Story

নিন্দুক

October 28, 2026

7 views

বুয়েটের লাল ইটের চত্বরে যখন পা রেখেছিল সুজন, তখন তার পুরো পৃথিবীটাই ছিল অচেনা। কাঁধে একটা মলিন কাপড়ের ব্যাগ, পরনে একমাত্র ইস্ত্রি-না-করা সুতি শার্ট আর পায়ে ফিতা জোড়া দেওয়া স্যান্ডেল। আহসানউল্লাহ হলের বারান্দা দিয়ে দামি স্নিকার্স আর ব্র্যান্ডেড জিন্স পরা শহরের সচ্ছল তরুণদের যখন সে দল বেঁধে হাসাহাসি করতে দেখত, তখন নিজের অজান্তেই সে দেওয়ালের ছায়ার সঙ্গে মিশে যেত। তার প্রতিদিনের দিনলিপি ছিল এক নিষ্ঠুর ক্লান্তি আর অবিরাম জেদের আখ্যান। সকালে ক্লাস ও কড়া ল্যাব সেশন, দুপুরে বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ার সবচেয়ে কমদামী ডাল-ভাতের থালা, আর বিকেল নামতেই শুরু হতো আরেক জীবন। পলাশী মোড় পেরিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি কিংবা আজিমপুরের গলিগুলোতে তিনটি টিউশনি সেরে যখন সে হলে ফিরত, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত দশটা ছুঁইছুঁই। সহপাঠীরা যখন আড্ডায় মাতত বা গিটারের তারে সুর তুলত, সুজন তখন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির কোণে কিংবা ডিপার্টমেন্টের ল্যাবে বসে পুরোনো ধার করা বইয়ের পাতা উল্টাত।

তৃতীয় বর্ষের শেষার্ধে এসে সুজন তার স্বপ্নের প্রজেক্টে হাত দেয়,গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য 'স্বল্পমূল্যের সমন্বিত সোলার মাইক্রোগ্রিড ও সেচ ব্যবস্থা'। যে গ্রামে বিদ্যুতের অভাবে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়, লোডশেডিংয়ের কারণে অন্ধকার ঘরে কেরোসিনের ধোঁয়ায় শিশুদের চোখ জ্বলে, সেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই সে সৌরশক্তিকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এই স্বপ্নপূরণের পথ ছিল কাঁটায় ভরা। আধুনিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত সেন্সর, ফটোভোলটাইক সেল আর সার্কিট কেনার সামর্থ্য তার ছিল না। পুরোনো ইলেকট্রনিক্স মার্কেট থেকে বাতিল যন্ত্রাংশ কুড়িয়ে এনে সে জোড়াতালি দিয়ে নিজের ল্যাব মডিউল তৈরি করত।

ঠিক এই কঠিন সময়েই তার জীবনে আসে নন্দিনী। নন্দিনী ছিল কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। শহরের অভিজাত পরিবারের মেয়ে, কিন্তু চালচলনে ছিল অদ্ভুত এক মাটির ছোঁয়া আর স্নিগ্ধ গভীরতা। প্রজেক্টের স্বয়ংক্রিয় কন্ট্রোলিং সফটওয়্যার ও অ্যালগরিদম তৈরির কাজে একজন দক্ষ প্রোগ্রামারের খোঁজে ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের হেড নন্দিনীকে সুজনের প্রজেক্ট পার্টনার হিসেবে যুক্ত করে দেন।

প্রথম প্রথম দুজনের জগৎ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। সুজনের ছিল অভাবজনিত আড়ষ্টতা আর নিজের চারপাশে গড়ে তোলা এক অদৃশ্য দেওয়াল। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা তার ছিল বললেই চলে, আর নন্দিনীর মতো ব্যক্তিত্বময়ী, স্বতঃস্ফূর্ত তরুণীর সামনে এলে তার কথা জড়িয়ে যেত। কিন্তু নন্দিনী খুব দ্রুতই সেই দেওয়াল চিনে ফেলেছিল। সে দেখত, যে ছেলেটি সারাদিন না খেয়ে থাকে, যে ছেলেটি ছেঁড়া জুতো লুকিয়ে রাখে টেবিলের নিচে,সেই ছেলেটির চোখের তারায় যখন কোনো জটিল ইলেকট্রনিক সার্কিটের সমাধান জ্বলে ওঠে, তখন সেখানে কোনো দারিদ্র্য থাকে না, থাকে এক অপরাজেয় দীপ্তি।

দিনের পর দিন বুয়েটের ইসিই ল্যাবে কাজ করতে করতে কখন যে তাদের কাজের সম্পর্ক হৃদয়ের গভীরে শিকড় গেড়েছিল, তারা নিজেরাও টের পায়নি। রাত গভীর হতো, সার্কিট বোর্ডের পোড়া রেজিনের গন্ধ আর সোল্ডারিং আয়রনের নীল ধোঁয়ায় ভরে থাকত ল্যাব। টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত কোডিংয়ের খসড়া আর সার্কিট ডায়াগ্রাম।

একদিন একটানা আঠারো ঘণ্টা ল্যাবে কাজ করার পর সুজনের হাত হঠাৎ কাঁপতে শুরু করে। লো ব্লাড সুগারে সে চেয়ারে ঢলে পড়ার উপক্রম হয়। নন্দিনী বুঝতে পারে, ছেলেটা গতকাল দুপুর থেকে পেটে একদানা ভাতও দেয়নি।নন্দিনী টেবিলের ওপর নিজের টিফিন বক্স খুলে জোর করে সুজনের সামনে ধরেছিল।

"আপনি কি নিজেকে মেরে ফেলতে চান সুজন?" নন্দিনীর চোখ ছলছল করে উঠেছিল।

সুজন অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলেছিল, "আমার অভ্যাস আছে নন্দিনী। পেটের ক্ষুধা তো অনেক পুরোনো সাথী।"

"আপনার পুরোনো সাথী থাকতে পারে, কিন্তু এখন থেকে আর কোনো না খেয়ে কাজ করা চলবে না। নিন, খান।" নন্দিনী নিজের হাতে একটা চামচ সুজনের মুখে তুলে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সুজন লজ্জা পেয়ে নিজেই বক্সটি টেনে নেয়। সেদিন খাবার খাওয়ার সময় নন্দিনী ফিসফিস করে বলেছিল, "আপনি এত বড় একটা লড়াই একা লড়ছেন, আমাকে কি একটু পাশে দাঁড়াতেও দেবেন না?"

সেই শুরু। নন্দিনীর স্পর্শ সুজনের রুক্ষ জীবনে এনে দিল বসন্তের বৃষ্টি। নন্দিনী তার ল্যাপটপটা সুজনের জন্য উন্মুক্ত করে দিল, রাত জেগে সুজনের হার্ডওয়্যার ডেটার জন্য সুক্ষ্ম অপটিমাইজেশন অ্যালগরিদম লিখে দিল। কত নির্জন সন্ধ্যায় কার্জন হলের লাল ইটের বারান্দায় কিংবা বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ার কোনায় তারা এক কাপ চা ভাগ করে খেয়েছে। নন্দিনী সুজনকে দেখাত আকাশ, আর সুজন তাকে শোনাত মাটির কথা,চৈত্র মাসে রূপসা নদীর চরের তৃষ্ণা আর এক বাবার ভাঙা রিকশার প্যাডেল ঘোরার গল্প।

"সুজন, তুমি একদিন অনেক উঁচুতে উঠবে," ক্যাফেটেরিয়ার কাঠের টেবিলে সুজনের হাত ছুঁয়ে বলেছিল নন্দিনী। "তোমার প্রতিভার ওপর আমার বিশ্বাস পাহাড়ের চেয়েও অটল। পৃথিবীর সব মানুষ একদিকে দাঁড়িয়ে যদি তোমার দিকে পাথর ছোঁড়ে, মনে রাখবে,আমি অন্যপাশে দাঁড়িয়ে তোমার হাত ধরে থাকব।"

সেই স্পর্শ সুজনকে শক্তি জোগাত। ক্লান্তি তার কাছে হার মানত। চূড়ান্ত পরীক্ষার ঠিক এক সপ্তাহ আগে তাদের তৈরি সৌর পাম্পের মূল চিপটি ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েশনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। দীর্ঘ দুই বছরের পরিশ্রম এক নিমিষে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছিল। ল্যাবের মেঝেতে বসে মাথায় হাত দিয়ে কেঁদে ফেলেছিল সুজন।

সেদিন নন্দিনী ভেঙে পড়েনি। সে নিজের শখের ক্যামেরা আর কিছু জমানো টাকা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নীলক্ষেত ও নবাবপুর চষে নতুন মাইক্রোকন্ট্রোলার কিনে আনে। একটানা ছত্রিশ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে সুজন আবার সার্কিট জোড়া দেয়, আর নন্দিনী ব্যাক-এন্ড কোড রি-রাইট করে।

যখন সিস্টেমটি আবার চালু হলো এবং স্ক্রিনে নিখুঁত এনার্জি গ্রাফ ভেসে উঠল, তখন ভোরের আলো ফুটছিল ল্যাবের জানালার কাচ চিরে। উত্তেজনায়, আনন্দে নন্দিনী নিজের সমস্ত দ্বিধা ভুলে জড়িয়ে ধরেছিল সুজনকে। সুজনের গায়ের ঘামভেজা শার্ট আর সোল্ডারিংয়ের গন্ধকে নন্দিনী আঁকড়ে ধরেছিল এক পরম ভালোবাসায়। সুজন প্রথমবারের মতো অনুভব করেছিল, শুধু প্রতিশোধ বা ক্ষোভ নয়,ভালোবাসাও হতে পারে মানুষের বেঁচে থাকার এবং সফল হওয়ার সবচেয়ে মহৎ প্রেরণা।

তাদের এই যৌথ উদ্ভাবন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরাই নির্বাচিত হয়নি, আন্তর্জাতিক জার্নালে শীর্ষস্থান অর্জন করে জার্মানির সেই বিশ্বখ্যাত সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সাফল্যের সেই লাল গালিচায় দাঁড়িয়ে সুজন যখন তার নিয়োগপত্র হাতে পেল, ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নন্দিনী তার বুকে মাথা রেখে বলেছিল, "আমি জানতাম সুজন, তুমি পারবে। তোমার ডানায় কোনো শকুনের নজর কোনোদিন দাগ ফেলতে পারবে না।"

সুজন তার ভালোবাসার হাতটি শক্ত করে ধরে বলেছিল, "এই জয় আমার একার নয় নন্দিনী। এ জয় তোমার আস্থার, আর আমার মাটির কাছে ফিরে যাওয়ার প্রতিজ্ঞার।"

হরিণটানা গ্রামে গাড়ির বহর এসে থামার দৃশ্যটা গ্রামবাসীদের কাছে ছিল কোনো রূপকথার মতো। তবে সেই বিস্ময়ের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে গেল, যখন সামনের কালো পাজেরো গাড়িটির দরজা খুলে প্রথমে নেমে এলেন এক তরুণী। গায়ে হালকা জামদানি শাড়ি, কপালে ছোট্ট একটা টিপ, আর মুখে অদ্ভুত এক মায়াবী স্নিগ্ধতা। শহরের ধুলোবালি বা বিত্তের কোনো দেমাক তার চোখেমুখে ছিল না। নন্দিনী নেমে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিল সুজনের দিকে। এরপর গাড়ি থেকে নামলেন সুজনের মা রাবেয়া বেগম আর বাবা রমিজ মিয়া।

গ্রামের উঠানে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। এককালে যারা সুজনের বাবাকে রিকশার ভাড়ার জন্য তাচ্ছিল্য করত, কিংবা রাবেয়া বেগমের ছেঁড়া আঁচল দেখে মুখ ফিরিয়ে নিত, তারা আজ চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে রইল।

"ও মাগো! এ কার ঘরের পরী রে?" ভিড়ের ভেতর থেকে ফিসফিস করে উঠল করিমের মা। "শুনলাম শহরের মস্ত বড় ঘরের মাইয়া, নিজে ইঞ্জিনিয়ার! রিকশাওয়ালার পোলা এমন রাজকন্যা পাইল কেমনে?"

"পায় নাই ক্যান? সুজন কি এখন আর সেই আগের সুজন আছে? দুনিয়া কাঁপানো ইঞ্জিনিয়ার হইছে! নিজের যোগ্যতায় সোনার হরিণ ধইরা আনছে!" পাশ থেকে জবাব দিল গ্রামেরই এক প্রবীণ কৃষক।নন্দিনী ভিড়ের ফিসফিসানি কানে নিল না। সে সোজা এগিয়ে গেল উঠানের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সুজনের জীর্ণ কুঁড়েঘরটির দিকে। যে মাটির দেওয়াল চুইয়ে বর্ষার জল পড়ত, যেখানে একসময় আধপেটা খেয়ে সুজন স্বপ্ন দেখত, নন্দিনী পরম শ্রদ্ধায় সেই ঘরের মাটির ভিটে স্পর্শ করে মাথায় ঠেকাল।

তারপর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা সুজনের মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করল।

রাবেয়া বেগম থতমত খেয়ে পিছিয়ে যেতে চাইলেন। তাঁর হাত দুটো কাঁপছিল। "আরে মা, কর কী! আমি গরিব মানুষ, পায়ে হাত দিও না..."

নন্দিনী তাঁর হাত দুটো নিজের নরম হাতের মুঠোয় তুলে নিল। অত্যন্ত শান্ত ও মধুর গলায় বলল, "মা, যে মা ছাইপাঁশ খেয়ে, চোখের জল ফেলে সুজনের মতো একটা হিরে এই দেশকে উপহার দিয়েছেন, তাঁর পায়ের ধুলো তো মাথায় তুলে নেওয়ার মতো। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন।"

রাবেয়া বেগমের চোখ দিয়ে শ্রাবণের ধারার মতো আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি নন্দিনীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। উপস্থিত গ্রামের মহিলারা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে লাগলেন।গ্রামের মাতব্বর আর নিন্দুকেরা  তখন ভিড়ের একপাশে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা ভেবেছিল, সুজন হয়তো শহরের কোনো অহংকারী বড়লোকের মেয়েকে নিয়ে এসে গ্রামের গরিব মানুষকে তাচ্ছিল্য করবে। কিন্তু নন্দিনীর এমন বিনয় আর সরলতা তাদের মুখের সমস্ত কুৎসিত কথাগুলোকে মুহূর্তেই ধুলোয় মিশিয়ে দিল।

সুজন যখন নন্দিনীর পাশে এসে দাঁড়াল, নন্দিনী মৃদু হেসে সুজনের কানে ফিসফিস করে বলল, "তোমার মাটির গন্ধটা সত্যিই খুব মিষ্টি সুজন। এবার বোঝো, তোমার শেকড়টা কত খাঁটি বলেই তুমি এত বড় ঝড় সামলে দাঁড়াতে পেরেছ।"

সুজন তার বাবার কাঁধে হাত রেখে গ্রামবাসীদের দিকে তাকাল। তার পাশে নন্দিনী,এক অচেনা সাহস, ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে। আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হরেন শিকদারের মতো নিন্দুকের দল তখন কেবল নির্বাক দর্শকের মতো নিজেদের ক্ষুদ্রতা আর পরাজয় প্রত্যক্ষ করছিল।

সুজন যখন নন্দিনীকে নিয়ে নতুন স্কুল ও কারিগরি কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল, তখন ভিড়ের ভেতর থেকে এক করুণ আর্তনাদের মতো শব্দ ভেসে এল। হঠাৎ করেই হাত থেকে কাঠের লাঠিটা ফেলে দিয়ে হরেন শিকদার ধপাস করে মাটিতে বসে পড়লেন। তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপছিল, চোখ দিয়ে বাঁধভাঙা জলের মতো অশ্রু গড়িয়ে সাদা দাড়িতে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। বুক চাপড়ে তিনি এমনভাবে কাঁদতে লাগলেন, যেন বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা পাপের বোঝা আর তিনি একা বইতে পারছেন না।

গ্রামের মানুষজন স্তব্ধ হয়ে গেল। যে হরেন শিকদারের এক হুঙ্কারে পুরো হরিণটানা গ্রাম কাঁপত, যার ভয়ে গরিব-দুখী মানুষ মেঠোপথ ছেড়ে জঙ্গলের আড়ালে লুকাত,তিনি আজ নিজের অহংকারের ছাইয়ের ওপর আছড়ে পড়েছেন। সুজন থেমে গেল। নন্দিনীর হাতের বাঁধনটা আলগা করে সে পেছনে তাকাল। তারপর ধীরপায়ে ফিরে এল মাটিতে লুটিয়ে পড়া বৃদ্ধের কাছে। নন্দিনীও সুজনের পাশাপাশি এসে দাঁড়াল।

"সুজন রে... ও বাবা সুজন!" হরেন শিকদার মাটির ধুলো মেখে সুজনের চকচকে জুতোর কাছে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সুজন সরে যাওয়ার আগেই তিনি দুই হাতে সুজনের পা চেপে ধরলেন।

"আমারে তুই মানুষ বইলা ক্ষমা করিস না রে বাপ, আমি জানোয়ারের অধম! আমার মতো কুলাঙ্গাররে তুই পা ছুঁইয়া সালাম করলি কোন পরাণে? তার চেয়ে তোর একজোড়া চাবুক দিয়া আমারে মাইরা ফেলতি, আমার এই কলিজার জ্বালা তাও জুড়াইত!"

সুজন তৎক্ষণাৎ ঝুঁকে পড়ে শিকদারের কাঁধ ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করল। "কাকা, কী করছেন আপনি! উঠুন, সবার সামনে এমন করবেন না।"

"না, আমারে উঠতে বলিস না রে বাজান! সবার সামনেই আজ আমার বিচার হউক!" শিকদার চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর গলা ভেঙে ফেটে যাচ্ছিল। "আজীবন আমি তোদের ভাতে মারার ফন্দি আঁটছি। তোর বাপের ওষুধ কেনার দশটা টাকা চাইলে দূর দূর কইরা তাড়াইয়া দিছি। মুখে বিষ ঢালছি প্রতিদিন, আর আজ তুই আমার চিকিৎসার ভার নিয়া আমার মুখে এমন থাপ্পড় মারলি রে বাপ, যার দাগ মরার পরেও মুছব না!"

চারপাশের গ্রামবাসীদের চোখে তখন নানা রঙ। কেউ একসময় এই লোকের ভয়ে তটস্থ থাকত, আজ তাঁর এমন করুণ দশা দেখে কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কেউ বা মুখ ফিরিয়ে নিল।

নন্দিনী শান্তপায়ে একধাপ এগিয়ে এসে হরেন শিকদারের সামনে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো আক্রোশ ছিল না, ছিল গভীর এক করুণা। নন্দিনী খুব মৃদু, কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "শিকদার কাকা, মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে কি পাপ কমে? সুজন আপনাকে ক্ষমা করেছে বলেই আপনার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে। সে প্রতিশোধ নেয়নি, সে জয় করেছে। আপনি যদি সত্যিই নিজের ভুল বুঝে থাকেন, তবে পা ধরে ক্ষমা না চেয়ে বাকি জীবন মানুষের সেবা করে নিজের প্রায়শ্চিত্ত করুন।"

নন্দিনীর কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল হরেন শিকদারের অন্তরে। তিনি চোখ তুলে তাকালেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুটো তরুণ প্রাণ,যাদের তিনি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, তারাই আজ তাঁকে নতুন করে বাঁচার পথ দেখাচ্ছে। হরেন শিকদার কাঁপা কাঁপা হাতে চোখ মুছলেন। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে হাতজোড় করলেন পুরো গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে।

"ও হরিণটানার মানুষ, তোরা সাক্ষী থাকিস! আমি তোদের বহু মানুষের ভিটা কাইড়া নিছি, সুদের জালে জড়াইয়া নিঃস্ব করছি। আমার নিজের পোলা আমারে ত্যাগ কইরা শহরে ভাগছে, আমার আড়ত গেছে, সম্মান গেছে। খোদা আমারে এই দুনিয়াতেই দোযখ দেখাইয়া দিছে। আজ সুজনের এই মাটির সামনে শপথ কইরা কইতাছি,আমার যেটুকুন ভিটা অবশিষ্ট আছে, আমি এই কারিগরি কলেজের নামে লেইখা দিয়া গেলাম! আমার পাপের এক ফোঁটাও যদি এতে মোছে..."

কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি, কান্নায় তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। সুজন আর কথা বাড়াল না। সে হরেন শিকদারের কাঁধে আলতো করে একটা হাত রাখল,সে স্পর্শে কোনো ঘৃণা ছিল না, ছিল শুধুই এক অমোঘ মুক্তির বার্তা। তারপর সুজন নন্দিনীর হাত ধরে স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তরের দিকে পা বাড়াল।

হরেন শিকদার ধুলোয় বসে তাকিয়ে রইলেন তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে। কুসুমপুরের বাতাসে তখন আর কোনো নিন্দার বিষবাষ্প নেই; শুধু এক অপরাজেয় তরুণের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নতুন এক ভোরের সুর বাজছিল।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login