প্রেমে পড়া, প্রেম প্রকাশ করতে না পারা, প্রেমিকার সাড়া না পাওয়ার যন্ত্রণা কী যে ভয়াবহ এবং এটা যে বিচ্ছেদের চেয়ে কম কিছু নয় সেটা আমরা বন্ধুরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম ক্লাস নাইনের শেষের দিকে এসে, যখন আমাদের আগাগোড়া ধার্মিক বন্ধু এক নাম করা ইসলামী সঙ্গীত শিল্পীর প্রেমে পড়েছিলো।
প্রেম ওর নিষ্কলুষ হৃদয়ে জমতে জমতে ভার হয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ওর নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে জীবনের ছন্দপতন ঘটতে ঘটতে পরিপার্শ্ব থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেটা সেও বুঝতে পারে, কিন্তু ওর মন তো বোঝে না।
একটু সাক্ষাতের আকাঙ্খায়, একটু প্রেম প্রকাশের বাসনায় ওর সমস্ত সত্তা কাঙাল হয়ে ওঠে। গভীর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজের সিজদায় পড়ে কান্নাকাটি করে প্রেমের এই অতলস্পর্শী, সর্বগ্রাসী মরণটান থেকে পরিত্রাণ পেতে খোদার কাছে ফরিয়াদ জানায়।
বন্ধুর অবস্থা দেখে ওর মা বেশ বিচলিত হয়ে একদিন স্কুলে এসে আমার আরেক বন্ধুর কাছে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কী হয়েছে, তিনি কিছুই বুঝতে পারেন না। বন্ধু তার সাদা মনে জানিয়ে দেয় সবকিছু আন্টিকে। এটা নিয়ে যদিও পরে বেশ কাউয়া ক্যাচাল হয়েছিলো নিজেদের মধ্যে। কিন্তু এর পর থেকেই মূলত ও সেরে উঠতে শুরু করে।
.
কলেজে উঠে নবতরুণ হয়ে সবাই যখন প্রেমের নিজস্ব ধান্দায় ব্যস্ত, তখন আমরা সেই বন্ধুর চিলেকোঠার বাসার ছাদে মাদুর পেতে শুয়ে নক্ষত্রখচিত দূষিত মফস্বলি আকাশ দেখতে দেখতে প্রেমের দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে আলাপ করছি রাতের পর রাত।
মানুষ কেন প্রেমে পড়ে, মানুষ কেন প্রেম করে, মানুষকে কেন প্রেম করতে হয়? কামনাকে একপাশে সরিয়ে আমরা প্রায় একই সাথে শূন্যতাকে আবিষ্কার করলাম। সেই আদিম শুন্যতা, যে শুন্যতায় প্রথম মানব, স্বর্গীয় পিতা আদমের হৃদয়ও ভার হয়ে ছিলো।
সবাই জানলো, যদি মনের মতো সঙ্গী পাওয়া যায়, যদি পরস্পরে হৃদয়ের অতলে ডুব দিতে পারে, যদি পারে এক হয়ে নাই হয়ে যেতে, তবেই এই দোজখ লাগা শূন্যতার মোচন হবে।
বারোটা কেবল আমারই বেজে গেলো। হৃদয়ের অতলান্ত হাতড়েও উপশমের কোনো উপায় পেলাম না। জানলাম, প্রেম-কাম-শিশু কিছুতেই পোষাবে না আমার। হৃদয়ে জ্বলে উঠলো সত্যিকারের 'কেমন অনল'। ডুবতেই থাকলাম এক ঘোরের ভেতর, হতেই থাকলাম ক্রমশ নিঃসঙ্গ; কবি। নিজেকে হারিয়ে খোঁজা শুরু হলো।
.
২০২৩ এ এসে, দুঃখে দূষিত দর্শনে আমি সংসারকেই সকল যন্ত্রণার মূল হিসেবে চিহ্নিত করে, যেহেতু প্রকৃতির নিয়মকে অস্বীকার করে, কামনাকে জয় করে মহাপুরুষ হয়ে উঠতে চেয়েছিলাম, প্রকৃতি আমাকে এক তীব্র প্রেমের ফাঁদে ফেলে এলোমেলো করে দিচ্ছিলো প্রায়।
এমন আত্মঅহম সম্পন্ন নির্বিকার আমি যে এমন ভেঁড়া হয়ে উঠবো, প্রেমের সকল লুতুপুতু বিষয় আমার এমন অদ্ভুত রঙিন লাগবে, একটা পোস্ট করে, স্টোরি শেয়ার করে তার একটা প্রতিক্রিয়া পাওয়ার মতো হীন আনন্দে উদ্ভাসিত হবো, এমন ক্ষুদ্রতা আমায় গ্রাস করবে কখনো ভাবি নাই।
যদিও এই প্রেম আমাকে নতুন উপলব্ধি দিয়েছে, নিজেকে চিনিয়েছে আরো ভালোভাবে, তবুও প্রেমের কাছে আমি হেরে যাবো না, আত্মসমর্পণ করবো না। তাতে দুঃখ হচ্ছে, যন্ত্রণা হচ্ছে -- হোক! জীবন ও দুঃখ নামক দুই সহোদরকে আমি বুড়ো আঙুল দেখাতে শিখে গেছি অনেক আগেই।
মুহাম্মদ রাকিবুল হাসান। সূর্যসেন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।