বলার মতো কথা ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে নয়; বরং কথাগুলো তখনও আগের মতোই জীবন্ত ছিল। লেখা হয়নি, কারণ সময় হয়নি। সময় বড় এক অদ্ভুত শিক্ষক। সে কাউকে কিছু না জানিয়েই অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। যাকে উদ্দেশ করে এত কথা জমিয়ে রাখা, তার কাছে পৌঁছানোর পথটুকুই একসময় হারিয়ে গিয়েছিল। সব অপেক্ষার শেষ দেখা দিয়ে হয় না, সব অভিমানের শেষ ক্ষমা দিয়ে হয় না, আর সব ভালোবাসার পরিণতি এক ছাদের নিচে ঠাঁই হয় না। কোনো কোনো সম্পর্ক ভাঙে না, তবু একসময় আর আগের মতো থাকে না। মানুষ যখন বুঝতে পারে, তার সমস্ত কথা শোনার মানুষটি আর আগের জায়গায় নেই, তখন সে কাগজের কাছেও নীরব হয়ে যায়। কোনো কোনো রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয়, দূরে কোথাও কেউ হয়তো একই আকাশের নিচে জেগে আছে। হয়তো তারও কিছু কথা বলার ছিল, হয়তোবা কোনো পুরোনো স্মৃতি বুকের ভেতর নীরবে গাঁথা ছিল। অথচ দুজনের মাঝখানে কত দূরত্ব, কত না-বলা কথা, কত অসমাপ্ত আত্ম- অভিমান আর নীরবতা।
এভাবেই একদিন দূরত্ব অভ্যাস হয়ে যায়। যে শূন্যতা একসময় অসহনীয় মনে হতো, তার সঙ্গেও মানুষ বসবাস করতে শিখে যায়। বুকের ভেতর কিছু ব্যথা স্থায়ী ঠিকানার মতো গেঁথে যায়, অথচ বাইরে থেকে তার কোনো চিহ্নের লেশ মাত্র বুঝা যায় না। মানুষ আবার হাসে, নতুন দিনের সূচনা করে, অন্যদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকে। যদি কখনো কোনো পুরোনো গান, পরিচিত কোনো গন্ধ, কিংবা হঠাৎ ডাকবাক্সে পড়ে থাকা চিঠির স্মৃতিচারণে মনটা অকারণে বিষণ্ন হয়ে ওঠে। তখন মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে বড় বিচ্ছেদ হয়তো দূরে চলে যাওয়া নয়; বরং পাশাপাশি থেকেও একে অপরের মনের ভাষা বুঝতে না পারা। সবচেয়ে বড় হারানো হয়তো কাউকে চিরতরে হারানো নয়; বরং এমন একটি সময়কে হারিয়ে ফেলা, যখন চাইলেই সব কথা বলা যেত। যে কথাগুলো একদিন বলা খুব প্রয়োজন ছিল, সেগুলো বলার জন্য সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে করতে একসময় অবহেলায় না বলা। হয়তো কোনো এক নিঃশব্দ বিকেলে আবার সেই পুরোনো কাগজটা বের করা। কাগজের ভাঁজে সময়ের ছাপ, কলমের কালি শুকিয়ে যাওয়া অথচ বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো ঠিক আগের মতোই থেকে যাবে। তখন হয়তো আর চিঠিটা লেখার প্রয়োজন অনুভব হবে না। কারণ তত দিনে বোঝা হয়ে যাবে, সব কথা কাউকে শোনানোর জন্য জমে থাকে না। কিছু কথা নিজের ভেতরেই বেঁচে থাকে, কিছু অনুভূতি কোনো উত্তর ছাড়াই পূর্ণতা পায়, আর কিছু ভালোবাসা ফিরে পাওয়ার আশায় নয়—শুধু একদিন সত্যি ছিল বলেই স্মৃতির কাছে ঋণী হয়ে থাকে।
তবু মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে, যদি আর একবার সুযোগ পাওয়া যেত! যদি সমস্ত অভিমান মুছে গিয়ে আবার সেই পুরোনো সময়টুকু ফিরে আসত! যদি একবার বলা যেত, কতটা কষ্ট পেয়েও কতটা ভালো চাওয়া যায়, কতটা দূরে গিয়েও কাউকে মনে রাখা যায়! কিন্তু জীবন তো আর পেছনের দরজা খুলে বসে থাকে না। তার চলার পথে কিছু মানুষ থেমে যায়, কিছু স্মৃতি থেকে যায়, কিছু অধ্যায় অসমাপ্ত থেকে যায়। আমরা শুধু সেই অসমাপ্তির ভার নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যাই। কখনো পেছন ফিরে তাকাই, কখনো তাকাতে ভয় পাই। আর বুকের গভীরে কোথাও পড়ে থাকে একটি চিঠি—যার প্রতিটি শব্দ লেখা হয়েছিল মনে মনে, অথচ কাগজে আর কোনো দিন লেখা হয়নি।
চারপাশের ব্যস্ততা মানুষকে ভুলিয়ে রাখে নিজের ভেতরের শূন্যতা। কাজের অবসরে জীবনের প্রয়োজনীয় ছোটাছুটি—সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, জীবন বুঝি আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। অথচ রাত একটু গভীর হলেই নেমে আসে যন্ত্রনাময় এক থিয়েটারের পর্দা। নীরব ঘরের দেয়ালে ঘড়ির কাঁটা শব্দ তোলে, জানালার বাইরে বাতাস এসে পর্দা নাড়িয়ে যায়, আর বুকের মধ্যে কোথা থেকে যেন জেগে ওঠে এক পুরোনো ডাক। সেই ডাকে কোনো শব্দ নেই, অথচ তার চেয়ে স্পষ্ট শব্দ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। ঠিক তখনই মনে পড়ে, কত কথা বলা হয়নি!
অথচ বলা আর হয়ে ওঠে না। কিছু অনুভূতি বুকের গভীরে শেকড় ছড়িয়ে এমনভাবে বসতি গড়ে, চাইলেও তাদের উপড়ে ফেলা যায় না। আর কিছু চিঠি থাকে, যা লেখার আগেই তার প্রতিটি শব্দ ভিজে ওঠে অদৃশ্য অশ্রুতে। একসময় কত সহজেই না মনের কথাগুলো বলা যেত! সামান্য অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, একটু অনাদরে চোখ ভিজিয়ে ফেলা, কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে একটি ছোট্ট বাক্যে সমস্ত রাগ ভুলে যাওয়া—এসবের মধ্যেই যেন জীবনের সমস্ত সুখ লুকিয়ে ছিল। তখন মনে হতো, পৃথিবী যতই বদলে যাক, কিছু সম্পর্ক বুঝি কখনো বদলায় না। কিছু মানুষ বুঝি দূরে গিয়েও দূরে যায় না। তাদের সঙ্গে কথা না হলেও অনুভূতিরা কথা বলে, দেখা না হলেও স্মৃতিরা এসে পাশে বসে।
কাগজের ওপর কলম স্থির হয়ে থাকে। অথচ মনের ভেতর তখন কত শত বাক্যের ভিড়! প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি স্মৃতি, প্রতিটি স্মৃতির সঙ্গে একটি দীর্ঘশ্বাস। মনে হয়, চিঠিটা লিখতে পারলেই বুঝি বুকের ওপর জমে থাকা ভারটুকু কিছুটা নামানো যাবে। আবার পরক্ষণেই ভয় হয়—যদি কোনো উত্তরই না আসে? তাই আজ আর নয়, অন্য কোনো দিন। যখন মনটা একটু স্থির হবে, যখন স্মৃতিগুলো এতটা কষ্ট দেবে না, যখন শব্দগুলো আর কাঁপবে না। আমরা কত সহজেই আগামীকালের হাতে তুলে দিই আজকের অনুভূতিগুলো। ভাবি, সময় তো আছেই। অথচ সময় কখনো কারও অসমাপ্ত কথার জন্য থেমে থাকে না।
কতবার মনে হয়েছে, অভিযোগগুলো আর জমিয়ে রেখে লাভ কী, দূরত্ব যতই বাড়ুক, কিছু অনুভূতি আজও মরে যায়নি। কতবার ভেবেছি, একটা শেষ চিঠি লিখবো; খুব সাধারণ কিছু কথা, কোনো অভিযোগ নয়, কোনো দাবি নয়, ফিরে আসার অনুরোধও নয়। জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে এসেও কিছু স্মৃতি আজও অমলিন, কিছু মুহূর্ত আজও বুকের মধ্যে যত্ন করে রাখা। কিন্তু কলম হাতে নিলেই শব্দগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আসে। তবুও সব অভিমান সরিয়ে শেষ চিঠিতে অন্তত একবার জিজ্ঞেস করা দরকার- কেমন আছো?
মোঃ আবু হানিফ
০৬ কার্তিক ১৪৩৩
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
Ayesha akter Shilpi
14 hours ago
পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত, হারিয়ে ফেলার পর ফের পাওয়া হবে না জেনেও অপেক্ষা করা যায় আর কাছে থাকলে উপেক্ষা!!!