিনদের কে তার মৃত্যু বিষয় জানালো শুধু মাটির পোকা (উইপোকা) যা সুলাইমান এর লাঠি খাচ্ছিলো। যখন সুলাইমান (আঃ) পড়ে গেলেন তখন জ্বিনেরা বুঝতে পারলো যে, তারা যদি অদৃশ্য বিষয় জানতো তাহলে লাঞ্চনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ব থাকতো না। রাসুল (সাঃ) বলেছেন মানুষের বাড়িঘরে জ্বিনেরা থাকে। এদের মধ্যে কাউকে তোমরা যখন দেখবে তো তিনবার তাকে বের করে দেবে। এতে যদি সে চলে যায়, তো ঠিক আছে। অন্যথায় তাকে মেরে ফেলবে। কারণ (যে জ্বিন এমন করে) সে কাফির হয়ে থাকে। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত,রাসুল (সাঃ) বলেছেন- মদিনার কিছু সংখ্যক জিন মুসলমান হয়েছে। এদেরকে (প্রাণী হিসেবে) যদি কেউ দেখো,তাহলে তিনবার সাবধান করবে। তারপরে ও আবার এলে সেই প্রাণীকে হত্যা করবে। (মুসলিম, ২২৩৬)
জিন তাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর দোয়া হল আয়াতুল কুরশী। এটা প্রমানীত হয়েছে বহুবার বহুজনের কাছে। জিন মৃগী রোগীর শরীলে প্রবেশ করতে পারে। আবার জিনে আছর করা ব্যক্তি মৃগী রোগীর মত আচারণ করতে পারে। জিনে আছরের ঘটনা হাদীসে পাওয়া যায়। ইমাম আহমদ এবং ইমাম বায়হাকী কতৃক লিপিবদ্ধ সহীহ হাদিসে উল্লেখ আছে, রাসুল (সাঃ) একবার একটি অসুস্থ বালকের সাক্ষাত পেয়েছিলেন যার ওপর জিনের ভর ছিল। রাসুল(সাঃ) ছেলেটির দিকে ফিরে জোরে বলেন ও আল্লাহর শক্রু, বের হয়ে আসো। ও আল্লাহর শক্রু বের হয়ে আসো। ছেলেটি দ্রত সুস্থ হয়ে উঠে। (ইবনে মাজাহ, ৩৫৪৮,আহমদ ৪/১৭১,১৭২) । জিনে ধরা ব্যক্তির স্বাভাবিক আচার আচরন বদলে যেতে পারে। শরীলে শক্তি বৃদ্বি পেতে পারে। আলো সহ্য করতে পারে না। আযানের সময় অস্থির হয়ে পড়তে পারে। রাতে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে পারে। এই রকম সময় আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হবে । আল্লাহ বলেন, আর যদি শয়তানের পক্ষ হতে কোন প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে,তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রেতা,সর্বজ্ঞ( সুরা আল আরাফ, আয়াত ২০০)। সুরা নাছ ও ফালাক হলো জিনের আছর থেকে বাচার মূল্যবান বাক্যে।
লেখক:ইসলামী গবেষক