মিরুর রেশম চুলে হাত বোলাতে বোলাতে নীরব আবেগ ধরা গলায় বলল, বিয়ের পরেও তুমি বদলাওনি একদম।
মিরু মুচকি হেঁসে বলল, বদলাবো কার কাছে? যাকে ভালবাসি তার কাছে? কি যে বলো না?
মিরু আর নীরব তাদের সেই পুরনো জায়গায় বসে প্রেমে মশগুল হয়ে আছে। জায়গাটা শহর থেকে একটু দুরে। একটা ভাঙ্গা ব্রিজের নিচে। এই জায়গা সহ শহরের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ওরা এমন প্রেম প্রেম খেলা করে বেরায়নি। কিন্তু বিধিবাম, মিরুর বাবা রিতিমত জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলো ওদের এলাকারি এক ছেলের সাথে। বড় মেয়ে, কত দিন প্রেম করে বেরাবে। নীরবেরও ভবিষ্যৎ খুব একটা উজ্জ্বল না। বলতে গেলে সে বখে গেছে অনেক আগে। এলাকায় তার নামে ভালো কেউ কিছু বলতে পারবে না। এমন একটা ছেলের সাথে কিভাবে যে প্রেম হয়ে গেলো সেটা এক আল্লাহ্ই জানে। প্রেম প্রেম খেলা ভালোই চলছি। নীরবের সব কুকাজ মিরু জানার পরেও কেন যেন ওকে জীবনের থেকে অনেক ভালবাসত। হয়তো মনে মনে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, এই খারাপ ছেলেটাকে ভালো করবে।
হঠাৎ নীরবের ফোনের রিং বেজে উঠলো। ওপাশে তার প্রিয় বন্ধু আসিকের গলা।
কইরে মামা? আসিক হেঁসে হেঁসে জিজ্ঞেস করলো।
নীরব উত্তর দিলো, কই আবার? ব্রিজের নিচে। গলায় তার বিরক্তি
ওপাশ থেকে আসিক বলল, হইছে শালা, পরের বউএর লগে এতো প্রেম মারাইতে হবে না। আড্ডায় আসো। তোমরা প্রেমিকার ভাতারকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে। দিমুনাকি একটা মাইর। বলে হেঁসে দিলো আসিক।
এবার নীরব হেঁসে দিয়ে বলল, আচ্ছা আসতেছি বাল। তোরা কেন, তারে তো আমি মারুম। আজ না হয় কাল। বলে ফোন কেটে দিলো।
মিরু চোখ তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কাকে মারার কথা বলছ?
প্যান্ট ঝাড়তে ঝাড়তে নীরব উঠে দাড়িয়ে বলল, কাউকে না। চল তোমার নাগর এলাকায় ঘুরাঘুরি করতাছে। দেখে ফেললে আবার তোমার ঝামেলা হবে।
দুজনে উঠে পরল। নীরবের মোটরসাইকেলের পিছনে উঠে তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল মিরু। যেন এটা শেষ ধরা।
বিকেলের একটু আগেই বাসায় ঢুকল মিরু। সোজা নিজের ঘরে। কাপড় বদলে নিয়ে হাতমুখ ধুয়ে রান্না ঘরে ঢুকল। এখন সে লক্ষি বউ। তার শ্বশুর বাড়ির মানুষজন তাকে যথেষ্ট ভালবাসে আর আদর করে। যদিও তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না। বিয়ে হল প্রায় ৭ মাস। এখনো মিরুর মনে পরে, কতই না যুদ্ধ করেছিল বিয়েটা ভাঙ্গার জন্য। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।
ওর জামাই শরীফ, খুব ভালো ছেলে। এলাকায় ব্যবসা করে পাশাপাশি রাজনীতির সাথেও জরিত। কিন্তু ছেলে খুবই অমায়িক। ঠিক নীরবের উলটো। শরীফ সব কিছু জেনেই মিরুকে বিয়ে করেছিল। ভেবেছিল বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। হল হিতের বিপরীত। বিয়ের তিন মাসের মাথায় একদিন জানতে পারলো বিয়ের পরেও নীরবের সাথে মিরুর যোগাযোগ আর মেলেমেশার কথা। প্রথমে বিশ্বাস করেনি। পরে একদিন নিজের চোখে দেখে ফেলল। সেদিন রাতে বাড়িতে কেয়ামত নেমে এসেছিল। মিরু সুধু একটা কথাই বলছে, বিয়ে করতে মানা করেছিলাম। ওই ঘটনার পর প্রায় ১০-১৫ দিন মিরু বাপের বাড়ি ছিল। পরে মুরুব্বীরা বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার মিরুকে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে আসলো। কিন্তু নীরব আর মিরুর মেলেমেশা কমলো না। তবে আগের থেকে সাবধান হল তারা।
রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে শরীফ ঘরে ঢুকেই মিরুর গালে চর।
শরীফের মা ধমক দিয়ে বললে, আরে কি করছিস? বউয়ের গায়ে হাত দেবার মত বীরপুরুষ জন্ম দিছি নাকি আমি!
শরীফ কাঁপতে কাঁপতে বলল, মা তুমি কাকে কি বলছ? এই অসভ্য মেয়েটা আজও ওই হারামজাদার সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে গেছিলো।
এবার মিরু খেকিয়ে উঠল, খবরদার আমাকে যা খুশি বল, নীরবকে কিছু বলবে না।
কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো মিরু।
রাত সাড়ে ন’টা। মফস্বল শহর মানে গভীর রাত। দরজা খোলেনি মিরু। রাতে খাবে না বলে দিয়েছে। শরীফ রাগ নিয়ে খেয়ে-দেয়ে বারান্দায় বিছানা পেতে শুয়ে পরেছে। ধীরে ধীরে ঘরের সবাই শুয়ে পরেছে। মিরু তখনো ঘুমায়নি। রাগে তার গা এখনো জ্বলছে। নীরবকে ফোন দিচ্ছে সেও ধরছে না। পৌনে এগারটার দিকে পিছনের দরজায় টোকার শব্দ পেলো মিরু। সংকেত তার পরিচিত। খুলে ফেলল জানালা। কাঠের জানালার কপাট আগে থেকে আলগা করা। সেটা শুদ্ধ খুলে নীরব ঢুলো ঢুলো নেশাতুর চোখ নিয়ে ভিতরে ঢুকে পরল। আর মিরু ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। কান্নার কারন জিজ্ঞেস করতে বিকেলের সব খুলে বলল মিরু।
সব শুনে নীরব খেপে গিয়ে বলল, ওই শুয়োরের বাচ্চাটাকে আমি এখনি খুন করবো।
মিরু ওকে বাধা দিয়ে বলল, না এখন না, মাথা ঠাণ্ডা করে বুদ্ধি কর।
মিরু যেন আজ সাই দিলো। যেটা সে গত ৭ মাসে দেয়নি।
নীরব উঠে দাড়িয়ে মিরুর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, তোমাকে জানাবো। আজ যাই।
এরপরে বেশ কিছুদিন কেটে যাবার পরে এক রাতে মিরু নীরবের কাছ থেকে একটা ম্যাসেজ পেলো।
পরের দিন সকালে উঠেই মিরু শরীফের জন্য নাস্তা বানিয়ে আনল। শরীফ একটু অবাক হলেও খেয়ে নিলো।
এরপর মিরু আদুরে শুরে বলল, আমি তোমাকে অনেক জ্বালিয়েছি। আর জ্বালাবো না কথা দিলাম। আজ থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি যেভাবে বলবে সেভাবেই হবে সব।
শরীফের চক্ষু চড়ক গাছ।
সে একটু হেয়ালি করে জিজ্ঞেশ করল, কি এমন হল শুনি?
মিরু হেঁসে বলল, তেমন কিছু না। বলবো, তার আগে উঠে রেডি হও আজ আমি তোমাকে শপিংএ নিয়ে যাবো।
দুজনেই রেডি হয়ে বের হল। শরীফ বাইক নিতে চাইলো, কিন্তু মিরু মানা করলো। সে হেটেই যাবে। দুজনে হাত ধরেই হাটতে লাগলো। শহরে নিউমার্কেটে যেতে একটা শর্টকাট আছে। একটা গলি, লোক সমাগম কম। শরীফ আর মিরু ওই রাস্তায় ঢুকে পরল। গলির ভেতরে অল্পসল্প কিছু লোক আসা যাওয়া করছে। তার মাঝে দু এক জনকে দেখে শরীফের একটু খটকা লাগলেও আমলে নেয়নি কারন দিনের বেলা আর রাস্তাটাও অল্প। গলির মাঝামাঝি আসতেই পিছন থেকে শক্ত ধারালো কিছু একটা ওর ঘাড়ে পরতেই তীব্র ব্যথায় ককিয়ে উঠে ওহ সামনে দিকে পরল। আর তখন সামনে থেকে কেউ উড়ে এসে ওর বুকে লাথি মারল। ছিটকে গিয়ে পরল রাস্তার সাথে লাগোয়া দেয়ালের উপর। তাকিয়ে দেখে ওর সামনে ওর রক্তে রাঙ্গানো একটা চাপাতি নিয়ে দাড়িয়ে আছে নীরব। আসিক লাথি মেরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। তার হাতেও ধারালো অস্ত্র। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যারা দাঁড়ানো তাদের বেশির ভাগই ওদের বন্ধু বান্ধব। মিরু ঠোঁটের কোনে একটু হাঁসি। শরীফের বুঝতে আর কিছুই বাকী রইলো না। এলোপাথাড়ি কোপ শুরু করে হয়ে গেলো। সাথে মিরু চিৎকার শুরু করলো। আমার স্বামীকে বাচাও, কেউ বাচাও। ওরা আমার স্বামীকে মেরে ফেলছে। শরীফ প্রথম দিকে আত্মরক্ষা করতে গেলেও মিরু এই অভিনয় দেখে সে নিজেকে সপে দিলো ওদের ধারালো অস্ত্রের কাছে।
***সমাপ্ত***