Article

মাছ ধরার মজার স্মৃতি

October 21, 2026

10 views

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

ছোট্ট একটি গ্রাম—দক্ষিণ নাজিরপুর। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শান্ত, স্নিগ্ধ এক নদী—সন্ধ্যা নদী। বর্ষাকালে নদীটির রূপ যেন উপচে পড়ত। চারদিকে শুধু পানি আর সবুজের মায়া। সেই শ্যামল, নির্মল পরিবেশেই আমার বেড়ে ওঠা। শৈশবের কত শত স্মৃতি আজও মনের ভেতর জেগে আছে! তবে সবচেয়ে আনন্দময় স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটি নিঃসন্দেহে মাছ ধরা।

বরশি, জাল, চাঁই—কত কী দিয়েই না মাছ ধরতাম! ভাটার সময় খাল শুকিয়ে এলে আমরা চাঁই বসাতাম। চাঁইয়ের দুই পাশে নারিকেল বা খেজুরের পাতা দিয়ে ঘিরে দিতাম, যেন মাছ পাতায় বাধা পেয়ে চাঁইয়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে। জোয়ারে মাছ ঢুকত, আর ভাটার সময় চাঁই তুললে মাছের ছটফট শব্দে মন ভরে যেত। আহ, সে কী আনন্দ!

সবচেয়ে বেশি লাফাতো চিংড়ি মাছ। তবে মাঝে মাঝে চাঁইয়ে অবিষধর ডোরা সাপ বা মাছুয়াপোনা সাপও উঠত। তখন ভয়ও লাগত খুব। তাই চাঁইয়ের এক কোণা সাবধানে ধরে তুলতাম।

বাড়ির সামনে ছিল লম্বা এক খাল। সেখানে আমরা জাল টানতাম। জালে বায়লা, টাকি, নুন্দি, ডগরি, শোল আর চিংড়ি মাছ বেশি উঠত। তবে পুকুর বা খালের পানি সেচে কাদার মধ্যে মাছ ধরার আনন্দ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। কোথায় মাছ থাকতে পারে, তা আন্দাজ করে বুঝতাম। তারপর সেখানকার পানি তুলে অন্যদিকে ফেলে কাদার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে মাছ বের করতাম। প্যাক কাদার ভেতর হাতড়ে মাছ তুলে আনার আনন্দ যেন ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

বিশেষ করে শিং মাছ কাদার অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকত। গ্রামে যেটাকে বলা হতো “হাইত্তা”। তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করতে হতো। মাঝে মাঝে শিং মাছের কাটায় আঙুল ফুলেও যেত।

একবার মাছ ধরতে গিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম। মাছ ধরা শেষে দেখি পা বেয়ে রক্ত পড়ছে। পরে খুঁজে দেখি, গোপনাঙ্গে জোঁক লেগেছে! লবণ দিয়ে জোঁক ছাড়ানো হলো। কিন্তু সমস্যা হলো—জোঁক চলে গেলেও রক্ত পড়া বন্ধ হয় না। পরে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছিল। সে কী লজ্জা! ঘটনাটা এখনো মনে পড়লে হাসিও পায়, আবার অদ্ভুত এক অনুভূতিও হয়।

বরশিতে কোচো গেঁথে খালে চিংড়ি মাছ ধরতাম। একবার বড়সড় এক চিংড়ি ধরা পড়েছিল। সেটা নিয়ে পুরো গ্রামে আলোচনা পড়ে গিয়েছিল—“অমুকের ছেলের বরশিতে বড় চিংড়ি ধরা পড়েছে!” তখন মনে হয়েছিল, আমি বুঝি বিশাল কোনো শিকারি!

তবে বরশিতে সবচেয়ে সহজে ধরা পড়ত তেলাপিয়া মাছ। দক্ষিণ নাজিরপুর গ্রামের বড় ভাইয়েরা মসজিদের পুকুরে তেলাপিয়া চাষ করতেন। আমি আর স্বপন আটা গেঁথে বরশি ফেলতাম, আর একের পর এক বড় বড় তেলাপিয়া উঠত। এত মাছ ছিল যে, বরশি ফেললেই মাছ ধরা পড়ত।

বর্ষাকালে গ্রামের অধিকাংশ পুকুর ডুবে যেত। তখন অন্যের পুকুরের মাছ আমাদের পুকুরে চলে আসত। একবার বরশিতে বড় একটি রুই মাছ ধরেছিলাম। সেই আনন্দ আজও ভুলিনি।

তবে মাছ ধরার স্মৃতিতে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল একটি সউল মাছ ধরার ঘটনা। পুকুরে বিশাল এক সউল মাছ ছিল। মাঝেমধ্যে মাথা তুলে আবার পানির নিচে ডুব দিত। সবাই দেখত, কিন্তু কেউ ধরতে পারত না। জাল ফেললেই সে পালিয়ে যেত। পরে সোহরাব ভাইজানকে নিয়ে প্রায় দশবার চেষ্টা করার পর মাছটি ধরতে সক্ষম হয়েছিলাম। পুকুরের ঘাটের নিচে একটি গর্তে তার আস্তানা ছিল। মাছটি ধরার পর মনে হয়েছিল, যেন পৃথিবী জয় করেছি!

সন্ধ্যা নদীর ওপারে ছিল চর। আমি, হেলাল, ফিরোজ, কামাল, লিটন, শাহিন, মহিউদ্দীন—সবাই মিলে নৌকায় জাল নিয়ে মাছ ধরতে যেতাম। দুষ্টুমিও কম করতাম না। মাঝে মাঝে অন্যের চাঁই থেকে মাছ চুরি করে নিয়ে আসতাম।

একবার আমি, রাজিব আর রানা ছোট্ট এক নৌকা নিয়ে চরের কাছে গিয়েছিলাম। হঠাৎ নৌকাটি প্রায় ডুবে যেতে লাগল। তখন আমরা নৌকা ধরে সাঁতরে পাড়ে উঠি। এর মধ্যে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একজনের লুঙ্গি নদীর স্রোতে ভেসে যায়! তখন নদীতে ছিল প্রচণ্ড স্রোত। আর সবচেয়ে বড় ভয় ছিল—নৌকাটা অন্যের, অনুমতি ছাড়াই নিয়ে এসেছিলাম!

গ্রামের বড় ভাইয়েরা রাতে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন। খুব ইচ্ছে করত তাদের সঙ্গে যেতে। কিন্তু তারা কখনো নিতেন না। তখন মনটা খুব খারাপ হতো।

আমাদের গ্রামের খলিল ভাই আর সোহরাব ভাই ছিলেন মাছ ধরার বিশেষজ্ঞ। পুকুরের পানির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়েই বলে দিতে পারতেন—মাছ আছে কি না, কী মাছ থাকতে পারে। আশ্চর্যের বিষয়, তাদের কথাগুলো বেশিরভাগ সময়ই সত্যি হতো।

গ্রামের একদল বয়স্ক মানুষ ছিলেন, যারা পরম মমতায় জাল বুনতেন। পাঁচ হাত, সাত হাত জাল—নিখুঁত ফাঁস। মাছ একবার পড়লে বের হওয়ার উপায় ছিল না। গ্রামের হাটে জাল, চাঁইসহ নানা মাছ ধরার সরঞ্জাম বিক্রি হতো।

আমার বড় ভাই শখ করে একবার সাত হাতের একটি জাল কিনেছিলেন। কিন্তু বেশিদিন সেটি দিয়ে মাছ ধরা হয়নি। জীবিকার তাগিদে তাঁকে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যেতে হয়। জাল ভালো রাখার জন্য গাবের রস লাগানো হতো। আহ, সে কী আয়োজন!

গ্রামীণ জীবনে মাছ ধরা ছিল আনন্দময়, বৈচিত্র্যময় এক উৎসবের মতো। কিন্তু আজ সেই দিনগুলো প্রায় হারিয়ে গেছে। গ্রাম আর আগের মতো গ্রাম নেই—ধীরে ধীরে শহর হয়ে যাচ্ছে। খাল, পুকুর ভরাট করে সেখানে উঠছে দালানকোঠা। বাড়িতে গেলে এসব দেখে বুকটা হুহু করে ওঠে। মনে হয়, কেউ যেন বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় এখনকার ছেলে-মেয়েদের জন্য। তারা তো মাছ ধরার সেই নির্মল আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তাদের জন্য হলেও কি কিছু খাল-পুকুর বাঁচিয়ে রাখা যায় না? টাকার জন্য সব পুকুর ভরাট করতেই হবে?

গ্রামের সৌন্দর্যই ছিল বাড়ির পেছনের পুকুর, শান বাঁধানো বা বাঁশের সিঁড়িওয়ালা ঘাট। পুকুরের একপাশে সুপারির খোল দিয়ে ঘেরা জায়গা, যেখানে বাড়ির মেয়েরা গোসল করতেন। আমি এখনো গ্রামে গেলে শিকদার চাচার পুকুরে গোসল করি, যদিও সেটিও প্রায় ভরাট হয়ে গেছে।

তবে আশার কথা, সরকার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে। কিছু খাল যদি আবার খনন করে বাঁচানো যায়, তবুও মন্দ কী! হয়তো একদিন আবার কোনো গ্রামের শিশুর হাতে বরশি উঠবে, কাদামাখা মুখে সে দৌড়ে বাড়ি ফিরবে, আর সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসবে মাছ ধরা মানুষের সেই চিরচেনা আনন্দের গল্প।

বানারীপাড়া,বরিশাল-৮৫৩০

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login