মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
এনজিওর ঋণ আর বাবা-মায়ের সহযোগিতায় কেনা একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতেই মানুষের গল্প খুঁজতে নেমেছিলেন মুহাম্মদ এমদাদ হোসাইন। সেই ক্যামেরায় তোলা অভাব, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের গল্পই একদিন পৌঁছে যায় বিশ্বমঞ্চে। এনে দেয় দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
মুহাম্মদ এমদাদ হোসাইনের বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার উত্তর ওয়াহেদপুর গ্রামে। বাবা, মা, ভাই, বোন ও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর পরিবার। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই চারপাশের প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষ ও যাপিত জীবন তাঁকে টানত। ভাবতেন, এসব দৃশ্য ছবির ফ্রেমে ধরে রাখতে পারলে কেমন হয়। সেই কৌতূহল আর ভালো লাগা থেকেই ফটোগ্রাফির জগতে আসা। তখন একটুও ভাবেননি, একদিন ফটোগ্রাফিই তাঁর পেশা হয়ে উঠবে। শুরুতে এটি ছিল কেবল কৌতূহল আর ভালো লাগার জায়গা। মুঠোফোনে নিজের পছন্দের দৃশ্যগুলো বন্দী করে রাখতেন। ২০১৬ সালে এসে মোবাইলের ক্যামেরায় আর মন ভরছিল না।
একটি গ্রামীণ এনজিও থেকে ঋণ এবং বাবা-মায়ের সহযোগিতায় প্রথম ডিএসএলআর ক্যামেরা কেনেন তিনি। এই ক্যামেরাই তাঁকে এক ভিন্ন জগতের সন্ধান দেয়। কৌতূহল থেকে যে ক্যামেরা হাতে নিয়েছিলেন, একসময় সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর পেশা। শুরুর দিকে নিজেই ছবি তুলতেন, পরে নিজের ছবির ভুলগুলোও নিজেই খুঁজে বের করতেন।
পেশাগতভাবে এমদাদের ফটোগ্রাফির যাত্রা শুরু হয় ২০২০ সালে। সে সময় তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সলেন্ট নিউজ অ্যান্ড ফটো এজেন্সির সঙ্গে ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে যুক্ত হন।
এরপর ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জুমা প্রেস -এর সঙ্গে ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশে থেকে ফ্রিল্যান্স ডকুমেন্টারি ফটোসাংবাদিক ও ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি ইতালির নুরফটো -এর ফ্রিল্যান্স কন্ট্রিবিউটর। আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফটো ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কন্ট্রিবিউটর ও অ্যাম্বাসেডর হিসেবে যুক্ত আছেন। ফ্রিল্যান্স কাজের কারণে নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা পান এমদাদ। তাঁর মনে হয়, কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে এই স্বাধীনতা হয়তো পেতেন না। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এত কিছু অর্জন করাও সম্ভব হতো কি না, সেটি তাঁর কাছে আজও প্রশ্ন।
এমদাদ যখন ফটোগ্রাফি শুরু করেন, তখন এ বিষয়ে তাঁর কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না, সুযোগও ছিল সীমিত। অথচ সংগ্রাম করে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও নিজের জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। এমদাদের মতে, ফটোগ্রাফিতে টিকে থাকতে ভালো ছবির পাশাপাশি ধৈর্য, ধারাবাহিকতা ও শেখার ইচ্ছাও জরুরি। ছবি কেউ গ্রহণ না করলেও থেমে থাকেননি। বরং আরও উৎসাহ নিয়ে ছবি তোলা ও শেখার কাজ চালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, “আমি ছবি তোলা বন্ধ করিনি। নিজের কাজ দেখেছি, অন্যদের কাজ থেকে শিখেছি, প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপের সুযোগ নিয়েছি এবং বিভিন্ন জায়গায় নিজের কাজ পাঠিয়েছি।”
এমদাদের ছবির বিষয়ও বহুমাত্রিক। কখনো একটি বিষয়ে আটকে থাকেননি। মানুষ, সমাজ ও পরিবেশ তো আছেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দৈনন্দিন জীবন, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত সংকট, পানি সংকট, দূষণ বা বাস্তুচ্যুতির মতো বড় পরিবর্তনের প্রভাবও তাঁর ছবিতে বারবার জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। মানুষের সংগ্রাম, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই—তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে, তাঁদেরই একজন হয়ে তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর এসব কাজ বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় বারবার প্রকাশিত হয়েছে।
ফটোগ্রাফির পথে চলতে চলতে একসময় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আসে এমদাদের জীবনে। সেই প্রথম স্বীকৃতির কথা আজও ভুলতে পারেননি তিনি। ROSL PHOTO ১৯-এ ‘Madiha Aijaz Young Photographer of Promise’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার মুহূর্তটি তাঁর কাছে ছিল বিশেষ কিছু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। Amateur Photographer এর ‘Young APOY 2021’ প্রতিযোগিতায় যৌথভাবে বিজয়ী হন তিনি। একের পর এক এমন স্বীকৃতি তাঁর কাজের প্রতি বিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
এমদাদের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ছবি। এর মধ্যে রয়েছে দ্য গার্ডিয়ান, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, দ্য টাইমস, বিবিসি, সিএনএন, ফোর্বস, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কাজ। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ, ইউনেস্কো, ইউএন নিউজ, এফএও ও ইউএনডিআরআর। বাংলাদেশের প্রায় সব প্রধান জাতীয় সংবাদপত্রেও একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ছবি।
দেশি-বিদেশি পুরস্কারের ঝুলিটাও বেশ সমৃদ্ধ এমদাদের। তাঁর দাবি, এ পর্যন্ত ২০০টির বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—এএফপি (আঁস ফ্রঁস-প্রেস) মারাই ফটো গ্রান্ট — ফ্রান্স,ফটোঅ্যাকুয়া ২০২৬ — বিজয়ী, স্পেন,সিটি অব লাতিনা আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা — গ্র্যান্ড উইনার, ইতালি,দ্য জন রাসকিন প্রাইজ — যুক্তরাজ্য,‘ জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) আয়োজিত ওনলি ওয়ান আর্থ’ , ইয়াং অ্যামেচার ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার — যৌথ বিজয়ী — যুক্তরাজ্য,গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স জলবায়ু ফটো এসেই প্রতিযোগিতা — প্রথম স্থান, যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এত অর্জনের মধ্যেও এএফপির মারাই ফটো গ্রান্ট পাওয়াকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এমদাদ। অনলাইন প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী, ওপেন কল ও জুরি-ভিত্তিক প্রতিযোগিতাতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। তাঁর হিসাবে, এমন অংশগ্রহণের সংখ্যা শতাধিক।
এমদাদের আলোচিত ছবিগুলোর একটি—নদীর পাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপের ওপর ঘুমিয়ে আছেন এক গৃহহীন নারী। পাশে কালো, দূষিত পানি। ছবিটিতে শুধু তাঁর অসহায়ত্ব নয়, দারিদ্র্য, পরিবেশদূষণ ও বেঁচে থাকার কঠিন বাস্তবতাও ধরা পড়েছে। হয়ে উঠেছে ঢাকার প্রান্তিক মানুষের জীবনের এক নীরব প্রতিচ্ছবি।
২০২৩ সালের ১৫ মে খুলনার শ্যামনগরে তোলা আরেক ছবিতে দেখা যায়, ফেটে চৌচির মাটির পাশ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন এক নারী ও তাঁর নাতি। অথচ তাঁদের বসতি নদীর কাছেই। চারপাশে পানি থাকলেও পান করার মতো মিষ্টি পানি নেই। প্রতিদিন দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় তাঁদের। এমদাদের কাছে ছবিটির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য—চারপাশে নদী, অথচ তৃষ্ণা মেটানোর পানি নেই।
২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ফেনীর বন্যায় তোলা আরেক ছবিতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা নারী ও শিশুদের নৌকায় করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। একজনের কোলে শিশু, অন্যরা ছাতা ধরে তাঁদের বৃষ্টি থেকে আড়াল করছেন। চারপাশে বন্যার পানি। দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর এই দৃশ্য ছবিটিকে দিয়েছে এক গভীর মানবিক আবেদন।
আজকের অবস্থানে আসতে এমদাদকে অনেক চ্যালেঞ্জ পেরোতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক এজেন্সি ও সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ, কাজ পাঠানো, পোর্টফোলিও তৈরি—সবই ধীরে ধীরে শিখেছেন। শুরুতে ইংরেজিতে যোগাযোগ করাও তাঁর জন্য সহজ ছিল না। পরে সেটিও আয়ত্ত করেছেন। এমদাদ বলেন, “আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় শিক্ষা পেয়েছি—কোথা থেকে শুরু করেছেন, তা নয়; শেষ পর্যন্ত কাজের সততা, ধারাবাহিকতা ও গল্প বলার সক্ষমতাই আপনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
ছবি তুলতে গিয়ে একবার সত্যিই জীবনসংকটে পড়েছিলেন এমদাদ। ঘটনাটি ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, রাজবাড়ীর একটি চরে। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, শুধু বালুচর। কাজের একপর্যায়ে হঠাৎ বদলে গেল আবহাওয়া। তারপরই শুরু হলো ভয়ংকর বালুর ঝড়। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক অন্ধকারের মতো হয়ে গেল। প্রচণ্ড বাতাসের সঙ্গে বালু ছুটে এসে আঘাত করতে লাগল চোখে-মুখে। চোখ খোলা যাচ্ছিল না। সামনে কী আছে, কোন দিকে যাবেন—কিছুই বোঝার উপায় নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচিত চারপাশটাও যেন হারিয়ে গেল বালুর আড়ালে। খোলা চরের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে তখন সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন এমদাদ। মনে হচ্ছিল, এই ঝড় থামবে তো? নাকি আরও ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে? কিছু সময় পর ঝড়ের তীব্রতা একটু কমলে স্থানীয়দের সহায়তায় নিরাপদ জায়গায় যেতে পারেন তিনি। সেই মুহূর্তের কথা মনে হলে আজও শিউরে ওঠেন এমদাদ।
অন্যদের তুলনায় এমদাদের কাজের ধরনটা যেন একটু আলাদা। কোনো ঘটনা ঘটলে তিনি যত দ্রুত সম্ভব ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর কাজ শুধু ঘটনাস্থলে পৌঁছানোতেই শেষ নয়। তিনি সময় নিয়ে মানুষের কাছাকাছি যান, তাঁদের জীবনযাপন, প্রস্তুতি, ভয় ও অপেক্ষাকে বোঝার চেষ্টা করেন। একটি ঘটনার শুরু থেকে তার পরের পরিবর্তন—দীর্ঘ সময় ধরে সেটিকে নথিবদ্ধ করেন।
ক্যামেরা হাতে নিয়েই ছবি তোলায় তাঁর তাড়া নেই। আগে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যান, চারপাশ বোঝেন, মানুষের সঙ্গে সময় কাটান। তারপর যখন মনে হয় মুহূর্তটি নিজেই একটি গল্প বলছে, তখনই ক্যামেরার শাটারে চাপ দেন। তাই তাঁর ছবিতে শুধু একটি ঘটনা দেখা যায় না, দেখা যায় সেই ঘটনার ভেতরে থাকা মানুষের জীবনও।
বিদেশের খ্যাতিমান ফটোগ্রাফারদেরও প্রশংসা পেয়েছে এমদাদের কাজ। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ইতালির City of Latina International Photography Competition-এ তাঁর ‘Survival Amidst Pollution’ ছবিটি Overall Winner নির্বাচিত হওয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডে ছিলেন ইতালীয় ফটোসাংবাদিক ও ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার ফাবিও বুচিয়ারেল্লি, ফটোগ্রাফার ও কিউরেটর ক্রিস নাইটসহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। জুরির লিখিত মূল্যায়নেও ছবিটির শক্তি ও আবেগের প্রশংসা করা হয়।
ফটোগ্রাফিতে সফলতার পেছনে পরিবারের অবদানকেই শতভাগ কৃতিত্ব দিতে চান এমদাদ। তাঁর ভাষায়, “বাবা-মা, ভাই-বোন ও স্ত্রীর ভালোবাসা ও সহযোগিতা ছাড়া আজকের জায়গায় আসতে পারতাম না। পরিবারের বিশ্বাস ও সমর্থনই কঠিন সময়েও আমাকে কাজ করে যাওয়ার সাহস দিয়েছে।”
ভবিষ্যতে ফটোগ্রাফিতে আরও গভীরভাবে কাজ করতে চান এমদাদ। নিজের একটি একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি কাজ নিয়ে একটি ফটোগ্রাফি বই প্রকাশের ইচ্ছা আছে তাঁর। পাশাপাশি বিদেশে গিয়ে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং নিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চান। সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, বাংলাদেশের মানুষের গল্প আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরা।