শুরুতেই বলে নিই। ঘটনাটি আমার জীবনের শতভাগ বাস্তব ঘটনা। একটি বাক্যও বানানো নয়।
আমি আর আমার বন্ধু জাকির প্রতিদিন আসরের নামাজের পর হাঁটতে যেতাম। স্থানীয় জামাইয়ের
দোকানে চা খেয়ে মাগরিবের আগে আগে ফিরতাম। কখনো বা মাগরিব পেরিয়ে যেত। আমরা যেতাম
কুন্দিহার, মাছরং, জম্বদ্বীপসহ কাছের গ্রামগুলোতে। মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতেই ভালো লাগত।
বিকেলের মিষ্টি রোদ এসে চোখেমুখে পড়ত। দুপাশের মাঠ পেরিয়ে দূরের গ্রামগুলোর দিকে তাকালে
মনটা কেমন উদাস হয়ে যেত। কখনো কখনো নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো, পৃথিবীটা যেন
হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
একদিনের ঘটনা।
জাকিরকে সেদিন সঙ্গে নিলাম না। সে বলল, কাজ আছে। সে বাড়িতেই থেকে গেল। আমার সঙ্গে তখন
সাদ্দাম কিংবা ইমন ছিল। আমরা সেদিন অনেক দূর গেলাম। বাসে গিয়ে কাজলা হাটে নামলাম। হাট ঘুরে
এটা-সেটা খেয়ে ব্রিজের পাশ দিয়ে গ্রামের দিকে হেঁটে অনেক দূর যাই।
ফেরার পথে বিকেল গড়িয়ে আসছিল। সূর্যের আলো তখন অনেকটা ম্লান। রাস্তার দুপাশের গাছপালার
ছায়া ক্রমেই লম্বা হয়ে আসছিল। আমরা ব্রিজের নিচের রাস্তা ধরে ফিরছিলাম।
হঠাৎ জাকিরের সঙ্গে দেখা।
তার সঙ্গে অন্য একজনও ছিল।
জাকিরকে দেখে আমি অবাক হলেও তখন বিষয়টা নিয়ে ভাবিনি। কাছে গিয়ে হ্যান্ডশেক করলাম,
কোলাকুলি করলাম। তারপর স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঘুরতে যাচ্ছো?’
সে বলল, ‘হ্যাঁ।’
কিন্তু কোলাকুলি করার মুহূর্তে একটা অদ্ভুত ব্যাপার অনুভব করলাম। জাকিরের হাতটা অস্বাভাবিক
ঠান্ডা। যেন অনেকক্ষণ বরফের মধ্যে হাত ডুবিয়ে রেখেছিল। শুধু তা-ই নয়, তার শরীর থেকে আসছিল
একধরনের তীব্র সুগন্ধ। এমন সুগন্ধ, যা পরিচিত কোনো আতর বা সুগন্ধির সঙ্গে মেলাতে পারছিলাম
না।
আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কেন জানি না, মনের ভেতর একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু তখন আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
ভাবলাম, হয়তো কোথাও থেকে ঘুরে আসছে।
অথচ একটা কথা আমার মাথায় আসেনি—জাকির তো বাড়িতে থাকার কথা! সে এখানে এল কীভাবে?
আমরা নিজেদের পথে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর পেছনে ফিরে তাকানোর কথা মনে হয়েছিল কি
না, আজ আর মনে নেই। তবে সেদিনের সেই ঠান্ডা হাত আর অদ্ভুত সুগন্ধের কথা আমি কোনো দিন
ভুলতে পারিনি।
বাড়িতে ফিরে মাগরিবের নামাজ পড়লাম। নামাজের পর জাকিরের সঙ্গে দেখা।
তাকে দেখে হঠাৎ বিকেলের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল।
আমি বললাম, ‘জাকির, তুমি না আজকে বেরোবে না বলছিলে? তাহলে গেলে কেন?’
আমার কথা শুনে জাকির যেন আকাশ থেকে পড়ল।
‘কী বলছ, এসব! আমি তো সারা বিকেল জমিতে গরুর কাছে ছিলাম। কিছু ধান কাটা ছিল। তা বাসায় নিয়ে
আসি।’
আমি কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর বললাম, ‘তুমি কাজলা যাওনি?’
জাকির অবাক হয়ে বলল, ‘আরে, কাজলার ওদিকে গত এক মাসেও আমি যাইনি।’
কথাটা শুনে আমি স্থির হয়ে গেলাম।
মুহূর্তের মধ্যে বিকেলের সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। একই মুখ, একই চেহারা, একই
কণ্ঠস্বর। সেই মানুষটার সঙ্গেই তো আমার হ্যান্ডশেক হয়েছে, কোলাকুলি হয়েছে। সে আমার
প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।
কিন্তু জাকির যদি সারা বিকেল জমিতেই থাকে, তাহলে কাজলা ব্রিজের নিচে আমার সঙ্গে দেখা
হয়েছিল কার?
আমার গায়ের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে এল।
আমি কথা বলতে পারছিলাম না।
আমার সঙ্গে থাকা ইমনও তখন আমার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে।
জাকির এবার আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার? তোমরা এমন করছ কেন?’
আমি কোনো রকমে বললাম, ‘বিকেলে কাজলা ব্রিজের নিচের রাস্তায় তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
হ্যান্ডশেক করেছি, কোলাকুলি করেছি। তুমি বললে, ঘুরতে যাচ্ছো।’
কথাগুলো শুনে জাকির নিজেও বিস্মিত হয়ে গেল। সে তো ওই সময় জমিতে ছিল। তার কথায় কোনো
দ্বিধা ছিল না।
তাহলে?
আমার সামনে তখন একটাই প্রশ্ন—দুটো জাকির কীভাবে এল?
এমন নয় যে আমি একা তাকে দেখেছি। আমার সঙ্গে আরেকজন ছিল। ইমনও তো সেই মানুষটিকে
দেখেছে! আমিই শুধু ভুল দেখলে একটা কথা ছিল। কিন্তু দুজন মানুষ একই সময়ে একই মানুষকে ভুল
দেখল কীভাবে?
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আমি তো শুধু দূর থেকে তাকে দেখিনি। তার সঙ্গে কথা বলেছি। হাত
মিলিয়েছি। কোলাকুলি করেছি। তার হাতের অস্বাভাবিক ঠান্ডা অনুভব করেছি। শরীর থেকে আসা সেই
অদ্ভুত সুগন্ধও পেয়েছি।
এসব কি কেবল চোখের ভুল হতে পারে?
আজও যখন ঘটনাটা মনে পড়ে, আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়।
কাজলা ব্রিজের নিচে সেদিন আমার সঙ্গে যে মানুষটার দেখা হয়েছিল, সে যদি জাকির না হয়, তাহলে
সে কে ছিল?
তার মুখটা তো জাকিরেরই ছিল। কণ্ঠস্বরটাও ছিল জাকিরের মতো। এমনকি তার সঙ্গে কথা বলার
সময় একবারও আমার মনে হয়নি, সে অন্য কেউ।
তবে কি পৃথিবীতে এমন কিছু আছে, যা আমরা প্রতিদিনের চোখে দেখি না, অথচ কোনো কোনো মুহূর্তে
তা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়?
আমি জানি না।