ঢাকা মেডিক্যালের মসজিদ থেকে মাগরিবের নামাজ পড়ে বাইরে এসে বসেছিলাম। মধ্যবয়সী এক লোক বাটন ফোন নিয়ে এসে বললেন, উনার ফোনে বিকাশে কত টাকা আছে, সেটা যেন একটু দেখে দেই।
বাটন ফোনে বিকাশে কীভাবে কী করে আমার ধারণা ছিল না। একটু পরে আকিব বেরিয়ে এলে ওকে দেখে দিতে বলি। জিজ্ঞেস করলাম পিন জানেন কিনা। বললো জানি। সতর্ক করলাম, যাকে তাকে দিয়ে চেক করাবেন না। পিন নাম্বার ও বলবেন না। ম্লান হেসে মাথা চুলকে বললো, আমি মুরুক্ষ মানুষ, এতকিছু তো বুঝি না।
গত তিন চারদিন আমার ঢাকা মেডিকেলে অনেকবার যাওয়া হয়েছে। হঠাৎ মনে হল উনাকে ভেতরে কোথাও দেখেছি। জিজ্ঞেস করলাম, হাসপাতালে আপনার রোগী আছে? দুইদিন আগে আপনাকে সম্ভবত দেখেছিলাম।
বললেন ২৯ দিন ধরেই আছেন। ছেলের ব্লাড ক্যান্সার। বিড়বিড় করে মলিন মুখে ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে বললেন, আশা নাই। আমার এই একটাই ছেলে। পকেট থেকে ২০ টাকার একটা নোট বের করে দানবাক্সে ফেললেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস। একমাত্র পুত্রকে হারাতে যাওয়া বাবার শূন্য দৃষ্টি -- তাকানো যায় না!
কিছু কিছু ঘটনা তাৎক্ষণিক আক্রান্ত না করলেও ভেতরে ভেতরে খুব প্যাঁচাতে থাকে। মন থেকে যেতে চায় না। যেহেতু জীবন নশ্বর, এখন অব্দি বুঝি, সম্পর্ক ব্যাপারটা মানুষকে যা কিছু হাসি-আনন্দ-উল্লাস দেয় বিদায় বেলায় তার চেয়ে অধিক কেড়ে নেয়। সুদটা অনেক বেশি চওড়া হয়ে যায়। একজীবনে সবাই শোধ করতে পারে না।
মাঝে মাঝেই বলি, আপনি যদি একা থাকেন বছরে হয়তো আপনার একটা খারাপ সময় আসবে। যদি দশজনকে নিয়ে থাকেন, বছরে আপনার দশটা খারাপ সময় আসবে। আমি জানি, এটা সরল, গাণিতিক, সমস্যাজনক, শিশুতোষ হিসেব। কিন্তু এটা অস্বীকার কি করতে পারেন?
এই সত্য জানার আগেই যাদের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন, তাদের তো অস্বীকারের উপায় নাই। তবুও যতটুকু আছে, আর বৃদ্ধি না করে পরিধি টেনে ফেলা সম্ভব। কেউই তা করে না। করতে পারে না, পারবে না। কারণ মানুষ সম্পর্কের এই সুদের চেয়ে অধিক ভয় পায় নিঃসঙ্গতাকে। কিন্তু সবাই কি পায়?