কুয়াশার ভারী চাদরে ঢাকা পাহাড়ি রাস্তাটা যখন হঠাৎ করে খাদের কিনারে এসে বাঁক নিল, তখন আবিরের পুরোনো জিপগাড়িটার ইঞ্জিন একটা তীব্র গোঙানি দিয়ে থেমে গেল। রাত তখন পৌনে বারোটা। জায়গাটা সিলেটের সীমান্তঘেঁষা কোনো এক গভীর পাহাড়ি জঙ্গল, যার নাম স্থানীয়রা বলে ‘কালাপাহাড়ের কোল’। আবির একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার ও গবেষক; পাহাড়ি লোকগাথা আর প্রাচীন পরিত্যক্ত স্থাপত্য নিয়ে তার কাজ। স্থানীয়দের শত নিষেধ উপেক্ষা করে সে একা এই গভীর রাতে বের হয়েছিল ব্রিটিশ আমলের এক পরিত্যক্ত নীলকুঠির সন্ধানে। কিন্তু গাড়ির ড্যাশবোর্ডে যখন ধোঁয়া উঠতে শুরু করল, তখনই তার প্রথম মনে হলো, হয়তো বয়স্ক চা-শ্রমিকদের দেওয়া কুফা সংকেতগুলো পুরোপুরি অমূলক ছিল না।
চারপাশ থমথমে। ঝিঁঝিঁ পোকার কোনো ডাক নেই, বাতাসের কোনো মৃদু দোলাচল নেই,চারিদিকে শুধু এক জমে থাকা ভারী, হিমশীতল নীরবতা। জিপের হেডলাইট দুটো একবার কাঁপল, তারপর দপ করে নিভে গিয়ে পুরো পাহাড়ি প্রান্তরকে এক আদিম কালো অন্ধকারে ডুবিয়ে দিল। আবির সিটবেল্ট খুলে একটা বড় টর্চলাইট আর ক্যামেরাটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিচে নামল। গাড়ির বনেটে হাত দিতেই ছ্যাঁৎ করে উঠল না, বরং অদ্ভুতভাবে লোহাটা বরফের মতো ঠান্ডা! কোনো ইঞ্জিনের তাপ নেই। ঠান্ডায় আবিরের মুখের ভাপ সাদা ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে, অথচ তখন সবেমাত্র কার্তিক মাসের শেষ। এমন হাড়কাঁপানো শীতের কোনো কারণ থাকার কথা নয়।
মোবাইলের স্ক্রিনটা অন করতেই সে দেখল কোনো নেটওয়ার্ক নেই, আর ব্যাটারির চার্জ দ্রুত নেমে আসছে,৮০ শতাংশ থেকে সোয়া এক মিনিটের মধ্যে শূন্য হয়ে ফোনটা কালো হয়ে গেল। হঠাৎ করেই পাহাড়ের ওপর থেকে ভেসে এল একটা মৃদু ঘণ্টার আওয়াজ। ‘টং... টং...’। যেন কোনো পুরোনো গির্জার ঘণ্টা, অথবা কোনো অচেনা প্রার্থনার আহ্বান। সেই শব্দের উৎস লক্ষ্য করে টর্চের আলো ফেলতেই আবির দেখতে পেল কুয়াশার বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে একটি ভগ্ন লোহার তোরণ। তোরণের মাথায় মরচে পড়া অক্ষরে খোদাই করা রয়েছে: ‘লর্ড হ্যামিল্টনের খামারবাড়ি - ১৮৮৪’।
আবিরের বুক ধক করে উঠল। এটাই সেই কুখ্যাত বাংলো,যেখানে এক শতাব্দী আগে এক রাতের ব্যবধানে লর্ড হ্যামিল্টন ও তার পুরো পরিবার রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, তাদের কাউকে কখনো জীবিত বা মৃত উদ্ধার করা যায়নি। কেবল তাদের ঘরের দেয়ালে রক্তের মতো গাঢ় রঙে নাকি লেখা ছিল একটি মাত্র বাক্য: “তারা অদ্ভুত, তারা ছায়া নয়।”
পাহাড়ের এই রাতে বাইরে ঠান্ডায় জমে যাওয়ার চেয়ে ভাঙা হলেও একটা মাথার ওপর ছাদ খোঁজা জরুরি মনে হলো আবিরের। সে লোহার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল। মরচে ধরা কব্জাগুলো তীব্র ধাতব আর্তনাদ করে উঠল, যেন বহু বছর পর কোনো জীবিত মানুষের স্পর্শে ঘুম ভাঙল বাড়িটার।
বাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আবির লক্ষ্য করল, দুই পাশের গাছগুলো জীবন্ত নয়। পাতাগুলো কুঁকড়ে কালো হয়ে আছে, আর ডালপালাগুলো অদ্ভুত ভঙ্গিতে একে অপরের সঙ্গে জড়ানো,ঠিক যেন যন্ত্রণায় মোচড়াতে থাকা মানুষের আঙুল। পা ফেলার শব্দ ছাড়াও আবিরের মনে হলো ঠিক তার পেছনে পেছনে আরও একজনের ভারী পদধ্বনি পড়ছে। প্রতিবার সে থামলেই পেছনের শব্দটাও থমকে যায়। আবির চট করে পেছনে আলো ফেলল।
কেউ নেই। শুধু একদলা কুয়াশা যেন খুব দ্রুত একটা গাছের আড়ালে সরে গেল। বাংলোর মূল দরজাটা আধখোলা ছিল। ভেতরে ঢুকতেই এক নাকে ধাক্কা দিল স্যাঁতসেঁতে ভেজা চুন আর কর্পূরের এক অদ্ভুত মিশ্র গন্ধ। সেই গন্ধের নিচে লুকিয়ে আছে পুরনো রক্ত আর পচনের এক হালকা ঝাঁজালো আভাস। বৈঠকখানাটা বিশাল। মেহগনি কাঠের তৈরি ভারী আসবাবপত্রগুলো ধুলোয় ঢেকে আছে। ছাদ থেকে ঝুলছে ভাঙা ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি।
আবির টর্চের আলো দেওয়ালে ঘোরাতেই থমকে দাঁড়াল। দেওয়ালে সারিবদ্ধভাবে টাঙানো রয়েছে বড় বড় তৈলচিত্র। কোনোটাতে শিকারের ছবি, কোনোটাতে চা-বাগানের সাহেবের ছবি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো,প্রতিটি ছবির মুখাবয়ব আঁচড়ে তুলে ফেলা হয়েছে। যেন কেউ ধারালো নখ দিয়ে ক্যানভাসের চোখ আর মুখ খুবলে নিয়েছে। শুধু শেষ তৈলচিত্রটি অক্ষত। এক কিশোরী, পরনে ভিক্টোরিয়ান আমলের সাদা ফ্রক, কোলে একটি চীনামাটির পুতুল। সেই কিশোরীর চোখ দুটো এত জীবন্ত যে মনে হয় ক্যানভাসের ভেতর থেকে তা আবিরের হৃৎপিণ্ড ভেদ করে দেখছে। আর সেই ছবির নিচের কাঠের তক্তায় খোদাই করা নাম: ‘অ্যানাবেল হ্যামিল্টন’।
“রাত দুপুরে অচেনা অতিথির আগমন এ বাড়িতে বহু যুগ বাদে হলো।”
অকস্মাৎ ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে আসা এক গম্ভীর, ভাঙা কণ্ঠস্বরে আবিরের শরীরের প্রতিটি রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল। সে ছিটকে পেছনে সরে এসে টর্চের আলো ফেলল ঘরের কোনায় থাকা এক পাথরের অগ্নিকুণ্ডের পাশে। সেখানে একটা দোলায়মান রকিং চেয়ারে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। গায়ে পুরোনো ময়লা আলখাল্লা, মাথায় উসকোখুসকো সাদা চুল, আর মুখভর্তি কোঁচকানো চামড়া। কিন্তু সবচেয়ে বীভৎস তার চোখ দুটো,চোখের মণি দুটো সম্পূর্ণ সাদা, কোনো কালো তারা নেই।
আবির চিৎকার চেপে ধরে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “কে... কে আপনি?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো মানবীয় উত্তাপ ছিল না, যেন দুটো শুকনো কঙ্কালের হাড় একে অপরের গায়ে ঘষা খাচ্ছে। “আমি এই ভিটের পাহারাদার। মানুষ আমাকে করিম বলে ডাকত যখন আমি শ্বাস নিতাম। এখন মানুষ আসে না, তাই নাম ডাকারও কেউ নেই।”
“যখন শ্বাস নিতেন মানে? আপনি কি পাগল?” আবির নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। “আমার গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে। আমি সকাল পর্যন্ত এখানে একটু আশ্রয় চাই।”
“আশ্রয়?” বৃদ্ধের হাসিটা দীর্ঘ হলো। “বেঁচে থাকার আশ্রয় মরা বাড়িতে মেলে না, খোকা। এখানে যা থাকে, তারা ভূত নয়। ভূত তো মানুষের চেনা ভয়,যে ভয় মানুষ বোঝে, যার একটা নিয়ম আছে। কিন্তু এ বাড়ির অন্ধকারটা ‘অদ্ভুত’। এরা ভূতের চেয়েও অচেনা। এরা মানুষের চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকে আত্মা চিবিয়ে খায়।”
“ফালতু কথা বলবেন না!” আবির একটু সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করল। “আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছাড়া কোনো কিছুকে আমি মানি না।”
বৃদ্ধ তার সাদা চোখ দুটো আবিরের টর্চের আলোর দিকে সরাসরি স্থির রাখলেন,চোখের পাতা এক ফোঁটাও পড়ল না। “বিজ্ঞান? বিজ্ঞান আলোর কথা বলে। কিন্তু এই সৃষ্টির শুরুতে কোনো আলো ছিল না, কেবল এক আদিম অন্ধকার ছিল। সেই অন্ধকার যখন রূপ নেয়, বিজ্ঞান তখন জিভ কামড়ে মরে যায়। ওপরে যেও না, খোকা। দোতলার ঘরগুলো এখনো ঘুমায়নি। তারা খেলছে।”
কথাটা শেষ হতেই দোতলা থেকে একটা ভারী কিছু পড়ার আওয়াজ হলো,‘ধপ!’
তার পরমুহূর্তেই এক তীব্র, তীক্ষ্ণ খলখল হাসির শব্দ ভেসে এল। শব্দটা কোনো স্বাভাবিক হাসির মতো নয়; যেন কোনো শিশুর কণ্ঠস্বর, কিন্তু তার মধ্যে মিশে আছে শতবর্ষী কোনো বৃদ্ধার হিংস্রতা। তার সাথে যোগ হলো কাঠের মেঝেতে ছোট ছোট পায়ের ছুটে চলার শব্দ,‘টপ টপ টপ টপ’।
আবির চমকে ওপরে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। আর যখন সে আবার টর্চের আলোটা রকিং চেয়ারের দিকে নামাল, তার হৃৎস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
চেয়ারটা খালি। করিম নামের বৃদ্ধ উধাও। কেবল রকিং চেয়ারটা আপন গতিতে সামনে-পেছনে দুলছে,খসখস... খসখস...। ভয় আর কৌতূহলের এক বিপজ্জনক দোলাচলে জড়িয়ে পড়ল আবির। একজন গবেষক হিসেবে তার মন বলছিল এর পেছনে কোনো প্রতারণা আছে, হয়তো কোনো চোরাচালানকারী দল তাকে ভয় দেখাচ্ছে। সে কাঁপা হাতে ক্যামেরাটা অন করল। নাইট-ভিশন মোডে স্ক্রিনটা সবুজ আলোয় জ্বলে উঠল। সে ধীরপায়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দিকে উঠতে লাগল।
প্রতিটি সিঁড়ির ধাপে পা ফেলার সাথে সাথে কাঠগুলো এমনভাবে মড়মড় করে উঠছিল যেন কেউ ব্যথায় আর্তনাদ করছে। সিঁড়ির রেলিংয়ে হাত দিতেই আবিরের হাত চিটচিটে এক তরলে ভিজে গেল। টর্চের আলো ফেলে সে দেখল,রেলিং বেয়ে চুইয়ে পড়ছে কালো, আলকাতরার মতো দুর্গন্ধযুক্ত এক তরল।
দোতলার করিডোরটা আরও দীর্ঘ ও অন্ধকার। দুই পাশে সার দিয়ে বন্ধ দরজা। করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে আবির দেখতে পেল একটি ছায়া। ছায়াটি খুব সাধারণ নয়। মানুষের অবয়ব, কিন্তু তার হাত দুটো অস্বাভাবিক লম্বা,মেঝে পর্যন্ত ঝুলছে। ছায়াটি দেওয়ালের সঙ্গে লেপটে দাঁড়িয়ে আছে। আবির টর্চের শক্তিশালী বিমটা সরাসরি ছায়াটার ওপর ফেলল।
আলো পড়তেই আবিরের চোখ কপালে উঠল। সেখানে কোনো রক্তমাংসের মানুষ নেই। কিন্তু আলো ফেলার পরেও দেওয়ালের সেই ছায়াটা মিলিয়ে গেল না! বরং সেই ছায়াটা আলোটাকে শোষণ করে নিল। দেওয়ালের ছায়াটা ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে আবিরের দিকে তাকাল। ছায়ার মুখের জায়গায় ফুটে উঠল দুটো ফুটফুটে লাল চোখ, আর একটা বিকৃত চওড়া হাঁ,যেখানে কোনো দাঁত নেই, আছে শুধু মাংস খুবলে খাওয়ার মতো অগুনতি কাঁটা। আবিরের হাত থেকে টর্চলাইটটা পড়ে গেল। ধাতব আলোটা মেঝের ওপর গড়িয়ে এক বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে থামল।
সেই দরজার পাল্লাটা ধীরে ধীরে নিজের থেকেই খুলে গেল,‘ক্রিইইইচ’। ভেতরের ঘর থেকে ভেসে এল এক অপরূপ অথচ ভয়ার্ত মিষ্টি সুর। কেউ যেন গ্রামোফোনে এক শতাব্দী পুরোনো কোনো ইংরেজি গান বাজাচ্ছে। গানের সুরের সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে শোনা গেল পুতুলের নূপুরের নিক্কণ। আবির সম্মোহিতের মতো যেন কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে সেই খোলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার পা যেন তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। মগজের ভেতর তীব্র এক ভোঁ-ভোঁ শব্দ হচ্ছে, মনে হচ্ছে হাজারটা মৌমাছি তার খুলির ভেতর ডানা ঝাপটাচ্ছে। ঘরে ঢুকতেই সে দেখল, ঘরটা সম্পূর্ণ পরিপাটি। কোনো ধুলো নেই, কোনো মাকড়সার জাল নেই। ঠিক যেন উনিশ শতকের এক রাজকীয় শয়নকক্ষ। ঘরের ঠিক মাঝখানে লাল গালিচার ওপর পিঠ ফিরিয়ে বসে আছে সেই তৈলচিত্রের কিশোরী,অ্যানাবেল। তার সাদা ফ্রকে কোনো দাগ নেই, তার স্বর্ণকেশী চুলগুলো কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়েছে। সে তার কোলে থাকা চীনামাটির পুতুলটাকে পরম স্নেহে দোলাচ্ছে।
“অ্যানাবেল...?” আবিরের মুখ দিয়ে এক অচেনা ফিসফিসানি বেরিয়ে এল।
মেয়েটি পুতুল দোলানো থামাল। গানটাও থেমে গেল মুহূর্তে। ঘরে নেমে এল কবরের নিস্তব্ধতা।
“তুমি আমার পুতুলের নতুন চোখ এনেছ?” মেয়েটির গলা ভেসে এল। কিন্তু সেই গলাটা ঘরের ভেতর থেকে নয়, আবিরের মনে হলো শব্দটা সরাসরি তার মস্তিষ্কের ভেতর থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
“আমি... আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমি চলে যাচ্ছি...” আবির পেছনে ফেরার চেষ্টা করল, কিন্তু আবিষ্কার করল তার পা দুটো মেঝের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে গেছে। মেঝেটা যেন কাঠের নয়, এক জীবিত মাংসল জলাভূমি, যা তাকে ধীরে ধীরে নিচের দিকে টানছে।
মেয়েটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। আবির যে দৃশ্য দেখল, তার জন্য পৃথিবীর কোনো মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারে না। মেয়েটির কোনো মুখ নেই! চামড়াটা মসৃণ হয়ে কপালের পর থেকে চিবুক পর্যন্ত নেমে এসেছে,কোনো নাক নেই, মুখ নেই। কেবল মুখের মাঝখানে চামড়ার নিচে যেন কিছু জীবন্ত পোকা কিলবিল করছে। আর সে যে পুতুলটিকে কোলে ধরে আছে, সেই পুতুলটির মুখটা অবিকল আবিরের নিজের মুখের মতো! পুতুলটির চোখের কোণ দিয়ে রক্ত ঝরছে।
মেয়েটি তার হাত তুলল। চামড়ার নিচ থেকে এক অমানুষিক আর্তনাদ বেরিয়ে এল, যা কোনো বাতাস দিয়ে নয়, তরঙ্গের মতো ঘরের চারপাশ কাঁপিয়ে দিল।
ঘরের আলমারির পাল্লাগুলো নিজে থেকেই সজোরে খুলতে ও বন্ধ হতে শুরু করল,ধড়াম! ধড়াম! দেয়ালের প্লাস্টার খসে খসে পড়তে লাগল, আর সেই ফাটলগুলো থেকে বের হয়ে আসতে লাগল শত শত কালো, লোমশ হাত। সেই হাতগুলো বাতাসে আঁকুপাঁকু করছে, যেন কোনো জীবিত শিকারকে স্পর্শ করার তীব্র তৃষ্ণা তাদের মধ্যে।
“এরা ভূত নয়... এরা অতৃপ্তির অন্ধকার!” আবিরের মনে পড়ল বৃদ্ধের সেই কথাটা।
আবির তার সর্বশক্তি দিয়ে পা টেনে তোলার চেষ্টা করল। ক্যামেরাটা তার কাঁধ থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশটা হঠাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠল,‘ঝলক!’
তীব্র সেই সাদা আলোয় সেই মুখহীন কিশোরী আর লোমশ হাতগুলো যেন ব্যথায় কুঁকড়ে গেল। তারা অন্ধকারের জীব, তীব্র আলো তাদের অস্তিত্বে আঘাত করে। সুযোগটা নষ্ট করল না আবির। সে তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা পুরনো মেটাল লাইটার বের করল। হাত কাঁপছিল প্রবলভাবে। এক ঝটকায় সে লাইটারের চাকা ঘুরাল। আগুনের শিখা জ্বলে উঠতেই সে ঘরের ভারী ভেলভেটের জানালায় ঝুলতে থাকা শতবর্ষী শুকনো পর্দায় ছুঁড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। শতাব্দী প্রাচীন শুকনো কাপড় আর বার্নিশ করা কাঠ ক্ষুধার্ত রাক্ষসের মতো আগুনকে আপন করে নিল। আগুনের লেলিহান শিখা দেখতেই দেওয়ালের হাতগুলো হিসহিস শব্দ করে পেছনের ফাটলে ঢুকে গেল। সেই মুখহীন অবয়বটি আগুনের তাপে ধোঁয়ার মতো কাঁপতে কাঁপতে ঘরের কোণে মিলিয়ে যেতে লাগল, কিন্তু মিলিয়ে যাওয়ার আগে সেই ঘরের বাতাস চিরে শেষবারের মতো প্রতিধ্বনিত হলো:
“তুমি পালাতে পারবে না... তুমি যা দেখেছ, তা এখন তোমার ছায়ার ভেতরেও বেঁচে থাকবে!”
আবির আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। দোতলার করিডোর দিয়ে সে অন্ধের মতো ছুটতে লাগল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সে একবার পা পিছলে গড়িয়ে পড়ল একতলার মেঝেতে। কনুই আর হাঁটুর চামড়া ছড়ে গিয়ে রক্ত বের হতে লাগল, কিন্তু সেই তীব্র শারীরিক ব্যথাও তার মনের ভেতর ঢুকে যাওয়া আদিম ভয়ের কাছে তুচ্ছ মনে হলো।
ভেঙে পড়া সদর দরজা দিয়ে সে বাইরে ছিটকে বেরিয়ে এল। পেছনে তখন লর্ড হ্যামিল্টনের কুখ্যাত বাংলো দাউদাউ করে জ্বলছে। আগুনের শিখাগুলো কুয়াশা ভেদ করে আকাশের দিকে উঠছে রক্তিম জিহ্বার মতো। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার,আগুনের কোনো পোড়া গন্ধ নেই, আগুনের কোনো তাপ বাইরে আসছে না! পুরো আগুনটাই যেন নিঃশব্দে জ্বলছে, কোনো কাঠের চটপটে শব্দ নেই। আবির পাগলের মতো দৌড়ে পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নামতে লাগল। জিপের কথা তার আর মনে নেই, ক্যামেরার কথাও না। সে কেবল দৌড়াতে লাগল,যতক্ষণ না তার ফুসফুস ফেটে রক্ত উঠে আসার মতো অবস্থা হলো।
ভোরের প্রথম আলো যখন পাহাড়ের শিখরে শিমুল গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল, তখন একদল চা-শ্রমিক রাস্তার পাশে খাদের কিনারে আবিরকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখল। তার সারা গায়ে আঁচড়ের দাগ, মাথার অর্ধেক চুল এক রাতের মধ্যে সাদা হয়ে গেছে।
তিন দিন পর। সিলেট শহরের এক হাসপাতালের বিছানায় আবিরের জ্ঞান ফিরল। তার পাশে বসে ছিল তার বন্ধু ও ডাক্তার রাশেদ।
“আবির! খোদা বাঁচিয়েছেন তোকে,” রাশেদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। “চা-শ্রমিকরা তোকে না পেলে হাইপোথার্মিয়ায় মরে যেতিস। কালাপাহাড়ের ওই খাদে কীভাবে পৌঁছালি তুই?”
আবির শুকনো ঠোঁট চাটল। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। সে বহু কষ্টে ফিসফিস করে বলল, “সেই বাংলোটা... হ্যামিল্টনের বাংলোটা পুরো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তাই না? আমি নিজের হাতে আগুন দিয়েছি...”
রাশেদ ভ্রু কুঁচকে আবিরের দিকে তাকাল। তার চোখে গভীর বিস্ময় ও করুণা।
“কীসের বাংলো আবির? তুই কোন বাড়ির কথা বলছিস?”
“হ্যামিল্টনের খামারবাড়ি! দোতলা সেই ভূতুড়ে বাংলো...”
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মোবাইলটা বের করে আবিরের সামনে ধরল। স্ক্রিনে একটা স্থানীয় খবরের পাতার ছবি। সেখানে লেখা:
“১৯২৪ সালের এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে কালাপাহাড়ের লর্ড হ্যামিল্টনের বাংলোটি পাহাড়ধসে সম্পূর্ণ মাটির নিচে দেবে যায়। গত একশো বছর ধরে সেখানে কেবল একটি সমতল পাথুরে মাঠ ছাড়া আর কোনো ধ্বংসাবশেষও অবশিষ্ট নেই।”
আবিরের চোখের পাতা স্থির হয়ে গেল। শীতল আতঙ্কের এক হিমস্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে আবার নেমে গেল।তাহলে সে সেই রাতে কার ভেতরে ঢুকেছিল? সে কার ঘরে আগুন দিয়েছিল? আর সেই বৃদ্ধ... সেই মুখহীন অ্যানাবেল?
হঠাৎ কেবিনের জানালার কাচে বাইরে থেকে একটা হালকা টোকার শব্দ হলো। ‘টপ... টপ...’। আবির ধীরে ধীরে মাথা ঘোরাল। হাসপাতালের দোতলার কাচের জানালার বাইরে কোনো ছাদ নেই, কোনো গাছ নেই। কিন্তু সেই স্বচ্ছ কাচের ওপর রক্ত দিয়ে উল্টো করে একটি কথা ফুটে উঠছে, যেন ওপার থেকে কোনো অদৃশ্য আঙুল তা লিখে দিচ্ছে:
“তারা অদ্ভুত, তারা ছায়া নয়। আমরা এখন তোমার ভেতরেই আছি।”
আবির চিৎকার করতে গেল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। সে লক্ষ্য করল, ঘরের মেঝের ওপর সকালের রোদে তার যে ছায়াটা পড়েছে,সেই ছায়াটার মাথাটা ধীরে ধীরে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সরাসরি তার দিকেই তাকিয়ে আছে।