সূর্য আর অরুণ দুই বন্ধু। তাঁদের বন্ধুত্ব অনেক দিনের। পড়াশুনা শেষ করে একি অফিসে চাকরিও নিয়েছে। এবং সেটা একি ডিপার্টমেন্টে। ওরা টিম হয়ে কাজ করে সবসময়। এমনই এক অফিসের কাজ শেষ করে ওরা রাতে ড্রাইভ করে চিটাগং থেকে ঢাকা ফিরছিল।
কাজ শেষ করতে বেশ রাত হয়ে যাওয়ায় অরুণ প্রথম দিকে নিষেধ করেছিল। কারন গাড়ি ওদের দুজনকেই ড্রাইভ করতে হবে। সে খুব একটা সাহস পাচ্ছিল না। কিন্তু সূর্য সবসময়ই সাহস দেখাতে চায় আর এডভেঞ্চার প্রিয়। তাই রীতিমত চাপ দিয়ে অরুণকে রাজি করিয়ে ফেলল রাতে রওনা দেবার দেবার ব্যাপারে।
চিটাগং থেকে খেয়েদেয়ে বের হতে হতে প্রায় নটা বেজে গেলো। সারা রাস্তায় গাড়িতে ধুমছে গান বাজিয়ে যাচ্ছে ওরা। সিগারেট ফুঁকছে। পালটে পালটে ড্রাইভ করছে। রাস্তায় থেমে থেমে চা কফি খাচ্ছে। নাস্তা করছে। অরুণ যে ভয় পাচ্ছিল সে ভয় তার কেটে গেলো। দুই বন্ধু বেশ উপভোগ করতে করতে রাত আড়াইটার দিকে দাউদকান্দি ব্রিজের টোল ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো। তখন ড্রাইভিং সিটে ছিল অরুণ। টোল পরিশোধ করে বের হয়ে গাড়ি সাইড করে থামালো অরুণ। অনেকক্ষণ ধরে সে ড্রাইভ করে চলেছে। এবার সিট বদলে সূর্য এসে বসলো ড্রাইভিং সিটে। তখন ঘড়ির কাটা তিনটা ছুই ছুই। রাস্তা বেশ সুনসান। মোটামুটি খুব দ্রুত গতিতে সূর্য গাড়ি নিয়ে ব্রিজে উঠে গেলো।
ওর গাড়ির টান দেখে অরুণ বলল, ওইত শালা আসতে। রকেট পাইছস নাকি?
স্টিয়ারিং হাত রেখে হাসতে হাসতে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল, বাসায় ঢুকে রাতের ঘুম পোষাতে হবে। অরুণ বলল, বাল পোষাবা তুমি। রাতের আর আছে কতোটুকু। বাসায় গিয়েই গাঁজা খাবা তুমি, আমি জানি। সূর্য ওর দিকে তাকিয়ে বাম হাত স্টিয়ারিং থেকে উঠিয়ে অরুণের রানে একটা চড় দিয়ে বলল, তুমি আমার বাল জানো।
ঠিক তখনই ওদের পাস থেকে সাই করে আর একটা গাড়ি চলে গেলো। অনেকটা ওদের গা ঘেঁষে। সূর্য তরিগরি করে স্টিয়ারিং ধরে সামলাতে গিয়ে গাড়ি কিছুটা নিয়ন্ত্রন হারাতে লাগলো। আর একি সময়ে গাড়ির সামনে কিছু একটা বাড়ি খেলো। ধাব করে শব্দ হলো। ওরা তখন ব্রিজের ঢাল ক্রস করে নিচে নামছে। ব্রিজের কোনা থেকে কিছু উঠে আসলে ওদের চোখে পড়ার কথা না। তার উপর গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিতে সূর্যের বেগ পেতে হচ্ছিল। ধাক্কা খাওয়ার পরেই সজোরে গাড়ি ব্রেক কষল সূর্য।
গাড়ি থেমে গেলো। ওভাবে কতক্ষন বসে ছিল বলতে পারবে না ওরা।
সূর্যই প্রথম মুখ খুলল, অরুণকে বলল, বন্ধু দেখ না কিসে বাড়ি খেলাম।
অরুণ এমনিতেই ভীতু। এমন অনুরোধ করা ওর কাছে অবাঞ্ছনীয়। কিন্তু অরুণের বাড়ি এই এলাকায়। পরিচিত এলাকা বলে কিছুটা সাহস করে গাড়ির দরজা খুলে ধীর পায়ে নামলো। হাত-পা কাঁপছে। কাঁপা হাতে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফ্লাস জ্বালিয়ে গাড়ির পিছন পর্যন্ত গেলো। মাথা উচু করে আলো ফেলতেই সে আর দাঁড়াতে পারলো না।
দৌড়ে এসে গাড়িতে ঢুকে বলল, দোস্ত স্টার্ট দে। দোস্ত প্লিজ, প্লিজ।
ওর অবস্থা দেখে সূর্য আর প্রশ্ন না করে গাড়ি স্টার্ট দিলো, সজোরে এক্সেলেটর চেপে ধরল। গাড়ি চালানো শুরু করলো দিগুণ গতিতে। গাড়ি আর কোথায় থামাল না। সোজা গিয়ে সূর্যদের বাসার সামনে দাঁড়ালো। গাড়িতে আসতে আসতে কোন কথা বলেনি ওরা।
সূর্য কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো, মানুষ ছিল দোস্ত?
অরুণ কথা না বলে ধীরেধীরে মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলল।
সূর্য হুহু করে কেঁদে উঠলো। অরুণও কাঁদছে।
সূর্য কাঁদতে কাঁদতে বলল, এতো রাতে ওখানে সে কি করতে আসছে?
অরুণ ভেজা গলায় বলল, জানি না দোস্ত।
হঠাৎ করে সূর্য সোজা হয়ে বসল। চোখ মুছল।
অরুণের দিকে তাকিয়ে বলল, বাসায় যেতে পারবি?
অরুণ বলল, তোকে একা রেখে কোথাও যাচ্ছি না। কেন কি করবি?
সূর্য বলল, আগে গাড়ির একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমার পরিচিত এক ভাই আছে। তার আগে চল দেখি গাড়িতে রক্ত টক্ত লেগেছে কিনা?
অরুণ বলল, আমি পারবো না দোস্ত।
সূর্য কথা না বাড়িয়ে গাড়ি থেকে নামলো। তখনো ভোরের আলো ফুটেনি। হয়তো দূরে কোথাও লাল আভা ছিটকে পড়া শুরু করবে কিছুক্ষণের মধ্যে। সূর্য মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে গাড়ির সামনে দেখতে লাগলো। কিছুক্ষন দেখে হেটে এসে গাড়ির পিছনের সিট থেকে এক বোতল পানি নিলো। রাস্তা থেকে ময়লা কাগজ তুলে নিলো। গাড়ির সামনের দিকে বাম পাশে ধীরেধীরে পানি ঢেলে কাগজ দিয়ে মুছতে লাগলো। মোছা শেষ করে গাড়িতে বসে স্টার্ট দিলো। গাড়ি চালাতে চালাতে তার সেই পরিচিত ভাইকে ফোন দিয়ে ঘুম থেকে উঠাল। খুব জরুরী সাহায্য লাগবে বলে তার গ্যারেজে চলে আসলো। মিথ্যা একটা গল্প বানিয়ে তার কাছে গাড়ি রেখে বাসায় চলে আসলো।
আসার সময় সূর্য অরুণকে বলল, দোস্ত তোর তো বাড়ি ওদিকে, কাল পরিচিত কাউকে ফোন দিয়ে একটু খবর নিতে পারবি।
অরুণ কিছুক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ পারবো। সকালে ফোন দিয়ে জানাবো তোকে।
ফোনের রিঙয়ের শব্দে ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠলো সূর্য। বিছানা হাতড়ে ফোনটা ধরে উচু করে এক চোখ খুলে দেখল অরুণের ফোন।
রিসিভ করে কানে ধরতেই অরুণ ওপাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, দোস্ত, সেই মানুষটাকে ঢাকায় নিয়ে আসছে। ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি। আমি ওখানে আছি। ওনার বাসার লোকজন খুব কান্নাকাটি করতেছে। জলদি আয়। অবস্থা ভালো না।
ফোন কেটে দিলো অরুণ। সূর্য লাফ দিয়ে উঠে পড়লো। দশ মিনিটের মধ্যে বাসা থেকে বের হয়ে ঢাকা মেডিক্যালের দিকে রওনা দিলো। বের হবার সময় ওর বোন ডাক দিয়েছিল, কিন্তু সে ফিরে তাকায়নি। ওর বাবা নেই। মা, সে আর বোন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। শ্বশুরবাড়িতেই থাকে। বেড়াতে এসেছে বাবার বাড়িতে কিছুদিন হল।
সূর্য হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে অরুণকে ফোন দিলো। কোথায় আছে জিজ্ঞেস করতেই অরুণ বলল জেনারেল বেডের দিকে আয়। ধ্রুত পায়ে সূর্য পৌছালো। অরুণকে খুজে পেতে কষ্ট হল না। অরুণ চোরের মতন এদিক সেদিক দেখছে আর জায়গা বদল করছে বারবার। সূর্য গিয়ে পিছন থেকে ওর ঘাড়ে হাত দিতেই লাফ দিয়ে উঠলো। পিছনে ফিরে ওকে দেখে ওর হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেলো।
একপাশে দাঁড়িয়ে বলল, বন্ধু অবস্থা ভালো না। শুনলাম মাথার খুলি ভেঙ্গে মগজ বের হয়ে ছিল। সারারাত ওভাবে পড়া ছিল মগজের কিছু অংশ মনে হয় কুকুর বা শিয়াল খেয়ে ফেলেছে।
ওরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। সূর্যের পিঠ ছিল রাস্তার দিকে, যেদিক থেকে রোগী আর মানুষজন বের হয়। ওর সামনে দাঁড়ানো অরুণ। হঠাৎ ওকে ঠেলে এক পাশে সরিয়ে জায়গা করে দিলো। কিছু মানুষ নামছে। সাথে একটা ট্রলি। সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। নেমে গিয়ে একটু সামনে দাঁড়ালো। হয়তো লাশ কিভাবে নিবে সেই আলাপ করছে সবাই। ওরা অন্যদিকে ফিরে কথা বলার ভান করে যাচ্ছে। কি মনে করে সূর্য ঘাড় ঘুড়িয়ে পিছনে তাকাল। লাশবাহী ট্রলিটা আড়াআড়ি সোজা ভাবে রাখা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে পা রাস্তার দিকে আর মাথা হাসপাতালের দিকে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া কাফনের কাপড়টা মাথার কাছ থেকে সরে গেলো কিছুটা। বাম দিকে মাথা কাত হয়ে আছে। সূর্যরা যেদিকে দাঁড়ানো সেদিকে। বীভৎস একটা মুখ। রক্তে ভেজা ছিল, যা শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল। মনে হল ঠোঁটের কোনে একটু হাসি ফুটে উঠেছে। সূর্য একটু কেঁপে উঠে ঘাড় ফিরিয়ে সামনে দিকে চলতে লাগলো। অরুণ কিছু না বুঝে ওর পিছনে হাটা দিলো। হাসপাতালের অন্য গেট দিয়ে বের হয়ে রাস্তার এক পাশে সূর্য বসে পড়লো।
অরুণ ওর পাশে বসে বলল, কিরে? ওভাবে বের হয়ে এলি?
সূর্য প্রায় শুঁকনো গলায় বলল, লাশটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
কথাটা শুনে অরুণ স্নায়ুর মতন হয়ে রইলো কিছুক্ষন। একবার ঘাড় ঘুড়িয়ে পিছনে তাকাল। মনে হল যেন লাশটা এবার এসে ওদের পিছনে দাঁড়িয়েছে।
যদিও সে সূর্যের থেকে ভীতু, তারপরেও বন্ধুকে সাহস দেবার জন্য বলল, দোস্ত, তুই শুধু শুধু মাথা খারাপ করছিস। এগুলো শুধু…
কথা শেষ করতে পারেনি সূর্য বলল, হ্যালুসিনেশন বলবি তো?
অরুণ মাথা ঝাঁকাল।
সূর্য এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চল বাসায় যাই।
অরুণ আর কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো। দুজনে বাসার দিকে রওনা দিলো।
রাত কটা বাজে বুঝতে পারলো না সূর্য। কেমন খসখস শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ওর রুমে আসবাবপত্র চারটা। ওর খাট, চেয়ার টেবিল, একটা বুকশেলফ আর একটা আলমারি। আলমারি আর বুকশেলফ পাশাপাশি। আর আলমারির পাশে একটা জানালা। ঘুম ভেঙ্গে সেদিকে চোখ পড়ে গেলো। মনে হল কেউ একজন আলমারিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ঘামতে শুরু করলো। চোখ বন্ধ করে ভাবল হয়তো খারাপ স্বপ্ন। এরপরে ধীরেধীরে চোখ খুলতেই ঠিক ওর মুখের সামনে এসে দাঁড়ালো সেই শুকিয়ে যাওয়া রক্ত মাখা মুখটা। শরীর কাফনের কাপড় দিয়ে মোড়া। মাথাটাও মোড়া, কিন্তু একটু সরে গিয়ে কাফনের ফাঁকে চোখ খোলা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠলো সূর্য। হাচরেপাচরে খাট থেকে নেমে দরজার কাছে দৌড়ে গেলো। দরজা খোলার আগেই ওপাশ থেকে দরজা ধাক্কার শব্দ পেলো। সে কোন মতে দরজা খুলে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো।
চলবে......