Story

সাইকেল। মিনহাজ রাফি

October 23, 2026

54 views

পুরোনো মডেলের একটা ব্রাদার্স সাইকেল। হ্যান্ডেলের ক্রোমিয়াম উঠে কালচে হয়ে গেছে। ক্যারিয়ারে একটা টিনের জং ধরা বাক্স। যে সাইকেল চালাচ্ছে, তার গায়ে ময়লা একটা হাফহাতা শার্ট। পিঠটা সামান্য কুঁজো। সে কোনো তাড়া ছাড়াই প্যাডেল ঘোরাচ্ছে। কিন্তু আজব ব্যাপার হলো, সাইকেলের চাকা ঘুরছে পেছনের দিকে। সাইকেলটা হুড়হুড় করে পেছনের দিকে পিছলে পিছলে চলে যাচ্ছে।

আমি চোখ কচলে নিলাম। না, ভুল দেখছি না। সামনের দিকে প্যাডেল করলে সাইকেল উল্টো পথে পেছনের দিকে ছুটছে।

আশেপাশে অনেক মানুষ। কেউ দেখল কি না জানি না। আমি শুধু দেখলাম।

আমি শুধু দেখলাম, সাইকেলটা আমাদের পারিবারিক কবরস্থানের ইটের সীমানার দেয়াল পেরিয়ে, ঠিক আমগাছের ছায়াঘেরা তলায় এসে থেমে গেল। চাকা থেমে যাওয়ার শব্দ হলো—্ট্রিং।

মানুষটা সাইকেল থেকে নামল না। সিটেই বসে রইল। তার মুখটা পাতার ফাঁক দিয়ে পড়া রোদের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। কেবল মাথার উসকোখুসকো চুলের জটগুলো বাতাসে দুলছে।

সে আমার দিকে তাকাল। খুব হালকা একটা স্বর ভেসে এল, ‘যাবেন?’

কোথায় যাব? এমন তো কোনো প্রশ্ন হতে পারে না। তবু মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘ব্রেক কই?’

সে হাসল। হাসির শব্দটা পাতার মর্মরের মতো শোনাল। বলল, ‘ব্রেক লাগবে না, আসুন।’

আমি দৌড়ে গেলাম সাইকেলের কাছে। কেউ বারণ করল না। ‘যাবেন’—মনে হলো এই ডাকটা বহু পুরোনো, অনেক দিন আগের কোনো এক দুপুরবেলার ফেলে আসা তাগিদ।

সাইকেলের সিটটা ছোঁয়া মাত্রই টের পেলাম, লোহাটা বরফের মতো ঠান্ডা। অথচ বাইরে চৈত্র মাসের কড়া রোদ।

আমি প্যাডেলে পা রাখলাম। প্যাডেলের সামনের দিকে চাপ দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে চাকাগুলো উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। সাইকেলওয়ালা আমার পিছে বসা। সাইকেলটা কবরস্থানের গলি ছেড়ে পেছনের দিকে ছুটল। পেছনের দিকে—মানে ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে।

আমাদের গলিটা ছোট হতে শুরু করল। রাস্তার ধারের কদম গাছগুলো ছোট হতে লাগল। টিনের চালগুলো নিচে নেমে এল। মুদি দোকানদার কাদের ভাইয়ের দোকানের সামনে যে লাল সাইনবোর্ডটা ঝুলছিল, সেটা ঝাপসা হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সাইকেলের টায়ার পিচঢালা রাস্তা ছেড়ে ইটের খোয়া বিছানো রাস্তায় নামল। রাস্তার ধারের কদম গাছগুলো আরও ছোট হতে লাগল। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ থেকে কচি পাতার ফ্যাকাশে হলদেটে রঙে বদলে গেল।

আমি পেছন ফিরে তাকাতে পারছিলাম না। আমার পিঠ যেদিকে, সেদিকে আমার ভবিষ্যৎ—মানে অতীত।

বাতাস দ্রুত বইতে শুরু করল। সাইকেলের হ্যান্ডেলটা কেমন যেন কাঁপুনি দিচ্ছে। বাতাসে কিসের যেন একটা গন্ধ ভেসে এল। পাকা জাম্বুরা আর ভেজা মাটির গন্ধ। এই গন্ধটা আমি কোথায় পেয়েছিলাম? উনত্রিশ বছর আগে। আমাদের সেই পুরোনো ভাঙা ঘরের পেছনে একটা বড় জাম্বুরা গাছ ছিল। সে গাছের নিচে আমার বন্ধুদের দেখলাম। বন্ধুরা মিলে খই ভাজছে। গোল্লাছুট খেলছে। বিকেলের মাঠে ফুটবল খেলে ঘামে ভিজে বাড়ি ফিরছে।

সাইকেলটা আমাকে নিয়ে আরও গভীরে ঢুকে গেল। যেখানে নদীর ওপর পুরোনো লোহার ব্রিজটা এখনো ভেঙে যায়নি, যেটার ওপর দিয়ে আমরা রিকশায় চড়ে স্কুলে যেতাম। স্কুল ফাকি দিতাম। ব্রিজের রেলিংয়ে মরচে ছিল না তখন। লাল রঙের চকচকে প্রিমরোজ পেইন্ট।

এরপর সাইকেলটা একটা জায়গাতে এসে নিজে থেকেই ধীর হয়ে গেল।

কোনো ব্রেক ছাড়াই সেটি আমাদের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল! আমগাছটা ছোট। কাঠালগাছটা ছোট। পুকুর পাড়ের ঘাট ভাঙ্গা। টিনের চালের ওপর একটা বিড়াল রোদ পোহাচ্ছে। আর দাওয়ায় বসে মা চাল বাছছেন।

আমি সাইকেল থেকে নেমে পড়লাম। আমার জুতো নেই পায়ে। খালি পায়ে মাটির ঠান্ডা ছোঁয়া লাগল।

মায়ের পরনে সেই পুরোনো নীলপাড় সুতির শাড়িটা। মা মুচকি মুচকি হাসছে চোখে ভেতর হাসনাহেনা ফুটিয়ে।

আমি ঘরের ভেতরে উঁকি দিলাম। টেবিলের ওপর একটা লাল কালির দোয়াত পড়ে আছে। আমার ছোটবেলার সেলাই করা খাতাটা খোলা। পাতার কোণায় আঁকা একটা উল্টোপাল্টা নৌকা। আমি জোরে জোরে পড়ছি। আলিম-লা-ম মী-ম। যা-লিকাল কি-তা-বু লা রাই-বা ফী-হি; হু-দাল লিল মুত্তা-ক্বীন। আল্লাযীনা ইউমিনূনা বিল গাইবি ওয়া ইউক্বীমূনাছ ছালা-তা ওয়া মিম্মা- রাযাক্বনা-হুম ইউংফিক্বূন। ওয়াল্লাযীনা ইউমিনুনা বিমা উনযিলা ইলাইকা ওয়ামা উনযিলা মিন কাবলিকা ওয়াবিল আখিরাতি হুম ইউকিনুন। উলাইকা 'আলা হুদাম মির রাব্বিহিম ওয়া উলাইকা হুমুল মুফলিহুন।

‘এসব কী?’ নিজের গলার স্বর নিজের কাছেই অচেনা ঠেকল।

উঠোনের পেয়ারা গাছের ডালটা বাতাসে একটু নড়ে উঠল। একটা ডাহুক পাখি কোথা থেকে যেন ডেকে উঠল—কাহ্... কাহ্...

সাইকেলওয়ালা তখন উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে। সে সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে অন্যমনস্কভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশে তখন কোনো মেঘ নেই, শুধু একটা চিল অনেক উড়ছিল গোল হয়ে ঘুরছে।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কত দূর?’

সে আমার দিকে তাকাল না। খুব নিচু গলায় বলল, ‘বহুদূর...’

‘কত দূর?’

সে কিছু বলল না। ।

আমি সাইকেলে চড়ে বসলাম। প্যাডেলে পা রাখলাম। প্যাডেলের সামনের দিকে চাপ দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে চাকাগুলো উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। সাইকেল চলতে শুরু করলো। সাইকেলওয়ালা পিছে বসা।

আমার বয়স কমতে শুরু করেছে। আমি টের পাচ্ছি আমার হাতের পেশিগুলো নরম হয়ে আসছে। হাড়ের ভেতরকার ভারী ভাবটা উবে গিয়ে কৈশোরের হালকা একটা চঞ্চলতা ভর করছে শরীরে। এটা কি ভালো লাগার বিষয়, নাকি ভয়ের? বুঝতে পারছিলাম না।

সাইকেল চলছে। পিছনের দিকে। স্মৃতির দিকে।

দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে আবার পরিষ্কার হলো। সময়টা আরও পিছিয়ে গেল। আমার জন্ম তখনো হয়নি। পৃথিবীর আলো দেখার বহু আগের এক অসহ্য দুপুর।

বাবা তখন শহরে গেছেন বিভিন্ন কাজে। দৌড়াচ্ছে। সিংহ দৌড়। বাবার গায়ে সুতির চাদর। যা দিয়ে তিনি চার শীত-গ্রীষ্ম সবসময় গা ঢেকে রাখতেন। আদালতের বারান্দায় কিংবা কোর্টের মুহুরিদের ভিড়ে বাবার জুতার তলা ক্ষয়ে যাচ্ছে। মাকে রেখে গেছেন ঘরের ভেতর একা। ঘরের বাতাসে কেমন যেন একটা ভয়ের গন্ধ। মা তখন বিছানায় শুয়ে আছেন, পেটে তখনো অস্ফুট এক অস্তিত্বের ভ্রূণ। গর্ভধারণের সেই ভারী ও ক্লান্ত দিনগুলোতে মা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না। মুখের ওপর ঝুলছে দীর্ঘশ্বাসের চাঁদ।

বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। ঝড় উঠছে। ঝড় থামছে। উঠোনের সুপারি গাছগুলো এদিক-ওদিক দুলছে।

ঘরে আর কেউ নেই। শুধু আমার বড়বোন শিউলি। বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বুকফাটা আর্তনাদে সে কেবল দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরে আছে। মাকে একা বিছানায় ছটফট করতে দেখে সে বুঝতে পারছে না কী করবে। তার সেই অবুঝ আর্তনাদ বাতাসে তলোয়ারের মতো বিঁধছে। ছোট একটা মেয়ের বুকচাপা কান্না সারা ঘরটাকে ভারী করে তুলেছে।

আমি সাইকেল থেকে নামলাম না। সাইকেলের ওপর বসেই দেখলাম সেই দৃশ্য। মায়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঘরের কোণে একটা হারিকেন টিম টিম করে জ্বলছে। বাইরের অন্ধকার তখন জানালার শিক গলে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

চাকাগুলো যেন আরও জোরে উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। পিছনের দিকে। আরো পিছনে। আরো পিছনে। সাইকেলে চড়ে যেতে যেতে দেখলাম আমাদের বাড়ির পাশের মসজিদ। ধবধবে সাদা। মানুষের ভিড়। চাদর বিছানো খাটিয়ায় শুয়ে আছেন দাদি। মানুষের মুখে কোনো কথা নেই, কেবল থমথমে বাতাস আর ফিসফিসানি। দাদির মুখটা সাদা কাপড়ে ঢাকা। কপালের একটুখানি অংশ দেখা যাচ্ছে। কী শান্ত দেখাচ্ছিল তাঁকে! তাঁর নিথর শরীরটা ওই বাঁশের খাটিয়ায় শুয়ে আছে।

সাইকেলের চাকাগুলো তখনো উল্টো ঘুরছে। ঘুরছে। ঘুরছে। ঘুরছে...

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের পেছনের ঝোপঝাড় থেকে একটা ডাহুক পাখি ডেকে উঠল—কাহ্... কাহ্...

সাইকেলটি অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি আমার পারিবারিক কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার সামনে বাবা, আম্মা, দাদি আর বড় বোন শিউলি ঘুমিয়ে আছে। বড্ড আনমনে। বড্ড স্বার্থপরতায়..

আমি নিশ্চুপ কিংবা অনেক কথা এসে আটকে আছে ঠোঁটে।

পেছনের ঝোপঝাড় থেকে একটা ডাহুক পাখি ডাকছে—কাহ্... কাহ্... কাহ্...

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login