Story

কাফনের ফাঁকে চোখ খোলা (শেষ পর্ব)

October 21, 2026

34 views

চোখ খুলে ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখতে পেলো ওর ঘরে কারা যেন হাঁটছে। ভীতু মনে ধীরে সুস্থে চোখ কচলে তাকাল। ঘরে তার সব পরিচিত লোক। তার বোন, আর বন্ধু অরুণ। অরুণ বসে আছে আর বোন ঘরে পাইচারি করছে। চোখ খুলতেই ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। চোখে মুখে উদ্বিগ্নতার থেকে রাগের ছাপ বেশী পরেছে।

দাঁত কিড়মিড় করে বলল, সত্যি করে বল সুর্য, তোরা কি করে এসেছিস?

সুর্য কাঁচুমাচু মুখ করে অরুণের দিকে তাকাল।

অরুণ মাথা নিচু করে বসে আছে।

আবার ওর বোনের দিকে তাকিয়ে চোখ বুঝতে গেলো।

ওর বোন তার মুখের ভাব পরিবর্তন না করে বলল, তুই সব সময়ে অনেক ভীতু। ছোট বেলায় এমন অনেক আকাম করে এসে বাসায় জ্বরে পরেছিস। এবার কি করেছিস বল?

সূর্য ঘরের বাইরে অনেক সাহস দেখিয়ে বেরালেও ঘরের মানুষ যাবে সে অনেক ভীতু।

চুপ থাকতে দেখে অরুণের দিকে তাকাল, বলল, অরুণ অফিসের কোন ঝামেলা? মেয়ে ঘটিত কিছু? নাকি বাজে কোন নেশা করেছিস তোরা?

অরুণ করুন মুখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তেমন কিছুই না আপু।

সূর্য কোনমতে উঠে বসলো। অরুণের হাতে আলতো করে চাপ দিয়ে মাথা ঝাঁকাল।

অরুণ কিছুক্ষন মাথা নিচু করে রাখল। এরপরে মাথা তুলে ওর বোনের চোখ চোখ রেখে সব ঘটনা খুলে বলল। সব শুনে সূর্যের বোন ধপ করে খাটের উপর বসে পড়লো।

সূর্য তখন বলল, দিদি আমরা ভয় পেয়েছিলাম অনেক।

বোন খুব নরম গলায় বলল, কাল কি হয়েছিল তোর?

সূর্য বলল, আমি সেই লাশটাকে স্বপ্ন দেখেছি।

অরুণ আর সূর্যের বোন দুজনেই একসাথে বলে উঠলো, মানে?

সূর্য কাঁপা গলায় বলল, কাল রাতের কোন এক সময়ে ওই আলমারির পাশে কাফনের কাপড় মোড়া কেউ যেন দাঁড়ানো ছিল, মাথার কাছ থেকে একটু ফাঁকা চোখ বেরিয়ে ছিল। তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।

সূর্যের বোন বলল, আর তুই সেটা দেখে ভয় পেয়ে হাউমাউ করে উঠেছিল?

সূর্য হ্যাঁসূচক মাথা ঝাঁকাল।

সে উঠে দাঁড়ালো, বল, তোদের কিছু বলার আগে আমার একটা জিনিস চেক করতে হবে। সূর্য উঠ। চোখে মুখে জল দে। আমার সাথে নিচে যাবি।

সূর্য বিছানা ছাড়ল। বাথরুমের গিয়ে দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে আসলো। ওর বোন ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। তার পিছনে পিছনে অরুণ আর সূর্য যেতে লাগলো। সূর্যের বোন বাসার দরজা খুলে নিচে নামতে লাগলো। তার পিছনে পিছনে অরুণ আর সূর্যও নামতে লাগলো।

সূর্যের ঘরটা সেই বিল্ডিঙয়ের পিছনের দিকে। ওর আর ওর বোনের ঘর পাশাপাশি। ওরা নিচে নেমে দারোয়ানকে নিয়ে বিল্ডিঙয়ের পিছনে গেলো।

সূর্যের বোন দারোয়ানকে বলল, মামা একটু কষ্ট করে উপরে উঠেন।

সাত তলা বাড়ির ওদের ফ্লাট দ্বিতীয় তলায়। পুড়নো বাড়ির ডিজাইন তাই জানালার সাথে সানসেট আছে। সূর্যের বোনের কথা শুনে যুবক দারোয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইলো।

সূর্যের বোন চোখে মুখে কিছুটা বিরক্তি এনে আবার বলল, মামা সানসেটে উঠে দেখবেন অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ে কিনা। মানে কেউ রাতে উঠেছে এমন। ওই জানালার নিচে।

দারোয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল, আফা আমি কিছু টের পাই নাই কিন্তু।

সূর্যের বোন একিভাবে চোখ মুখ খিঁচিয়ে বলল, এতো কথা বলার দরকার নেই। উঠে পরেন দয়া করে।

যুবক দারোয়ান তড়তড় করে দোতলার সানসেটে উঠে পড়লো। সানসেটে অনেক ময়লার স্থুপ হয়ে আছে বলতে গেলে। মনে মনে ভাড়াটিয়াদের গালি দিলো দারোয়ান। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ময়লা এদি ওদিক করছে। তেমন কিছু চোখে পড়লো না।

নিচে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, আফা সব পুরান ময়লা। নিচে ফালামু?

সূর্যের বোন হাতের ইশারায় নিচে নামতে বলল। দারোয়ান যেভাবে তড়তড় করে উঠলো সেই ভাবে তড়তড় করে নেমে গেলো।

ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, কি হইছে?

সূর্যের বোন বলল, কিছু না। যাও তুমি। তোরাও আয়।

দারোয়ান ঘুরে হাটা দিলো। তার পিছনে সূর্যের বোন। তার পিছনে সূর্য আর অরুণ। ঠিক তখন একটা সাদা দড়ির মতন উপর থেকে ওদের সামনে দিয়ে বাতাসে ভাসতে লাগলো। ভাসতে ভাসতে ওদের সামনে পড়লো। ওরা দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে গেলো। মাটিতে পড়তেই সূর্য বসে ওটাকে হাতে তুলে নিলো।

ওর সামনে থেকে কেউ একজন বলে উঠলো, এটা দিয়ে কি লাশের পা বা মাথা বাধছিল নাকি?

ওরা দুজন সামনে তাকিয়ে দেখে দারোয়ান দাঁড়ানো, তার পিছনে ওদের বোন। ওরা আসছে না দেখে দারোয়ান আর সে ফিরে এসেছে। সূর্য হাত থেকে ওটা ফেলে দিলো। এক দৌড়ে বাসার দিকে চলে গেলো। ওর পিছনে পিছনে অরুণ আর ওর বোন আসতে লাগলো। দারোয়ান কিছু না বুঝে দাঁড়িয়ে রইলো সাদা কাপড়টার দিকে তাকিয়ে।

রাত কটা বাজে বুঝতে পারলো না সূর্য। এবার আর কোন খসখস শব্দে ঘুম ভাংগেনি। খাটে জোরে কাপুনে সে কাঁপতে কাঁপতে বসলো। অন্য সময় হলে ভূমিকম্প ভাবত কিন্তু এখন মাথায় আসলো হয়তো সেই সাদা কাফনে মোড়ানো মানুষটাই তার খাট ঝাঁকাচ্ছে। এবং সেটা সত্য। পায়ের কাছ থেকে খাট ধরে জোরে জোরে ঝাঁকাচ্ছে। এবার তার হাত দেখা যাচ্ছে। কারন খাট সে হাত দিয়ে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। পুরো শরীর ঢাকা, মাথা মোড়ানো আর কাফনের এক ফাঁক দিয়ে তার চোখ দেখা যাচ্ছে। সূর্য কাঁপতে কাঁপতে খাট থেকে নিচে পরল। খাট কাঁপা থেকে গেলো। সূর্য প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে দরজার কাছে চলে গেলো। অন্ধকারে হাতরে কোনমতে দরজা খুলে ফেলল। বের হতে যাবে দেখে দরজার বাইরে সেই ভয়ংকর কাফনে মোড়া দেহটা দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য জায়গায় জমে গেল আর সেই দেহটা কাফনের ফাঁক থেকে একটা হাত বের করে সূর্যের বাম হাত চেপে ধরল। ওর হাত ধরে ধীরেধীরে বাসার সদর দরজার কাছে চলে গেল। সূর্য যেন যাদুতে আক্রান্ত হয়ে আছে। কিছুই বলতে পারছে না, করতে পারছে না, নড়তে পারছে না। সেই কাফনে মোড়া দেহটার যে চোখটা বের হয়ে ছিল, সেই চোখ আগুনের মতন জ্বলছে। জ্বলজ্বলে চোখে দরজার খোলার ইশারা করলো। সূর্য ডান হাত দিয়ে দরজাটা খুলল। সেই দেহটা সূর্যকে নিয়ে ছাদে উঠে গেলো। ছাদের এক কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো দুজন। ছাদের চার পাশে রেলিং দেয়া আড়াই ফুটে মতন। সূর্যকে আবার ইশারা করলো সেই রেলিঙয়ের উপরে উঠতে। সূর্য উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়ানো পড়ে সে হাত ছেড়ে দিলো। হাত ছাড়তেই সূর্যের হুস ফিরে এলো। নিচে তাকাতেই ওর পা টকটক করে কাঁপতে লাগলো। ঠিক তখন একটা গড়গড়ে গলা শুনতে পেলো সে। গলাটা বলছে, আমাকে রেখে চলে আসলেও পারতি। হয়তো আমি বেঁচে জেতাম। এমন নির্মম মৃত্যু তো আমার কাম্য ছিল না। সূর্য কিছু একটা বলার জন্য ঘাড় ঘুরাল। দেহটা শূন্যে ভেসে উঠে সেই ঘোরানো ঘাড় পুরো ঘুড়িয়ে দিলো। কড়াত ঘাড়ের হাণ্ডি ভাঙ্গার শব্দ হল। তখন সূর্য বেঁচে আছে। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে সেই দেহটা বলল, তোর একি ভাবে মৃত্যু কাম্য হয়েছে। দেখা হবে নড়কে।

কথা শেষ করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো সূর্যকে সাততলা ছাদ থেকে।

সূর্যের মৃত্যের চারদিন পড়ে। এরমাঝে অরুণ শুধু সূর্যের দাহতে গিয়েছিল। আর কোথাও বের হয়নি।  অরুণের মন খারাপ। শুধু মন খারাপ না, সে অনেক ভয়ে আছে। এখন আর একা থাকে না, একা শোয় না। বাসায় অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওর এক ছোট পিসতুতো ভাইকে নিয়ে এসেছে। যদিও সূর্যের মতন তাকে কেউ ভয় দেখাচ্ছে না এখনো। তারপরেও সে জানে সব কিছু। সে জানে হয়তো তার বন্ধুর মতনই তার একি অবস্থা হবে। আজ না হয় কাল।

ওই দিন সন্ধ্যায় চা নাস্তার পর্ব শেষ করে নিজের ঘরে এসে বসেছে দুই ভাই। অরুণের ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দা। বারান্দায় বসেই ওর বই পড়ে, মোবাইল চাপে, সিগারেট খায়। ছোট পিসতুতো ভাইকে ঘরে রেখে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো অরুণ। সিগারেট জ্বালিয়ে মোবাইল বের করে স্ক্রোল করতে লাগলো। একটা নিউজ পোর্টালের সূর্যের মৃত্যুর ফলোআপ একটা খবর সামনে এলো। পড়তে লাগলো অরুণ। পড়তে পড়তে এক জায়গায় থেমে গেলো, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে সূর্যের ঘাড় মটকানো পাওয়া গিয়েছে। সেটা মৃত্যুর আগে। পুলিশ ধারনা করছে কেউ তাকে ঘাড় মটকে পড়ে ছাদ থেকে ঢাকা দিয়েছে। আর বাম হাতের কব্জিতে একটা কালশিটে দাগ। মনে হচ্ছে সেখানে কেউ শক্ত করে ধরেছে বা কিছু দিয়ে চেপে রেখেছে।

অরুণ পড়তে এতোটাই মশগুল ছিল যে ওর পিছনে কিছু একটা দাঁড়িয়েছে সে লক্ষ করেনি। যতক্ষণ না সেই কিছু একটা কথা বলতে শুরু করেছে। সেই গড়গড়ে গলায় বলল, তোর বন্ধু তো তোর জন্য অপেক্ষা করছে। কি ভেবেছিস? তুই বেঁচে যাবি?

অরুণ পিছনে তাকিয়ে দেখল সাদা কাফনে মোড়া একটা দেহ। মাথার কাছে একটু ফাঁকা হয়ে চোখ বের হয়ে আছে। কাফনের ফাঁকে সেই চোখ খোলা। এরপরে কিছু বুঝে ওঠার আগে কাফনের এক পাশ থেকে একটা হাত তার মুখের উপর পড়লো।

পরের দিন প্রধান খবরের কাগজ গুলোর প্রথম পাতায় খবর ছাপা হল।

“অরুণ নামের এক তরুনের রহস্যময় মৃত্যু”।

ছবিতে সাথে সংযুক্ত করা। রক্তাক্ত জায়গা ঘোলা করে দেয়া। অরুণ তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দায় গ্রিল ভেদ করে তার মাথা বাইরে চলে গেছে। কিভাবে সম্ভব কেউ বুঝতে পারছে না। কিভাবে এতো জোরে চাপ লাগলো যে দেহ ভেতরে মাথা কেটে বাইরে ঝুলে আছে। রক্তে ভিজে আছে বারান্দার মেঝে। সাথে ভিজেছে সিগারেটের ফিল্টার আর অরুণের মোবাইল। মোবাইল স্ক্রিনে ভাবছে সূর্যের ময়নাতদন্তের রিপোর্টের খবরটা।

***সমাপ্ত***

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login