ডিয়ার কমরেড,
আমি কোনো নির্দিষ্ট পতাকার তলে
আমার বিবেক বন্ধক রাখিনি,
কোনো দলের ইশতেহারকে
ঈশ্বরের বাণী ভেবে নেইনি,
কোনো মতবাদের পায়ের তলে
আমার প্রশ্নগুলোকে কোরবানি দেইনি।
আমি মার্কসের বই থেকে তুলে এনেছি
শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস,
গণতন্ত্রের কাছ থেকে এনেছি
মানুষের কণ্ঠস্বর,
খেলাফতের ইতিহাস থেকে কুড়িয়ে এনেছি
ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা আর সাম্যের চেতনা,
সমাজতন্ত্রের বীজে বুনেছি
সম্পদের ওপর মানুষের ন্যায্যতার অধিকার,
আর ব্যক্তিস্বাধীনতার দর্শনে অনুভব করেছি—
মানুষ কোনো রাষ্ট্রের গোলাম নয়,
কোনো দলের সম্পত্তি নয়,
নয় কোনো মতবাদের ব্যক্তিগত সৈনিক।
আমি সবখান থেকে একটু একটু করে কুড়িয়ে এনেছি
ন্যায্যতা, ন্যায্যতা, ন্যায্যতা ।
যেমন ভোর অন্ধকার থেকে আনে আলো,
যেমন নদী গ্রহণ করে শত উপনদীর মিষ্টি জল,
অথচ নিজের গতিপথ তৈরি করে নিজেই।
ডিয়ার কমরেড,
আমি এমন সমাজ চাই, এমন আস্থা চাই,
এমন রাজনীতি চাই,
যেখানে কারখানার শ্রমিক জানে
তার শ্রমের মূল্য,
কৃষক জানে তার ফসলের ন্যায্য দাম,
আর কোনো শিশু জন্মের পরেই
দারিদ্র্যের কাছে বন্ধক রাখে না তার ভবিষ্যৎ।
যার দরজায় ক্ষুধার্ত মানুষের পরিচয় জিজ্ঞেস করা হয় না,
যেখানে ক্ষমতা মানুষের সেবা করে।
কিন্তু কমরেড,
গণতন্ত্রের মুখোশ পরে যে আজ স্বৈরাচারের হাট বসেছে,
বিপ্লবের স্লোগানেও
যে নিজের সিংহাসন খুঁজে।
তাই আমি নেতার ভাষণে বিশ্বাস করি না আর।
যদি সত্য না থাকে,
যদি ন্যায্যতা না থাকে,
যদি পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্য না থাকে,
তবে কোনো বিপ্লবই মুক্তির নয়
যদি পুরোনো শৃঙ্খল ভেঙে
নতুন শৃঙ্খল পরানো হয়,
তবে কোনো বিজয়ই আমাদের নয়।
ডিয়ার কমরেড,
আমার কোনো ঘর নেই,
কোনো শিবির নেই,
কোনো নির্দিষ্ট মতবাদের প্রতি
আমার অন্ধ আনুগত্য নেই।
কিন্তু কমরেড আমার পক্ষ আছে।
আমি ক্ষুধার বিপক্ষে,
ক্ষুধার্ত মানুষের পক্ষে।
আমি শোষণের বিপক্ষে,
শ্রমের মর্যাদার পক্ষে।
আমি সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে,
সব মানুষের পক্ষে।
আমি স্বৈরাচারের বিপক্ষে,
স্বাধীনতার পক্ষে।
আমি মিথ্যার বিপক্ষে,
সত্যের পক্ষে।
ডিয়ার কমরেড,
মনে রেখো,
একটি কণ্ঠের আঘাতে ভাঙে না শতাব্দীর প্রাচীর;
তবু প্রতিটি বিপ্লবের শুরুতে
কেউ একজন প্রশ্ন করেছিল—
“এই পৃথিবী কি এমনই থাকার কথা?”
ডিয়ার কমরেড,
সেই প্রশ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখো।
চেতনা বদলানোর আগে
মানুষের ভাগ্য বদলানোর কথা ভাবো।
ক্ষমতা দখলের আগে
ক্ষমতার চরিত্র বদলানোর কথা ভাবো।
শত্রু খোঁজার আগে
নিজের ভেতরের স্বৈরাচারকে খোঁজো।
আর যেদিন দেখবে
তোমার নিজের দল অন্যায় করছে,
সেদিন দলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস রেখো;
কারণ বিপ্লব মানে শুধু শত্রুর পতন নয়,
বিপ্লব মানে নিজের ভুলের বিরুদ্ধেও
নির্দয় হয়ে ওঠা।
মনে রেখো,
আমি কোনো মতবাদের শেষ কথা নই,
আমি তার প্রতিটি অসংগতির সামনে
দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রশ্নচিহ্ন।
আমি কোনো পতাকার অন্ধ সৈনিক নয়,
আমি সেই মানুষের সহযাত্রী
যে মানুষ রং, ধর্ম, জাতি আর শ্রেণির দেয়াল পেরিয়ে
একটি ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে।
ডিয়ার কমরেড,
আমি এমন এক ভোর চাই
যেখানে বিপ্লবের পর আরেকটি বিপ্লবের
প্রয়োজন পড়বে না;
যেখানে মানুষ স্বাধীন হবে
কেবল শাসকের হাত থেকে নয়,
নিজের ভেতরে জন্ম নেওয়া
প্রতিটি ক্ষুদ্র স্বৈরাচার থেকেও।
ডিয়ার কমরেড,
আমি কোনো দলের নই—
আমি মানুষের।
আর মানুষকে বাঁচানোর প্রশ্নে
যে মতবাদই সত্যের পাশে দাঁড়াবে,
আমি তার কাছ থেকে শিখব;
যে মতবাদই অন্যায়ের পাশে দাঁড়াবে,
আমি তার বিরুদ্ধে লিখব।
কারণ আমার শেষ পরিচয় বিপ্লবী নয়,
কমিউনিস্ট নয়, গণতন্ত্রী নয়,
সমাজতন্ত্রী নয়, খেলাফতপন্থী নয়—
আমার শেষ পরিচয়—
আমি মানুষ,
আমি মানুষের পক্ষে।
তাই আমি কমিউনিস্ট
আমি গণতন্ত্রী, সাম্যবাদী এক খেলাফতপন্থী।