Story

ঘর

October 26, 2026

18 views

'জীবনে কখনো হেরেছেন আপনি?'

'আগে কখনোই হারিনি স্যার। এখন রোজ হারি। দিনে অসংখ্যবার আমি হেরে যাই।'

'হারতে খারাপ লাগে না।'

'আগে কখনো হারিনি আমি, তাই জানতাম না হারতে কেমন লাগে। কিন্তু জীবনে যখন আমার এতো পূর্ণতা। সৃষ্টিকর্তা আমায় এতো সুখে রাখলেন। এই সুখের মাঝে হেরে যাওয়ার যে আনন্দ তা আমি এখন বুক জুড়ে অনুভব করি।'

'হেরে যেতে আনন্দ? হারতে কি কারো ভালো লাগে?'

'স্যার, এই হেরে যাওয়াতেই আমার যত আনন্দ। আমি ভীষণ ভাবে এভাবেই হেরে যেতে চাই সারাটা জীবন।'

'অদ্ভুত ব্যাপার! আমি আগে কখনো কারো কাছে শুনিনি হেরে যেতেও মানুষ আনন্দ পায়।'

'আপনার মতো আমিও শুনিনি। আমিও জানতাম না হেরে যাওয়ায় এতো আনন্দ। এই দেখুন স্যার! কথাটা বলতে বলতেই আমার শরীরে কাটা দিয়ে উঠেছে। হেরে যাওয়ার আনন্দটা অনুভব করলেই মনটা শীতল হয়ে যায়। আরেকটু হলে হয়তো চোখেই পানি চলে আসবে।'

'অদ্ভুত! খুবই অদ্ভুত!'

শায়লা বসে আছে অফিসের বসের সামনে। বসের সাথে এটা ওটা নিয়ে কথা বলতে বলতে কথা প্রসঙ্গে হেরে যাওয়া ব্যাপারটা এলো। বস বললেন উনি জীবনে কখনো সেকেন্ড হননি। উনার জীবনে হেরে যাওয়ার কোন রেকর্ড নেই। শায়লার সাথে এই ব্যাপারে কথা বলে উনি এখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন শায়লার দিকে। উনি বুঝে উঠতে পারছেন না হেরে গিয়ে মানুষ কিভাবে আনন্দ পায়।

শায়লা চুপ করে বসে আছে। বসও চুপ করে বসে শায়লাকে দেখছেন। আবার প্রশ্ন করলেন, 'রোজ হেরে যান বললেন। ব্যাপারটা বুঝলাম না।'

'আমি যখন বাসায় থাকি। সেই সময়ে কখনো না কখনো আমাকে হারতেই হয় স্যার। দিনে অসংখ্যবার।'

'কিভাবে হারেন? কার কাছে হারেন?'

'আমার দুই বছর তিন মাসের ছেলেটার কাছে। আমার বাবাইটার কাছে। ওর সাথে কোনো যুদ্ধে আমি আজ পর্যন্ত জিততে পারিনি স্যার। মাঝেমাঝে বাবাই সোনাটা খুব দুষ্টুমি করে। অফিস থেকে ফিরে সব সময় মেজাজ ঠাণ্ডা রাখা যায় না। বাবাইটার উপর রাগ করে চুপচাপ বসে থাকি। ও তখন আমার গলা ধরে ঝুলে পরে। কিন্তু আমি একবারের জন্যও সেই রাগ ভাঙতে চাই না। বাবাই তখন আমার সারা মুখে চুমু দিয়ে ভরিয়ে দেয়। ওর ছোট্টছোট্ট হাত দিয়ে আমার সারা মুখে হাত বুলিয়ে দেয়। বিশ্বাস করেন স্যার, সেই মুহূর্তে আমার সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমিষে চলে যায়। আমার রাগ পানি হতে থাকে। তাও অভিমান করে বসে থাকি। বাবাই আমার জন্য দৌড়ে গিয়ে গ্লাসে পানি নিয়ে আসে। আমাকে খাইয়ে দেয় মুখে তুলে। আমার সারা শরীর শীতল হয়ে যায়। আমার মনটা সজীব হয়ে যায়। বাবাইকে বুকের ভিতরে জড়িয়ে ধরি। ও খুব শান্ত হয়ে বিড়াল ছানার মতো মিউমিউ করে বলে- আর দুত্তামি কব্বো না মা! ওর মুখে এই মা শব্দটা শুনলেই সারা দুনিয়া আমার কাছে রঙিন লাগে। আমি হেরে যাই আমার বাবাইটার কাছে। ওর সাথে রাগ করে আমি আজ পর্যন্ত কখনো জিততে পারিনি স্যার। এই হেরে যাওয়ায় যে কি আনন্দ। কি মায়া। আমি আপনাকে বোঝাতে পারবো না স্যার।'

'ঠিক আছে আপনি আসুন। ফাইলটা আজ আর রেডি না করলেও চলবে। কাল এসে করবেন। আজ বাসায় চলে যান।'

'স্যার! মাত্র তো অফিসে এলাম। এখন চলে যাবো কেন?'

'অফিসটা কি আমার নাকি আপনার? অফিস কি করে চালাতে হয় সেটা কি আমি বুঝবো নাকি আপনি বুঝবেন?'

'স্যরি স্যার!'

'বাসায় যান। আর যাওয়ার সময় আপনার ছেলে যা খেতে পছন্দ করে কিনে নিয়ে যাবেন। এবার আসুন আপনি।'

'স্যার...'

কথাটা শেষ করতে পারলো না শায়লা। বস হাতের ইশারায় থামিয়ে চলে যেতে বললেন। শায়লা বসকে যেমন খুব শ্রদ্ধা করে। ভয়ও পায়। মানুষটা একটু অদ্ভুত। যখন যা বলেন সেটা না করলে উনি খুব চিৎকার করে কথা বলেন। শায়লা আর কিছু না বলে ফাইলটা নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

ইমতিয়াজ মৃধা। ষাট বছর বয়সের একজন মানুষ। একটু রুক্ষ। কিন্তু এখনো খুবই কর্মঠ। অফিসের অন্য সবাই ইমতিয়াজ মৃধাকে আড়ালে আবডালে বালাইষাট বলে ডাকে এখন। জীবনে কোথাও সেকেন্ড হননি। কোন পরীক্ষায় হেরে যাননি। কোনো চ্যালেঞ্জে হেরে যাননি।

শায়লা রুম থেকে যাওয়ার পরে উনার মন বিষণ্ণতায় পেয়ে বসলো। শায়লা মেয়েটাকে অনেক স্নেহ করেন উনি। সবকাজ খুব সুন্দর গুছিয়ে করে শায়লা। মাঝেমাঝে শায়লার সাথে অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলেন। অনেক প্রশ্ন করেন। শায়লা কিভাবে যেন খুব সুন্দর করে গুছিয়ে উত্তর দেয়। উনার খুব ভালো লাগে উত্তর গুলো শুনে। কিন্তু তা প্রকাশ করেন না। রুক্ষ ভাবটা মুখেই ধরে রাখেন।

কিন্তু আজ শায়লা যা বলে গেলো; উনার মনটা নিমিষে কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছে। সারাটা জীবন পড়ালেখা আর ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটেছেন কাজ পাগল ইমতিয়াজ মৃধা। বিয়ে আর করা হয়নি। বিয়ে না করায় কোন আক্ষেপও ছিল না। বেশ চলে যাচ্ছিলো জীবনটা। কিন্তু এই সকালবেলা সব হিসেব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো। সেক্রেটারিকে ফোন দিয়ে বললেন কেউ যেন না আসে এখন রুমে। কেউ ফোন দিলে যেন বলে পরে কল দিতে।

নিজের চেয়ার থেকে উঠে এসে টাইয়ের নট হালকা করতে করতে সোফায় এসে বসলেন। শার্টের হাতা গুটিয়ে কনুইয়ের কাছে তুললেন। অথচ এই কাজটা উনি কখনোই করতেন না। সব আজ এলোমেলো লাগছে। সবকিছুতে জয়ী হওয়া মানুষটাই যেন আজ সবচেয়ে পরাজিত একজন মানুষ। মেয়ের বয়সী শায়লা মেয়েটার কাছে হেরে গেলো ইমতিয়াজ মৃধা। শায়লাও কখনো কোথাও হারেনি। এই অফিসেই ছিল শায়লার প্রথম ইন্টার্ভিউ। এখানেই চাকরিটা হয়ে গেলো। শায়লা জিতে গেছে ওর ছেলের কাছে পরাজিত হয়ে। শায়লা জিতে গেছে সবকিছু জয় করার পরেও একটা পরিবার গড়ে তুলতে পেরে। ইমতিয়াজ মৃধা এইখানটায় এসে হেরে গেলেন।

আগে কখনো বিন্দুমাত্র আক্ষেপ উনার ছিল না। কিন্তু মনটা আজ যেন অনেক কিছুর অভাব অনুভব করছে। উনার এতো বড় বাড়িতে কয়েকটা রুম আছে ঠিকই। কিন্তু একটাও ঘর নেই। সংসার ছাড়া কোন বাসা যে ঘর হয় না এটা খুব করে বুঝতে পারছেন।

আজ যদি উনার ঘর থাকতো। তাহলে হয়তো শায়লার মতো তেজি একটা মেয়ে থাকতো। শায়লার ছেলেটার মতো একটা নাতি থাকতো। যেই নাতির কাছে উনি প্রতি মুহূর্তে হেরে যেতেন। হেরে গিয়ে জিতে যেতেন। নাতিটা সারা বাড়ি হয়তো চিৎকার করে বলতো- দাদা আমার সাথে পারে নাই। দাদাকে লাড্ডুগুড্ডু বানাই দিছি।

নাতিটা যত খুশি হতো দাদাকে হারিয়ে তারচেয়েও কয়েকগুণ বেশি খুশি হতো ইমতিয়াজ মৃধা নাতির কাছে হেরে গিয়ে। পরিবারের মানুষ গুলোর কাছে ভালবাসায় হেরে যাওয়ার মতো বিজয় মনে হয় দুনিয়ার আর কোথাও নেই।

ইমতিয়াজ মৃধা ফোনটা হাতে নিয়ে শায়লার নাম্বারের উপরে আঙুল ঘুরাচ্ছেন। উনার খুব ইচ্ছে করছে শায়লাকে ফোন দিয়ে জিগ্যেস করতে; ওর ছেলের পছন্দের খাবার কি। পছন্দের খেলনা কি। উনার খুব করে ফোন দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, 'মা শায়লা, আমি কি আজ দুপুরে তোর বাসায় দু'টো ডাল ভাত খেতে পারি? আমাকে কি আজ একটু তোর পরিবারের সাথে থাকতে দিবি! আমি ঘোড়া সেজে তোর ছেলেকে পিঠে চড়াবো। ওর সাথে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে গিয়ে হেরে যাবো। তুই শুধু খাবার টেবিলে আমার খাওয়া হয়ে গেলেও; পাতে আরেক চামচ ভাত তুলে দিয়ে শুধু একবার বলিস- বাবা এটুকু খেলে কি হবে; আরেকটু খাও...'

ঘর || শাকিল রনি

২০০৪১৯

#শাকিল_রনির_পোস্ট_সমগ্র

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login