Story

অপেক্ষা ও এক কাপ চা

October 23, 2026

MD Zidan

10 views

শাহবাগের মোড়ে তখন অফিস ছুটির তুমুল ব্যস্ততা। বাসের হর্ন, রিকশার টুংটাং আর মানুষের তাড়াহুড়োর মাঝে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের পাশে ছোট একটা চায়ের দোকানে বসে ছিল আকাশ। দিনটা ছিল ভীষণ ভ্যাপসা গরমের। আকাশ গত তিন বছর ধরে এই শহরে একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করছে। প্রতিদিনের এই চেনা জ্যাম আর ব্যস্ততা এখন তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

দোকানের মামা যখন ফুটন্ত কেতলি থেকে লিকার ঢালছিলেন, তখন আকাশের ঠিক পাশের প্লাস্টিকের টুলটায় এসে বসলেন এক বৃদ্ধ। পরনে সাধারণ ফতুয়া, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, আর হাতে একটা পুরোনো খবরের কাগজ। বৃদ্ধ বসেই গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আকাশ সাধারণত অপরিচিত মানুষের সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলে না, কিন্তু বৃদ্ধের ক্লান্তিটা এত স্পষ্ট ছিল যে সে নিজেকে আটকে রাখতে পারল না।

আকাশ জিজ্ঞেস করল, "নিন মামা, আগে ওনাকে এক কাপ চা দিন। চাচা, খুব ক্লান্ত লাগছে?"

বৃদ্ধ চশমাটা খুলে ফতুয়ার কোণ দিয়ে মুছতে মুছতে হাসলেন। "ধন্যবাদ বাবা। ক্লান্ত ঠিক শরীর নয়, মনটা। এই বয়সে এসে প্রতিদিন মিরপুর থেকে এখানে আসাটা একটু কঠিনই বটে।"

"মিরপুর থেকে প্রতিদিন এখানে আসেন? কোনো কাজ আছে?" আকাশ কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইল।

বৃদ্ধ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকালেন। "কাজ বলতে পারো, আবার নাও পারো। আজ থেকে ঠিক পঁয়ত্রিশ বছর আগে, আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন এই শাহবাগ মোড়েই একটা মেয়ে প্রথম আমার হাতে এক কাপ চা তুলে দিয়েছিল। আমাদের পরিচয়, বন্ধুত্ব আর জীবনের সুন্দর দিনগুলো এই চত্বরটা ঘিরেই কেটেছিল। সে এখন আর এই দুনিয়ায় নেই, গত পাঁচ বছর হলো আমাকে একা রেখে চলে গেছে।"

বৃদ্ধ একটু থামলেন, তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, "মেয়েরা যখন বিয়ের পর বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, তখন নাকি বাবারা একাকীত্বে ভোগে। আমার কোনো সন্তান নেই বাবা। ও চলে যাওয়ার পর এই পুরো শহরটা আমার কাছে একদম শূন্য হয়ে গেছে। কিন্তু যখনই আমি এই শাহবাগের মোড়ে এসে বসি, এই কোলাহল, এই চায়ের গন্ধ—সবকিছুর মাঝে আমি ওর উপস্থিতি টের পাই। মনে হয়, ও এখনই পিছু ডেকে বলবে, 'চলো, অনেক দেরি হলো, এবার বাড়ি ফিরি'।"

আকাশ চুপ করে রইল। তার চোখের সামনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, প্রত্যেকেই নিজের মতো ব্যস্ত। কিন্তু এই ভিড়ের মাঝেও যে একেকটা মানুষ কতটা গভীর একাকীত্ব আর ভালোবাসা বুকে নিয়ে ঘোরে, তা সে কোনোদিন ভেবে দেখেনি। বৃদ্ধের এই রোজকার জার্নি কোনো কাল্পনিক সিনেমা নয়, এটি এই শহরের বুকে লুকিয়ে থাকা এক চরম বাস্তব সত্য।

বৃদ্ধ চা শেষ করে টুলের ওপর দশ টাকার একটা নোট রাখলেন। তারপর আকাশের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "ভালো থেকো বাবা। ব্যস্ততার মাঝেও চেনা মানুষগুলোকে সময় দিও। দিনশেষে এই স্মৃতিটুকুই মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়।"

বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেলেন। আকাশ তার নিজের চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে রইল। চা ততক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু বৃদ্ধের কথাগুলো তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উষ্ণতা রেখে গেল। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে অনেকদিন ফোন না করা তার গ্রামের বাড়ির মায়ের নাম্বারে ডায়াল করল।

Picked up where you left off

Comments

তারিক হোসেন was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • তারিক হোসেন 2 hours ago First reader

    অসাধারণ একটি গল্প। অনেক সুন্দর বিষয়বস্তু। অনেক সুন্দর উপস্থাপনা করেছেন। অনেক অনেক শুভকামনা।

    • MD Zidan 2 hours ago

      ধন্যবাদ মন্তব্য করার জন্য