আদি-বাঙালি নদীর পাড়ে বসিয়া কাদামাটির ওপর কাঠি দিয়া একটা গোল পাত্রের ছবি আঁকিয়াছিল, যাহার ওপর হইতে কুণ্ডলী পাকাইয়া ধোঁয়া উঠিতেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু যুদ্ধ হইয়াছে। কেহ স্বর্ণের জন্য লড়িয়াছে, কেহ ভূখণ্ডের জন্য মরিয়াছে, ট্রয় নগরী ধ্বংস হইয়াছে হেলেনের রূপের কারণে। কিন্তু বাঙালি জাতির পাঁচ হাজার বছরের যাবতীয় সংগ্রাম, কলহ, কবিতা, সাহিত্য এবং আলস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে একটিমাত্র অণু সর্বদা ঘূর্ণায়মান রহিয়াছে,যাহার রাসায়নিক নাম ‘শ্বেতসার’ এবং আটপৌরে নাম ‘ভাত’। বাঙালির কাছে পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত,ভাত, এবং ভাতের আনুষঙ্গিক। এই মহাজাগতিক সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করিয়া প্রশ্ন উঠিতে পারে: এই ভাতের প্রতি এমন সর্বগ্রাসী, অন্ধ ও সর্বনাশা প্রেমের উৎপত্তি কীভাবে ঘটিল? আসুন, ইতিহাসের হাঁড়ি উঁকি দিয়া দেখা যাক।
বৈদিক যুগ ও আদিম ফসিল: মাছে-ভাতে ভূতের আছর
ইতিহাসের ধূলিমলিন পাণ্ডুলিপি ঘেঁটিলে দেখা যায়, আর্যরা যখন উত্তর ভারত দিয়া দাপটের সাথে ঘোড়া ছুটাইয়া প্রবেশ করিল, তখন তাহারা বাংলার মাটিতে আসিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। বঙ্গদেশ তখন ছিল জলাভূমি, খাল-বিল আর বর্ষার কাদায় একাকার। আর্য পণ্ডিতরা নাক সিঁটকাইয়া বলিলেন, “এখানে মানুষ বাস করে না, এরা পক্ষীজাতীয় প্রাণী, এদের ভাষা পাখির ডাকের মতো।”
কিন্তু কেন এই অপবাদ? কারণ বাঙালি তখন ঘোড়া ছুটাইতে কিংবা সোমরস পান করিয়া যুদ্ধ করিতে ব্যস্ত ছিল না। তারা নদীর পাড়ে মাটির সানকিতে কচি কলাপাতা বিছাইয়া ধোঁয়া ওঠা নরম আউশ চালের ভাতের ওপর একটু গাওয়া ঘি এবং এক চিমটি লবণ দিয়া চক্ষু বুজিয়া চর্বণ করিতেছিল। আর্য সেনাপতি এসে যখন হুংকার দিয়া বলিলেন, “বশ্যতা স্বীকার করো!” বাঙালি চোখ আধবোজা অবস্থায় আঙুলের ডগায় এক গ্রাস অন্ন তুলিয়া বলিল, “আহা, চিল্লাচিল্লি করিস না বাপু, ডালটা ঠান্ডা হইয়া যাইতাছে। যুদ্ধ পরে হইব, আগে খাইয়া একখান ভাতঘুম দিয়া লই।”
ঐতিহাসিক দলিল ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’-এ স্পষ্ট লেখা আছে:
"ওগ্গর ভত্তা গাইক ঘিত্তা, দুগ্ধ সজুত্তা মোইলি মচ্ছা।
দিজ্জই কন্তা খাই পুনবন্তা..."
সহজ বাংলায় এর অর্থ: থালায় গাওয়া ঘি সহযোগে গরম ফ্যানা ভাত, সাথে মৌরি বা মাছের ঝোল,যে পুরুষের কপালে এই খাদ্য তাহার স্ত্রী পরিবেশন করে, সেই পুরুষই পুণ্যবান!
লক্ষ করুন, প্রাচীন যুগেও বাঙালি কাব্যে কোনো স্বর্ণমুদ্রা, রাজপ্রাসাদ কিংবা বিশ্বজয়ের স্বপ্ন লেখে নাই। বাঙালির স্বর্গের সংজ্ঞাই ছিল ভাত আর মাছের ঝোল। রোমানরা যখন কলোসিয়ামে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই দেখিয়া উল্লাস করিত, গ্রিকরা যখন অলিম্পিকে বর্শা নিক্ষেপ করিত, তখন প্রাচীন বাঙালি নদীতীরে বসিয়া আঙুল চাটিয়া ভাতের শেষ লোকমাটি উদরস্থ করিয়া ডেকুর তুলিত। এই প্রেম এক-দুই দিনের নহে; ইহা আমাদের সেলুলার মেমোরি বা কোষের স্মৃতিতে খোদাই করা।
মধ্যযুগ ও বারোভূঁইয়ার খানাখন্দ: এক মণ চালের মহিমা
মধ্যযুগে মোঘলরা যখন বাংলা দখল করিতে আসিল, তখন তাহাদের সাথে আসিল বিরিয়ানি, কোরমা আর পোলাওয়ের রাজকীয় সুবাস। মোঘল সুবাদাররা ভাবিয়াছিলেন, জাফরান আর মাংসে মেশানো এই রাজকীয় খাদ্য দিয়া বুঝিবা বাংলার মানুষদের গোলাম বানাইয়া ফেলা যাইবে।
কিন্তু মোঘলরা জানিত না, বাঙালির পেটের ভেতর স্বয়ং পরমাত্মা এক মাটির হাঁড়ি লইয়া বসিয়া আছেন। কয়েকদিন জাঁকজমকের বিরিয়ানি খাওয়ার পরই মোঘল সেনাদলে থাকা স্থানীয় বাঙালি সিপাহিরা গোপনে বিদ্রোহ ঘোষণা করিল। তাহাদের বক্তব্য সাফ:“মশলাদার পোলাও-মাংস দিয়া আমাদের ভুলাইতে পারিবে না জাহাঁপনা! পেটে শান্তি পাইতে হইলে মোটা চালের ঢ্যাঁড়া ভাত আর শাকের ঘণ্টই লাগিবে!”
ঐতিহাসিকদের মতে, মোঘলদের বঙ্গবিজয়ের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল না বারোভূঁইয়াদের নৌবাহিনী; আসল বাধা ছিল ‘দুপুর আড়াইটার ভাতঘুম’। দুপুরবেলা গরম ভাতের স্তূপ ভক্ষণ করিয়া বাংলার সিপাহিরা এমন এক অলৌকিক নিদ্রায় নিমজ্জিত হইত যে, গোলার আওয়াজেও তাহাদের ঘুম ভাঙিত না। যুদ্ধের ময়দানে যখন রণহুংকার দেওয়ার কথা, তখন তাঁবুর ভেতর হইতে শত শত নাসিকা-গর্জনের সম্মিলিত সিম্ফনি বাজিত। ফলে স্বয়ং সেনাপতি মানসিংহকেও বলিতে হইয়াছিল, “এ জাতিকে তরবারি দিয়া মারা সম্ভব, কিন্তু ভাতের থালা কাড়িয়া লইয়া পরাজিত করা অসম্ভব!”
শায়েস্তা খাঁ-র আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়ার ঘটনাকে আমরা পরম গৌরবের সাথে ইতিহাসে পড়িয়া থাকি। কিন্তু কখনো কি গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিয়াছেন, টাকায় আট মণ ঘি বা আট মণ সোনা পাইলে বাঙালি কি খুশি হইত? কস্মিনকালেও না! আট মণ চাল পাওয়া গিয়াছিল বলিয়াই শায়েস্তা খাঁ আজও বাঙালির হৃদয়ে অমর হইয়া আছেন। বাঙালি যদি কোনোদিন স্বর্গে যায় এবং সেখানে গিয়া দেখে ইন্দ্রদেবের সভায় অমৃতের বদলে চালের অভাব, তবে সে সাথে সাথেই নরকে ট্রান্সফারের আবেদন করিবে,যদি সেখানে এক মুঠো পান্তাভাতের ব্যবস্থা থাকে!
আধুনিক মনস্তত্ত্ব: ‘নাস্তা’ বনাম ‘খাবার’ সংকট
বাঙালির জীবনে সবচেয়ে জটিল ও সাইকোলজিক্যাল চ্যাপ্টারটি হইল ‘খাবার’ শব্দের সংজ্ঞা নির্ধারণ। পৃথিবীর যে কোনো সভ্য দেশে আপনি যদি এক বাটি ওটস, দুটো ডিমসেদ্ধ, তিনটি কলা, চারটা পরোটা, এক বাটি হালুয়া এবং এক গ্লাস দুধ খান,তাহারা বলিব আপনি একটি ভারী খাদ্য গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু কোনো খাঁটি বাঙালির সামনে এই মেনু পরিবেশন করিয়া দেখুন। সে এক নিঃশ্বাসে সবকিছু সাবাড় করিবে, ঠোঁট মুছিবে, তারপর পরম করুণ চোখে আপনার দিকে তাকাইয়া উদাস গলায় বলিবে:“এ তো সকালবেলা সামান্য নাস্তা করিলাম। কিন্তু দুপুর তো হইয়া আসিল, দুপুরে খাবারের কী বন্দোবস্ত?”
বাঙালির অভিধানে ‘খাবার’ শব্দের একমাত্র সমার্থক শব্দ হইল ‘ভাত’। চাল ফুটাইয়া যে শ্বেতবর্ণ নরম দানা উৎপন্ন হয়, তাহা যতক্ষণ না খাদ্যনালী দিয়া পাকস্থলীতে প্রবেশ করিয়া গ্যাস্ট্রিকের অ্যাসিডের সাথে আলিঙ্গন করিতেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাঙালি নিজেকে ‘অনাহারক্লিষ্ট’ বলিয়া মনে করে। আপনি তাহাকে সকালবেলা আস্ত একটি রোস্ট করা খাসি খাওয়াইয়া দিন, সে ঢেঁকুর তুলিয়া বলিবে, “আজ সারা দিন পেটে কোনো দানা পড়ে নাই ভাই! শরীরটা কেমন যেন খালি খালি লাগতাছে!” এই যে ‘দানা’,এই দানা কোনো সাধারণ দানা নহে, ইহা বাঙালির জৈবিক অস্তিত্বের চালিকাশক্তি।
থালার ভূগোল ও গ্রাসের স্থাপত্যকলা
একজন ফরাসি শেফ যখন কোনো প্লেটে খাবার সাজান, তাহাকে বলা হয় ‘প্লেটিং আর্ট’। কিন্তু বাঙালি যে ভাতের থালায় প্রতিদিন যে মহাকাব্যিক স্থাপত্যকলা প্রদর্শন করে, তার কাছে পৃথিবীর সমস্ত ফাইন ডাইনিং তুচ্ছ। বাঙালির ভাতের থালা কোনো সমতল মরুভূমি নহে; ইহা একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।
ধাপ ১: পর্বতমালা নির্মাণ: প্রথমে থালার কেন্দ্রস্থলে গরম চালের একটি বিশাল পিরামিড তৈরি করা হয়।
ধাপ ২: জ্বালামুখ খনন: এরপর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দিয়া সেই পর্বতের ঠিক চূড়ায় একটি গভীর গর্ত বা জ্বালামুখ প্রস্তুত করা হয়।
ধাপ ৩: লাভা নিঃসরণ: সেই গর্তের মধ্যে ঢালিয়া দেওয়া হয় ফুটন্ত ঘন মসুর ডাল অথবা গাঢ় লেবু-লঙ্কার রস।
ধাপ ৪: মাখামাখি ও গ্রাস উত্তোলন: এরপর শুরু হয় হস্তশিল্পের চরম পরাকাষ্ঠা। পাঁচ আঙুল মিলিয়া যখন সেই পর্বত ভাঙিয়া ডাল, ঝোল, ভাজা ও মাছের টুকরা দিয়া এমনভাবে চটকানো হয়,যাহাকে রসায়নবিদরা বলিলে বলিবেন ‘হোমোজিনাস মিক্সচার’ বা সমসত্ত্ব মিশ্রণ। বিদেশিরা চামচ দিয়া খায়, কারণ তাহারা খাদ্যকে ভয় পায়। বাঙালি খায় হাত দিয়া, কারণ খাদ্যের সাথে তাহার সম্পর্ক কেবল জিভের নহে; তাহার সম্পর্ক স্পর্শের, আবেগের এবং কাদার সহিত কৃষকের আদিম বন্ধনের। আঙুলের প্রথম দুই কর পর্যন্ত ভাতের ঝোলে মাখিয়া যখন সেই গ্রাস মুখের ভেতরে নিক্ষিপ্ত হয়, তখন বাঙালির মুখমণ্ডলে যে অপার্থিব স্বর্গীয় সুখের দ্যুতি দেখা যায়, মোনালিসার রহস্যময় হাসিও তাহার কাছে নিতান্তই পানসে!
চিকিৎসা বিজ্ঞান বনাম ভাতের অমর প্রেম
ডায়াবেটিস নামক এক নিষ্ঠুর ব্যাধি আধুনিক বাঙালির দরজায় আসিয়া খলনায়কের মতো দাঁড়াইয়াছে। ডাক্তারবাবু গম্ভীর মুখে প্রেসক্রিপশনে লাল কালি দিয়া লেখেন: “ভাত সম্পূর্ণ বন্ধ! সকালে দুটো শুকনো পাতলা আটার রুটি, দুপুরে এক বাটি ওটস, রাতে সালাদ।” এই প্রেসক্রিপশন দেখামাত্র বাঙালির আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়। তাহার কাছে মনে হয়, আদালত তাহাকে ফাঁসির আদেশ শুনাইয়া দিয়াছে। কিন্তু বাঙালি কি এত সহজেই নতি স্বীকার করিবার পাত্র? কখনোই নহে! শুরু হয় ডাক্তারকে ফাঁকি দিবার জন্য আণবিক স্তরের গভীর গবেষণা:
রুটি-সাইজ এক্সপ্যানশন থিওরি: ডাক্তার বলিয়াছেন দুটো রুটি খাইতে। বাঙালি বাড়িতে আসিয়া বেলুন-চাকি লইয়া বসে এবং রুটির পরিধি এমনভাবে বৃদ্ধি করে যে, একেকটি রুটি দেখতে ফুটবল মাঠের মতো সুবিশাল রূপ নেয়। দুই রুটিতেই আধ কেজি আটা শেষ!
ভাতের পরিমাপের আপেক্ষিকতা: রোগী করুণ মুখে ডাক্তারকে গিয়া বলে, “স্যার, এক মুঠো ভাত কি একদমই খাওয়া যাইবে না?” ডাক্তার দয়া পরবশ হইয়া বলিলেন, “আচ্ছা, খুব ইচ্ছা করিলে সামান্য এক কাপ খাইয়েন।” বাড়ি আসিয়া রোগী সেই ‘এক কাপ’ ভাত মাপার জন্য বাজারে গিয়া আধা লিটারের কফি মাগ কিনিয়া আনে!
চিরন্তন সান্ত্বনা: ডায়াবেটিস রোগী যখন কাঁচুমাচু মুখে এক থালা ভাতের সামনে বসে, তখন তাহার চোখ দিয়া আনন্দাশ্রু ঝরে। সে মনে মনে বলে, “সুগার বাড়িলে ইনসুলিন ইনজেকশন দুই ইউনিট বেশি লব, ক্ষতি নাই। কিন্তু এই ধোঁয়া ওঠা নরম আউশের লোকমা ছাড়া এই জীবন রাখিয়া কী লাভ?”
এই আত্মঘাতী অথচ রোমান্টিক ভালোবাসার কোনো তুলনা কি পৃথিবীর কোনো চিকিৎসা বিজ্ঞানের জার্নালে মিলিবে?
পান্তা ও বৈশাখ: বারোমাসি প্রেমের আন্তর্জাতিকীকরণ
বাঙালি ভাতের রূপের বৈচিত্র্য লইয়া খেলা করিতে ভালোবাসে। গরম ভাতের সাথে তাহার সম্পর্ক যদি হয় প্রেমের পূর্ণিমার মতো, তবে ‘পান্তা ভাত’-এর সাথে তাহার সম্পর্ক হলো আধ্যাত্মিক সুফি সাধনার মতো!
রাতের বেলা উদ্বৃত্ত ভাতের মধ্যে ঠান্ডা জল ঢালিয়া রাখিয়া দিলে সারা রাত ধরিয়া এক অদ্ভুত ব্যাকটেরিয়া ঘটিত ম্যাজিক বা ফারমেন্টেশন ঘটে। পরদিন সকালে সেই পান্তা ভাতের থালায় একটুখানি সরিষার তেল, এক চিমটি পোড়া শুকনা মরিচ, কাঁচা পেঁয়াজের ফালি এবং এক টুকরো পচা গন্ধযুক্ত শুঁটকি ভর্তা অথবা ইলিশের লেজ,উফ!
এই পান্তা যখন পেটে যায়, তখন পেটের ভেতরের উষ্ণতা নিমেষে জুড়াইয়া বরফ হইয়া যায়। সেই সাথে মস্তিষ্কের কোষে কোষে এক চরম শান্তির সিগন্যাল পৌঁছায়।
বাঙালি এই পান্তাকে কেবল ঘরের কোণেই আটকাইয়া রাখে নাই, পহেলা বৈশাখের দিন কোটি টাকার স্যুট-বুট পরা আধুনিক কর্পোরেট এক্সিকিউটিভও মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ লইয়া রোদের মধ্যে দাঁড়াইয়া থাকে। যে খাদ্য এককালে ছিল দরিদ্র কৃষকের গ্রীষ্মকালীন শক্তির উৎস, তাহা আজ বাঙালির সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের প্রধানতম ব্র্যান্ড!
ভাতঘুম: এক অলিখিত জাতীয় সঙ্গীত
ভাতের মাহাত্ম্য আলোচনা করিতে গিয়া যদি ‘ভাতঘুম’-এর উল্লেখ না করা হয়, তবে ইতিহাসের পাতা অপবিত্র থাকিয়া যাইবে। ভাত এবং ঘুম,ইহাদের সম্পর্ক শরীর ও ছায়ার মতো।
বিজ্ঞান বলে, ভাতের মধ্যে থাকা উচ্চমাত্রার কার্বোহাইড্রেট ও ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামাইনো অ্যাসিড মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন হরমোনের বন্যা বহাইয়া দেয়। ফলে মস্তিষ্ক সংকেত পাঠায়: “চোখ বোজো, পৃথিবী গোল, তোমার আর কিছুই করার দরকার নাই।”
কিন্তু বাঙালি বিজ্ঞান মানিয়া ঘুমায় না; বাঙালি ঘুমায় ধর্মীয় নিষ্ঠার সাথে। ঘড়িতে যখন দুপুর আড়াইটা বাজে, থালায় যখন ভাতের শেষ কণাটি নিঃশেষ হয় এবং তাহার ওপর এক গ্লাস ঠান্ডা জল ঢালিয়া উদরস্থ করা হয়,তখনই বাঙালির শরীরে নেমে আসে এক মহাজাগতিক মোহ।
তখন আপনি তাহাকে পদোন্নতির চিঠি দিন, লটারিতে দশ কোটি টাকা জেতার খবর দিন, কিংবা ঘরের বাইরে সাইরেন বাজাইয়া যুদ্ধ ঘোষণা করুন,বাঙালি কেবল বালিশটা একটু চাপড়াইয়া নরম করিবে, সিলিং ফ্যানের রেগুলেটর পাঁচে ঘুরাইবে এবং পাশ ফিরিয়া বলিবে:“সব ঠিক আছে ভাই, যা বলার বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর কহিও। এখন ডিস্টার্ব করিও না, ভাতটা নামতে দেও।”
এই ভাতঘুমের গভীরতা মাপার কোনো সিসমোগ্রাফ যন্ত্র আজও আবিষ্কৃত হয় নাই। এই ঘুম কেবল ক্লান্তি মোচনের জন্য নহে; ইহা এক আত্মিক পুনর্জন্ম, যাহার মাধ্যমে বাঙালি প্রতিদিন বিকেলে এক নতুন মানুষ হইয়া বিছানা হইতে জাগিয়া ওঠে এবং পুনরায় সন্ধ্যার চা ও রাতের ভাতের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাতের বাঙালি অ্যাম্বাসেডর
বাঙালিকে আপনি ইউরোপে পাঠান, আমেরিকায় পাঠান কিংবা অ্যান্টার্কটিকার বরফের দেশে পাঠান,তাহার চালচলন বদলাইতে পারে, পোশাকের ব্র্যান্ড গুচি-প্রাডা হইতে পারে, মুখে বিদেশি ইংরেজি বুলি ফুটিতে পারে; কিন্তু তাহার ডিএনএ-র কোড বদলাইবে না। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বা লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে কোনো সুটকেসের চেইন খুলিলে যদি দেখেন ভেতরে সুগন্ধি বা বিদেশি ব্র্যান্ডের মদের বদলে উঁকি দিতেছে:
দুই কেজি চিনিগুঁড়া সুগন্ধি পোলাওয়ের চাল,
পাঁচ প্যাকেট রাঁধুনি বিরিয়ানি মশলা,
আর সাবধানে প্লাস্টিক মোড়ানো এক কৌটা খাঁটি গাওয়া ঘি,
তবে শতভাগ নিশ্চিত থাকিবেন, এই সুটকেসের মালিক একজন জন্মগত বাঙালি!
বিদেশে গিয়া পাঁচ তারকা রেস্তোরাঁয় বসে ফর্ক আর নাইফ দিয়া কাঁচা মাংসের স্টেক চিবাইতে চিবাইতে প্রবাসে থাকা বাঙালির চোখ দিয়া অশ্রুধারা নামে। সে জানালার বাইরে তাকাইয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া মনে মনে গান ধরে:“যে দেশেতে ভাত নাইরে ভাই, সে দেশেতে মন বসে না...”
সে বাড়ি ফিরিয়া গভীর রাতে গোপনে রাইস কুকারে বাসমতী চাল বসাইয়া দেয়। চাল ফোটার সেই ভেজা ভেজা ভাপ যখন প্রবাসের ফ্ল্যাটের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে ছড়াইয়া পড়ে, তখন তাহার মনে হয়,অবশেষে সে নিজ মাতৃভূমির বুকে ফিরিয়া আসিয়াছে।
অমর শ্বেতশুভ্র ভালোবাসা
সুতরাং, দেখা যাইতেছে যে বাঙালির ভাতের প্রীতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নহে। ইহা একটি সহস্রাব্দব্যাপী চলমান জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও আত্মিক প্রক্রিয়া।
বাঙালি যখন প্রেমে পড়ে, তখন সে চাঁদকে ভাতের থালার মতো দেখে (সুকান্ত ভট্টাচার্য হয়তো ক্ষুধার্ত হইয়া লিখিয়াছিলেন, কিন্তু খাঁটি বাঙালি মাত্রই রোমান্টিক অবস্থাতেও পূর্ণিমার চাঁদকে এক লোকমা পোলাওয়ের চালের চেয়ে আলাদা কিছু ভাবে না)। বাঙালি যখন রেগে যায়, তখনো সে হুমকি দেয়, “তোর ভাতের থালা কাইড়া লমু!” বাঙালি যখন কাউকে পরিবারভুক্ত করিতে চায়, তখন সে নিমন্ত্রণ করিয়া বলে, “একদিন আমাদের বাড়ি আসিয়া দুটি ডাল-ভাত খাইয়া যাইবেন।”
রাজনীতিতে পরিবর্তন আসিবে, ঋতু বদলাইবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের বরফ গলিয়া যাইবে, হয়তো ইলন মাস্কের রকেটে চড়িয়া মানবজাতি একদিন মঙ্গল গ্রহেও কলোনি বানাইবে। কিন্তু সেই লাল গ্রহের ধূসর মাটিতে যখন প্রথম কোনো বাঙালি নামিবে, সে মহাকাশের পতাকা পোতার আগে পকেট হইতে একটি ছোট পলিথিনের পুটলি বাহির করিবে। সেই পুটলির ভেতর সযত্নে রাখা থাকিবে কয়েকটি নাজিরশাইল কিংবা কাটারিভোগ ধানের বীজ। সে মঙ্গলের মাটিতে বসে পরম মমতায় মাটি খুঁড়িবে এবং মনে মনে বলিবে:
“হে পরদেশী লাল মাটি, বহু মহাকাশ ভ্রমণ করিয়াছি। এবার জলদি জলদি একটু ধানের চারা গজাও দেখি, দুপুরের খাবারটা একটু তৃপ্তি কইরা খাইতে হইব!” জয়তু ভাত! জয়তু ভোজনরসিক বাঙালি!
(একটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞান-উপেক্ষিত, কাল্পনিক অথচ চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ)