Story

দুষ্ট মিষ্টি প্রেম

October 25, 2026

11 views

ইউলিয়াম সোমারসেট মম্ তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প ‘দ্য লাঞ্চন’-এ এক মহিলার রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে কী লিখেছিলেন, মাহিনের এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না। তবে সেই গল্পের হতভাগা লেখক মহিলার ফর্দ দেখে যে ঠান্ডা ঘাম ফেলেছিল, মাহিনের কপালে এখন ঠিক সেই ঠান্ডা ঘামের ধারা। মাহিন মনে মনে বিড়বিড় করল, “হে সাহিত্যিক মম্, তোমার যুগে অন্তত কাচ্চি বিরিয়ানি আর গ্রিলড প্রন ছিল না। তুমি এক প্যারিসের রেস্তোরাঁয় সামান্য ক্যাভিয়ার আর স্যামন মাছ খেয়ে পার পেয়েছিলে। আমার তো এখানে পুরো বঙ্গোপসাগর আর চর চাটগাঁর খাসির গোয়াল খালি হওয়ার উপক্রম!”

সামনে বসে আছে তনিমা। চোখে চশমা, পরনে হালকা গোলাপি কুর্তি, গলায় একটা লাল স্কার্ফ জড়ানো। মুখের অবয়বে এমন এক চরম নিষ্পাপ ভাব,যেন পৃথিবীর কোনো পাপের সাথে তার বিন্দুমাত্র লেনদেন নেই। বয়স বড়জোর বাইশ-তেইশ। ফেসবুকে যখন পরিচয় হয়েছিল, মাহিনের মনে হয়েছিল স্বয়ং বনলতা সেন হয়তো ডিজিটাল অবতারে নীলক্ষেত টু ধানমন্ডি রুটে ঘোরাফেরা করছেন।

ফেসবুক চ্যাটে তনিমা লিখেছিল,

“মাহিন ভাইয়া, আসলে বাইরের ধুলোবালি আমার একদম সহ্য হয় না। আর তেল-মশলা দেওয়া খাবার? ওহ গড! আমার তো পেটের খাঁচায় প্রজাপতি ডানা ঝাপটায়। আমি জাস্ট সার্ভাইভ করি পানি আর ফলমূল খেয়ে। একটু শসা আর একটা সেদ্ধ ডিম পেলেই আমার দিন চলে যায়।”

সেই প্রজাপতির ডানা ঝাপটানো নিরীহ তনিমা আজ প্রথম সাক্ষাতের ভেন্যু হিসেবে বেছে নিয়েছে গুলশানের এক অভিজাত রেস্তোরাঁ,‘দ্য রয়্যাল ফিস্ট’। মাহিন ভেবেছিল এক কাপ কফি আর বড়জোর দুটো মাফিনেই এই রোমান্টিক পরিচয়ের শুভ সূচনা ঘটবে। কিন্তু মেন্যু কার্ড হাতে নিয়েই তনিমার মুখের সেই বৈরাগ্যভাব এক লহমায় যেন হাওয়া হয়ে গেল।

“মাহিন ভাইয়া, আপনি কী খাবেন?” তনিমার চোখে হরিণীর মতো সরল চাহনি। মাহিন বুক পকেটের মানিব্যাগে আঙুল ছুঁইয়ে আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করল। সেখানে সদ্য মাসের শুরুতে তোলা বেতনের কয়েকটা চকচকে নোট রাখা আছে। সে একটু স্মার্ট হাসি দিয়ে বলল, “আমি আসলে বিকেলে ভারী কিছু খাই না তনিমা। একটা কোল্ড কফি হয়তো নেব। তুমি কী নেবে বলো?”

তনিমা মেন্যু কার্ডে আঙুল বোলাতে বোলাতে অত্যন্ত করুণ মুখে বলল, “আমারও তো খাওয়ার একদম ইচ্ছে নেই। খিদে তো পেতেই চায় না। শরীরটা কেমন যেন দুর্বল লাগছে আজ। এক কাজ করি, একদম হালকা কিছু দিয়ে শুরু করি, কেমন?”

মাহিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।”

তনিমা অমায়িক হেসে ওয়েটারকে ডাকল। ওয়েটার ছেলেটি স্যুট-বুট পরা, হাতে ইলেকট্রনিক প্যাড।

তনিমা বলল, “ভাইয়া, স্টার্টারে বেশি কিছু না,জাস্ট ওই ট্রাফল অয়েল ড্রপ করা মাশরুম ক্যাপুচিনো স্যুপটা দিন। আর সাথে ওই যে চিজ-স্টাফড জাম্বো প্রন উইথ গার্লিক বাটার... ওটা চার পিস না দিয়ে ছ’পিস দেবেন। আর সামান্য কালামারি ফ্রাই। ব্যস, এর বেশি আমি একদম খেতে পারব না ভাইয়া।”

মাহিন চেয়ারের ওপর একটু নড়েচড়ে বসল। মাশরুম স্যুপের পাশে দাম লেখা,সাতশত পঞ্চাশ টাকা। জাম্বো প্রন,আঠারো শত টাকা। কালামারি,নয়শত টাকা।

মাহিনের কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠল, “তনিমা... তুমি তো বলেছিলে শুধু কফি খাবে?”

তনিমা চোখ বড় বড় করে বলল, “হ্যাঁ ভাইয়া! এটা তো খাবার না, এটা জাস্ট গলাটা একটু ভিজিয়ে নেওয়া। স্যুপ তো জলীয় জিনিস, তাই না? আর চিকিৎসকরা তো বলেইছেন,সি-ফুডে গুড কোলেস্টেরল থাকে।”

 মিনিট পনেরোর মধ্যে টেবিল ভরে গেল। মাহিনের কোল্ড কফির গ্লাসটা এক কোণে নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে রইল, আর তনিমা যেন এক দক্ষ যুদ্ধবিদের মতো চামচ আর কাঁটাচামচ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

যে মেয়ে নাকি তেল-মশলা সহ্য করতে পারে না, সে জাম্বো প্রনের লেজ চিবোতে চিবোতে চোখ বন্ধ করে তৃপ্তির শব্দ করল, “উমম... বাটারটা দারুণ ব্লেন্ড হয়েছে মাহিন ভাইয়া! এই নিন, আপনি একটা নিন!”

মাহিন সৌজন্যমূলকভাবে হাত বাড়িয়ে বলল, “না না, তুমিই খাও।”

তনিমা মুহূর্তের মধ্যে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি যখন জোর করছেন, তবে আমিই শেষ করে ফেলি। নষ্ট করা তো পাপ!”

মাহিন মনে মনে বলল, “আমি কবে জোর করলাম হে সর্বগ্রাসী নারী?”

স্যুপের বাটিটা যখন চাঁদের মতো ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে গেল এবং চিংড়ির কঙ্কালগুলো প্লেটের একপাশে পাহাড়ে রূপ নিল, তনিমা একটা টিস্যু দিয়ে আলতো করে ঠোঁট মুছল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “উফ, আমার যা ছোট পেট! একটুতেই ভরে যায়। মনে হচ্ছে আর কিছুই মুখে তুলতে পারব না।”

মাহিনের মুখে তখন এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। যাক, সর্বসাকুল্যে সাড়ে তিন-চার হাজারে রক্ষা পাওয়া গেছে। মাসের বাকি পঁচিশ দিন না হয় ক্যান্টিনের ডাল-ভাত খেয়ে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। প্রেম করতে গেলে একটু আধটু ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়। মেয়েটা দেখতে তো খারাপ নয়! চশমার ফ্রেমের পেছনে চোখ দুটো বেশ ডাগর ডাগর।

ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়েটার প্লেট সরাতে এল। তনিমা মেন্যু কার্ডটা আবার টেনে নিল।

“ভাইয়া, আপনাদের মেইন কোর্সে সিগনেচার আইটেমটা কী?”

ওয়েটার গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, “ম্যাম, আমাদের অস্ট্রেলিয়ান ওয়াগিউ বিফ স্টেক উইথ ট্রাফল ম্যাশড পটেটো। আর ঢাকাইয়া জাফরানি খাসির ডালগোশত উইথ বাটার নান।” তনিমা গালে হাত দিয়ে মাহিনের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে এক অপার বিষাদ, “মাহিন ভাইয়া! আপনি তো জানেন আমি রেড মিট একদম খাই না। মা বারণ করেছে। কিন্তু এই ওয়াগিউ জিনিসটা না বড্ড এক্সোটিক। অস্ট্রেলিয়া থেকে গরুর মাংস এনে গুলশানে রাঁধছে, এদের এই পরিশ্রমকে সম্মান জানানো উচিত, তাই না ভাইয়া?”

মাহিনের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার জোগাড়। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “না মানে... সন্ধ্যেবেলা গরুর মাংস হজম হবে তো তনিমা? তোমার আবার পেটে প্রজাপতি...”

“আরেহ না ভাইয়া!” তনিমা হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল, “আমি তো এক-আধ টুকরোর বেশি মুখেও তুলব না। জাস্ট স্বাদটা নেওয়া। আপনি তো মানুষটা বড্ড কৃপণ গোছের মনে হচ্ছে! আচ্ছা যান, ডালগোশতটা বাদ দিই। শুধু ওয়াগিউ স্টেকটা মাঝারি আঁচে ওয়েল-ডান করে দিন ভাইয়া। আর সাথে দুটো রেশমি কাবাব আর একটা গার্লিক নান। বেশি আনবেন না প্লিজ, আমি একদম নষ্ট করা অপছন্দ করি।”

ওয়েটার কুর্নিশ করে চলে গেল। মাহিনের চোখের সামনে এখন ওয়াগিউ স্টেকের দাম জ্বলজ্বল করছে,চার হাজার পাঁচশত টাকা প্লাস ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জ!

মাহিন টেবিলের নিচে রাখা নিজের হাত দুটো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করল। পকেটের মানিব্যাগটা এখন আর তাকে সাহস দিচ্ছে না; মনে হচ্ছে মানিব্যাগটা পকেট থেকেই করুণ গলায় মাহিনকে বলছে, “ওহে মাহিন, আজ আমাদের বিসর্জনের দিন সমাগত।”

স্টেক যখন টেবিলে এল, তার সুবাসে রেস্তোরাঁর বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু মাহিনের কাছে সেই সুবাসকে মনে হলো চন্দনকাঠের ধূপের মতো,যা সাধারণত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জ্বালানো হয়। তনিমা ছুরি আর কাঁটাচামচ এমন ক্ষিপ্রতায় চালাতে শুরু করল যে মাহিনের চোখের পলক ফেলা বন্ধ হয়ে গেল। এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে তনিমা চোখ বুজে বলল, “আহ! নরম তুলোর মতো। মাহিন ভাইয়া, প্রেমের চেয়েও পৃথিবীতে বড় কোনো অনুভূতি থাকলে তা হলো ঠিকঠাক গ্রিল করা স্টেকের অনুভূতি। আপনি একটু টেস্ট করবেন?”

মাহিন ঢোক গিলে বলল, “না... আমার বুকটা একটু ভারী লাগছে।”

“গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বুঝি?” তনিমা সহানুভূতিশীল গলায় বলল, “আমি তো বলেইছি, বাইরের খাবারে মারাত্মক গ্যাস্ট্রিক হয়। আমার তো একদম সহ্য হয় না। আমি এইজন্যই তেল-চর্বি এড়িয়ে চলি।”

বলেই তনিমা স্টেকের চর্বিযুক্ত রসালো অংশটা সুরুৎ করে মুখে পুরে দিল। তার চিবোনোর ছন্দে এক আদিম উল্লাস ছিল। রেশমি কাবাবের দুটো সিখ নিমেষে ফাঁকা হয়ে গেল। নানরুটির শেষ কণাটুকু দিয়ে প্লেটের সমস্ত গ্রেভি মুছে যখন সে শেষ গ্রাসটা মুখে দিল, মাহিন নিশ্চিত ছিল যে তনিমার পেটের ভেতর প্রজাপতি নয়, আস্ত এক ড্রাগন বাসা বেঁধেছে, যা সবকিছু ভস্ম করে দিয়ে উদরস্থ করতে পারে।

মাহিন তখন কল্পনার সাগরে ডুব দিয়েছে। এই মেয়ের সাথে যদি তার সত্যি সত্যি প্রেম হয়? তারপর যদি ভুলবশত বিয়ে হয়ে যায়? সংসারের চিত্রটা কেমন হবে?

প্রতি মাসের এক তারিখে মাহিন তার বেতনের পুরো খামটা তনিমার হাতে তুলে দেবে। তনিমা বেনারসি পরে ডাইনিং টেবিলে বসবে। সকালের নাস্তায় থাকবে খাঁটি ঘিয়ে ভাজা চল্লিশটা পরোটা আর একটা আস্ত খাসির পায়া। দুপুরের খাবারে ইলিশ মাছের আস্ত একটা ইলিশ আর কাচ্চি বিরিয়ানির ডেকচি। আর মাহিন নিজে এক কোণে বসে চশমা মুছে মুছে শুকনা মুড়ি চিবোবে আর ক্যালকুলেটরে হিসেব করবে,কিডনি দুটো বিক্রি করলে ঠিক কত মাসের বাজার খরচ জোগাড় করা সম্ভব!

“মাহিন ভাইয়া? আপনি কোন জগতে হারিয়ে গেলেন?” তনিমার মধুর ডাকে মাহিনের ঘোর কাটল।

তনিমা টিস্যু দিয়ে মুখ মুছছে। তার মুখে এক ধরনের তৃপ্তির উজ্জ্বল আভা।

মাহিন কোনোমতে শুকনো গলায় বলল, “না মানে... ভাবছিলাম তোমার খাওয়া শেষ হলো কি না। বিলটা দিতে বলি?”

তনিমা যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ দুটো গোল গোল করে বলল, “বিল? এখনই? মাহিন ভাইয়া, আপনি কি কোনোদিন ফ্রেঞ্চ ডাইনিং করেননি? ডেজার্ট ছাড়া কোনো সভ্য মানুষ টেবিল ছাড়ে? খাবারের শেষটা মিষ্টি না হলে সম্পর্কের শুরুটা মিষ্টি হবে কী করে বলুন?”

মাহিনের মনে হলো তার মাথার ভেতর কোনো একটা নার্ভ ‘টুইং’ করে ছিঁড়ে গেল। সে কাঠের পুতুলের মতো চেয়ে রইল। তনিমা তখন মেন্যুর শেষ পাতায় আঙুল বোলাচ্ছে।

“এই যে ভাইয়া, শুনুন,” তনিমা ওয়েটারকে উদ্দেশ করে বলল, “আপনাদের বেলজিয়ান ডার্ক চকলেট লাভা কেক উইথ ভ্যানিলা বিন আইসক্রিম দিন। আর ওই পেস্তা দেওয়া শাহি টুকরাটা। না না, শাহি টুকরাটা থাক... তার চেয়ে বরং ওই চিজকেকটা দিন তো, নিউ ইয়র্ক স্টাইল। দুটোই দিন। মাহিন ভাইয়া তো মিষ্টি পছন্দ করেন নিশ্চয়ই?”

মাহিন বলতে চাইল,আমি বিষ পছন্দ করি। এই মুহূর্তে এক পেয়ালা হেমলক এনে দিলে আমি খুব তৃপ্তি সহকারে পান করতাম। কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। কেবল ঘাড়টা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপর-নিচ দুলল।

ডেজার্ট পর্ব শেষ হতে হতে রাত প্রায় সাড়ে ন’টা। তনিমা আইসক্রিমের শেষ চামচটা চেটেপুটে খেয়ে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসল।

“উফ! বাঁচলাম। আজ সত্যিই আমার ডায়েটটা নষ্ট হয়ে গেল মাহিন ভাইয়া। এই সব আপনার জন্য! আপনি এত করে জোর না করলে আমি কি এসব ছাইপাঁশ খাই? আমি তো সপ্তাহে চারদিন শুধু ওটস আর গ্রিন টি খেয়ে থাকি। আজ যে কত ক্যালরি ইনটেক হলো! কাল সকাল থেকে আমাকে অন্তত দশ কিলোমিটার দৌড়াতে হবে।”

মাহিন তার দিকে চেয়ে রইল। মানুষের হিপোক্রেসি বা ভণ্ডামি কত উচ্চতায় পৌঁছালে এমন কথা মুখ দিয়ে বের হতে পারে, তা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কোনো গবেষণা হওয়া উচিত। পুরো আড্ডায় মাহিন কেবল ‘না না তুমি খাও’ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বাক্য বলেনি। আর সমস্ত অপরাধের দায় গিয়ে পড়ল মাহিনের ঘাড়ে!

ওয়েটার এসে চামড়ার বাঁধানো ফোল্ডারে বিলটা রেখে গেল। মাহিন কাঁপা কাঁপা হাতে ফোল্ডারটা খুলল।

চোখের সামনে সংখ্যাটা ভেসে উঠল,১১,৮৫০ টাকা! ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জ যোগ করে মোট ১৩,৬২৭ টাকা!

মাহিনের বুকটা ধক করে উঠল। তার ওয়ালেটে আছে ঠিক বারো হাজার টাকা। বাকি এক হাজার ছয়শত সাতাশ টাকা সে কোথা থেকে দেবে? এই রেস্তোরাঁর কি কোনো বাসন মাজার ব্যাক-ইয়ার্ড আছে? সেখানে কি এক ঘণ্টা থালাবাসন মাজলে ষোলশত টাকা মওকুফ হবে?

মাহিন পকেট থেকে নিঃশব্দে ফোনটা বের করল। তনিমা তখন সেলফি তোলায় ব্যস্ত। সে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে মুখ বাঁকিয়ে স্ন্যাপচ্যাটে ছবি তুলছে আর ক্যাপশন দিচ্ছে,“হালকা বিকেলের আড্ডা উইথ আ ফ্রেন্ড... ফিলিং ব্লেসড!” মাহিন টেবিলের নিচ দিয়ে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং রুমমেট শুভ্রকে মেসেজ পাঠাল,

“জরুরি অবস্থা। বিকাশ কর এখনই দুই হাজার টাকা। না হলে কাল সকালের খবরের কাগজে আমার লাশ গুলশান লেকে ভেসে ওঠার খবর ছাপা হবে।”

সৌভাগ্যবশত, শুভ্র তখন অনলাইনে ছিল। দুই মিনিটের মধ্যে মাহিনের ফোনে টুং করে মেসেজ এল। বিকাশে দুই হাজার টাকা ক্যাশ-ইন হয়েছেমাহিন বাঁচল। সে ক্যাশ টাকা আর বিকাশ মিলিয়ে বিল পরিশোধ করল। ওয়েটার যখন ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার’ বলে টিপস নিয়ে চলে গেল, মাহিনের মনে হলো তার বুকের ভেতরের কলিজাটা কেউ ধারালো বঁটি দিয়ে কেটে নিয়ে গেছে।

রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে গুলশানের ফুটপাতে এসে দাঁড়াল দুজন। রাতের হিমেল হাওয়া বইছে। নিয়ন বাতির আলোয় শহরটাকে বেশ রঙিন দেখাচ্ছে। তনিমা একটা তৃপ্তির হাই তুলে বলল, “আহ! বিকেলটা দারুণ কাটল, তাই না মাহিন ভাইয়া? আপনার সাথে কথা বলে খুব ভালো লাগল। মানুষ হিসেবে আপনি বেশ জেন্টলম্যান।”

মাহিন মনে মনে বলল, “জেন্টলম্যান না, বলো জাঁতাকলে পড়া রামছাগল!”

মুখে বলল, “হ্যাঁ, দারুণ। তা তুমি কীভাবে যাবে তনিমা? একটা উবার ডেকে দেব?”

তনিমা একগাল হেসে বলল, “না না, উবারের কোনো দরকার নেই। আমার এক কাজিন এই কাছেই থাকে। ও গাড়ি নিয়ে আসছে আমাকে পিক করতে। ওই যে, সাদা প্রাডো গাড়িটা এসে গেছে!”

একটি চকচকে সাদা প্রাডো গাড়ি এসে ফুটপাতের পাশে থামল। গাড়ির জানালা দিয়ে এক হ্যান্ডসাম যুবক মুখ বের করে হাসল।

তনিমা গাড়ির দিকে এক পা বাড়িয়ে মাহিনের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক চিলতে শয়তানি আর এক সমুদ্র দুষ্টুমি।

“মাহিন ভাইয়া?”

“বলো?” মাহিন শুকনো মুখে বলল।

তনিমা গাড়ির হাতল ধরে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “সোমারসেট মম্-এর ‘দ্য লাঞ্চন’ গল্পটা আমার ইন্টারের পাঠ্যবইয়ে ছিল ভাইয়া। খুব প্রিয় গল্প আমার। আপনি ফেসবুকের ইনবক্সে নিজেকে বড় সাহিত্যপ্রেমী দাবি করছিলেন না? তাই ভাবলাম, বাস্তব জীবনে সাহিত্যটা কেমন লাগে একটু পরীক্ষা করে দেখি!”

মাহিন বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ চড়কগাছ। “তু... তুমি...?”

তনিমা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে গুলশানের বাতাস যেন আরও সতেজ হয়ে উঠল।

“হ্যাঁ ভাইয়া! আমি জানতাম আপনি মনে মনে ঘামছেন। আপনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল বিল দেখে আপনার হার্ট অ্যাটাক হতে বাকি ছিল। তবে চিন্তা করবেন না, এই নিন!”

তনিমা তার কাঁধের পার্স থেকে একটা খাম বের করে মাহিনের বুক পকেটে গুঁজে দিল।

“এটা কী?” মাহিন হতভম্ব।

“আপনার বিলের অর্ধেক টাকা। আমি কারও ঘাড়ে বসে ফ্রিতে খাই না ভাইয়া। আমি খেতে ভালোবাসি, এটা সত্যি। কিন্তু কাউকে নিঃস্ব করে খাওয়ার মতো ছোটলোক আমি নই। আপনার পরীক্ষা নেওয়া শেষ। আপনি পরীক্ষায় পাস করেছেন,কারণ আপনি পুরোটা সময় ধৈর্য ধরে হাসিমুখে সহ্য করেছেন, একটা বাজে ব্যবহারও করেননি।”

তনিমা গাড়িতে উঠে বসল। তারপর জানালা দিয়ে হাত নাড়িয়ে বলল, “মাহিন ভাইয়া! এই দুষ্টুমিটা মিষ্টি ছিল না? কাল বিকেলে ধানমন্ডি লেকে আসবেন তো? কথা দিচ্ছি, কাল আমি শুধু ফুচকা খাব... বড়জোর দশ প্লেট!”

গাড়িটা শোঁ করে স্টার্ট নিয়ে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

মাহিন ফুটপাতে একা দাঁড়িয়ে রইল। সে পকেট থেকে খামটা বের করল। ভেতরে সাত হাজার টাকা। আর সাথে একটা ছোট চিরকুট,

“মেয়েদের মন আর পেট,দুটোই বুঝতে সাহিত্যের চেয়ে বেশি সাহসের প্রয়োজন হয়, মিস্টার মাহিন! কাল বিকেল পাঁচটায় দেখা হচ্ছে।”

মাহিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর রাতের খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সে একা একাই হেসে উঠল। পকেটের মানিব্যাগটা হয়তো আজ খালি হতে হতে বেঁচে গেছে, কিন্তু বুকের ভেতরের খাঁচায় যে প্রজাপতিটা এতক্ষণ দমবন্ধ হয়ে পড়ে ছিল, সে যেন হঠাৎ ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে।

মাহিন মনে মনে বলল, “উইলিয়াম সোমারসেট মম্, তুমি ভুল ছিলে হে! তোমার গল্পের মহিলার প্রতি তোমার জন্ম নিয়েছিল অনন্ত ঘৃণা। কিন্তু আমার এই সর্বগ্রাসী পেটরোগা তনিমার জন্য আমার বুকের ভেতর কেন যেন এক অদ্ভুত, দুষ্টু-মিষ্টি প্রেমের জন্ম হচ্ছে!”

রাতের নিস্তব্ধ গুলশান এভিনিউ ধরে একা একা হাঁটতে হাঁটতে মাহিন হাসিমুখে মনে মনে হিসেব করতে লাগল, দশ প্লেট ফুচকার দাম বর্তমান বাজারে ঠিক কত হতে পারে!

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login