Essay

উচ্চফলনশীল সবজি বীজের সহজলভ্যতা জরুরি

October 17, 2026

42 views

ক্রমবর্ধমান বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার এই দেশ সবজি উৎপাদনে তৃতীয় হলেও আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ বিবেচনায় বার্ষিক উৎপাদন যথেষ্ট নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে আবাদি জমির পরিমাণ ৮৫ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ আবাদযোগ্য জমি ব্যবহার হয় সবজি চাষে। এছাড়া ছাদ কৃষি, বাড়ির বাগান, আঙিনা, বেলকোনি, বাড়ির আশেপাশের পতিত জমি, পুকুরের পাড় ও কৃষিবনায়ন পদ্ধতিতে ইদানিং ব্যাপক সবজি চাষ হচ্ছে যা এই সমীক্ষার মধ্যে নেই। তবুও রবি মৌসুমে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে

চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সবজি উৎপাদন হয়; ঘাটতি দেখা দেয় খরিপ ও আমন মৌসুমে। শীতকালীন এই সবজিগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোচ্চ খরিপ-১ পর্যন্ত ভোক্তার চাহিদা মেটালেও আকাল দেখা দেয় খরিপ-২ ও আমন মৌসুমে। আমাদের দেশে শীতকালীন সবজির পরিমাণ বেশি।

গ্রীষ্মকালীন যে সবজিগুলো চাষ হয় তা দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য অপ্রতুল। শীতকালীন সবজি গ্রীষ্মকালে চাষের জন্য কৃষি বিজ্ঞানীরা আবহাওয়া উপযোগী জাত আবিস্কার করলেও এখনও দেশের আধিকাংশ কৃষক এ ব্যাপারে অজ্ঞ। এছাড়া মানসম্মত বীজ সহজলভ্যতার অভাবে প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে চাষিদের মনে ভীতি কাজ করে। তা সত্ত্বেও বিগত অর্ধশতকে প্রায় ছয়গুণ সবজি উৎপাদন বেড়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ১.৫ কোটি মেট্রিক টন সবজি উৎপাদন হয়েছে; পরবর্তী বছরেই অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সবজি উৎপাদন দাঁড়ায় ১.৭ কোটি মেট্রিক টনে। অর্থাৎ প্রতি বছর দেশে সবজি উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি সমানুপাতিক হারে দেশে জনসংখ্যার পরিমাণও বাড়ছে। ফলে দিন দিন উৎপাদন বাড়ানো কৃষকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বব্যংকের পর্যবেক্ষণ মতাবেক, পরবর্তী বছরগুলোতে ৩৮ শতাংশ সবজি চাহিদা বাড়বে। এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর খাদ্যের যোগান দিতে ফসল উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। জাপানে বাংলাদেশের তুলনায় হেক্টরপ্রতি জমিতে তিনগুণ অধিক ফসল উৎপাদন হয়।

উচ্চফলনশীল বীজ, সঠিক ও টেকসই চাষ পদ্ধতি, উন্নত সেচ ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভরতাই তাঁদের সফলতার মূল ভিত্তি। এছাড়া সংগ্রহোত্তর অপচয় তো রয়েছেই। সব মৌসুমেই সবজি চাষে প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়। আধুনিক সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অবলম্বন করে এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠলেই দেশে সবজির চাহিদা অনেকটা মেটানো সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

অপরদিকে এর পেছনে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যায় মাটির কার্যকারিতা বিনষ্ট, ভেজাল বীজের প্রাচুর্য বা উন্নত বীজের অভাব, সার, কীট ও বালাই নাশক, সেচ সংকট ইত্যাদি। ফলে, বছরের একটা সময় বাজারে সবজি সরবরাহ কমে গেলে ব্যবসায়ীরা উচ্চ মূল্যে বাজারজাত শুরু করে। এতে কৃষক সমাজের কোনো লভ্যাংশ নেই। দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষক চাষাবাদের শুরুতেই বীজ অঙ্কুরোদগমের শঙ্কায় থাকেন।

হতাশাজনক বিষয় হলো, এখনও মোট সবজির ৫০ শতাংশ কৃষকের নিজস্ব উৎপাদিত বীজ দিয়ে চাষাবাদ করা হয়। হাইব্রিড বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়াটি সামান্য কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় প্রশিক্ষিত কৃষক ও প্রতিষ্ঠানের দ্বারাই কেবলমাত্র প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত কিংবা নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়, যা দেশের সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তত্ত্বাবধান করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। ফলে বীজের দাম ও খানিকটা বেড়ে যায়। তবে লোকাল বীজ ব্যবহারের কারণ হিসেবে কৃষকদের অসচেতনতার চেয়ে হাইব্রিড বীজের চড়া মূল্য এবং অপ্রতুলতাকে চিহ্নিত করা হয়।

দেশের মাত্র দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান (বিএডিসি এবং ডিএই) বাণিজ্যিকভাবে বীজ উৎপাদন করে থাকে। বিএডিসি শুধুমাত্র দানাদার ফসলের বীজ সরবরাহ করে থাকে আর ডিএই দেশের বিভিন্ন হর্টিকালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে কিছু সংখ্যক সবজি বীজ বাজারজাত করলেও এর পরিমাণ খুবই নগণ্য। চাহিদার বাকি অংশের যোগান দিচ্ছে বীজ উৎপাদনকারী বেসরকারি সংস্থা, কোম্পানি এবং ব্যবসায়ীরা।

এক সভায় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক প্রথমবারের মতো বীজে ভর্তুকি প্রদান করার কথা জানান। কিন্তু সেটিও কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বিএডিসিতে দানাদার ফসলের বীজ উৎপাদনের জন্য প্রদান করা হয়। সবজি বীজ উৎপাদনে সরকারি সহায়তা প্রায় নেই বললেই চলে। কৃষি তথ্য সার্ভিস অনুসারে, বীজ উৎপাদনকারী বেসরকারি সংস্থাগুলো দেশে মোট চাহিদার ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে এবং ৩০ শতাংশ সবজি বীজ আমদানি নির্ভর। আমদানিকৃত বীজগুলো চীন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে আসে। আর এই বীজ আমদানি করতেও বেশ বিপত্তিতে পড়তে হয় আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের।

সময়মতো এপ্রুভাল না পাওয়া, সুস্পষ্ট গাইডলাইন অনুসরণ না করা, ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দুর্নীতি, পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা সংকট ইত্যাদি কারণে আমদানিকারকেরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং ইচ্ছেমতো বীজের মোড়কে দাম বসিয়ে রাখে। যা আমদের দেশের দরিদ্র কৃষকের পক্ষে বেশ দুর্বহ।

বিএডিসি’র বীজ সম্পর্কিত একটি স্লোগান রয়েছে, “বীজ যদি হয় গুনে-মানে, ফসল হবে টনটনে”। বাস্তবেও তাই; কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, উন্নতজাতের মানসম্মত বীজ ব্যবহারে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ী এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর কালোহাত নিয়ে ঢুকে পড়েছে বীজ বিপণন খাতে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া বাকি যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বীজ মোড়কে আবৃত করে বাজারজাত করছে এদের বেশিরভাগই কৃষকের উৎপাদিত ফসল; নিম্নদামে বাজার থেকে ক্রয় করে কিংবা কৃষকের সাথে চুক্তি করে সেগুলো সামান্য প্রক্রিয়াজাতের পর উন্নতজাতের বীজ হিসেবে চিহ্নিত করে কৃষকের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করছে।

মানসম্মত বীজ উৎপাদনের যে ধারাবাহিকতা, যে দিক-নির্দেশনা কিংবা মানদণ্ড এবং আইসোলেশান (বীজের জন্য উৎপাদিত ফসলের জাতকে একই ফসলের ভিন্ন জাত থেকে ন্যূনতম দূরত্বে ভিন্ন জমিতে আবাদ করার প্রক্রিয়াই আইসোলেশান বা পৃথকীকরণ পদ্ধতি। এক্ষেত্রে দূরত্ব বীজের জাত এবং ব্যবহারের প্রকারভেদের ওপর নির্ভর করে।) প্রক্রিয়ার এক-তৃতীয়াংশও মান্য করেনা এই বেসরকারি সংস্থাগুলো। অথচ কৃষক সমাজে উন্নতবীজের বুলি ছড়িয়ে উচ্চমূল্যে বাজারজাত করতে এক-পা পিছপা হয়না তাঁরা। এই গেল দেশের বিশভাগ উন্নতবীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের অবস্থা।

এবার নজর দেওয়া যাক দেশের ত্রিশভাগ চাহিদা মেটানো আমদানিকারক বীজ এজেন্সীসমূহের কাছে। এদের মধ্যে কেউ সরকারি মানদণ্ড অনুসরণ করে আবার কেউ চোরাই পথে দেশে বীজ নিয়ে আসে। যে পদ্ধতিতেই নিয়ে আসুক না কেন আমদানিকৃত বছরে বীজ বিপণন সম্পন্ন হওয়ার পর অবশিষ্ট বীজের সাথে কৃষক কর্তৃক নির্দিষ্ট ফসল ক্রয় করে পূর্ববর্তী বছরের বীজের সাথে মিশিয়ে অথবা নতুন মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ ভিন্ন মোড়কে সীলমোহর করে পরবর্তী বছরে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করতে বিন্দুমাত্র সংকোচবোধ নেই তাঁদের মধ্যে। ফলে বীজ অঙ্কুরোদগমের হার অর্ধেক বা তারও বেশি কমে যায়।

প্রকারান্তে অসাধু বীজ ব্যবসায়ীদের অপকর্ম রোধে বীজ আইন ১৯৯৮ ও ২০১৬ তাত্ত্বিক বা স্মারকলিপি হিসেবে আবদ্ধ থাকলেও এর প্রয়োগ অতিশয় ক্ষীণ। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তদারকি কার্যক্রম বৃদ্ধি করে এই অসাধু আমদানিকারক ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশের প্রধান কর্মখাত কৃষির প্রতি কদাচরণের বিপরীতে উপর্যুক্ত সাজার ব্যবস্থা করে সম দুষ্কর্মকারীদের দৌরাত্ম্যে লাগাম টানা জরুরি।

অন্যথায় দেশে বিস্ফোরিত জনসংখ্যার পিঠে তালা মেরে উৎপাদিত সবজি দিয়ে চাহিদা মেটানোর স্বপ্ন শুধু আসমানে মেঘের ভেলায় ভাসমান হয়েই থাকবে। টেকসই উন্নয়নে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কৃষিখাতে উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে মানসম্মত বীজের অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে সহজ বিপণন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।  

#হাবিব_রহমান #Habib_Rahman
বি.দ্রঃ এই লেখাটি ২০২০ সালে মানবকন্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login