অয়ন জানালার ভারি পর্দাটা খুব সন্তর্পণে একটু ফাঁক করল। কার্তিকের শেষাশেষি এই সময়টাতে উত্তর দিক থেকে একটা হিমেল স্রোত শহরের কংক্রিটের শরীরে এসে আছড়ে পড়ে। তবে সেই হিমের সঙ্গে মিশে থাকে এক আশ্চর্য নরম আলো,মিষ্টি, তিরতিরে এক টুকরো সোনালী রোদ। এই রোদটুকু অয়নের বড় চেনা, আবার বড় অচেনাও। গত আড়াই বছর ধরে এই আলোটাই তার সারা দিনের একমাত্র সঙ্গী।
দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। অয়ন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোর আগেই ঘরের ভেতর প্রবেশ করল তার ছোট বোন তনয়া। হাতে ধূমায়িত চায়ের কাপ আর কিছু প্রয়োজনীয় অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ট্যাবলেট। তনয়া নিঃশব্দে টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। ভাইয়ের এই একঘেয়ে, নিশ্চল অস্তিত্ব দেখতে দেখতে সে নিজেও যেন কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
“ভাইয়া, চা-টা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।” তনয়ার কণ্ঠে এক ধরণের সাবধানী স্নেহ।
অয়ন কোনো কথা বলল না। শুধু চোখ দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ওষুধগুলোর দিকে একবার তাকাল। তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল জানালার ওপারে। আড়াই বছর আগে, এক বৃষ্টিভেজা শ্রাবণের সন্ধ্যায়, চট্টগ্রামের মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। অয়ন ছিল সেই মাইক্রোবাসের চালকের ঠিক পেছনের সিটে। এক লহমার অসাবধানতা, উল্টো দিক থেকে আসা বেপরোয়া ট্রাক, আর তারপরই ধাতব চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার তীব্র আর্তনাদ। হাসপাতালে যখন অয়নের জ্ঞান ফিরেছিল, তখন সে জেনেছিল তার বাঁ পা-টি হাঁটুর নিচ থেকে চিরতরে বাদ দিতে হয়েছে। আর তার সাথে সাথে বাদ হয়ে গেছে তার জীবনটাও।
সেই যে সে নিজের ফ্ল্যাটের এই আট ফুট বাই দশ ফুটের ঘরটাতে নিজেকে নির্বাসনে পাঠাল, তারপর আর বের হয়নি। হাসপাতালের প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট অয়ন এখন কেবল এক জোড়া ক্রাচ আর একরাশ জমাট বাঁধা অন্ধকারের নাম। বন্ধুরা প্রথম প্রথম আসত, সহমর্মিতা জানাত, আশ্বাস দিত। কিন্তু সময়ের চেয়ে নিষ্ঠুর ওষুধ আর কিছু নেই। সবাই ধীরে ধীরে নিজেদের জীবনে ফিরে গেছে, কেবল অয়ন পড়ে রইল তার থমকে যাওয়া ঘড়ির কাঁটার মতো।
“আজ বিকেলে একটু বারান্দায় যাবি ভাইয়া?” তনয়া আবার চেষ্টা করল। “রোদের রঙটা আজ খুব সুন্দর। একটু আলোয় বসলে মনটা ভালো লাগত।”
অয়ন মৃদু গলায় বলল, “মন ভালো করার কোনো উপায় নেই তনু। আলো আমার জন্য নয়। তুই যা, তোর অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
তনয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই দীর্ঘশ্বাস তাদের পরিবারের প্রতিদিনের রুটিন। সে আর কথা না বাড়িয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অয়ন আবার জানালার কাচে কপাল ঠেকাল।
ঠিক তখনই, উল্টো দিকের বাড়ির তিন তলার খোলা ছাদে একটা নড়াচড়া তার চোখে পড়ল।
উল্টো দিকের বাড়িটা দীর্ঘদিন খালি পড়ে ছিল। পুরনো আমলের লাল ইটের দোতলা দালান, ছাদে এককালে বাগান ছিল হয়তো, কিন্তু পরিচর্যার অভাবে সব শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। দিন চারেক আগে সেখানে নতুন ভাড়াটে এসেছে বলে তনয়ার মুখে শুনেছিল অয়ন। কিন্তু সেদিকে তাকানোর মতো মানসিক অবকাশ তার ছিল না।
আজ প্রথম সে ভালো করে দেখল। ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। পরনে হলুদ রঙের সুতির সাধারণ একটি তাঁতের শাড়ি, এলোমেলো চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। মেয়েটির হাতে একখানা মাটির সরা, তাতে কিছু ভেজা চাল আর জল। সে হাত উঁচিয়ে শব্দ করছে,একঝাঁক চড়াই আর পায়রা তার চারপাশে পাখা ঝাপটে নিচে নেমে আসছে।
মেয়েটির মুখে অদ্ভুত এক আলোর ঝিলিক। যখনই সকালের তির্যক সোনালী রোদ এসে তার মুখের ওপর পড়ছে, মেয়েটি চোখ ছোট করে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে আর খিলখিল করে হাসছে। এমন এক হাসি, যা এই ইট-পাথরের ধূসর ঢাকায় সচরাচর দেখা যায় না। যেন কোনো পাহাড়ি ঝরনা শহরের বুকে পথ হারিয়ে নেমে এসেছে।
অয়ন নিষ্পলক চেয়ে রইল। কতদিন সে কোনো মানুষকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখেনি! তার ঘরের আলোহীন জগতে হাসি জিনিসটা ছিল নিষিদ্ধ কোনো বিষয়ের মতো।
পাখিগুলোকে খাওয়ানো শেষ করে মেয়েটি ছাদের ওপর রাখা ভাঙা একটা টব টেনে আনল। টবের শক্ত এঁটেল মাটি খুরপি দিয়ে আলগা করতে করতে সে সুর করে একটা গান গাইছিল। দূরত্বের কারণে কথাগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না, তবে সুরটা বাতাসে ভেসে এসে অয়নের বদ্ধ জানালার কাচে ধাক্কা খাচ্ছিল।
গান গাইতে গাইতে মেয়েটি হঠাৎ মুখ তুলে সরাসরি অয়নের জানালার দিকে তাকাল। অয়ন চমকে উঠল। চোরের মতো ধরা পড়ে যাওয়ার এক তীব্র লজ্জায় সে দ্রুত পর্দা টেনে দিতে চাইল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, মেয়েটি চোখ ফিরিয়ে নিল না। বরং জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছায়ামূর্তিটিকে স্পষ্ট দেখতে পেয়ে সে একগাল হেসে হাত নাড়ল। যেন বহু যুগের চেনা কোনো বন্ধু ওপারে দাঁড়িয়ে আছে!
অয়নের হাত পর্দার কাপড়ে জমে রইল। বুকে এক অজানা আলোড়ন। সে পর্দাটা টানল বটে, কিন্তু বুক ধড়ফড় থামল না অনেকক্ষণ।
কে এই মেয়ে? এমন অচেনা একটা মানুষের দিকে তাকিয়ে কেউ ওভাবে হাসতে পারে?
পরের কয়েকটা দিন অয়নের জীবনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এল। সকালের সূর্য ওঠার আগেই অয়ন বিছানায় উঠে বসত। যে মানুষটা বেলা এগারোটার আগে বিছানা ছাড়ত না, সে এখন ঠিক সাতটা বাজার দশ মিনিট আগে হুইলচেয়ার কিংবা ক্রাচে ভর দিয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াত। পর্দার ফাঁক দিয়ে সে দেখত উল্টো দিকের ছাদের সেই জীবন্ত ক্যানভাস।
মেয়েটির নাম রোদেলা। নামটা অয়ন জেনেছিল তনয়ার কাছ থেকে। তনয়া একদিন কথায় কথায় বলেছিল, “উল্টো দিকের বাড়িতে এক অদ্ভুত মেয়ে এসেছে রে ভাইয়া। নাম রোদেলা। আর্ট কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্রী। বাবা রিটায়ার্ড সরকারি কর্মকর্তা, মা আর ও,এই নিয়ে সংসার। মেয়েটার সঙ্গে নিচে দেখা হয়েছিল, কী যে অমায়িক ব্যবহার! ছাদে নাকি ক্যাকটাস আর বনসাইয়ের নার্সারি করবে।”
‘রোদেলা’। নামটার সাথেই যেন আলোর একটা অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র আছে। অয়ন মনে মনে হাসল। আসলেই মেয়েটা যেন রোদেরই এক মূর্ত প্রতীক।
রোদেলার প্রতিদিনের নিয়ম ছিল বাঁধা। সকাল সাতটায় ছাদে ওঠা, পাখিদের খাবার দেওয়া, তারপর শুরু হতো তার ক্যানভাসে রঙের খেলা। সে ছাদের এক কোণে ইজেল বসিয়ে ছবি আঁকত। মাঝে মাঝে অয়ন দেখত, রোদেলা ছবি আঁকতে আঁকতে হঠাৎ তুলি থামিয়ে সোজা অয়নের জানালার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে।
প্রথম দু-তিন দিন অয়ন কোনো প্রত্যুত্তর দেয়নি। কিন্তু চতুর্থ দিন, রোদেলা যখন হাত নাড়িয়ে নিজের কানের দুলটা দেখিয়ে ইশারায় কিছু একটা জিজ্ঞেস করল, অয়ন অবচেতনভাবেই নিজের ডান হাতটা সামান্য তুলল। সেই দেখে ছাদের ওপার থেকে মেয়েটা এমনভাবে আনন্দে নেচে উঠল, যেন কোনো দুরূহ যুদ্ধে সে জয়লাভ করেছে!
ধীরে ধীরে জানালার কাচ আর ছাদের কার্নিশের মাঝখানের এই ত্রিশ-চল্লিশ ফুটের দূরত্বটা এক অদৃশ্য সেতুতে পরিণত হলো। দূরত্বের ভাষা বড় বিচিত্র। সেখানে শব্দ থাকে না, কেবল থাকে ইশারা, অভিব্যক্তি আর দৃষ্টির গভীরতা। রোদেলা কখনো তুলি উঁচিয়ে দেখাত,আজ সে নীল রঙ ব্যবহার করছে। অয়ন দূর থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাত। কখনো রোদেলা কফির মগ হাতে নিয়ে ধোঁয়া ওড়াত, অয়ন নিজের টেবিলের চায়ের কাপটা তুলে জানালার সামনে ধরত। এক অদ্ভুত নিঃশব্দ কথোপকথন। যে ছেলেটি আড়াই বছর ধরে নিজেকে চার দেয়ালের ভেতর কয়েদি বানিয়ে রেখেছিল, সে এখন সকালের ওই একটা ঘণ্টার প্রতীক্ষায় পুরো রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দেয়।
কার্তিকের মেঘহীন নীল আকাশে এক বিকেলে হঠাৎ কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা দিল। অকালবৃষ্টি।বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে জানালার পর্দা উড়তে লাগল। অয়ন জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। উল্টো দিকের ছাদে তখন তুমুল কাণ্ড। রোদেলা তার ক্যানভাস আর রঙের টিউবগুলো বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্য পাগলের মতো দৌড়াদৌড়ি করছে। কিন্তু ততক্ষণে ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে গেছে।
ক্যানভাস ঘরে সরিয়ে নেওয়ার পর রোদেলা কিন্তু নিচে নেমে গেল না। সে ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু-হাত প্রসারিত করে মুখটা আকাশের দিকে তুলে দিল। বৃষ্টির ধারায় তার পরনের সুতির শাড়ি ভিজে লেপ্টে গেল, চুল বেয়ে জল পড়তে লাগল। সে ভিজছে আর একা একাই ছাদের ওপর ঘুরে ঘুরে নাচছে।
অয়ন স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় মেয়েটির ভেতরে যেন জীবনের এক আদিম তৃষ্ণা ফুটে উঠছে। হঠাৎ রোদেলা অয়নের দিকে তাকাল। তার ভেজা মুখমণ্ডলে এক অদ্ভুত তীব্র আহ্বান। সে হাত নেড়ে অয়নকে ডাকল,বাইরে এসো! হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছোঁও!
অয়ন নিজের কাটা পায়ের দিকে তাকাল। তার ভেতরে আবার সেই পরিচিত হীনমন্যতার বিষাক্ত সাপটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে তো অক্ষম! সে তো এক অপূর্ণাঙ্গ মানুষ। এই উন্মুক্ত পৃথিবীর বৃষ্টি আর রোদের স্পর্শ পাওয়ার অধিকার তার নেই।
অয়ন তীব্র যন্ত্রণায় জানালার কপাট দুটো সজোরে বন্ধ করে দিল। টেনে দিল ভারী কালো পর্দা। ঘরের ভেতর নেমে এল এক লহমায় কৃত্রিম অন্ধকার। অয়ন ক্রাচ দুটো ফেলে দিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। কেন সে ওই মেয়েটির মায়ায় জড়াচ্ছে? যে জীবনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই, যে মানুষটা সমাজের চোখে কেবল এক করুণার পাত্র, তার আবার কিসের আলো? কিসের রোদ?
পরের তিন দিন অয়ন জানালার পর্দা একচুলও ফাঁক করল না। তনয়া এসে চা দিয়ে গেল, ওষুধ দিয়ে গেল, কিন্তু অয়ন ঘরের বাতিও জ্বালাল না। সে আবার ফিরে গেল তার সেই পুরনো নিঃসঙ্গতার গুহায়। কিন্তু এবার আর আগের মতো শান্তি পাওয়া গেল না। সেই অন্ধকার গুহার ভেতরও এখন একজোড়া ডাগর চোখ আর এক চিলতে সোনালী রোদ এসে কড়া নাড়ে। মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে যেন কেবল ওই একটা সুর বাজছে,রোদেলা, রোদেলা...
চতুর্থ দিন বিকেলে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। অয়ন ভাবল তনয়া হয়তো ফিরেছে। সে নিরুত্তাপ গলায় বলল, “দরজা খোলা আছে তনু, ভেতরে আয়।” দরজাটা খুলে গেল। কিন্তু যে পায়ের শব্দ ঘরের ভেতর ঢুকল, তা তনয়ার পরিচিত চটির শব্দ নয়। একজোড়া কাচের চুড়ির টুংটাং শব্দে নিস্তব্ধ ঘরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। সেই সাথে ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল চন্দ্রমল্লিকা আর ভেজা মাটির এক অচেনা সুবাস।
অয়ন ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে রোদেলা। পরনে তার সেই পরিচিত হলুদ শাড়ি, হাতে মাঝারি আকারের একটি শক্ত কাগজের বোর্ড, যা কাপড়ে মোড়ানো। তার পেছনে দাঁড়িয়ে তনয়া, চোখে এক ধরণের মিটিমিটি দুষ্টুমি আর স্বস্তির হাসি।
“আমি ভেতরে আসতে পারি, মিস্টার জানালার ওপারের মানুষ?” রোদেলার কণ্ঠস্বর যেন বেহালার কোনো কোমল সুর।
অয়ন হতভম্ব। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না। সে কেবল অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। সামনাসামনি রোদেলা আরও বেশি উজ্জ্বল, আরও বেশি বাস্তব।
রোদেলা ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল। সে অয়নের কাটা পা কিংবা ঘরের অপরিচ্ছন্নতার দিকে একবারের জন্যও তাকাল না। তার চোখ শুধু খুঁজে নিল অয়নের চোখ দুটোকে।
“তিন দিন ধরে জানালার পর্দাটা বন্ধ,” রোদেলা অভিমানের সুরে বলল, যেন বহু বছরের অধিকার তার এই মানুষটার ওপর। “আমার পায়রাগুলো ঠিকমতো খাচ্ছিল না। আমার ক্যানভাসের হলুদ রঙটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম ওপাশের মানুষটা বোধহয় শহর ছেড়ে পালিয়েছে!”
অয়ন শুকনো গলায় বলল, “আপনি... তুমি এখানে?”
“হ্যাঁ, এলাম। তনুর সাথে নিচে দেখা হলো। ও বলল ওর ভাইটা খুব একগুঁয়ে, নিজেকে অন্ধকারের ড্রাকুলা বানিয়ে রেখেছে। তাই ভাবলাম সূর্যের রোদ যদি ঘরে না ঢোকে, তবে রোদকে নিজেই হেঁটে হেঁটে ঘরে আসতে হয়।”
অয়ন মাথা নিচু করল। এক তীব্র আত্মগ্লানি তাকে গ্রাস করতে চাইল। “আমার এই ঘরে কোনো রোদ ঢোকার জায়গা নেই রোদেলা। আমি এক পঙ্গু মানুষ। এই অন্ধকারই আমার নিয়তি। তুমি ভুল জায়গায় এসেছ।”
“পঙ্গু?” রোদেলার কণ্ঠে কোনো করুণা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। “পা না থাকা মানে কি জীবন শেষ হয়ে যাওয়া? যার মনের ভেতরে আলো জ্বালানোর মতো আকাশ আছে, সে কখনো পঙ্গু হতে পারে না। তুমি নিজেকে আয়নায় দেখেছ কখনো? তোমার ওই জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা চোখ দুটোর মধ্যে আমি কী দেখেছি জানো?”
রোদেলা তার হাতের মোড়ানো কাগজটার বাঁধন খুলল। তারপর অয়নের কোলের ওপর মেলে ধরল ক্যানভাসটি।
অয়ন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ক্যানভাসে আঁকা এক অপরূপ চিত্রকর্ম। ক্যানভাসের তিন চতুর্থাংশ জুড়ে এক ঘন, নীলচে-কালো অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের এক কোণে একটি খোলা জানালা। সেই জানালা দিয়ে ভেতরে এসে পড়ছে এক অদ্ভুত, মোহনীয় সোনালী রোদ। আর সেই রোদের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক,তার পরনে সাদা শার্ট, মুখমণ্ডলে এক অপার্থিব তৃপ্তি আর গভীর বিষাদ মিলেমিশে একাকার। ছবির নিচে ছোট করে তেলের রঙে লেখা,“অন্ধকারের ওপারে সোনালী রোদ”।
“এটা... এটা আমি?” অয়নের চোখের পাতা ভিজে উঠল।
“হ্যাঁ, এটা তুমি,” রোদেলা অয়নের বিছানার পাশে বসল। তার ডান হাতটা খুব সহজভাবে অয়নের শক্ত হয়ে থাকা বরফশীতল হাতের ওপর রাখল। “গত এক মাস ধরে আমি শুধু তোমাকেই এঁকেছি। তুমি জানো না অয়ন, তোমার ওই দূর থেকে তাকিয়ে থাকা দৃষ্টি আমাকে প্রতিদিন ছবি আঁকার সাহস জুগিয়েছে। যখন তুমি হাত নাড়তে, আমার মনে হতো আজকের দিনটা বৃথা যায়নি। আলো কোনো বাইরে থেকে আসা জিনিস নয় অয়ন, আলো মানুষের বুকের ভেতর থাকে।”
অয়ন রোদেলার হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠল। কত দিন, কত সহস্র প্রহর সে এমন কোনো উষ্ণ স্পর্শ পায়নি! তার বুকের ভেতরের জমে থাকা আড়াই বছরের জমাট পাথরটা হঠাৎ গলে জল হয়ে গেল। অয়ন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুই হাতে মুখ ঢেকে সে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। সেই কান্নায় কোনো হীনমন্যতা ছিল না, ছিল দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তির আকুলতা। রোদেলা তাকে থামাল না। সে শুধু পরম মমতায় অয়নের কাঁধে হাত রেখে বসে রইল। ক্ষতে ওষুধ লাগালে যেমন জ্বালা করে, তেমনই দীর্ঘ অন্ধকারের পর আলোর প্রথম স্পর্শেও চোখ দিয়ে জল পড়ে। এই জল অয়নের পুনর্জন্মের জল।
অগ্রহায়ণের প্রথম সকাল। শহরের কুয়াশা ভেদ করে আকাশে সোনার থালার মতো সূর্য উঠেছে। ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুম পেরিয়ে সদর দরজার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে একটি অবয়ব। অয়ন। তার কাঁধের নিচে এক জোড়া ক্রাচ। পরনে একখানা পরিষ্কার নীল রঙের পাঞ্জাবি, চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো আজ সকালে সে যত্ন করে ট্রিম করেছে। তার পাশে হাঁটছে তনয়া, চোখে আনন্দাশ্রু।
দরজা খুলে বাইরে পা রাখল অয়ন। দীর্ঘ আড়াই বছর পর সে লিফটের বোতাম ছুঁল। নিচে নেমে যখন সে ভবনের প্রধান ফটক পেরিয়ে খোলা রাস্তায় এসে দাঁড়াল, তখন শীতের সকালের নরম হাওয়া তার মুখ ছুঁয়ে গেল। পিচের রাস্তার গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসা গাড়ির হর্ন, ভোরের পাখির কলকাকলি,সবকিছু যেন নতুন কোনো পৃথিবীর সংগীত।
সামনেই সেই লাল ইটের পুরনো বাড়িটা। গেট পেরিয়ে অয়ন বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল। ছাদের কার্নিশ থেকে উঁকি দিল রোদেলা। তার পরনে আজ একখানা উজ্জ্বল লাল রঙের শাড়ি, কপালে ছোট্ট একটা টিপ।
রোদেলা ছাদ থেকে চিৎকার করে বলল, “উপরে আসবে কী করে? এখানে তো লিফট নেই!”
অয়ন নিজের ক্রাচ দুটো মাটির ওপর শক্ত করে গাড়ল। তারপর ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকাল। সূর্যের সোনালী আলো তখন সরাসরি এসে পড়েছে তার মুখের ওপর। সেই আলোয় তার চোখের সমস্ত অন্ধকার এক নিমেষে বিলীন হয়ে গেছে।
অয়ন হাসল। এক অপার, আত্মবিশ্বাসী হাসি। “সিঁড়ি ভাঙতে আমার কষ্ট হবে না রোদেলা!” অয়ন চেঁচিয়ে বলল, তার কণ্ঠস্বর সকালের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো, “কারণ আমি জানি, ছাদের ওপরে আমার জন্য রোদ অপেক্ষা করছে!”
রোদেলা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে ছাদের কার্নিশ থেকে একঝাঁক চড়াই পাখি আকাশে ডানা মেলল। অয়ন এক পা, দুই পা করে সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপে সে অনুভব করতে পারল,জীবন কোনো নিখুঁত অঙ্কের সমীকরণ নয়। জীবনে ভাঙন আসবে, ক্ষতি আসবে, ঝড় এসে সাজানো বাগান তছনছ করে দেবে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তরে ভালোবাসার আলো থাকে, ততক্ষণ কোনো অন্ধকারই চিরস্থায়ী নয়।
প্রেম কোনো অলীক স্বপ্ন নয়; প্রেম হলো সেই নিঃশর্ত হাত, যা অন্ধকারের অতল থেকে টেনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় সকালের মিষ্টি রোদের সামনে। অয়ন এখন আর কোনো ছায়া নয়, সে এক আস্ত মানুষ,যার জীবনের ক্যানভাসে এখন শুধুই সোনালী রোদের অবাধ বিস্তার। আর সেই রোদের নাম,রোদেলা।