সাতসকালবেলা। কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তা। গায়ে হালকা ছাইরঙা জগিং স্যুট, পায়ে রানিং জুতো আর কানে গোঁজা ইয়ারফোনে গান বাজছে। রবীন্দ্রনাথের গান।
তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমানিশীথিনী-সম॥
এমন এক রোমান্টিক মুহূর্তে আমার জীবনটা যে থ্রিলার মুভি হয়ে যাবে, তা কে জানত!
দৌড়াতে দৌড়াতে লেকের পাড়ে পৌঁছাতেই হঠাৎ একটা চকচকে লাল রঙের প্রাইভেটকার এসে আমার সামনে বিকট শব্দে ব্রেক কসল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ি থেকে বের হয়ে এল বিশাল আকৃতির দুজন গাবাগুব গোছের লোক। এক চড়েই আমার ইয়ারফোন খতম! কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দুজনে মিলে আমাকে পাউরুটির মতো মুড়ে গাড়ির পেছনের সিটে ছুড়ে ফেলল। মনে হচ্ছে আমি কিডন্যাপ হলাম।
গাড়ির ভেতর সিটে বসে হাঁপাচ্ছি, এমন সময় সামনের সিট থেকে একটা মিষ্টি পারফিউমের গন্ধ ভেসে এল। ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে ঘুরে বসল এক তরুণী। পরনে তার জমকালো থ্রি-পিস, চোখে মারাত্মক রাগ আর মুখে ভাঙা ভাঙা কান্নার সুর।
মেয়েটি আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "খুব তো পালিয়ে বেড়াচ্ছিলে? ব্লক করে দিয়েছ ভাবছ আর খুঁজে পাবো না? বলো, আজ কোথায় পালাবে?"
আমি তখনো ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে বললাম, "শুনুন... আপনি কে বোন? আমি তো জাস্ট জগিং করতে বের হইছিলাম! আপনারা আমাকে এভাবে ধরে আনলেন কেন?"
আমার মুখে "বোন" ডাকটা শোনার সাথে সাথেই মেয়েটার চোখের কোণ দিয়ে সত্যি সত্যি জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তার তেজ একটুও কমল না। সে রাগে থরথর করে কেঁপে উঠে বলে উঠল, "বোন?! আমাকে আজ ‘বোন’ বলছ নির্লজ্জের মতো। গত ৯ মাস ধরে ফেসবুক মেসেঞ্জারে আমার জীবনটা বরবাদ করে দিয়ে এখন অচেনা সাজছ? তোমার কি একটুও মায়া হয় না?"
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। ৯ মাস ধরে মেসেঞ্জারে জীবন বরবাদ করেছি? আমি তো সারাদিন বেকার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে আর ঘরে মার বকা খেয়ে জীবন পার করছি, ফেসবুক চালালেও তো দিনে আধা ঘণ্টার বেশি থাকি না!
আমি আমতা আমতা করে বললাম, "বিশ্বাস করুন আপু, আমি আপনাকে চিনিই না! আমার সাথে আপনার কোনো দিন কথাই হয়নি।"
আমার কথা শুনে মেয়েটা যেন আরও তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। সে এক হাত সামনের সিটের ওপর রেখে ফুঁসতে ফুঁসতে বলতে লাগল, "চিনো না?! আচ্ছা, তোমার কিচ্ছু মনে নাই? গত বছরের ঠিক এই সময়ে রেইনট্রি হোটেলের পেজের একটা কমেন্টে আমাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল। তুমি আমাকে ইনবক্সে নক করে রবীন্দ্রসংগীতের লাইন পাঠিয়েছিলে। গত ৯ মাসে প্রতিদিন রাতে অন্তত দুই ঘণ্টা করে আমার সাথে ফোনে কথা বলেছ—তোমার সেই দরদি গলা আমি চিনব না? গত মাসে আমার জন্মদিনে মধ্যরাতে ঠিক বারোটার সময় একটা বিশাল লাল গোলাপের তোড়া আমার বাসার নিচে কে রেখে গেছিল, বলো? আর গত শুক্রবার আমরা যে টানা সাত ঘণ্টা অডিও কলে মেসেঞ্জারে বাসর করলাম— একে অপরের কসম কাটলাম কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না—সেসব কিচ্ছু মনে নেই তোমার?!"
আমি তো এই কথা শুনে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাওয়ার জোগাড়! ম্যাসেঞ্জারে বাসর! এ আবার কোন নতুন টেকনোলজি ভাই? ভার্চুয়াল বাসর আবার কবে থেকে আইনগত বৈধতা পেল? আমি তো ভয়ে ঘেমে একাকার হয়ে বললাম, "আল্লাহর কসম আপু, আমি ওসবের কি কি কিচ্ছু জানি না! আমি জীবনেও কাউকে রবীন্দ্রসংগীতের লাইন পাঠাইনি, ফুল তো দূরের কথা! আপনি ভুল করছেন, আমি সেই মানুষ না!"
মেয়েটা তখন ফোলা গলায় বলল, "আমি ভুল করছি? আমার চোখের পলক ভুল দেখছে? তোমার ছবি দেখেনি আমি? আমার কান কি তোমার ওই ভরাট গলার স্বর চিনতে ভুল করেছে?"
আমি মরিয়া হয়ে বললাম, "আপু, আমি সিঙ্গল মানুষ! আমার গার্লফ্রেন্ড তো দূরের কথা, কোনো ফিমেল বন্ধুও নাই যে ম্যাসেঞ্জারে আড্ডা দেবো!"
মেয়েটা আর সহ্য করতে পারল না। সে পার্সের পকেট থেকে তার মোবাইল ফোনটা বের করে রাগে স্ক্রিনটা আমার নাকের ডগার একদম সামনে এনে এক প্রকার আছড়ে ফেলার মতো ধরে বলল, "তাহলে এইটা কার আইডি? ভালো করে চেয়ে দেখো! এই আইডি থেকে ৯ মাস ধরে আমাকে প্রেমিকা বানিয়ে রেখেছ, আর এখন অস্বীকার করছ? এই নাও ভালো করে দেখে নাও!"
আমি ভয়ে ভয়ে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। আর তাকাতেই আমার চক্ষু চড়কগাছ!
প্রোফাইল পিকচারে দিব্যি আমারই একটা ছবি ঝুলে আছে যেটা আমি গত বছর প্রোফাইলে আপলোড করেছিলাম। কিন্তু নামটার জায়গায় লেখা—"অচিন পাখি ফাহিম"! ফেস আমার, ছবি আমার, কিন্তু আইডিটা আমার না! এটা একটা আস্ত ফেইক আইডি! কে বা কারা আমার ছবি চুরি করে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে, তা আমি কল্পনাও করতে পারছি না।
আমি তো থরথর করে কেঁপে উঠে বললাম, "এই... এইটা তো আমার আইডি না! আমার একটাই রিয়েল আইডি, সেখানে আমার আসল নাম। এই ফেইক আইডি কে চালায় আমি জানি না!"
কিন্তু কে শোনে কার কথা? মেয়েটার মাথায় তখন প্রেমের ভূত এমন জেঁকে বসেছে যে সে আমার এই সাফাইকে ডাহা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিল। সে ফোনটা পকেটে গুঁজে ড্রাইভারকে হুকুম দিল, "চল, আর এক সেকেন্ডও দেরি করা যাবে না। সোজা কাজীর অফিসে চলো। আজকে এর সাথে আমার রেজিস্ট্রি বিয়ে হবেই!"
এর পরের আধা ঘণ্টা আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও ভীতিজনক অভিজ্ঞতা। আমাকে একটা বিশাল বসার ঘরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আগে থেকেই এক কাজী সাহেব চশমা পরে বসা। মেয়েটা সাফ জানিয়ে দিল, "আজকেই বিয়ে!
কাজীর চোখ তো টাকার বাক্সে! মেয়েটি পার্সের পকেট থেকে এক বান্ডিল টাকা বের করে কাজীর টেবিলে ফেলতেই কাজী সাহেব রেকর্ড স্পিডে আরবি খুতবা পড়া শুরু করে দিলেন। আমার "কবুল" বলার আগেই মেয়েটা আমার হাত জোর করে ধরে কাজীর রেজিস্টারে সই করিয়ে নিল। আমার অবস্থা তখন এমন—যেন গরুর হাটে গিয়ে নিজে নিজেই গরু সেজে দাম চুকিয়ে আসছি!
সন্ধ্যাবেলা। আমাদের পাড়ার গলির মুখে একটা লাল রঙের প্রাইভেটকার এসে থামল। গাড়ি থেকে প্রথমে নাম লসদ্য বিবাহিত সেই মেয়েটি—তার পরনে আস্ত একটা লাল বেনারসি শাড়ি, নাকে নাকফুল, গলায় সোনার হার। ঠিক তার পেছনেই নেমে এলাম আমি—গায়ে সেই সকালের ঘামে ভেজা ছাইরঙা জগিং স্যুট, পায়ে দৌড়ানোর জুতো!