ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক ইতিহাসে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামের ধারায় এমন কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রের আবির্ভাব ঘটেছিল, যাঁরা নিছক সামরিক শক্তির শক্তিতে নয়, বরং গণমানুষের অধিকারবোধ ও অদম্য আত্মত্যাগের শক্তিতে সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পুরোভাগে যাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত, তিনি সৈয়দ মীর নিসার আলী,ইতিহাসের পাতায় যিনি চিরভাস্বর হয়ে আছেন ‘তিতুমীর’ নামে। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণের জাল সমগ্র বাংলায় বিস্তৃত এবং তাদের তোষণকারী স্থানীয় জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার সাধারণ গ্রামীণ জনজীবনকে চরম দুরবস্থায় নিক্ষেপ করেছিল, তখন তিতুমীর এক অবহেলিত, নির্যাতিত কৃষকশ্রেণিকে সংগঠিত করে গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধের অভেদ্য দুর্গ। বাঁশের কেল্লার রূপকার এই বীর কেবল ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধেই লড়েননি; তিনি আঘাত হেনেছিলেন তৎকালীন সমাজের সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং নীলকরদের অমানবিক শৃঙ্খলের ওপর। তিতুমীরের লড়াই ছিল স্বাধীনতা, মানবিক আত্মমর্যাদা এবং কৃষক সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তির এক যুগান্তকারী সংগ্রাম।
তিতুমীরের প্রারম্ভিক জীবন ও আত্মিক গঠন
১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি (১৪ মাঘ ১১৮৮ বঙ্গাব্দ) চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ মীর হাসান আলী এবং মাতার নাম আবিদা রোকাইয়া খাতুন। তিতুমীরের পূর্বপুরুষ সৈয়দ শাহাদাত আলী আরব থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় এসে স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেছিলেন।
শৈশবে তিতুমীর অত্যন্ত দুরারোগ্য এক জ্বরে আক্রান্ত হন। সে সময় চিকিৎসার অঙ্গ হিসেবে তাঁকে তিক্ত ও ঝাঁঝালো ওষুধ সেবন করতে দেওয়া হতো। বিষাদময় এই তিতা ওষুধ শিশু নিসার আলী কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই অত্যন্ত আগ্রহের সাথে গ্রহণ করতেন। সেই থেকে পরিবারের সদস্যরা ভালোবেসে তাঁকে ‘তেতো’ বা ‘তিতু’ বলে ডাকতেন; আর এই তিতু থেকেই কালক্রমে তাঁর নাম হয়ে ওঠে ‘তিতুমীর’।
শৈশব থেকেই তিতুমীর ছিলেন অসাধারণ শারীরিক শক্তির অধিকারী, নির্ভীক এবং স্বাধীনচেতা। গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি অত্যন্ত মেধার স্বাক্ষর রাখেন এবং অল্প বয়সেই পবিত্র কুরআন হিফজ করে হাফেজ উপাধি লাভ করেন। একই সাথে তিনি আরবি, ফারসি ও বাংলা ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি তিতুমীর শরীরচর্চা, লাঠিখেলা, কুস্তি ও তীরন্দাজিতে পারদর্শিতা অর্জন করেন। সে যুগে লাঠিখেলা ও কুস্তি কেবল আত্মরক্ষার উপায় ছিল না, বরং তা ছিল গ্রামীণ যুবকদের প্রতিরোধশক্তি ও বীরত্বের প্রতীক। উত্তর চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া অঞ্চলে একজন অপরাজেয় কুস্তিগীর হিসেবে তিতুমীরের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর এই অসামান্য শারীরিক সক্ষমতা এবং গভীর নৈতিক শিক্ষা পরবর্তীকালে তাঁকে কৃষক আন্দোলনের বীরসেনানীতে রূপান্তরে ভূমিকা রেখেছিল।
ঐতিহাসিক পটভূমি: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, নীলকর ও জমিদারতন্ত্র
তিতুমীরের উত্থানের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে তৎকালীন বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে এবং ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস জারি করেন ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’। এই নীতি বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভূমিসম্পর্ককে রাতারাতি ধ্বংস করে দেয়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে একটি কৃত্রিম, পরজীবী জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয়। এই নতুন জমিদাররা ব্রিটিশ সরকারের কাছে নির্দিষ্ট রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে রায়তদের (কৃষক) ওপর অবাধ শোষণের আইনি বৈধতা পায়। চাষীদের জমির স্বত্ব কেড়ে নিয়ে তাদের সম্পূর্ণভাবে জমিদারদের ইচ্ছাধীন প্রজায় পরিণত করা হয়। জমিদাররা খাজনার অতিরিক্ত বহুবিধ বেআইনি উপকর বা ‘আবওয়াব’ ধার্য করে কৃষকদের ওপর চরম জুলুম চালাতে শুরু করে।
একই সময়ে বাংলার উর্বর জমিতে চেপে বসে নীলচাষের বিষবাষ্প। ব্রিটিশ নীলকররা ইউরোপীয় বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে কৃষকদের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের জমি দখল করে জোরপূর্বক নীল চাষে বাধ্য করে। কৃষকদের সামান্য দাদন বা অগ্রিম অর্থ দিয়ে এমন এক ঋণের জালে আবদ্ধ করা হতো, যা বংশপরম্পরায় কৃষকরা শোধ করতে পারত না। নীল চাষে অস্বীকৃতি জানালে কৃষকদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, গবাদিপশু লুট করা হতো এবং পুরুষদের নীলকুঠির অন্ধকূপে আটক রেখে অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবরা পরস্পর জোট বেঁধে সাধারণ কৃষকদের সর্বস্বান্ত করতে নেমেছিল; আর ব্রিটিশ আদালত ও পুলিশবাহিনী সর্বদা কাজ করত এই শোষকদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে। এই ত্রিমুখী শোষণের শিকার গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল এক অগ্ন্যুৎপাতের মতো, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তিতুমীরের নেতৃত্বে।
আধ্যাত্মিক রূপান্তর ও মক্কা সফর
যৌবনে তিতুমীর কিছুকাল স্থানীয় একটি জমিদার পরিবারে দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সেখানে প্রজাদের ওপর জমিদারের অন্যায় আচরণ প্রত্যক্ষ করে তিনি সেই পথ ত্যাগ করেন। ১৮২২ সালে তিতুমীর পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরিফ গমন করেন। এই সফর তাঁর চিন্তাজগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়।
মক্কায় অবস্থানকালে তিতুমীরের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে তৎকালীন ভারতের অন্যতম মহান বিপ্লবী ও সংস্কারক সৈয়দ আহমদ বেরলভীর (রহ.)। বেরলভীর নেতৃত্বে পরিচালিত তরিকাহ-ই-মুহাম্মদীয়া আন্দোলন তখন উত্তর ভারতে শিখ ও ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। সৈয়দ আহমদ বেরলভীর বিপ্লবী আদর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনতা থেকে মুক্তির দর্শন তিতুমীরকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। তিতুমীর আনুষ্ঠানিকভাবে বেরলভীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মক্কায় দীর্ঘ অবস্থানকালে তিনি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, সুফিবাদ এবং সমাজ সংস্কারের আধুনিক রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি উপলব্ধি করেন যে, পরাধীন দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক মুক্তি কোনোদিন সম্ভব নয়; রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক মুক্তিই একটি জাতির আত্মবিকাশের মূল শর্ত। ১৮২৭ সালে তিতুমীর দেশে ফিরে আসেন এক নতুন সংকল্পে দীপ্ত হয়ে।
সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও কৃষক জাগরণ
মক্কা থেকে ফিরে তিতুমীর চব্বিশ পরগনার বারাসাত ও নদীয়া অঞ্চলে ব্যাপক সমাজ সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি সাধারণ মুসলমানদেরকে কুসংস্কার, বেদাত এবং অনৈসলামিক আচার-আচরণ পরিহার করে ইসলামের আদি ও বিশুদ্ধ শিক্ষার দিকে আহ্বান জানান। তবে তিতুমীরের সংস্কার আন্দোলন কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা দ্রুত একটি তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আন্দোলনে রূপ নেয়।
তিতুমীর সমাজের নিচুতলার তাঁতি, চাষী, জেলে ও ভূমিহীন দিনমজুরদের একত্রিত করতে শুরু করেন। তিনি প্রচার করেন যে, আল্লাহর জমিনে মানুষের ওপর মানুষের শোষণ চলতে পারে না। মানুষ কেবল স্রষ্টার অধীন; কোনো জমিদারের অযৌক্তিক হুকুম মানতে কৃষকরা বাধ্য নয়। তিতুমীরের সহজ-সরল জীবনযাপন, অসাধারণ বাগ্মিতা এবং ন্যায়পরায়ণতা গ্রামীণ মেহনতি মানুষকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে প্রান্তিক কৃষকরা তাঁর মধ্যে খুঁজে পায় একজন নির্ভীক অভিভাবককে। তিতুমীর কৃষকদের নিয়ে পঞ্চায়েতি ব্যবস্থা গড়ে তোলেন এবং কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ব্রিটিশদের পক্ষপাতদুষ্ট আদালতের বদলে নিজেদের সালিশি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করার ডাক দেন। এর ফলে জমিদারদের কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত আসে।
স্থানীয় জমিদার ও নীলকরদের সাথে বিরোধ
তিতুমীরের নেতৃত্বে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ রূপ দেখে স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম জমিদাররা নিজেদের কায়েমি স্বার্থে আঘাতের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পুড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়, তারাগোনিয়ার জমিদার রামনারায়ণ, গোবরডাঙ্গার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় এবং নাগপুরের জমিদারেরা তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের দমনে উঠেপড়ে লাগে।
জমিদার কৃষ্ণদেব রায় এক কুখ্যাত ও অবমাননাকর ফরমান জারি করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, তিতুমীরের অনুসারীরা যারা মুখে দাড়ি রাখবে, তাদের প্রতি দাড়ির ওপর আড়াই টাকা করে খাজনা দিতে হবে। এ ছাড়া মসজিদের ওপর কর ধার্য করা হয়, তিতুমীরের অনুসারীদের টুপি পরা নিষিদ্ধ করা হয় এবং নতুন কোনো মসজিদ নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সে যুগে আড়াই টাকা ছিল একজন সাধারণ কৃষকের কয়েক মাসের আয়ের সমান।
এই চরম সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমূলক করের বিরুদ্ধে তিতুমীর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানান। তিনি বারাসাত ও কলকাতার ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে জমিদারদের এই অবৈধ কর ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি প্রদান করেন। কিন্তু ঔপনিবেশিক সরকার জমিদারদের স্বার্থরক্ষায় কোনো প্রতিকার তো করলই না, বরং তিতুমীরের আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেয়। আদালতের দরজা বন্ধ দেখে তিতুমীর বুঝতে পারেন যে, দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে হলে আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে আত্মরক্ষার জন্য প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
১৮৩০ সালে পুড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায় সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে তিতুমীরের অনুসারীদের একটি গ্রামে আক্রমণ করে মসজিদ পুড়িয়ে দেয় এবং নিরীহ কৃষকদের হত্যা ও লুণ্ঠন করে। এই ঘটনায় সাধারণ কৃষকদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তিতুমীর তখন আত্মরক্ষার্থে তাঁর অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেন। প্রতিরোধে সাধারণ লাঠিয়ালদের নিয়ে কৃষকরা জমিদার কৃষ্ণদেবের বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে তিতুমীরের আন্দোলন আত্মরক্ষা থেকে প্রকাশ্য গণসংগ্রামে পদার্পণ করে।
বাঁশের কেল্লা নির্মাণ: স্বাধীনতার এক অনন্য দুর্গ
জমিদারদের সম্মিলিত আক্রমণ এবং তাদের পক্ষে ব্রিটিশ প্রশাসনের নির্লজ্জ অবস্থান দেখে তিতুমীর বুঝতে পারেন যে, খুব দ্রুত কোম্পানি বাহিনী তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। এই বাস্তবতায় ১৮৩১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি বারাসাতের অদূরে বাদুড়িয়া থানার অর্ন্তগত নারকেলবেড়িয়া গ্রামে এক সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
এখানেই জন্ম নেয় ইতিহাসের সেই চিরস্মরণীয় প্রতীক,বাঁশের কেল্লা। আধুনিক সমরাস্ত্র কিংবা পাথরের দুর্গ নির্মাণের আর্থিক বা কারিগরি সক্ষমতা তিতুমীরের ছিল না। কিন্তু তাঁর ছিল হাজার হাজার নিবেদিতপ্রাণ কৃষকের শ্রম এবং স্থানীয় উপকরণের সৃজনশীল ব্যবহার। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত পরিপক্ক বাঁশ কেটে, মাটি ও কাদার গাঁথুনি দিয়ে তিনি এক সুবিশাল ও দুর্ভেদ্য কেল্লা বা দুর্গ নির্মাণ করেন। এই দুর্গের প্রাচীর ছিল অত্যন্ত মজবুত এবং এর চারপাশ গভীর পরিখা দ্বারা বেষ্টিত ছিল।
কেল্লার অভ্যন্তরে তিতুমীর একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। তিনি নিজেকে এই স্বাধীন অঞ্চলের প্রশাসক ঘোষণা করেন। তাঁর বিশ্বস্ত ও প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তাঁরই যোগ্য ভাগ্নে গোলাম মাসুম। আন্দোলনের বেসামরিক উপদেষ্টা ও প্রধান উজির পদে বসেন মইনুদ্দিন নামে এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি।
তিতুমীর বাদুড়িয়া, বারাসাত, নদীয়া এবং সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত স্বাধীন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ব্রিটিশদের শাসন অবৈধ এবং স্থানীয় কৃষকদের আর কোনো ধরনের খাজনা জমিদার বা নীলকরদের দেওয়া হবে না। তিতুমীরের অনুসারী সৈন্যসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজারে পৌঁছায়। তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল দেশীয় বাঁশের লাঠি, ধারালো সড়কি, বল্লম, ধনুক এবং কিছু সংগৃহীত তলোয়ার। আধুনিক কামানের গোলার মুখে কেবল বাঁশ দিয়ে দুর্গ গড়ে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর এই ঘটনা ইতিহাসে অনন্য।
বারাসাত বিদ্রোহ ও প্রাথমিক বিজয়
নারকেলবেড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিতুমীর ও তাঁর বাহিনীর উপস্থিতি পুরো অঞ্চলে এক নতুন শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা দেয়। স্থানীয় নীলকর ও জমিদাররা তিতুমীরের বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্য বিভিন্ন স্থানে চক্রান্ত করতে থাকে। বিশেষ করে মোল্লাহাটির অত্যাচারী নীলকর ডেভিস তার ব্যক্তিগত সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে তিতুমীরের বাহিনীকে আক্রমণের ছক কষে। তিতুমীর তাঁর বাহিনী নিয়ে মোল্লাহাটি নীলকুঠিতে আক্রমণ চালান। নীলকর ডেভিসের গুন্ডাবাহিনী কৃষকদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং ডেভিস কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়। নীলকুঠির বন্দিশালা থেকে শয়ে শয়ে নির্যাতিত বন্দি কৃষককে মুক্ত করা হয় এবং কুঠির যাবতীয় অন্যায় নথি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এরপর একের পর এক প্রতিরোধ যুদ্ধে তিতুমীরের লাঠিয়াল বাহিনী জমিদারদের সশস্ত্র বাহিনীকে পরাস্ত করে। পুড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের প্রাসাদ আক্রান্ত হয় এবং কৃষ্ণদেব পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। বারাসাত ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সরকারি থানাগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার একদল পুলিশ এবং রামনারায়ণ ও কৃষ্ণদেব রায়ের পদাতিক বাহিনী নিয়ে তিতুমীরের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। কিন্তু নারকেলবেড়িয়ার প্রান্তরে তিতুমীরের গেরিলা বাহিনীর প্রবল লাঠির আঘাতে ম্যাজিস্ট্রেটের বাহিনী সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়। আলেকজান্ডার কোনোমতে ঘোড়া ছুটিয়ে প্রাণ বাঁচান এবং বহু সিপাহী ও জমাদার নিহত হয়। এই বিজয়ের ফলে সমগ্র চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জুড়ে তিতুমীরের কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং কৃষক সাধারণের মাঝে এই বিশ্বাস জন্মে যে, ব্রিটিশদের অন্যায় শাসন কোনো অজেয় শক্তি নয়। ইতিহাসে এই আন্দোলনকে আখ্যায়িত করা হয় বারাসাত বিদ্রোহ হিসেবে।
নারকেলবেড়িয়ার ঐতিহাসিক যুদ্ধ ও বীরত্বপূর্ণ শাহাদাত
ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারের শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ ফোর্ট উইলিয়ামে পৌঁছালে তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক চরমভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ রাজ উপলব্ধি করে যে, এটি কেবল স্থানীয় কোনো আইন-শৃঙ্খলাজনিত সংকট নয়; এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত কৃষক বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক বিদ্রোহ। বেন্টিঙ্ক কালবিলম্ব না করে এক পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন। ১৮৩১ সালের নভেম্বর মাসে তিতুমীরকে সমূলে ধ্বংস করতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে এক বিশাল নিয়মিত ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী প্রেরণ করা হয়। এই আধুনিক বাহিনীতে ছিল:
১০০ জন ব্রিটিশ অশ্বারোহী সৈন্য (European Cavalry), ৩০০ জন দুর্ধর্ষ গোর্খা পদাতিক সেনা,বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির এক বিশাল সেনাদল, এবং ধ্বংসাত্মক দুটি আধুনিক আর্টিলারি কামান। ১৪ নভেম্বর ১৮৩১ তারিখে ব্রিটিশ বাহিনী নারকেলবেড়িয়া গ্রাম চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে। ১৯ নভেম্বর সকালে শুরু হয় ইতিহাসের সেই অসম, লোমহর্ষক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম।
একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অত্যাধুনিক রাইফেল, বেয়নেট এবং দূরপাল্লার বিধ্বংসী কামান; অন্যদিকে তিতুমীরের নেতৃত্বে দেশপ্রেমিক কৃষকদের হাতে থাকা দেশীয় বাঁশের লাঠি, বল্লম, ধনুক ও তীর। যুদ্ধের শুরুতে তিতুমীরের অনুসারীরা প্রবল বিক্রমে কামানের তোপ উপেক্ষা করে ব্রিটিশ সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের গগনবিদারী ধ্বনি এবং দুঃসাহসী প্রতিরোধে ব্রিটিশ পদাতিক বাহিনী প্রথমে কিছুটা বিভ্রান্ত ও পিছু হটতে বাধ্য হয়।
কিন্তু বীরত্ব কখনোই আধুনিক কামানের বারুদের বিকল্প হতে পারে না। কর্নেল স্টুয়ার্ট তাঁর গোলন্দাজ বাহিনীকে কামানের মুখ উন্মুক্ত করার নির্দেশ দেন। দূরপাল্লার গোলার আঘাতে তিতুমীরের ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লা একে একে গুঁড়িয়ে যেতে থাকে। বাঁশের প্রাচীর ভেঙে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে দুর্গের সর্বত্র। শত শত যোদ্ধা কামানের গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হতে থাকেন। এতদ্বসত্ত্বেও তিতুমীর এবং তাঁর প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুম আত্মসমর্পণের কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভাবেননি। তিতুমীর কেল্লার ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন। ব্রিটিশদের গোলার সরাসরি আঘাতে এই মহান বীরসিংহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বীরের মতো লড়াই করতে করতে যুদ্ধক্ষেত্রেই শাহাদাত বরণ করেন তিতুমীর।
তিতুমীরের মৃত্যুর পর তাঁর প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুমসহ প্রায় সাড়ে তিনশত অনুসারী জীবিত অবস্থায় ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হন। পরে এক সামরিক প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে সেনাপতি গোলাম মাসুমকে বাঁশের কেল্লার সামনেই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যান্য জীবিত বিপ্লবীদের বিভিন্ন মেয়াদে দ্বীপান্তর ও সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের বাঁশের কেল্লাকে পুরোপুরি পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়, যাতে এই দুর্গের কোনো স্মৃতিচিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে।
ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের বয়ান বনাম বাস্তবতা ঔপনিবেশিক শাসনের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল ছিল নিজেদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিটি মুক্তিসংগ্রামকে কলঙ্কিত করা। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও তৎকালীন সরকারি কর্মচারীরা (যেমন ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার প্রমুখ) তিতুমীরের আন্দোলনকে স্রেফ একটি "ধর্মান্ধ মুসলিমদের উগ্র বিদ্রোহ" বা "ডাকাত দলের বিশৃঙ্খলা" হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। তিতুমীরের রাজনৈতিক ও কৃষকস্বার্থের দিকটিকে সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে একে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসেবে চিত্রিত করার কসরত চলেছে দশকের পর দশক। কিন্তু গভীর ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিতুমীরের আন্দোলন ছিল মূলত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কৃষক বিদ্রোহ।
তিতুমীরের প্রধান শত্রু ছিল ব্রিটিশ শাসন এবং তাদের সহযোগী জমিদার ও নীলকররা। কৃষ্ণদেব রায় কিংবা রামনারায়ণের মতো হিন্দু জমিদারদের তিনি যেমন প্রতিরোধ করেছিলেন, তেমনি পুড়ার মুসলিম জমিদার কিংবা কোম্পানি তোষণকারী যেকোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকেও তিনি ছাড় দেননি।
তিতুমীরের বাহিনীতে অসংখ্য সাধারণ কৃষক যোগদান করেছিল তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা অমানবিক অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য।
বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন যে, তিতুমীর ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম পর্যায়ের কৃষক আন্দোলনের অগ্রদূত, যিনি ধর্মীয় মূল্যবোধকে সাধারণ মানুষের মুক্তির চেতনা ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিতুমীরের গুরুত্ব ও উত্তরাধিকার
১৮৩১ সালে নারকেলবেড়িয়ার বাঁশের কেল্লা হয়তো ধ্বংস হয়েছিল, কিন্তু তিতুমীর যে প্রতিরোধের আগুন প্রজ্বলিত করেছিলেন, তা কোনোদিন নিভে যায়নি। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ভিত্তি: তিতুমীরের এই দুঃসাহসী লড়াই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যে গণপ্রতিরোধের নজির স্থাপন করেছিল, তা পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ এবং নীল বিদ্রোহকে (১৮৫৯-৬০) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রসদ জুগিয়েছিল।
নীল বিদ্রোহের অনুপ্রেরণা: তিতুমীর যেভাবে নীলকুঠি ধ্বংস করে নীলকরদের বিরুদ্ধে আঘাত হেনেছিলেন, তা বাংলার কৃষকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল। নীল চাষের বিরুদ্ধে বাংলার চাষীরা যে সংগঠিত রুখে দাঁড়িয়েছিল, তার শিকড় প্রোথিত ছিল তিতুমীরের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগে।
প্রান্তিক মানুষের নেতৃত্বের উত্থান: সে যুগের যেকোনো বড় প্রতিরোধ আন্দোলন পরিচালিত হতো কোনো রাজা, নবাব বা জমিদারের নেতৃত্বে। কিন্তু তিতুমীর ছিলেন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এমন এক নেতা, যিনি সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষকে (কৃষক, তাঁতি) একত্রিত করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্যারালাল সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।
তিতুমীরের আত্মত্যাগ পরবর্তীকালের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে। বিপ্লবী সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ,ঔপনিবেশিক ও অন্যায্য শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে তিতুমীর বারবার ফিরে এসেছেন আত্মমর্যাদা ও সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে।
তিতুমীর নিছক ইতিহাসের একটি নাম নন; তিনি ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও সামন্তবাদী বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক কালজয়ী চেতনার মূর্ত প্রতীক। আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত বিশ্বের পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শুধুমাত্র সাধারণ বাঁশ ও স্থানীয় লাঠিয়ালদের নিয়ে তিনি যে অসম লড়াইয়ের সাহস দেখিয়েছিলেন, বিশ্ব ইতিহাসে তার নজির বিরল। তিতুমীর জানতেন যে তাঁর এই বাঁশের কেল্লা ব্রিটিশদের ভারী কামানের সামনে বেশিদিন টিকবে না; তবুও তিনি মাথা নত করেননি। কারণ তিনি আপসকামিতার চেয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেছিলেন।
তাঁর শাহাদাত প্রমাণ করেছে যে, কামানের গোলার শক্তিতে হয়তো মাটির শরীরকে চূর্ণ করা যায়, কিন্তু মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতার চেতনাকে কখনো ধ্বংস করা যায় না। তাই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তিতুমীর ছিলেন এক অকুতোভয় "বীরসিংহ",যাঁর গর্জন আজও বাংলার আকাশে বাতাসে স্বাধীনতাবোধ, সাম্য এবং ন্যায়ের পক্ষে লড়ার শাশ্বত প্রেরণা হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।