Fiction

কগনিটিভ অফলোডিং

October 26, 2026

13 views

পড়ন্ত বিকেলের রোদ যখন লেকের কৃত্রিম কাচের গম্বুজ ভেদ করে এসে পড়ল, অর্কর চোখের কোণে তখন হালকা নীল আলো টিমটিম করে জ্বলছিল। তার ডান কানের ঠিক পেছনের চামড়ায় বসানো ছোট্ট সিলিকন চিপটা,‘মেমটেক-৭’। পুরো শহরের মানুষ একে ডাকে 'স্মার্ট লোডার'। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘কগনিটিভ অফলোডিং ডিভাইস’। মানুষের মস্তিষ্ককে তথ্য মনে রাখার, জটিল অঙ্ক কষার কিংবা পথ চেনার বাড়তি চাপ থেকে মুক্তি দিতেই এই যন্ত্রের আবিষ্কার। মনে রাখার দরকারটা কী, যখন মাত্র ০.২ সেকেন্ডে ক্লাউড থেকে তথ্য সরাসরি অপটিক স্নায়ুর মাধ্যমে চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে?

অর্কর বয়স সবে পনেরো। সেন্ট জোসেফ ফিউচারিস্টিক একাডেমির দশম শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু সে নিজের নাম আর ঘরের ডিজিটাল পাসকোড ছাড়া আর কিছুই মুখস্থ রাখে না। রাখার প্রয়োজনও নেই। ক্লাসের জটিল পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ, পৃথিবীর ইতিহাস, ত্রিকোণমিতি, এমনকি বন্ধুদের জন্মতারিখ,সবকিছুই জমা থাকে মেমটেকের ক্লাউড সার্ভারে। সে শুধু চোখের পলক ফেলে মনে মনে একটা কি-ওয়ার্ড ভাবলেই হলো; তৎক্ষণাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে সম্পূর্ণ সমাধান।

"অর্ক, তুই কি আজকেও কগনিটিভ অফলোডার বন্ধ করবি না?"

পাশ থেকে তার সহপাঠী এবং একমাত্র বাস্তব বন্ধু ঋতজা বলে উঠল। ঋতজার কানের পেছনে কোনো চিপ নেই। তার বাবা একজন প্রাচীনপন্থী নিউরোসার্জন; তিনি কখনোই নিজের মেয়েকে এই ‘মানসিক পঙ্গুত্ব’ বরণ করতে দেননি। ফলে স্কুলের আশি শতাংশ ছেলেমেয়ে যখন মেমটেকের ওপর ভরসা করে খালি মাথায় ঘুরে বেড়ায়, ঋতজা তখন নিজের মস্তিষ্কের নিউরন খাটিয়ে ভাবার চেষ্টা করে।

অর্ক কানের পেছনে হাত বুলিয়ে আলতো হাসল। "কেন বন্ধ করব ঋতু? অফলোড করে রাখলে মাথাটা কত হালকা থাকে তুই জানিস? কোনো টেনশন নেই, পরীক্ষার ভয় নেই, সূত্র ভোলার রিস্ক নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা,আমাদের আসল নিউরনগুলো এখন ফ্রেশ থাকে অন্য কাজের জন্য।"

"অন্য কাজ মানে কী? সারাদিন ভার্চুয়াল গেম খেলা আর হলোগ্রাম স্ক্রল করা?" ঋতজা ভুরু কুঁচকাল। "অর্ক, তুই খেয়াল করছিস না, তুই নিজের চিন্তা করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলছিস। গত পরশু তোকে যখন আমি জিজ্ঞেস করলাম সাত আটে কত হয়, তুই মেমটেকে পিং না করে বলতে পারিসনি! তোদের প্রজন্ম ভাবাটাই বন্ধ করে দিচ্ছে।"

"ধুর, ক্যালকুলেটর যখন আবিষ্কার হয়েছিল, মানুষ তখনো বলেছিল মানুষের গণিতচর্চা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু শেষ হয়েছিল কি? বিজ্ঞান এগিয়েছে, ঋতু। বিজ্ঞান মানেই তো অপ্রয়োজনীয় কাজ মেশিনের ওপর অফলোড করে দেওয়া।"

কথা বলতে বলতেই অর্কর চিপটা মৃদু কম্পন দিয়ে উঠল। চোখের পর্দায় এক টুকরো স্বচ্ছ ফ্লোটিং উইন্ডো ভেসে উঠল,

[জরুরি নোটিফিকেশন: ঢাকা সেন্ট্রাল ডেটা গ্রিড আপগ্রেড। আগামী আধঘণ্টা মেমটেক ক্লাউড ট্র্যাফিক ধীরগতির হতে পারে।]

অর্ক নোটিফিকেশনটা ব্রাউজ করে উড়িয়ে দিল। এই আধুনিক যুগে ক্লাউড কখনো পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে, এমন দুঃস্বপ্ন কেউ দেখে না। অন্ধকারের নাম ব্ল্যাকআউট; স্কুল ছুটির পর তারা হেঁটে ফিরছিল। বর্তমান ঢাকা শহর এখন আর আগের মতো ধোঁয়া-ধুলোর শহর নয়। চারদিকে ম্যাগলেভ ট্রেনের মসৃণ শব্দহীন চলাচল, ড্রোনভর্তি আকাশ, আর নিচ দিয়ে সাজানো ফুটপাত। রাস্তা পার হওয়ার সিগন্যাল থেকে শুরু করে কোনো দোকানে কী দাম,সবকিছু মেমটেকের সাথে সংযুক্ত হয়ে সরাসরি মানুষের চোখের লেন্সে চলে আসে।

হঠাৎ এক অচেনা নিঃশব্দতা নেমে এল। প্রথমে নিভে গেল রাস্তার ডিজিটাল সাইনবোর্ডগুলো। তারপর আকাশে উড়তে থাকা তিনটি কুরিয়ার ড্রোন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধুপধাপ করে আছড়ে পড়ল পাশের কৃত্রিম ঝিলের জলে। ম্যাগলেভ ট্রেনগুলো লাইনের ওপর হঠাৎ ব্রেক কষে থমকে দাঁড়াল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, অর্কর চোখের কোণের নীল আলোটা হঠাৎ লাল হয়ে গেল। তীব্র এক ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মতো তীক্ষ্ণ শব্দ তার মস্তিষ্কের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হলো।

[ERROR 404: CLOUD DISCONNECTED]

[CRITICAL ALERT: CENTRAL SYNAPTIC SERVER OFFLINE]

অর্ক চিৎকার করে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ফুটপাতের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার মনে হলো, মাথার ভেতর থেকে যেন কেউ একটা অদৃশ্য প্লাগ টেনে খুলে নিয়েছে।

"অর্ক! কী হয়েছে তোর?" ঋতজা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরল।

"ঋতু... আমার মাথা... কিচ্ছু নেই!" অর্কর গলা কাঁপছে, চোখ দুটো বিস্ফারিত, ভয়ার্ত। "আমি... আমি ভাবতে পারছি না! চারপাশটা অন্ধকার লাগছে কেন?"

চারপাশে তাকিয়ে ঋতজা যে দৃশ্য দেখল, তা কোনো ভৌতিক সিনেমার চেয়ে কম নয়। ফুটপাতে হাঁটতে থাকা শত শত মানুষ হঠাৎ থেমে গেছে। কেউ পাগলের মতো মাথায় চাপড়াচ্ছে, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে হাঁপাচ্ছে, কেউবা আতঙ্কে চিৎকার করছে। এক ভদ্রলোক নিজের পকেটের ডিজিটাল ওয়ালেট বের করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন; পিনের সংখ্যাটা মনে করতে পারছেন না। এক ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যাল পোস্টের নিচে বসে পড়ে অঝোরে কাঁদছেন,কোন রঙের পর কোন আলো জ্বলে, সেই সামান্য তথ্যটাও তাঁর মাথা থেকে ক্লাউডে অফলোড করা ছিল, যা এখন আর ফেরত আসছে না।

সেন্ট্রাল কগনিটিভ গ্রিডে ভয়ংকর কোনো সাইবার হামলা হয়েছে, অথবা সোলার ফ্লেয়ারের কারণে পৃথিবীর মূল সার্ভার ক্র্যাশ করেছে। গোটা শহর এক নিমেষে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। প্রযুক্তি মানুষকে অন্ধ করেনি, প্রযুক্তির অনুপস্থিতি মানুষকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দিয়েছে।

শূন্য মগজের মিছিল: "অর্ক, ওঠ! তোকে বাড়ি পৌঁছাতে হবে," ঋতজা অর্কর কাঁধ ধরে ঝাঁকাল।

অর্ক উঠে দাঁড়াল, কিন্তু তার পা কাঁপছে। সে যেন এক সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু, যার পায়ের নিচের মাটি অচেনা।

"ঋতু, আমার বাড়ির ঠিকানা কত যেন? আমি... আমি মনে করতে পারছি না। বাড়ি যাওয়ার রাস্তা কোনটা?" অর্কর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মেমটেক তাকে প্রতি মোড়ে দিকনির্দেশনা দিত,'বামে যাও', 'ডানে যাও'। কোনোদিন নিজের চোখে সে রাস্তা চেনে নি, ল্যান্ডমার্ক মনে রাখেনি।

"তোর বাড়ি তো ধানমন্ডি আট নম্বরে, মনে নেই? তোর ফ্ল্যাট নাম্বার ৪/বি?" ঋতজা শান্ত গলায় বলল।

"আট নম্বর... সেটা কোন দিকে? আমরা এখন কোথায় আছি?" অর্কর বিভ্রান্তি বাড়ছে।

"আমরা এখন তিন নম্বরে আছি অর্ক। মাত্র পাঁচটা ব্লক সোজা গেলেই তোর বাসা। তুই শান্ত হ।"

"আমি শান্ত হতে পারছি না ঋতু! আমার মস্তিষ্কের ভেতরে মনে হচ্ছে একটা বিশাল গহ্বর। কোনো স্মৃতি নেই, কোনো গণিত নেই, কোনো যুক্তি নেই। সব ক্লাউডে ছিল... সব চলে গেছে!"

ফুটপাত ধরে এগোতে এগোতে তারা দেখল এক অবিশ্বাস্য ট্র্যাজেডি। আধুনিক সভ্যতার মানুষ, যাদের হাতে সৌরজগতের নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার কথা ছিল, তারা সামান্য রাস্তা হারিয়ে একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে। মোবাইল ফোন বা হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইসগুলোর ব্যাটারি আছে, কিন্তু সেগুলোর স্ক্রিনে তাকিয়ে সবাই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে,পাসওয়ার্ড আনলক করার প্যাটার্নটা কারও মাথায় নেই। কারণ সব প্যাটার্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিনত তাদের মেমটেক চিপ।

এক তরুণী ফুটপাতে বসে নিজের ছোট বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। বাচ্চার রক্তের গ্রুপ কী, সেটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অ্যাপ ছাড়া তিনি বলতে পারছেন না, আর ইন্টারনেট না থাকায় সেই অ্যাপও খুলছে না।

ঋতজা শক্ত হাতে অর্কর হাতটা চেপে ধরল। "অর্ক, তোকে নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে হবে। চিপটা বন্ধ কর। ওটা এখন শুধু তোকে এরর মেসেজ পাঠিয়ে প্যানিক তৈরি করছে।"

"বন্ধ করব? ওটা বন্ধ করলে তো আমি পুরোপুরি বোকা হয়ে যাব!"

"তুই এখনো বোকা হয়ে আছিস অর্ক! চিপটা তোকে সাহায্য করছে না, তোর চিন্তাকে আটকে রেখেছে। ম্যানুয়াল ওভাররাইড পিনটা খোল।"

অর্কর হাত কাঁপছিল। কানের পেছনে ছোট্ট একটা লাল বোতাম আছে,জরুরি ইমার্জেন্সি শাটডাউনের জন্য। কোনোদিন সে ওটা ছোঁয়নি। ভয়ে ভয়ে সে আঙুল দিয়ে বোতামটা তিন সেকেন্ড চেপে ধরে রাখল।

 

একটা মৃদু ‘ক্লিক’ শব্দ হলো। চোখের কোণের লাল আলোটা নিভে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার মতো শব্দটা থেমে গিয়ে এক আদিম, অচেনা নীরবতা অর্কর মাথায় ভর করল।


 নিউরনের পুনর্জন্ম;চিপ বন্ধ হতেই অর্ক জোরে একটা নিঃশ্বাস নিল। মাথার ভেতর যে কৃত্রিম চাপটা ছিল, সেটা সরে গেছে। কিন্তু সেই জায়গায় এখন এক অদ্ভুত খালি অনুভূতি। যেন একটা বড় লাইব্রেরি ঘর, যার সব তাক খালি করে দেওয়া হয়েছে।

"কেমন লাগছে?" ঋতজা জিজ্ঞেস করল।

"খালি... ভীষণ খালি। কিন্তু শব্দটা বন্ধ হয়েছে।" অর্ক চারদিকে তাকাল। দৃষ্টি এখনও কিছুটা ঝাপসা, কিন্তু কৃত্রিম ইন্টারফেসের ফ্লোটিং টেক্সটগুলো আর দৃষ্টি আটকে রাখছে না।

"গুড। এবার নিজের চোখে দেখ। বল, আমরা কোন দিকে যাব?"

অর্ক বিভ্রান্ত হয়ে সামনের রাস্তার দিকে তাকাল। কোনো ডিজিটাল সাইনবোর্ড নেই। আকাশে সূর্যের আলো নিভে গিয়ে গোধূলির ধূসর ছায়া নামছে।

"আমি... আমি জানি না ঋতু।"

"ভাবো, অর্ক! মেমটেকের আগে মানুষ কীভাবে ভাবত? লজিক ব্যবহার কর। সূর্য কোন দিকে ডোবে?"

"পশ্চিমে," অর্ক খুব ধীরে ধীরে বলল। শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে তার মস্তিষ্কের গভীরের কোনো এক মরচে ধরা গিয়ার যেন বহু কষ্টে ঘুরল।

"বেশ। ধানমন্ডি লেক আমাদের কোন পাশে ছিল যখন আমরা স্কুল থেকে বেরিয়েছিলাম?"

অর্ক চোখ বন্ধ করল। সে কোনো ক্লাউড সার্ভার খুঁজছে না, সে তার নিজস্ব ভিজ্যুয়াল মেমোরি হাতড়াচ্ছে,যে স্মৃতিগুলো চিপের নিচে চাপা পড়ে ছিল।

"লেকটা... লেকটা আমাদের বাঁ পাশে ছিল। আর লেকের ওপারে সূর্য ডুবছিল। তার মানে আমরা উত্তর দিকে হাঁটছিলাম!" অর্কর চোখে হঠাৎ একটা আলোর ঝলক খেলে গেল। সে নিজের শক্তিতে একটা সিদ্ধান্ত বের করেছে! ঋতজা হাসল। এক মাসের মধ্যে এই প্রথম সে অর্কর মুখে সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তার হাসি দেখল। "একদম ঠিক! তাহলে আট নম্বর ব্লক কোন দিকে হবে? উত্তরের দিকে, নাকি পেছনের দিকে?"

"সামনে! আরও সোজা যেতে হবে!" অর্ক প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। সে এক পা বাড়াল। এবার তার পায়ে আর দ্বিধা নেই। তার নিজের তৈরি করা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত তাকে শক্তি জোগাচ্ছে।

ধানমন্ডি সাত নম্বরের মোড়ে এসে তারা দেখল এক ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা। একটা স্বয়ংক্রিয় ব্যাটারিচালিত বাস মোড়ের ডিভাইডারে উঠে গেছে। চালকের কানের চিপ ক্র্যাশ করায় সে আতঙ্কে স্টিয়ারিং ভুল ঘুরিয়ে ফেলেছিল। বাসের ভেতরে কয়েকজন যাত্রী আটকে আছে, কারণ স্বয়ংক্রিয় দরজার লক কোড ড্রাইভার মনে করতে পারছে না।

"দরজার নিচে একটা ম্যানুয়াল হাইড্রোলিক লিভার থাকে," ঋতজা বাসের কাছে গিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে বলল। "ড্রাইভার আঙ্কেল, সিটের নিচ থেকে লিভারটা টানুন!"

কিন্তু ড্রাইভার তখন মাথায় হাত দিয়ে কাঁপছেন। "লিভার কোন দিকে ঘোরাতে হয়? ডান দিকে না বাঁ দিকে? আমার চিপ বলছে না... সার্ভার এরর দেখাচ্ছে!"

অর্ক বাসের জানালার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার পাশে একটা ছোট লাল রঙের লিভার দেখা যাচ্ছে। তাতে একটা ছোট্ট প্রতীক আঁকা,একটি বৃত্তাকার তীরচিহ্ন, ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে।

অর্কর মনে পড়ে গেল। মেমটেক নয়, ছোটবেলায় তার দাদু তাকে একটা মেকানিকাল ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। ঘড়ির কাঁটা কোন দিকে ঘোরে, আর অ্যান্টি-ক্লকওয়াইজ মানে কী,সেই অত্যন্ত প্রাচীন স্মৃতিটা অর্কর নিউরনের নিউক্লিয়াস থেকে হঠাৎ এক লহমায় বেরিয়ে এল।

"ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘোরান!" অর্ক চিৎকার করে বলল। "বাঁ দিকে চাপ দিন আঙ্কেল! ভাববেন না, শুধু গায়ের জোরে বাঁ দিকে টানুন!"

ড্রাইভার কাঁপতে কাঁপতে তাই করলেন। হিস্ করে একটা শব্দ হলো, আর বাসের হাইড্রোলিক দরজাটা খুলে গেল। যাত্রীরা হাঁপাতে হাঁপাতে বেরিয়ে এল।

কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে একজন বয়স্ক লোক অর্কর দিকে তাকালেন। "তোমাদের চিপ কাজ করছে খোকা? নেটওয়ার্ক কি এসেছে?"

অর্ক শান্ত গলায় বলল, "না দাদু। নেটওয়ার্ক আসেনি। আর কখনো নাও আসতে পারে। নিজের মাথা খাটান, সব মনে পড়বে।"

অবশেষে অর্ক তার নিজের বাসার সামনে এসে পৌঁছাল। বারো তলা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সমস্ত লিফট বন্ধ। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হবে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় অর্ক লক্ষ্য করল, তার ক্লান্তি লাগছে, কিন্তু মনের ভেতরের সেই ভীতি আর নেই। প্রতিটা ধাপ ওঠার সময় সে মনে মনে গুনছে,এক, দুই, তিন, চার...। সাধারণ এই গণনাটাই তাকে এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি দিচ্ছে। সে অনুভব করতে পারছে, তার মস্তিষ্কের লাখ লাখ নিউরন, যারা এত দিন অলস বসে ছিল, তারা আবার একে অপরের সাথে সিন্যাপসের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেত আদান-প্রদান শুরু করেছে।

ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে সে দাঁড়াল। ডিজিটাল কি-প্যাডটা ব্যাকআপ ব্যাটারিতে টিমটিম করে জ্বলছে। চার ডিজিটের কোড।

অর্ক চোখ বুজল। মেমটেকে সে এই কোডটা কোনোদিন টাইপ করেনি, চিপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লুটুথে সিগন্যাল পাঠিয়ে দরজা খুলে দিত।

"মনে করার চেষ্টা কর অর্ক," ঋতজা পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করল। "তোর আঙুলের মাসল মেমোরি আছে। তুই যখন প্রথম এই ঘরে ঢুকেছিলি, চিপ বসানোর আগে... কী কোড দিয়েছিলি?"

অর্ক হাত বাড়াল। তার তর্জনীটা কি-প্যাডের ওপর ভাসল। কোনো ক্লাউড নেই, কোনো উইন্ডো নেই। শুধুই তার নিজের অবচেতন মনের এক অস্পষ্ট স্মৃতি।আঙুলটা প্রথমে গেল ‘১’-এ। তারপর একটু থেমে ‘৯’। তারপর ‘৮’, এবং শেষে ‘৩’। ১৯৮৩,তার বাবার জন্মসাল। ক্লিক!

সবুজ আলো জ্বলে উঠল। ভারী মেটালিক লকটা খুলে গেল। ভেতর থেকে অর্কর মা ছুটে এলেন। তাঁর চোখেমুখে চরম আতঙ্ক, কিন্তু ছেলেকে সুস্থ শরীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। "অর্ক! তুই ঠিক আছিস বাবা? পুরো শহরের সিস্টেম ভেঙে পড়েছে! আমি তো ভাবতেই পারছিলাম না তোকে কীভাবে খুঁজে পাব..."

অর্ক মাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত গলায় বলল, "আমি ঠিক আছি মা। একদম ঠিক আছি।"

সে পেছনে ফিরে ঋতজার দিকে তাকাল। ঋতজার মুখে সেই পরিচিত বিজয়ের হাসি।

অর্ক ডান হাতটা কানের পেছনে নিয়ে গেল। তারপর ছোট্ট একটা মোচড় দিয়ে, চামড়ায় লাগানো মেমটেক-৭ চিপটাকে শরীর থেকে পুরোপুরি আলগা করে টেনে বের করে আনল। সামান্য রক্তের ফোঁটা ফুটল চামড়ায়, একটু ব্যথাও করল। কিন্তু সেই ব্যথার সাথে সাথে অর্ক অনুভব করল এক অবিশ্বাস্য মুক্তি।

হাতের তালুতে রাখা খুদে চিপটার দিকে তাকিয়ে সে বলল, "আমরা ভাবতাম এটা আমাদের সুপারপাওয়ার দিচ্ছে। আসলে এটা আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছিল। মানুষের চেয়ে বড় কোনো কম্পিউটার প্রকৃতি আজ পর্যন্ত তৈরি করেনি ঋতু। আমরা শুধু সেটা ব্যবহার করতে ভুলে গিয়েছিলাম।"

বারান্দার বাইরে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। কোনো কৃত্রিম বাতি জ্বলছে না ঢাকা শহরে। কিন্তু কোটি বছর পর, শহরের আকাশের ওপর আজ মেঘহীন তারার মেলা দেখা যাচ্ছে। মহাবিশ্বের নক্ষত্রগুলো নিজেদের আলোয় জ্বলছে,কোনো ক্লাউড সার্ভারের ওপর নির্ভর না করেই।

অর্ক ঘরের পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। বহু বছর ধরে ধুলো জমে থাকা একটি সাদা কাগজের খাতা আর কাঠের পেন্সিল তুলে নিল হাতে। তারপর খাতায় বড় বড় অক্ষরে লিখল,

"আমি ভাবছি, অতএব আমি আছি।"

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login