Article

৭৬ বছরেও দৌড়ের মাঠে নৃপেন

October 28, 2026

6 views

৭৬ বছর বয়সে মানুষ যখন একটু ধীরে হাঁটতে চান, নৃপেন চৌধুরী তখনো দৌড়ান। শুধু নিজের শহরে নয়, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দৌড়ের আসরে ছুটে বেড়ান। ৬৫ বছর বয়সে যে মানুষটি দৌড় শুরু করেছিলেন, তাঁর ঝুলিতে এখন ১৯০টি মেডেল ও ৫০টি ট্রফি-অ্যাওয়ার্ড। ৫০ কিলোমিটার ট্রেইল আলট্রাও দৌড়েছেন। তবে এত অর্জনের পরও নৃপেনের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো পদক নয়; সুস্থ থাকা, স্বাধীনভাবে চলা এবং মানুষের ভালোবাসা পাওয়াই তাঁর কাছে বড়।

আমার বয়স তো ৭৬—এখন আর কী করার আছে ? এমন ভাবনা কখনো আসে না তাঁর মনে। বরং উল্টোটা মনে হয় , এখনও তো অনেক কিছু করার আছে!’

এই ভাবনা থেকেই এখনো দৌড়ান নৃপেন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেউচিয়া গ্রামে তাঁর বাড়ি। কাপড়ের ব্যবসা করতেন। এখন অবশ্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় স্থায়ীভাবে থাকা হয় না। বছরের বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশের দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ছুটে বেড়ান। বাংলাদেশে থাকলে সাধারণত জ্যেষ্ঠ মেয়ে ডা. সংযুক্তার বাসায় থাকেন। বছরের কয়েক মাস কাটান যুক্তরাষ্ট্রে ছোট মেয়ে শর্মিষ্ঠার বাসায়।

দৌড়ের শুরু ৬৫ বছরে

নৃপেনের দৌড়ের গল্প শুরু ২০১৬ সালে। তখন তাঁর বয়স ৬৫ বছর। বান্দরবানে একটি হাফ ম্যারাথন হওয়ার খবর শুনেছিলেন। পরে টেলিভিশনে ম্যারাথন দৌড়ের দৃশ্য দেখেন। সেখান থেকেই দৌড়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। পরদিন থেকেই দৌড়ানো শুরু করেন।

কয়েক মাসের মধ্যে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন। প্রথমে ঢাকায় ১০ কিলোমিটার দৌড়ে অংশ নেন। এরপর কলকাতার TSK25K 2016-এ ১০ কিলোমিটারে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে নিজের বয়সী এবং আরও বয়স্ক দৌড়বিদদের দৌড়াতে দেখে তাঁর উৎসাহ আরও বেড়ে যায়।তারপর আর থামেননি। ধীরে ধীরে দৌড় তাঁর জীবনের ভালোবাসার অংশ হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে শুরু করেন ম্যারাথনের প্রস্তুতি। পরের বছরই অংশ নেন ভারতের Tata Mumbai Marathon-এ। সেটি সফলভাবে শেষও করেন।এখন পর্যন্ত ৮টি পূর্ণ ম্যারাথন সফলভাবে শেষ করেছেন নৃপেন। ম্যারাথনের পূর্ণ দূরত্ব ৪২.১৯৫ কিলোমিটার। তবে একবারে তাঁর সর্বোচ্চ দৌড় ৫০ কিলোমিটার। ২০১৮ সালে ভারতের নৈনিতালে Ultra Warrior–Nainital Trail Ultra-তে ৫০ কিলোমিটার দৌড়ান। প্রায় ২ হাজার ৮১৬ মিটার উচ্চতার এই ট্রেইল দৌড় শেষ করে ITRA-এর ৩ পয়েন্ট অর্জন করেন।

পদকের চেয়েও বড় অর্জন

নৃপেনের দৌড়জীবনের ঝুলিতে জমেছে অসংখ্য পদক ও পুরস্কার। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ইভেন্টে পেয়েছেন ১৯০টি মেডেল এবং ৫০টি ট্রফি/অ্যাওয়ার্ড। অংশ নিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দৌড় প্রতিযোগিতায়। এর মধ্যে Tata Mumbai Marathon, Bank of America Chicago Marathon এবং Wanda Age Group World Championship উল্লেখযোগ্য। তবে একটি অর্জন তাঁর কাছে বিশেষভাবে মূল্যবান। ২০১৯ সালের Tata Mumbai Marathon-এর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে তিনি Wanda Age Group World Ranking-এ স্থান পান। এর ফলে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত Wanda Age Group World Championship-এ অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। সেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ এবং অর্জিত মেডেলকে নিজের দীর্ঘ দৌড়যাত্রার বিশেষ স্বীকৃতি মনে করেন তিনি।তবে পদক-ট্রফির সংখ্যা দিয়ে নিজের সাফল্য মাপতে চান না নৃপেন। তাঁর কাছে আসল অর্জন হলো দৌড়ের মাধ্যমে সুস্থ ও ফিট থাকা, প্রতিযোগিতার আনন্দ এবং মানুষের ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা পাওয়া।

এই বয়সে আবার কেউ দৌড়ায় নাকি!’

দৌড় শুরু করার সময় নৃপেন জানতেন না কতদিন এই অভ্যাস ধরে রাখতে পারবেন। পাঁচ বছর বা দশ বছর—এমন কোনো পরিকল্পনাও ছিল না। শুধু দৌড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।শুরুর দিকে পরিচিতজন ও বন্ধুরা অবশ্য তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছেন। বলেছেন, এই বয়সে আবার কেউ দৌড়ায় নাকি? হাত-পা ভেঙে যাবে, আহত হয়ে পড়ে থাকবে! তাঁদের কথায় থামেননি নৃপেন।দৌড়ের জীবনে এখন পর্যন্ত গুরুতর কোনো ইনজুরিতেও পড়েননি। শুধু নৈনিতালের ৫০ কিলোমিটার আলট্রা দৌড়ের পর দুই-তিন দিন মাংসপেশিতে ব্যথা হয়েছিল। পরে তা এমনিতেই সেরে যায়।

তরুণদের কাছ থেকেও প্রশংসা

দৌড়াতে গিয়ে বেদনার চেয়ে আনন্দের স্মৃতিই বেশি নৃপেনের। ২০১৮ সালে কলকাতার একটি ইভেন্টে কয়েকজন তরুণ বিদেশি দৌড়বিদের সঙ্গে দৌড়াচ্ছিলেন। তাঁদের পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। তখন তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন, ‘Sir, you are running like a 30 year young!’

হায়দরাবাদ ম্যারাথনেও এক তরুণ দৌড়বিদ তাঁকে বলেছিলেন, ‘Sir, you are faster than me.’এমন মন্তব্য তাঁকে আনন্দ দেয়। আবার বিভিন্ন দৌড়ের আসরে শিশু থেকে প্রবীণ—অনেকেই তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে আগ্রহ দেখান। সানন্দে তাঁদের সঙ্গে ছবি তোলেন তিনি।মানুষের এই ভালোবাসা, সম্মান এবং দৌড়ের পথে তৈরি হওয়া সুন্দর মুহূর্তগুলোই নৃপেনের কাছে বড় প্রাপ্তি।

বয়স বাড়লেও শরীর থামবে কেন?

৭৬ বছর বয়সে নিয়মিত দৌড়ানোর শক্তি কোথা থেকে পান নৃপেন? তাঁর উত্তর, সুস্থ ও প্রফুল্ল থেকে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার আনন্দই তাঁর বড় শক্তি। মনকে চিরতরুণ রাখা এবং যেকোনো বয়সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব—এই আত্মবিশ্বাস তাঁকে প্রতিদিন ট্র্যাকে নামায়।

তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা হলো, বয়স বাড়লে শরীরের সক্ষমতা কিছুটা কমতে পারে। তাই বলে শরীরচর্চা বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন, গতি ও সময় ঠিক করে নিতে হবে।

তবে ৫০ বছরের বেশি বয়সী কেউ নতুন করে দৌড় বা ব্যায়াম শুরু করতে চাইলে প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন তিনি। নিজের শারীরিক অবস্থার জন্য দৌড়ের মতো তুলনামূলক উচ্চমাত্রার ব্যায়াম উপযোগী কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। চিকিৎসকের অনুমতি থাকলে ধীরে শুরু করার পরামর্শ তাঁর। প্রথমে হাঁটা ও অল্প সময়ের দৌড় মিলিয়ে শুরু করা যেতে পারে। শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় ও দূরত্ব বাড়াতে হবে।

 শুধু দৌড় নয়

নৃপেনের কাছে সুস্থ থাকার জন্য শুধু দৌড় যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম খাবারের পাশাপাশি স্ট্রেংথ ট্রেনিং, ফ্লেক্সিবিলিটি ও ব্যালান্স ট্রেনিংও দরকার বলে মনে করেন তিনি।

কার্ডিও এক্সারসাইজ হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। স্ট্রেংথ ট্রেনিং পেশির শক্তি ধরে রাখতে সহায়তা করে। ফ্লেক্সিবিলিটি শরীরকে নমনীয় রাখতে এবং ব্যালান্স ট্রেনিং বিশেষ করে প্রবীণ বয়সে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে মনে করেন তিনি।

নিজের সকালটাও প্রস্তুতি দিয়ে শুরু করেন নৃপেন। ঘুম থেকে উঠে প্রায় ৫০০ মিলিলিটার পানি পান করেন। আধা ঘণ্টা পর দৌড়ের ধরন ও দূরত্ব অনুযায়ী হালকা নাশতা করেন। এরপর প্রায় আধা ঘণ্টা পর এক কিলোমিটার brisk walking করে শরীর গরম করেন। কিছু হালকা ড্রিল শেষে শুরু করেন দৌড়।

পরিবারের সঙ্গেও দৌড়

নৃপেনের দৌড় শুধু তাঁকে একা সক্রিয় রাখেনি, পরিবারের সদস্যদেরও কাছে এনেছে। তাঁর দুই মেয়ে ও তিন নাতি কোনো না কোনো সময়ে তাঁর সঙ্গে দৌড়েছেন।একসঙ্গে দৌড়ানোয় শুধু শরীর সক্রিয় থাকেনি, পারিবারিক বন্ধনও আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর কাছে দৌড় তাই শুধু শরীরচর্চা নয়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোরও একটি সুন্দর মাধ্যম।

সামনে ৩০০

এখন নৃপেনের সামনে নতুন লক্ষ্য—৩০০টি ইভেন্টে অংশ নেওয়া। ৭৬ বছর বয়সে নতুন লক্ষ্য ঠিক করার পেছনে তাঁর যুক্তি সহজ। নতুন ইভেন্ট, নতুন জায়গা এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আনন্দ তাঁকে উৎসাহ দেয়।

তবে ৩০০ তাঁর কাছে শেষ গন্তব্য নয়। আরও কিছু সুন্দর স্মৃতি তৈরির একটি লক্ষ্য মাত্র।

যাঁরা সারাদিন অফিসে বসে থাকার কারণে ব্যায়ামের সময় পান না, তাঁদের জন্য নৃপেনের বার্তাও সরল: ব্যায়াম করার জন্য সময় খুঁজে পেতে হয় না, সময় বের করে নিতে হয়।’ তাঁর মতে, সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজের শরীরকে দেওয়া খুব বেশি কিছু নয়। দরকার শুধু সদিচ্ছা ও সুস্থ থাকার আকাঙ্ক্ষা।

তরুণদেরও তাঁর পরামর্শ—দৌড়কে শুধু প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার অংশ হিসেবে নিতে হবে। শুরুতেই দ্রুত বা বেশি দূরত্বে যাওয়ার চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে গতি ও দূরত্ব বাড়াতে হবে। শরীরের সংকেত শুনতে হবে, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে হবে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। পাশাপাশি স্ট্রেংথ, ফ্লেক্সিবিলিটি ও ব্যালান্স ট্রেনিংও চালিয়ে যেতে হবে।

৬৫ বছরের নৃপেনকে কী বলতেন?

আজকের ৭৬ বছরের নৃপেন যদি ফিরে গিয়ে ৬৫ বছরের নৃপেনের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন, কী বলতেন তাঁকে? নৃপেনের উত্তর, সেদিন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। সেই সিদ্ধান্তের পর হাজারো মাইলের ঘাম, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং দৌড় তাঁকে দিয়েছে শারীরিক সুস্থতা, আনন্দ আর মানুষের ভালোবাসা।

আর তাই এখনো থামতে চান না তিনি।

নৃপেনের বয়স ৭৬। কিন্তু তাঁর চোখে বয়স কোনো শেষরেখা নয়। যতদিন সুস্থ ও সক্ষম আছেন, ততদিন শরীর ও মনকে সক্রিয় রাখতে চান। দেশ-বিদেশ ঘুরতে চান, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে চান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান। কারণ তাঁর কাছে জীবনের দৌড় এখনো শেষ হয়নি। বরং ৭৬ বছর বয়সেও তিনি মনে করেন—সামনে আরও অনেক পথ বাকি।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login