Article

বঙ্গদেশে তেলবাজির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

October 27, 2026

5 views

তেলের মহিমা ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পিচ্ছিল রহস্য: বিজ্ঞান বলে, জগতে ঘর্ষণ না থাকলে কোনো বস্তু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নড়তে পারে না। কিন্তু বঙ্গীয় সমাজবিজ্ঞান তার চেয়েও একধাপ এগিয়ে প্রমাণ করেছে,জীবনে ‘ঘর্ষণ’ থাকলে কেবল আগুন ধরে, কিন্তু ‘তেল’ থাকলে জীবন মসৃণ গতিতে এগোতে থাকে। তেল মূলত দুই প্রকার:

১. যা ঘানিতে পিষে বোতলে ভরা হয় (সরিষা, সয়াবিন, পাম ওয়েল)।

২. যা মুখে পিষে অন্যের শরীরে ও আত্মায় ঢালা হয়,যাকে পোশাকি ভাষায় বলে তোষামোদি, ইংরেজিতে ফ্ল্যাটারি, আর আমাদের প্রাণের ভাষায় ‘তেলবাজি’।

প্রথম প্রকার তেলের দাম বাড়লে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ওঠে, কারওয়ান বাজারে হাহাকার পড়ে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার তেলের সাপ্লাই যত বাড়ে, সমাজ তত তরতর করে উন্নতির মই বেয়ে ওপরে ওঠে। এই তেলের কোনো ভ্যাট নেই, কোনো আমদানি শুল্ক নেই, কিন্তু এর কার্যক্ষমতা পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী।

বাঙালি চিরকালই ভোজনরসিক ও রসগ্রাহী জাতি। রুই মাছের পেটি থেকে শুরু করে খাসির রেজালার ওপর চকচকে তেলের স্তর না ভাসলে বাঙালির ভোজ অপূর্ণ থেকে যায়। খাদ্যনালী থেকে শুরু হওয়া এই তৈলাক্ত প্রীতি কালক্রমে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র, মনস্তত্ত্ব, অফিস-আদালত এবং সামাজিক সম্পর্কের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে এক মহিমান্বিত শিল্পে রূপ নিয়েছে। এই গবেষণায় আমরা দেখব,কীভাবে বঙ্গদেশে আদিম সরিষার তেল বিবর্তিত হয়ে আজকের এই হাইপার-ডিজিটাল সুপারসনিক তেলবাজিতে রূপ নিল।

প্রাগৈতিহাসিক তেল ভিত্তি

বঙ্গদেশে তেলবাজির শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের সরাসরি যেতে হবে বরেন্দ্রের কাদামাটি আর চণ্ডীদাসের যুগেরও বহু আগে। আদিম যুগে যখন মানুষ বনজঙ্গলে ঘুরত, তখন একজন গুহাবাসী শিকারী হয়তো বুনো হরিণ শিকার করে এনে গুহার প্রধানের পায়ের কাছে রেখে অমায়িক হেসে বলেছিল,

“ওহে দলপতি! এই হরিণটা তীর মারার সময় আমি খেয়াল করলাম, আপনার বাঁকা হাসির তেজ দেখেই ওটা অর্ধেক হার্ট অ্যাটাক করেছিল! আমি তো কেবল একটা আলতো খোঁচা দিয়েছি মাত্র!”

দলপতি খুশি হয়ে তাকে শিকারের সবচেয়ে রসালো রানটা উপহার দিলেন। ব্যস! মানব ইতিহাসের প্রথম সফল তেলবাজি সম্পন্ন হলো। সেই আদিম শিকারী হয়তো জানত না, সে মানবজাতির জন্য চাকা আবিষ্কারের চেয়েও বড় এক বৈপ্লবিক মেকানিজম আবিষ্কার করে ফেলেছে।

এরপর আসে রাজদরবারের যুগ। পাল, সেন, মোগল কিংবা নওয়াবি আমলে তেলবাজি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। রাজসভায় কবিরা কবিতা লিখতেন:

“মহারাজ, আপনি যখন হাঁটেন, তখন মনে হয় স্বয়ং ইন্দ্রদেব স্বর্গ ছেড়ে আপনার পায়ের জুতো পরিষ্কার করতে এসেছেন!”

মহারাজ তখন খুশি হয়ে মণিমুক্তো খচিত থলে ছুড়ে দিতেন। এই চাটুকার কবিরাই হলেন আমাদের আধুনিক তেলবাজদের আদিপুরুষ। তাঁরা বুঝেছিলেন,তলোয়ার দিয়ে রাজ্য জয় করা যায় বটে, কিন্তু মসৃণ মিষ্টি কথায় জমিদারি কব্জা করা যায় বিনা রক্তপাতে।

নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার দরবারে মীর জাফর যে কায়দায় কুর্নিশ করে বলতেন, “জাহাঁপনা, আপনার জন্য জান কোরবান!”,সেটি ছিল তেলবাজির এক ঐতিহাসিক, যদিও বিষাদময় নমুনা। তবে মীর জাফরের তেলের কোয়ালিটি ভালো ছিল না; অতিরিক্ত তাপে সেটা পুড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের সেই শিক্ষা থেকে শিক্ষা না নিয়ে বাঙালি পরবর্তীকালে তেলকে আরও পরিশোধিত, আরও গন্ধহীন এবং আরও পিচ্ছিল করে তুলেছে।

ব্রিটিশ আমল ও 'খানসামা-বাবু' তৈল বিপ্লব

ইংরেজরা যখন বঙ্গদেশে এল, তারা বন্দুকের গুলির চেয়েও বেশি কুপোকাত হয়েছিল বাঙালির তেলের সান্নিধ্যে। ব্রিটিশ আমলে তেলবাজি একটি চারুকলা থেকে সরাসরি ‘বিজ্ঞান ও পেশা’য় রূপান্তরিত হয়। সাহেবদের খুশি করতে জন্ম নিল এক নতুন শ্রেণি,যাদের বলা হতো ‘বাবু’।

সাহেব সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ হাঁচি দিলে বাবু রুমাল এগিয়ে দিয়ে বলতেন,

“আহা হুজুর! আপনার হাঁচির যা সাউন্ড, স্বয়ং বাকিংহাম প্যালেসের তোপধ্বনিও এর কাছে ফিকে! কী পৌরুষ, কী ছন্দ!”

সাহেব হয়তো শিকার করতে গিয়ে একটা পাতিহাঁসও মারতে পারলেন না। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বনের বাঁদরের ল্যাজে লাগল। অমনি বাঙালি দেওয়ানজি হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠতেন,

“মার্ভেলাস মাই লর্ড! অপূর্ব নিশানা! আপনি তো ইচ্ছা করলেই বাঘটাকে মারতে পারতেন, কিন্তু আপনার দয়াশীল মন পশুটিকে প্রাণে মারল না,শুধু বাঁদরের অহংকার চূর্ণ করে দিলেন! আপনার মতো দরদী শিকারী ইংল্যান্ডেও দুটি নেই!”

সাহেব গলে জল। পরের দিনই দেওয়ানজির নামে দুই পরগনার তালুকদারি লিখে দেওয়া হলো। এভাবেই বঙ্গদেশে তেলের বিনিময়ে ‘রায়বাহাদুর’, ‘খানবাহাদুর’ উপাধির মহাযজ্ঞ শুরু হয়। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারল,বিদ্যা অর্জনে ক্লান্তি আছে, কায়িক শ্রমে ঘাম আছে, কিন্তু বড়কর্তার পিঠে তেল মালিশে কেবলই লাভ আর লাভ।

আধুনিক তেলবাজির পঞ্চরঙ্গ রূপভেদ

যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে তেলবাজি এখন আর শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। বর্তমান বঙ্গদেশে গবেষণার স্বার্থে আমরা তেলবাজিকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি:

করপোরেট তেল

রাজনীতির তেল

পারিবারিক তেল

অ্যাকাডেমিক তেল

 ডিজিটাল তেল

 করপোরেট তেল: এসি রুমের পিচ্ছিল মেহফিল

আধুনিক তেলবাজির সবচেয়ে চকচকে রূপ দেখা যায় এসি লাগানো করপোরেট অফিসগুলোতে। এখানে তেল দেওয়া হয় পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন এবং কফি মাগের আড়ালে। ধরা যাক, অফিসের বস একটি চরম অবাস্তব ও হাস্যকর আইডিয়া উপস্থাপন করলেন:

“আমাদের এমন একটা সাবান বানাতে হবে, যা দিয়ে গোসল করলে ক্ষুধা লাগবে না!”

সাধারণ মানুষ হলে বলত, ‘পাগল নাকি!’ কিন্তু খাঁটি করপোরেট তেলবাজ সিনিয়র এক্সিকিউটিভ সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে টেবিল চাপড়ে বলবেন:

“ব্রিলিয়ান্ট স্যার! জিনিয়াস! স্টিভ জবস বা এলন মাস্কও এমন যুগান্তকারী ডিসরাপটিভ চিন্তার ধারেকাছে যেতে পারত না! স্যার, আপনার এই ভিশনারি কনসেপ্ট শুনলে হাভার্ডের প্রফেসরেরা নিজেদের ডিগ্রি ছিঁড়ে ফেলবে! আপনি জাস্ট একটা ব্রিলিয়ান্ট জীবন্ত ইনস্টিটিউট, স্যার!”

বস মনে মনে জানেন আইডিয়াটা ফালতু, কিন্তু এই তৈলাক্ত প্রশংসার ওমে তাঁর পিঠের শিরদাঁড়া শিরশির করে ওঠে। মাস শেষে দেখা যায়, যে ছেলেটা রাত জেগে কোডিং করেছে বা ব্যালেন্স শিট মিলিয়েছে, তার ইনক্রিমেন্ট হয়নি; কিন্তু যে ছেলেটি বসের প্রতিটি ফালতু কথায় 'ইয়েস স্যার, রাইট স্যার' বলে তেলের ফোয়ারা ছুটিয়েছিল, সে প্রমোশন পেয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে!

রাজনীতির তেল: পাইকারি ও মাইক মারফত তেল

এটি হলো তেলের সবচেয়ে খোলাখুলি ও উচ্চ-ডেসিবেল সংস্করণ। এখানে গোপনীয়তার কোনো বালাই নেই। পাড়ার মোড়ের ছোট নেতা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত,সবাই এক বিশাল তেলের ড্রাম নিয়ে প্রস্তুত।

মঞ্চে মাইক পেলেই রাজনৈতিক তেলবাজের চোখ দিয়ে ভক্তি ঝরতে থাকে:

“প্রিয় উপস্থিতি, আমাদের মহান নেতা অমুক ভাই যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটেন, তখন রাস্তার পিচও ধন্য হয়ে নরম হয়ে যায়! উনি যখন হাসেন, মনে হয় মেঘলা আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের বাল্ব জ্বলে উঠেছে! উনি যদি বলেন দিনকে রাত, তবে আমরা সূর্যকে চাদর দিয়ে ঢেকে রাত বানিয়ে দেব!”

নেতা মঞ্চে বসে মৃদু হাসেন, পান চিবোন আর ভাবেন,‘পোলাটা তো ভালোই মালিশ করতে পারে, ওরে এবার একটা টেন্ডার পাইয়ে দিতে হবে!’ এই রাজনৈতিক তেলের কোনো এক্সপায়ারি ডেট নেই; ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথে সাথে তেলের ব্র্যান্ড ও পাত্র বদলায়, কিন্তু তৈলপ্রবাহের গতিবেগ একই থাকে।

পারিবারিক ও সামাজিক তেল: কুটুম্বিতার রসে ভেজা

বাঙালির ড্রয়িংরুমে যখন আত্মীয়-স্বজন আসে, তখন সেখানে যে মিষ্টি তেলের লেনদেন হয়, তা যে কোনো মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের রসগোল্লাকে হার মানায়। ধরা যাক, ধনী খালাতো বোন তাঁর গোলগাল, পড়ায় মন না বসা ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। ছেলেটি ড্রয়িংরুমের ফুলদানি ভেঙে, সোফায় জুতো তুলে বাঁদরামি করছে।

সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে,ছেলেটাকে একটা চড় দেওয়া উচিত। কিন্তু মেজবানের ভেতরের তেলবাজ সত্তা তখন জেগে ওঠে। গৃহকর্ত্রী গদগদ হয়ে বলবেন,

“ওমা! আপা, আপনার বান্টি তো সাধারণ বাচ্চা না! কী যে শার্প ওর বুদ্ধির তেজ! দেখুন, ফুলদানিটা ও কত সুন্দর সায়েন্টিফিক অ্যাঙ্গেলে ফেলে ভাঙল! নিশ্চিত ও বড় হয়ে নাসা-র রকেট সায়েন্টিস্ট হবে! একদম বাপের মতো রাজকীয় মেধা পেয়েছে!”

খালা তখন গর্বে বুক ফুলিয়ে বলেন, “হ্যাঁ রে, সবাই বলে ওর নাকি আইনস্টাইনের মতো মাথা!”

এই তেল দেওয়ার ফলে হয়তো খালার কাছে থেকে পরবর্তীতে কিছু সুযোগ-সুবিধা বা জমিজমার তদ্বির আদায় করা সহজ হয়ে যায়।

অ্যাকাডেমিক তেল: থিসিস ও নম্বরের পিচ্ছিল পথ

বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে এই তেলের গন্ধ সবচেয়ে তীব্র। এখানে তেলের বোতল নিয়ে ঘোরে কিছু বিশেষ প্রজাতির ছাত্র-ছাত্রী। শিক্ষক হয়তো ক্লাসে এসে কোনো পুরোনো চুটকি বললেন, যা তিনি গত বিশ বছর ধরে প্রতিটি ব্যাচকে বলে আসছেন। ক্লাসের বাকিরা হাই তুললেও প্রথম বেঞ্চের খাস তেলবাজটি এমনভাবে টেবিল চাপড়ে হাসবে, যেন সে জীবনে এর চেয়ে মজার কৌতুক শেভন বা শেক্সপিয়রের লেখাতেও পায়নি!

“স্যার! হাহাহা... উফ স্যার, আপনি শিক্ষক না হয়ে স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান হলে তো কপিল শর্মা রাস্তায় বসে যেত স্যার! কী হিউমার সেন্স আপনার!”

পরীক্ষার পর দেখা যায়, যে ছেলেটা ক্লাসে স্যারের সব বোরিং কথায় হেসেছে আর স্যারের বাজার-সদাইয়ের ব্যাগটা গাড়ি পর্যন্ত পরম ভক্তিতে এগিয়ে দিয়েছে, সে থিসিসে পেয়েছে ‘এ প্লাস’; আর যে ছেলেটা লাইব্রেরিতে দিনরাত গবেষণা করেছে, সে বসের সাথে ঠিকমতো ‘ইন্টারেকশন না থাকায়’ ঝুলছে ‘বি মাইনাস’ নিয়ে।

ডিজিটাল ও ভার্চুয়াল তেল: কমেন্ট বক্সের মহাতৈল মর্দন

একুশ শতকে তেলবাজি হয়ে গেছে পরিবেশবান্ধব ও পেপারলেস। এর নাম ‘সোশ্যাল মিডিয়া তেল’। ফেসবুক, লিংকডইন বা ইনস্টাগ্রামে এই তেলের অবাধ সরবরাহ।অফিসের বস ফেসবুকে একটা ঘোলাটে, ব্লার হয়ে যাওয়া সূর্যাস্তের ছবি দিয়ে ক্যাপশন দিলেন,‘লাইফ ইজ জার্নি’।

নিচে তেলবাজ কর্মীদের কমেন্টের বান ডাকে:

“অসাধারণ ক্যাপশন স্যার! আপনার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাল!”

 “স্যার, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের উচিত এই ছবিটা কাভার পেজে দেওয়া! আপনার ফটোগ্রাফিক চোখ তো জেনুইন জিনিয়াসের মতো!”

 “স্যার, এই ছবির গভীরতা মাপার মতো লেন্স পৃথিবীতে এখনো তৈরি হয়নি! ওয়াও জাস্ট ওয়াও!”

লিংকডইনে বস যদি লেখেন,“আজ সকালে একটা পিপড়াকে রাস্তা পার হতে দেখলাম। সেখান থেকে আমি লিডারশিপের ৫টি লেসন শিখলাম...”

সাথে সাথে হাজার হাজার কমেন্ট পড়বে:

“অগাধ প্রজ্ঞা স্যার! আপনার কাছ থেকে প্রতিদিন মানবতা ও ম্যানেজমেন্ট শিখছি!”

এই তেলবাজির একমাত্র খরচ হলো সামান্য মোবাইল ডেটা, কিন্তু রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) আকাশচুম্বী!

তেলবাজের মনস্তত্ত্ব ও শারীরিক লক্ষণ

একজন অভিজ্ঞ তেলবাজকে দূর থেকেই চেনা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান হয়তো এখনো এর ক্লিনিক্যাল লক্ষণ বের করেনি, তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে একজন খাঁটি তেলবাজের মধ্যে  শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যগুলো সুস্পষ্ট।

সফল তেলবাজির ‘গোল্ডেন রুলস’

তেল দেওয়া কোনো ছেলেখেলা নয়। আনাড়ির মতো তেল দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। যে তেল দেবে, তাকে হতে হবে একজন দক্ষ সার্জনের মতো সূক্ষ্ম এবং একজন কবির মতো কল্পনাপ্রবণ। নিম্নে তেলবাজির কয়েকটি শাস্ত্রীয় নীতি তুলে ধরা হলো:

[নীতি ১: লক্ষ্য নির্ধারণ]  ──► [নীতি ২: তেলের ঘনত্ব পরিমাপ] ──► [নীতি ৩: টাইমিং ও প্রেসার] ──► [নীতি ৪: চরম নির্লজ্জতা]

(কার ওপর প্রয়োগ?)           (কতটা বাড়াবাড়ি সহ্য হবে?)         (কখন ও কীভাবে ঢালবেন?)        (নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন)

১. অতিরিক্ত তেল না ঢালা (The Viscosity Rule): তেলের পরিমাণ এমন হতে হবে যেন পাত্র বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করতে পারে। বসকে যদি সরাসরি বলেন, “স্যার, আপনি তো দেখতে একদম ব্র্যাড পিটের চেয়েও সুন্দর”,বস বুঝে ফেলবেন এটা বাটপারি। কিন্তু যদি মোলায়েম গলায় বলেন,

“স্যার, আপনার চেহারাটা যেন কেমন... ওই হলিউডের ক্লাসিক্যাল তারকাদের একটা ভাইব আছে না? ঠিক ধরা যায় না, কিন্তু খুব ডিসেন্ট একটা আভিজাত্য!”

ব্যস! বস আয়নায় নিজের টাকমাথা মুখটা দেখেও নিজেকে টম ক্রুজ ভাবতে শুরু করবেন।

২. বসের শখকে নিজের ধর্ম বানানো (The Mirror Effect): বস যদি গলফ পছন্দ করেন, আপনাকে গলফের ইতিহাস মুখস্থ করতে হবে। বস যদি বলেন, “আমার কাঁচা আম দিয়ে চা খেতে ভালো লাগে”,আপনাকে চোখ বড় বড় করে বলতে হবে,

“অদ্ভুত কো-ইন্সিডেন্স স্যার! আমি গত তিন বছর ধরে এই রেসিপি খুঁজছি! আপনার টেস্ট বাড তো অসামান্য প্রোফেশনাল!”

৩. চরম আত্মসম্মান বিসর্জন (Zero-Ego Principle): একজন সত্যিকারের তেলবাজের কোনো নিজস্ব ‘ইগো’ বা আত্মমর্যাদা থাকতে পারে না। আত্মসম্মান হলো তেলের সবচেয়ে বড় শত্রু। যেখানে তেল আছে, সেখানে আত্মসম্মান থাকতে পারে না; যেখানে আত্মসম্মান আছে, সেখানে তেল জমে গিয়ে চাকা জ্যাম হয়ে যায়। তেলবাজের একমাত্র ব্রত,বসের পা পিছলে যেন না যায়, তার আগেই মাটিতে নিজের পিঠ পেতে দেওয়া।

অর্থনীতির ওপর তেলের প্রভাব

অর্থনীতিবিদরা হিসাব করেন জিডিপি (GDP), মুদ্রাস্ফীতি আর রেমিট্যান্স নিয়ে। কিন্তু বঙ্গদেশের প্যারালাল অর্থনীতি যে পুরোপুরি ‘তেল’-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সে হিসাব কোনো অর্থমন্ত্রী কোনোদিন বাজেটে দেননি। ভেবে দেখুন, যদি তেলবাজি বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের অর্ধেকের বেশি বদলি, প্রমোশন আর ফাইল ছাড়ানোর কাজ এক ঘণ্টার মধ্যে স্থবির হয়ে যাবে।

 সরকারি অফিসের টেবিলে যে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, তার একমাত্র লুব্রিকেন্ট বা পিচ্ছিলকারক হলো মিষ্টি কথার তেল (সাথে কিছু কাঁচা পয়সার মবিল)।

 বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য লোকগুলো যদি তেল দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে বসেরা হতাশায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবেন; কারণ দিনে অন্তত দশবার “স্যার আপনিই সেরা” না শুনলে তাঁদের হজমপ্রক্রিয়া ঠিকমতো কাজ করে না।

তেলবাজি মূলত বঙ্গদেশের সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। এটি যোগ্য ও অযোগ্যের মধ্যকার বৈষম্য দূর করার এক মহাজাগতিক ইকুয়ালাইজার। আপনার মেধা নেই? কোনো সমস্যা নেই! আপনার কর্মদক্ষতা শূন্য? কুচ পরোয়া নেহি! আপনার মুখে যদি থাকে এক ছটাক খাঁটি তেল, তবে আপনি পৃথিবীর যেকোনো পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন।

অবিনশ্বর তেল ও ভবিষ্যতের বঙ্গভূমি

দিন বদলাবে, শতাব্দী পেরোবে, রোবট আসবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) হয়তো মানুষের চাকরির বড় অংশ দখল করে নেবে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বাজি ধরে বলতে পারি,কোনো এআই বা চ্যাটবট বাঙালির তেলবাজির বিকল্প হতে পারবে না! একটি রোবট হয়তো নিখুঁতভাবে কোডিং করতে পারবে, হিসাব মেলাতে পারবে; কিন্তু সে কি পারবে বসের পানসে রসিকতায় চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু বের করতে? সে কি পারবে বসের ড্রয়িংরুমের অসুস্থ বিড়ালটিকে দেখে বলতে,“আহা! মার্জার বংশে এমন নূরাণী চেহারার বিড়াল তো আমি আর দেখিনি স্যার!”? না, রোবটের সেই মানবিক পিচ্ছিল অনুভূতি নেই। এটা কেবল খাঁটি বঙ্গসন্তানের রক্তেই প্রবাহিত এক বিশেষ ডিএনএ।

অতএব, হে বঙ্গবাসী! হতাশ হবেন না। দ্রব্যমূল্য বাড়ুক, সয়াবিন তেলের দাম লিটারে পাঁচশো টাকা ছুঁয়ে ফেলুক,আমাদের ভেতরের প্রাকৃতিক তেলের খনি কখনো শুকাবে না। যে পর্যন্ত বঙ্গদেশে বস থাকবে, বড় ভাই থাকবে, খালা-শ্বাশুড়ি থাকবে আর মঞ্চের নেতা থাকবে,সে পর্যন্ত আমাদের তেলের ফোয়ারা অনন্তকাল ধরে উৎসারিত হতে থাকবে।

আসুন, আমরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি,আমাদের গলার স্বর মিষ্টি থাকুক, মুখের হাসিতে ঘিয়ের ঘনত্ব বজায় থাকুক এবং আমাদের তেলবাজির অমর ঐতিহ্য যুগ থেকে যুগান্তরে পিচ্ছিল ধারায় প্রবাহিত হোক!

জয়তু তেলবাজি! নিখিল তৈলপ্রেমী ঐক্যজোট দীর্ঘজীবী হোক!

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ ইহা একটি ফানি পোস্ট। কেই সিরিয়াসলি নিবেন না প্লিজ।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login