এখন বৃষ্টি হলে আমি বিরক্ত হয়ে আকাশ দেখি।
আমি শুধু বৃষ্টির শব্দ গুনে রাখি।
সেই সংখ্যাগুলো টুকেও রাখি।
মাঝে মাঝে সেই সংখ্যাগুলোতে হাত বুলিয়ে দিই।
বহুকালের বহুকিছু এখন উবে গেছে।
তার বদলে ভেসে আসে বিজ্ঞাপন,
অফার, এমবি, কিছু চিৎকার।
আমি একা হেঁটে যাই ফার্মগেটের মোড়ে,
যেখানে আগে সিনেমা হল ছিলো,
এখন সেখানে আছে লিফলেট।
শুধু পাঁচশত টাকায় রত্ন কিনে ভাগ্যকে ফিরিয়ে আনুন।
শাহবাগের মোড়ের সেই ফোয়ারাটা
আমার থেকে অনেক বেশি জানে রাজনীতি নিয়ে।
তার শেকড়ে বৃষ্টি জমে, হাজার স্মৃতি তার গল্পে।
আর আমি ফুসফুসে জমিয়ে রাখি ধোঁয়া।
হাতঘড়ি পরি না এখন,
সময় আর আমার চেনা নেই, অচেনা কিছু।
সব কিছু অন ডিমান্ড, অনলাইন,
বিজ্ঞাপনের মেইল ছাড়া আর কিছু নেই ইনবক্সে।
এক বন্ধু বলেছিলো,
আমি নাকি কফির মতো।
আমি ভেবেছিলাম উষ্ণ ক্যাফেইন এর কথা বলেছে।
এখন শুধু মাথা ধরে থাকে। চশমা পরতে হয় আজকাল।
রাসেল স্কয়ারের বেঞ্চে বসলে
ফেরিওয়ালার হাঁক আর শুনি না।
শুধু হেডফোনে গানের ভেতর
মগ্নতা খুঁজি জোর করে।
কিছুই ভালো না লাগা মানুষ হয়ে গেছি বোধহয়।
বহুদিন নিজেকে আয়নায় দেখা হয়না।
নিজের প্রতিবিম্বকেও ভুলে গেছি অনেকটা।
তবু মাঝে মাঝে ঘরের কোণে
একটা ছায়া আসে।
আমি জানি, সেটি আসলে আমিই।
একদিন ছায়াও দূরে চলে যায় নিস্পৃহ মানুষদের।
এখানে আকাশ খুব ছোট।
আমাদের জীবনের মতোই।
প্রতিদিন হেলমেট মাথায় চাপিয়ে
আমি আমার ভাবনাকে ঢেকে রাখি।
সবকিছু মানুষকে দেখাতে নেই।
বাসে ওঠা, পকেটমারের ভিড়,
মুখোশে ঢাকা মুখ, গাড়ির শব্দে
আমি কী খুঁজি, নিজেও জানি না।
অসংখ্য মানুষের মধ্যেও অনেকেই একা একা থাকে।
কখনো ফুডকোর্টে বসে দেখি
কিছু জোড়া মানুষ হাসছে
কিন্তু আমি জানি, সেসবে ভালোবাসা নেই।
সেসব ডিসকাউন্ট কুপনের আড়ালে সামাজিকতা।
কেউ বলেছিলো, ভালো মানুষেরা খুব চুপচাপ হয়।
এই কথাটা আর কেউ স্বীকার করলো না।
এখানে প্রেম মানে সেলফি,
আর ভালোবাসা মানে রিংটোন বদল।
রবীন্দ্র সংগীত শুনতে শুনতে আগে অনেক কিছু ভাবতাম।
আজকাল তার চেয়েও বেশি শব্দ পাই অ্যাপে।
তবু, তাতে চোখে পড়ে না,
সেই চুপচাপ গান শোনা মুগ্ধতার নেশায় ভাবনার মৃদুতা।
কিছু বন্ধু এখনো গান গায়।
কিছু লেখে পোস্ট, কিছু রিল,
আর আমি লুকিয়ে রাখি
নিস্পৃহ থাকার আড়ালে মাথায় ভাবনার আগুনে ঝড়।
সে ভাবনাগুলোকে আমি লিখে রেখেছি, ডিলিট করি না।
কখনো গুলিস্তান পার হতে হতে
মনে হয় কেউ পেছন থেকে ডাকছে।
ঘাড় ফিরিয়ে দেখি সব ফেরিওয়ালা
আর হকারদের নৈমিত্তিক কলহ।
কিন্তু আমি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি,
আমার শৈশবের স্কুল শিক্ষক আমাকে ডেকেছেন।
আমার কান এখনো সেই স্বর চেনে।
আজকাল চোখে জল আসে না,
তবু ভিজি, বৃষ্টিতে নয়,
ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা
এক অপ্রাপ্তির অশ্রুতে এবং হতাশায়।
আহারে জীবন!
ঢাকা শহরে এখন উপচে পড়ছে হিমোগ্লোবিন।
নিয়ন আলোয় সাইনবোর্ডগুলো আমাকে দেখে হাসে।
আর আমি প্রতিরাতে গুণতে থাকি,
সুইচ অফ করলে থামার আগে
সিলিং ফ্যান কতোবার ঘোরে।
কেউ হাসে না এ শহরে
শুধু জিপিএ চায়, চাকরি চায়।
সকাল সন্ধ্যা অফিস করতে চায়।
ভুল করে কিছুদিন কবিতা লিখেছি।
সেসব আমি একা একা পড়ে নিজের মাথা চুলকাই।
এ শহরে মানুষের মনগুলো এক একটা বনসাই।
এই শহরটা গোল্লা পাকায় মাথায়।
আর আমি রাতের খোলা জানালায়
একটা সিগারেট জ্বালাই,
আরেকটা শহরে চলে গেলে কেমন হয়!
নাকি সব শহর একই রকম!
ঢাকায় বৃষ্টিতে আমি বিরক্ত হলেও
মনে মনে আমি অপেক্ষা করি।
এইখানে, এই ইট সিমেন্টের ঘন জংগলের ভিতরে,
কেউ হয়ত একদিন এসে বলবে,
হ্যালো ভালো মানুষ, চলো এবার।
আমি চোখে হাজার প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকলে
সে তখন বলবে, এখানে তোমার পালা শেষ।
চলো দিগন্তের কাছে যাই।
সেখানে সকল বিগত রূহেরা তোমার অপেক্ষায় বসে আছে।