Fiction

লাল খামের রহস্য

October 28, 2026

4 views

মিরপুর রোডের ওপর গাড়িগুলোর অবিরাম হর্নের আওয়াজ আর আসাদগেটের ট্র্যাফিক জ্যামের কোলাহল ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের সুবিশাল সবুজ ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকতে গিয়ে যেন থমকে দাঁড়ায়। প্রায় পঞ্চাশ একরের এই নির্জন, সুবিন্যস্ত প্রাঙ্গণে তখন হেমন্তের শেষ বিকেলের হালকা সোনালী রোদ আর ঝরাপাতার সোঁদা গন্ধ। কলেজের সাত নম্বর একাডেমিক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বাইসাইকেলের চেইন ঠিক করছিল জাবির আল রাইয়ান। ক্লাস এইট, সেকশন ‘বি’, হাউস,ফজলুল হক। চশমার পুরু ফ্রেমের পেছনে রাইয়ানের বাদামি চোখ দুটোতে সবসময় এক ধরনের তীব্র কৌতূহল খেলে যায়। ক্লাসের ফার্স্ট বয়দের মতো সে সারাদিন শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকে না; স্কুলের সায়েন্স ক্লাব, আইটি সোসাইটি আর বিতর্ক দলের নিয়মিত সদস্য সে। তবে তার আসল নেশা হলো ক্রিপ্টোগ্রাফি, প্রাচীন রহস্যের বই আর সাইবার পাজল সমাধান করা। সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা আর শার্লক হোমস পড়ে পড়ে তার মনটা গড়ে উঠেছে একজন খাঁটি ইনভেস্টিগেটরের মতো।

"এই রাইয়ান! তোর চেইন কি আজও তোকে ড্রিমল্যান্ডে পৌঁছে দেবে, নাকি আমরা পায়ে হেঁটেই মোহাম্মদপুর যাব?"

ডাক শুনে ঘাড় ঘোরাল রাইয়ান। তারই সহপাঠী এবং ক্লাসের সবচেয়ে চঞ্চল ছেলে,তাহমিদ। রাইয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাহমিদের মাথায় সবসময় দুষ্টু বুদ্ধি আর স্কুলের ফুটবল টিমের স্ট্রাইকার হিসেবে তার আলাদা একটা ভাব আছে। তার কাঁধে ঝোলানো ভারি স্পোর্টস ব্যাগ।রাইয়ান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে আঙুলের গ্রিজ মুছতে মুছতে বলল, "সবুর কর তাহমিদ। ধৈর্যের ফল সবসময় সাইকেলের নতুন চেইনের মতোই মসৃণ হয়।"

"তোর দর্শন তোর ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডে রেখে আয় ভাই! বাড়ি গিয়ে এক কাপ চা আর আম্মুর বানানো পেঁয়াজু না খেলে আমার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো আজ ধর্মঘট ডাকবে।"

দুজনে সাইকেল ঠেলে মেইন গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। ঠিক তখনই কলেজের মূল প্রশাসনিক ভবনের পেছনে, প্রাচীন মেহগনি গাছের ছায়ায় ঘেরা পুরোনো কমনরুমের করিডোরে রাইয়ানের চোখ আটকে গেল। কমনরুমের কাঠের নোটিশ বোর্ডের নিচে, ঘাসের ওপর লাল টুকটুকে কিছু একটা পড়ে আছে। বাতাসের ঝাপটায় সেটা মৃদু কাঁপছে।

"কী দেখছিস ওদিকে?" তাহমিদ জিজ্ঞেস করল।

"এক মিনিট দাঁড়া তো," রাইয়ান সাইকেলটা একপাশে স্ট্যান্ড করে ঘাসের লন পেরিয়ে মেহগনি তলায় গিয়ে দাঁড়াল।

ঘাসের ওপর পড়ে আছে মাঝারি আকারের একটি গাঢ় রক্তবর্ণ খাম। সাধারণ কোনো পোস্ট অফিসের খাম নয় এটি। অত্যন্ত দামি, ভারী হ্যান্ডমেড আর্ট পেপারের তৈরি। আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো,খামের মুখটা কোনো সাধারণ আঠা দিয়ে নয়, বরং খাঁটি লাল মোম গলিয়ে সিলমোহর দিয়ে আটকানো। আর সেই মোমের সিলমোহরের বুকে কোনো এক প্রাচীন প্রতীকের ছাপ,একটি বৃত্তাকার ডালপালার ভেতর আঁকা একজোড়া চাবুক আর নিচে খোদাই করা রোমান হরফে তিনটি সংখ্যা: ‘VIII-C-1994’।

খামের ওপরে নিবের কলম আর ঘন কালো কালিতে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পরিষ্কার বাংলায় লেখা:

"প্রাপক: জাবির আল রাইয়ান, শ্রেণি: অষ্টম, রোল: ০৭।"

তাহমিদ ততক্ষণে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। খামটার দিকে তাকিয়ে সে চোখ কপালে তুলল, "আরে ভাই! এটা কী রে? তোকে আবার কেউ লাভ লেটার পাঠাল নাকি? কিন্তু এই মধ্যযুগীয় লাল মোমের সিল মারল কে? আর এই নির্জন জায়গায় ফেলে গেলই বা কীভাবে? রাইয়ান কোনো কথা বলল না। সে ঝুঁকে পড়ে খুব সাবধানে খামের কোণাটা ধরল। খামটা বেশ ভারী। ভেতরে কাগজের চেয়েও শক্ত কোনো ধাতব বস্তুর অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে।

"এটা কোনো প্রেমের চিঠি নয় তাহমিদ," রাইয়ান গম্ভীর মুখে বলল, "এখানে রক্তের মতো লাল রঙের কালি আর মোম ব্যবহার করা হয়েছে। আর আমাদের ক্যাম্পাসে আজ সারাদিন ইন্টার-স্কুল ডিবেট চলছিল। বাইরের শত শত ছাত্র আর অতিথি এসেছে। কেউ একজন সুযোগ বুঝে এই নির্জন কর্নারে এটা রেখে গেছে আমারই জন্য।"

"খুলে দেখ না ভেতরে কী আছে! এত সাসপেন্স সিনেমা আমার সহ্য হয় না!" তাহমিদ তাড়া দিল।

রাইয়ান তার জ্যামিতি বক্স থেকে সাবধানে একটা ধারালো কম্পাস বের করে মোমের সিলটা অক্ষত রেখে পেছনের খাঁজ কেটে খামের মুখ আলগা করল। খামের ভেতর থেকে প্রথমে বেরিয়ে এল ভারী একটি ধাতব বস্তু। সেটা হাতে নিতেই দুজনেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।

একটি প্রাচীন, মরচে ধরা পিতলের চাবি। চাবির গায়ে একটি ক্ষুদ্র সংখ্যা খোদাই করা,**‘B-13’**।

আর চাবির সাথে ভাঁজ করা একটি ধূসর রঙের অ্যাসিড-ফ্রি কাগজ। তাতে টাইপরাইটারে টাইপ করা মাত্র কয়েকটি লাইন:

> "রাইয়ান, তুমি যুক্তিবাদী এবং গণিতে পারদর্শী বলে তোমাকেই বেছে নেওয়া হলো। আজ মধ্যরাত বারোটায় ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের সুবর্ণ গৌরবের একটি অংশ চিরতরে ছাই হয়ে যাবে। যদি পারো, তবে ‘বি-১৩’-এর বন্দিশালা থেকে সত্যকে উদ্ধার করো।

> প্রথম ক্লু তোমার হাতের চাবিতেই লুকানো। কিন্তু মনে রেখো, আলো যখন নিভে যায়, তখন ছায়ারা কথা বলতে শুরু করে।

> সময় বাকি মাত্র ছয় ঘণ্টা। কোনো পুলিশ বা শিক্ষককে জড়ালে খেলা শেষ হয়ে যাবে।"

চিঠির নিচে কোনো নাম নেই। কেবল আঁকা আছে সেই একই প্রতীক,বৃত্তাকার ডালপালার মাঝে চাবুকের চিহ্ন। তাহমিদের মুখের রক্তিম ভাব নিমিষে মিলিয়ে গেল। সে রাইয়ানের হাত ধরে কাঁপা গলায় বলল, "দোস্ত... এটা কোনো মারাত্মক প্র্যাঙ্ক, না হলে কোনো সাইকোপ্যাথের কাজ! চল, এখনই ভাইস প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে গিয়ে এটা জমা দিই।"

রাইয়ান চাবিটা আলোর বিপরীতে তুলে ধরল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। "তাহমিদ, ভালো করে লক্ষ্য কর। চিঠির কাগজটা সাধারণ নয়। এটা ১৯৭০ বা ৮০-র দশকের অফিসিয়াল টাইপরাইটারের ফন্ট। আর চাবিতে লেখা ‘B-13’। আমাদের কলেজে ‘বি’ দিয়ে কী আছে বল তো?"

তাহমিদ কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল, "আমাদের ফজলুল হক বা ড. কুদরত-ই-খুদা হাউস নয়... কলেজের সবচেয়ে পুরোনো আন্ডারগ্রাউন্ড আর্কাইভ,‘বেসমেন্ট ১৩’? ওটা তো নব্বইয়ের দশক থেকে পরিত্যক্ত আর তালাবন্ধ!"

সন্ধ্যা নেমে এসেছে ক্যাম্পাসে। শীতের শুরুতে কুয়াশা জমে উঠছে বিশাল খেলার মাঠের ওপর। সাধারণ ডে-স্কলার ছাত্ররা সবাই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছে, কেবল আবাসিক হোস্টেলগুলোর জানালায় হলুদ বাতি জ্বলছে। রাইয়ান ও তাহমিদ কলেজের ক্যাফেটেরিয়ার পেছনে পুরোনো সাইকেল স্ট্যান্ডের আড়ালে লুকিয়ে অপেক্ষা করছিল। রাইয়ান তার স্কুলের ব্যাকপ্যাকে দুটি শক্তিশালী এলইডি টর্চ, একটি সুইস নাইফ, কিছু প্লাস্টিক জিপ-লক ব্যাগ আর তার বাবার পুরনো ডিজিটাল ক্যামেরা ভরে নিয়েছে।

"রাইয়ান, এখনো সময় আছে। চল গার্ডদের বলি," তাহমিদ দাঁতে দাঁত চেপে কাঁপছিল। শীতের জন্য নয়, উত্তেজনায়।

"গার্ডদের বললে তারা এটাকে দুষ্টুমি ভেবে আমাদেরই ডিসিপ্লিনারি কমিটির সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে," রাইয়ান ফিসফিস করে বলল, "আর চিঠিতে স্পষ্ট লেখা আছে,পুলিশ বা স্যারদের জানালে কোনো বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। সুবর্ণ গৌরব বলতে কলেজের কিছু একটা ধ্বংস করার কথা বলা হয়েছে। এই কলেজ আমাদের প্রাণের জায়গা তাহমিদ। এখানে কিছু ঘটতে আমি দেব না।"

পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের পেছনে, ল্যাবরেটরি ভবনের নিচে মাটির নিচে নেমে যাওয়া স্যাঁতসেঁতে সিঁড়ির মুখ। এককালে এখানে কলেজের প্রথম দিককার আর্কাইভ এবং পুরোনো বইপত্রের গুদাম ছিল। ১৯৯৪ সালে এক ভয়াবহ বন্যার পর বেসমেন্টে জল ঢুকে বহু মূল্যবান নথিপত্র নষ্ট হয়ে যায়, তারপর থেকে সেটি তালাবন্ধ করে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সাধারণ ছাত্ররা বিশ্বাস করে এই বেসমেন্টে ভূত আছে, তাই দিনের বেলাতেও কেউ ওমুখো হয় না।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই নাকে এল ভেজা স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল আর বহু বছরের জমে থাকা ধুলোবালির গন্ধ। সিঁড়ির শেষ মাথায় একটি বিশাল লোহার দরজা। দরজার মরচে ধরা লকের ওপর খোদাই করা আছে,**‘Basement 13’**।

রাইয়ান পকেট থেকে সেই লাল খামে পাওয়া পিতলের চাবিটা বের করল। হাত সামান্য কাঁপছিল তার। সে চাবিটা তালার ভেতর ঢোকাল।*ক্লিক!* একটু জোর দিতেই বহু যুগের জং ধরা তালাটা এক অদ্ভুত ধাতব আর্তনাদ করে খুলে গেল। তাহমিদ নিজের টর্চটা জ্বালাল। টর্চের সাদা আলোয় ভেসে উঠল একটি সুবিশাল অন্ধকার ঘর। চারদিকে কাঠের বড় বড় বুকশেলফ, যেগুলোতে উইপোকায় খাওয়া পুরোনো নথিপত্রের ফাইল স্তূপ হয়ে আছে। ভাঙা টেবিল, পুরোনো কম্পিউটার মনিটর আর ছাদ থেকে ঝুলছে ঝুলকালি।

"এখানে কী খুঁজতে হবে রাইয়ান?" তাহমিদ ভয়ে ভয়ে এগোতে লাগল।

রাইয়ান লাল খামের চিরকুটটা বের করল। "চিঠিতে লেখা ছিল,‘আলো যখন নিভে যায়, তখন ছায়ারা কথা বলতে শুরু করে’। আর মোমের সিলমোহরে লেখা ছিল ‘VIII-C-1994’।"

"১৯৯৪ সালের ক্লাস এইট, সেকশন সি?" তাহমিদ চোখ গোল গোল করল।

"এক্সাক্টলি!" রাইয়ান দ্রুত পা চালিয়ে ঘরের একদম শেষ প্রান্তের একটি শেলফের সামনে গেল। সেখানে খোদাই করা লেবেল,‘অ্যাকাডেমিক রেকর্ডস: ১৯৯০–১৯৯৫’।

ধুলো ঝেড়ে রাইয়ান ১৯৯৪ সালের একটি মোটা লেজার খাতা টেনে বের করল। খাতার ওপর মোটা ধুলোর আস্তরণ। সে খাতাটা খুলে দ্রুত পাতা ওল্টাতে লাগল। অষ্টম শ্রেণি, সেকশন সি।

ছাত্রদের নামের তালিকা দেখতে দেখতে একটি জায়গায় এসে রাইয়ানের চোখ আটকে গেল। একটি নামের ওপর লাল কালি দিয়ে আড়াআড়ি ক্রস চিহ্ন দেওয়া। পাশে সংক্ষেপে লেখা: ‘এক্সপেল্ড অ্যান্ড রিমুভড ফ্রম রোলস , ১৫ অক্টোবর, ১৯৯৪’।

নামটি হলো: মুহিবুর রহমান চৌধুরী।

আর সেই নামের ঠিক নিচেই পেন্সিল দিয়ে কাঁচা হাতে সম্প্রতি কেউ লিখে রেখে গেছে:

"ল্যাব-৪। সোডিয়ামের পাত্রটি আগুনে পুড়তে ভালোবাসে। রাত ১১:৪৫। ধ্বংসের প্রথম ধাপ।"

রাইয়ান আতঙ্কে জমে গেল। "তাহমিদ! ঘড়িতে কটা বাজে?"

তাহমিদ হাতঘড়ি দেখে চিৎকার করে উঠল, "রাত এগারোটা বেজে পঁচিশ মিনিট! আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি!"

"ল্যাব-৪ হলো আমাদের মেইন সায়েন্স বিল্ডিংয়ের দোতলার কেমিস্ট্রি ল্যাব!" রাইয়ান দৌড়াতে শুরু করল, "কেউ একজন কেমিস্ট্রি ল্যাবে রাখা পিওর মেটালিক সোডিয়াম ব্যবহার করে আগুন লাগানোর পরিকল্পনা করেছে! সোডিয়াম পানির সংস্পর্শে এলে বিস্ফোরণ ঘটে!"

রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসের মেঠোপথ ধরে দুই কিশোর ছায়ার মতো দৌড়াতে লাগল। কুয়াশা এখন এতটাই ঘন যে দশ হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। দূরে হোস্টেলগুলোর বাতি মিটিমিটি জ্বলছে। ল্যাবরেটরি ভবনের পেছনের পাইপ বেয়ে কার্নিশে ওঠা রাইয়ানের জন্য খুব একটা কঠিন হলো না। ছোটবেলা থেকেই সে গাছে ওঠায় পটু। সে তাহমিদকে হাত বাড়িয়ে দোতলার বারান্দায় তুলে নিল। ল্যাব-৪-এর কাঠের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া, কিন্তু সাইডের একটি ভেন্টিলেটর সামান্য ফাঁক করা।

রাইয়ান জানালার কাচ ফাঁক করে হাত গলিয়ে ভেতরের ছিটকিনি খুলে ফেলল। নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল দুজন। কেমিক্যাল আর স্পিরিটের পরিচিত গন্ধ। সারি সারি কাচের টেস্টটিউব, পিপেট আর বিকার অন্ধকারে চকচক করছে।

"টর্চ সাবধানে জ্বালা তাহমিদ। বাইরের নাইট গার্ড যেন আলো না দেখে," রাইয়ান নিচু গলায় নির্দেশ দিল। তারা চারদিকে তাকাতে লাগল। হঠাৎ ল্যাবের উত্তর কোণে, অ্যাসিড সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত ফায়ারপ্রুফ লকারের নিচে একটি হালকা নীল আলোর স্পন্দন দেখা গেল।

দুজনে দ্রুত এগিয়ে গেল। লকারের নিচের তাকে একটি কাচের বড় পাত্র রাখা। পাত্রের ভেতর কেরোসিনে ডোবানো রয়েছে পিওর সোডিয়ামের তিনটি বড় খণ্ড। আর সেই পাত্রের ঠিক উপরে একটি ডিজিটাল টাইমার সার্কিট সেট করা, যা একটি ছোট ব্যাটারির সাথে যুক্ত। ব্যাটারির সংযোগস্থলে একটি ধাতব ড্রপার লাগানো, যাতে রয়েছে সাধারণ পানি!

টাইমারের ডিজিটাল স্ক্রিনে লাল সংখ্যাগুলো কমছে: ০৮:৪২... ০৮:৪১... ০৮:৪০...

আর আট মিনিট পর টাইমারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রপারটিকে চাপ দেবে। ড্রপারের পানি সোডিয়ামের ওপর পড়লেই ঘটবে এক প্রচণ্ড রাসায়নিক বিস্ফোরণ, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো ল্যাবের ইথানল আর স্পিরিটের জারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে দোতলাকে আগুনের নরক বানিয়ে দেবে!

"রাইয়ান! এটা তো আস্ত একটা টাইম বোমা!" তাহমিদ আতঙ্কে পিছিয়ে গেল, "চল পালাই! ফায়ার অ্যালার্ম বাজিয়ে দিই!"

"কোনো লাভ নেই তাহমিদ! অ্যালার্ম বাজিয়ে গার্ডরা আসতে আসতে আট মিনিট পার হয়ে যাবে। এই দোতলায় শত শত ছাত্রের প্রজেক্ট, ঐতিহাসিক বিজ্ঞান গবেষণার আদি জার্নাল আর কাল সকালে এখানে ক্লাস হওয়ার কথা। কাউকে মরতে দেওয়া যাবে না।"

রাইয়ান হাঁটু গেড়ে বসল। তার হাত কাঁপছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে সার্কিটটার দিকে মন দিয়ে তাকাল।

তিনটি তার ড্রপারের মোটরের সাথে যুক্ত,একটি লাল, একটি সবুজ, আর একটি কালো। কিন্তু সার্কিট বোর্ডের পাশে একটি ছোট চিরকুট সেঁটে দেওয়া আছে। তাতে লেখা:

> "একটি ভুল তার কাটলে টাইমার সরাসরি শূন্যে নেমে যাবে।

> ক্লু: অম্ল আর ক্ষারের মিলনে যে বর্ণ জন্ম নেয় প্রমিত লিটমাসে, সেই তারটিই সত্য।"

রাইয়ানের মাথায় বিদ্যুতের মতো স্কুলের কেমিস্ট্রি ক্লাসের পড়া খেলে গেল। স্যার ক্লাসে পড়িয়েছিলেন,নিরপেক্ষ বা প্রমিত (Neutral) দ্রবণে লিটমাসের নিজস্ব স্বাভাবিক বর্ণ কী থাকে?

তাহমিদ হাঁপাচ্ছে, "লাল না সবুজ? কোনটা কাটবি রাইয়ান? অ্যাসিডে নীল লিটমাস লাল হয়, ক্ষারে লাল লিটমাস নীল হয়... কিন্তু এখানে নীল তার তো নেই!"

"লিটমাসের নিজস্ব নিরপেক্ষ বর্ণ হলো বেগুনি! কিন্তু এখানে বেগুনি তারও নেই!" রাইয়ান বিড়বিড় করল। তার মস্তিষ্ক ঝড়ের গতিতে চিন্তা করছে।

টাইমার দেখাচ্ছে: ০৩:১২... ০৩:১১...

"তাহলে অন্যভাবে ভাব," রাইয়ান নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। "লাল আর সবুজের মিশ্রণ নয়... উদ্ভিজ্জ লিটমাস যখন সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ পানিতে থাকে, তখন তার এক্সট্র্যাক্ট আর ল্যাবরেটরি স্ট্যান্ডার্ড কী? না, চিঠিতে অম্ল ও ক্ষারের মিলনের কথা বলা হয়েছে! অ্যাসিড আর বেস যখন নিউট্রালাইজ বা প্রশমিত হয়, তখন তৈরি হয় লবণ আর পানি। পানি হলো স্বচ্ছ বা বর্ণহীন... কিন্তু আলোর মিশ্রণে?"

হঠাৎ রাইয়ানের চোখ গেল ব্যাটারির গ্রাউন্ড ওয়্যারের দিকে। কালো তারটি সরাসরি ড্রপারের মোটর হয়ে সার্কিটে ফিরে গেছে।

"কালো কোনো রঙ নয় তাহমিদ! আলো না থাকলে সবকিছুই কালো! কিন্তু চিঠিতে প্রমিত লিটমাসের কথা বলেছে। দাঁড়াও... স্যার বলেছিলেন, বাজারে যেসব বাণিজ্যিক লিটমাস পেপার পাওয়া যায়, সেগুলোর বেসলাইন পিএইচ-৭ এ থাকে সম্পূর্ণ সবুজ!"

"তুই কি শিওর?" তাহমিদের গলা শুকিয়ে কাঠ।

"খোদার নাম নিয়ে কাটছি," রাইয়ান তার সুইস নাইফের ছোট কাঁচিটা বের করল।

টাইমারে বাকি আর মাত্র ৫০ সেকেন্ড... ৪৯... ৪৮...

রাইয়ান কম্পিত হাতে সবুজ তারটির ওপর কাঁচির ব্লেড রাখল। এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল সে। তার মায়ের মুখ, বাবার হাসি আর স্কুলের অ্যাসেম্বলির জাতীয় সংগীতের সুর যেন এক লহমায় মনে পড়ে গেল।ক্যাচ! তারটি কেটে গেল। টাইমারের লাল বাতিটা একবার তীব্র হয়ে জ্বলে উঠল, তারপর... নিভে গেল।চারপাশ নিস্তব্ধ। কোনো বিস্ফোরণ হলো না। ড্রপারটি স্থির হয়ে রইল।

তাহমিদ মেঝের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। "দোস্ত... আমরা বেঁচে গেছি! আমরা সত্যি সত্যি বেঁচে গেছি!"

কিন্তু রাইয়ানের দৃষ্টি তখন ড্রপারের নিচে থাকা আরেকটি ছোট ভাঁজ করা কাগজের দিকে। সে সাবধানে কাগজটি তুলে নিল। কাগজের ভেতরে আরেকটি লাল কালির বার্তা:

> "প্রথম পরীক্ষা সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছ, জাবির। কিন্তু খেলা এখনো শেষ হয়নি। আসল প্রতিশোধ তোলা হবে রাত বারোটায়, যখন কলেজের আকাশবাণীর চত্বরে ইতিহাস পুড়বে।

> কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে এসো, যদি তোমার জন্মদাতা পিতার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাও।"

রাইয়ান পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল।

'তোমার জন্মদাতা পিতার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত?' রাইয়ানের বাবা, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, এই কলেজেরই প্রাক্তনী ছিলেন! তিনি ১৯৯৪ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন! এই ঘটনার সাথে তার বাবার কী সম্পর্ক?

রাত পৌনে বারোটা।পুরো ক্যাম্পাস যেন এক জমাট বাঁধা ভূতের নগরী। উত্তরের কনকনে বাতাস বইছে। দূর থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে ক্যাম্পাসের পেছনের জঙ্গল থেকে। রাইয়ান আর তাহমিদ অডিটোরিয়াম ভবনের প্রধান ফটকে এসে দাঁড়াল। এই সুবিশাল মিলনায়তনেই কলেজের সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ডিবেট আর পুরস্কার বিতরণী হয়। অডিটোরিয়ামের পেছনের একটি ছোট জরুরি দরজা অর্ধেক খোলা। রাইয়ান পকেট থেকে টর্চ বের করে ভেতরে ঢুকল। অডিটোরিয়ামের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাজার হাজার দর্শকাসনের সারি যেন অন্ধকারের মাঝে কোনো নীরব সৈন্যদলের মতো বসে আছে।

স্টেজের ঠিক মাঝখানে একটি মৃদু মোমবাতি জ্বলছে। আর সেই মোমবাতির পাশে চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছেন কলেজের একজন প্রবীণ শিক্ষক,ইংরেজি বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক এবং কলেজের লাইব্রেরি ও আর্কাইভ ইনচার্জ ড. জামিল স্যার! তাঁর মুখে কাপড় গোঁজা, চোখে চরম আতঙ্ক।

আর স্টেজের ওপর কালো ট্রেঞ্চকোট আর মুখে লাল রঙের একটি কাপড় বাঁধা এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। লোকটির হাতে একটি পেট্রোলের গ্যালন। সে পুরো স্টেজে এবং ড. জামিল স্যারের পায়ের চারপাশে পেট্রোল ঢালছে।

"কে ওখানে?" রাইয়ান টর্চের আলো সরাসরি লোকটির মুখের ওপর ফেলল।

ছায়ামূর্তিটি আলো দেখেও বিন্দুমাত্র চমকাল না। সে ধীরেসুস্থে পেট্রোলের খালি গ্যালনটি নামিয়ে রাখল। তারপর তার মুখের লাল কাপড়টি টেনে খুলে দিল।

লোকটির বয়স চল্লিশের কোঠায়। চুলে পাক ধরেছে, বাঁ চোখের নিচে একটি গভীর কাটা দাগ। মুখের চোয়াল শক্ত, কিন্তু চোখে এক পাগলাটে অন্ধ আক্রোশ।

"আমি জানতাম তুই আসবি, রফিকের ছেলে," লোকটির কণ্ঠস্বর ফাটা বাঁশির মতো শোনাল, "তোর বাপের মতো তুইও খুব চতুর, তাই না?"

"আপনি কে?" রাইয়ান স্টেজের সিঁড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াল, "মুহিবুর রহমান চৌধুরী? ১৯৯৪ সালের সেই এক্সপেল্ড ছাত্র?"

লোকটি এক তীব্র বিদ্রূপের হাসি হাসল। "বাহ্! বেসমেন্ট ১৩-এর ফাইল তুই ঠিকই খুঁজে পেয়েছিস দেখছি। হ্যাঁ, আমিই সেই মুহিব! বত্রিশ বছর আগে এই কলেজের শ্রেষ্ঠ ছাত্র ছিলাম আমি। বিতর্ক চ্যাম্পিয়ন, সায়েন্স ফেয়ারের গোল্ড মেডেলিস্ট। কিন্তু তোর বাবা,রফিকুল ইসলাম,সে ছিল আমার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী!"

রাইয়ানের বুকটা ধক করে উঠল। "আমার বাবা কোনো অন্যায় করতে পারেন না!"

"অন্যায় করেনি?" মুহিব গর্জে উঠল, তার গলার রগ ফুলে উঠল, "১৯৯৪ সালের ফাইনাল পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র চুরির এক মিথ্যা ফাঁদে আমাকে ফাঁসানো হয়েছিল! প্রিন্সিপালের টেবিলের ড্রয়ারে প্রশ্ন রাখার সেই গোপন ড্রয়ারের চাবি ছিল তোর বাপের কাছে! কিন্তু পুরো দোষটা চাপানো হয়েছিল আমার ঘাড়ে! কারণ রফিকের বাবা ছিলেন বোর্ডের প্রভাবশালী সদস্য, আর আমার বাবা ছিলেন এক সাধারণ কেরানি! আমাকে ঘাড় ধরে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে, আমার বাবা অপমানে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন! আর তোর বাপ আজ একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার, তার ছেলে এই কলেজের নামকরা ছাত্র!"

চেয়ারে বাঁধা ড. জামিল স্যার মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ করতে লাগলেন। তিনি মাথা নাড়ছেন, যেন কিছু একটা বলতে চান। রাইয়ান এক পা এগিয়ে গেল। "আর সেজন্য আপনি কলেজের হাজার হাজার নিরীহ ছাত্রের ক্ষতি করতে চান? ল্যাবে আগুন দিতে চেয়েছিলেন? কলেজ অডিটোরিয়াম পুড়িয়ে দিতে চান? এটা কি আপনার বাবার আত্মাকে শান্তি দেবে?"

"আমি এই কলেজের ইতিহাস থেকে আমার কলঙ্ক মুছে ফেলতে চাই!" মুহিব পকেট থেকে একটি অ্যান্টিক গোল্ডেন লাইটার বের করল। "এই অডিটোরিয়ামে কাল সকালে কলেজের গৌরবগাথার প্রদর্শনী হওয়ার কথা। এখানে সেই ১৯৯৪ সালের রেকর্ডস আর ট্রফি রাখা আছে। আমি সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেব! জামিল সাহেব সাক্ষী ছিলেন সেই অন্যায়ের, তিনিও পুড়বেন!"

লাইটারের ঢাকনা খুলল মুহিব। চিঁক! ছোট্ট একটা আগুনের শিখা জ্বলে উঠল।

তাহমিদ অডিটোরিয়ামের পেছনের সারি দিয়ে নিঃশব্দে স্টেজের ডানপাশে চলে গিয়েছিল। সে একটি ভারী কাঠের লেকচার স্ট্যান্ড শক্ত করে ধরেছিল।

রাইয়ান বুঝল, কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করা যাবে না। মুহিব এখন উন্মাদ।

"মুহিব আঙ্কেল!" রাইয়ান চিৎকার করে উঠল, "আপনি ভুল জানতেন! প্রশ্নপত্র আমার বাবা চুরি করেননি!"

মুহিব থমকে গেল। লাইটার হাতে তার চোখ বিস্ফারিত হলো, "কী বললি তুই?"

"আমি আজ বেসমেন্ট ১৩-এর পুরোনো ডায়েরি দেখেছি," রাইয়ান দ্রুত বানিয়ে বলতে লাগল মুহিবের মনোযোগ সরানোর জন্য, "সেখানে তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপালের স্বীকারোক্তি লেখা আছে! প্রশ্ন চুরি করেছিল অন্য একজন... সেকশন ‘এ’-এর এক ছাত্র! আমার বাবা আপনাকে বাঁচানোর জন্য হেডস্যারের কাছে চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু সেই চিঠি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল! আপনার শত্রুদের আসল সত্য আপনি কোনোদিন জানতে চাননি!"

"মিথ্যা! তুই আমাকে বোকা বানাচ্ছিস!" মুহিবের হাত কেঁপে উঠল, সে লাইটারটি পেট্রোল ঢালা মেঝের দিকে নামাতে চাইল।

"এখনই তাহমিদ!" রাইয়ান বাঘের মতো গর্জে উঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তে স্টেজ কাঁপিয়ে তাহমিদ পেছন থেকে ভারী কাঠের লেকচার স্ট্যান্ডটা নিয়ে মুহিবের কোমরে সজোরে ধাক্কা দিল। মুহিব ভারসাম্য হারিয়ে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। তার হাত থেকে লাইটারটি ছিটকে গিয়ে স্টেজের অনেক দূরে কাচের জানালার পাশে গিয়ে পড়ল।

মুহিব নিমেষের মধ্যে হিংস্র পশুর মতো ঘুরে দাঁড়াল। সে তাহমিদের কলার চেপে ধরে ঘুষি মারতে উদ্যত হলো। কিন্তু রাইয়ান ততক্ষণে স্টেজে উঠে পড়েছে। তার হাতে ছিল ল্যাব থেকে নিয়ে আসা সোডিয়াম পরীক্ষার ভারী মেটাল ক্ল্যাম্প। সে সর্বশক্তি দিয়ে মুহিবের ডান কাঁধের নার্ভ পয়েন্টে আঘাত করল।

মুহিব যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে হাত আলগা করে দিল। রাইয়ান তাহমিদকে টেনে তুলল। কিন্তু মুহিব আবার উঠে দাঁড়াল, তার কোমর থেকে চকচকে একটি ফোল্ডিং ছুরি বেরিয়ে এল।

"তোদের দুজনকেই আজ এখানে শেষ করব!" মুহিব উন্মাদ হয়ে ধেয়ে এল।

রাইয়ান তার জ্যাকেটের ভেতর থেকে বের করল ফায়ার এক্সটিংগুইশার,অডিটোরিয়ামের গেট থেকে সে এটা সাথে নিয়ে এসেছিল। সে সেফটি পিন খুলে সরাসরি মুহিবের মুখের দিকে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তীব্র সাদা ফোমের ফোয়ারা ছুড়ে দিল। হিশ্-শ্-শ্! চোখ, নাক আর মুখে রাসায়নিক গ্যাসের তীব্র ঝাপটা লেগে মুহিব অন্ধের মতো চিৎকার করে হাত থেকে ছুরি ফেলে দিল। সে শ্বাস নিতে না পেরে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ে কাশতে লাগল। তাহমিদ কালবিলম্ব না করে স্টেজের পেছনের ভারী পর্দা টানার দড়ি দিয়ে মুহিবের হাত-পা শক্ত করে বেঁধে ফেলল।

রাত তখন সাড়ে বারোটা। অডিটোরিয়ামের বাইরে ভারী বুটের শব্দ আর সাইরেনের লাল-নীল আলোয় কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। তাহমিদ আগেই ল্যাবের কাজ শেষ করে প্রিন্সিপাল স্যারের বাসভবনের নাইট বেল বাজিয়ে এসেছিল এবং পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল। মোহাম্মদপুর থানার ওসির নেতৃত্বে একদল পুলিশ মুহিবকে গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলল।

স্টেজের ওপর ড. জামিল স্যারকে মুক্ত করা হয়েছে। তাঁর চোখের কোণে জল। কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এনামুল হক গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাইয়ানের বাবা,প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম! গভীর রাতে কলেজের জরুরি ফোন পেয়ে তিনি পাগলের মতো ছুটে এসেছেন।

"বাবা!" রাইয়ান ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

রফিকুল ইসলাম ছেলেকে পরম স্নেহে বুকে টেনে নিলেন। তাঁর চোখে জল, হাত কাঁপছে। "রাইয়ান... তুই ঠিক আছিস বাবা? আমি খবর পেয়ে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না!"

ড. জামিল স্যার ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। তিনি রফিকুল সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "রফিক, আজ তোমার ছেলে শুধু আমাদের জীবন বাঁচায়নি, পুরো কলেজের গৌরব বাঁচিয়ে দিয়েছে।"

তারপর জামিল স্যার রাইয়ানের দিকে তাকালেন। "মুহিব যা বলেছিল, তার কিছুটা সত্য ছিল রাইয়ান। ১৯৯৪ সালে মুহিব সত্যিই দুর্দান্ত ছাত্র ছিল। কিন্তু তার মনের ভেতর অতিরিক্ত অহংকার আর প্রতিহিংসা ছিল। পরীক্ষার প্রশ্ন সে নিজেই চুরি করেছিল,শুধু তোমার বাবাকে পরীক্ষায় নিচে নামানোর জন্য। কিন্তু ধরা পড়ে যাওয়ার পর সে মিথ্যা গল্প বানিয়ে সবার কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চেয়েছিল। তোমার বাবা সেদিন প্রিন্সিপাল স্যারের পায়ে ধরে কেঁদেছিল মুহিবের টিসি বাতিল করার জন্য। কিন্তু শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে গভর্নিং বডি তাকে বহিষ্কার করে। সেই আক্রোশ বত্রিশ বছর ধরে সে বুকের ভেতর পুষে রেখেছিল।"

রাইয়ান পকেট থেকে সেই লাল খাম আর পিতলের চাবিটা বের করে প্রিন্সিপাল স্যারের হাতে দিল।

"স্যার, এই খামটা সে আমার কাছে পাঠিয়েছিল, যাতে আমি বেসমেন্টে গিয়ে আতঙ্কিত হই এবং বাবার অপমানের ভয় পেয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে একা তার ফাঁদে পা দিই। সে চেয়েছিল বাবার অতীত টেনে আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতে।"

প্রিন্সিপাল স্যার খামটা হাতে নিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "প্রতিশোধের আগুন মানুষকে অন্ধ করে দেয় রাইয়ান। মুহিব মেধা পেয়েছিল, কিন্তু নৈতিকতা আর ক্ষমাশীলতা পায়নি। আর তুমি... তুমি আর তাহমিদ যে সাহস, প্রজ্ঞা আর উপস্থিত বুদ্ধি দেখিয়েছ, তা এই কলেজের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।"

ক্যাম্পাসের পূর্বাকাশ তখন ধীরে ধীরে ফর্সা হয়ে উঠছে। কুয়াশার চাদর ভেদ করে কাঁচা রোদের নরম আলো এসে পড়ছে মেহগনি গাছের পাতায়। কলেজের প্রশাসনিক ভবনের চূড়ায় স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা পতপত করে উড়ছে।

তাহমিদ রাইয়ানের পিঠে এক সজোরে থাপ্পড় মেরে হেসে উঠল, "কী রে জাবির আল রাইয়ান! এবার কি বাড়ি ফেরা যায়? নাকি সকালে ক্লাসে বসে ফার্স্ট পিরিয়ডের ম্যাথ পরীক্ষা দিবি?"

রাইয়ান তার চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে হাসল। ভোরের মিষ্টি বাতাসে তার সমস্ত ক্লান্তি যেন নিমেষে ধুয়ে গেল।

"পরীক্ষা তো দেবই তাহমিদ। তবে তার আগে তোর আম্মুর হাতের সেই পেঁয়াজু আর গরম চা না খেলে আমার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো আজ সত্যিই ধর্মঘট ডাকবে!"

দুই বন্ধু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভোরের সোনালী আলোয় ভেজা ক্যাম্পাসের সবুজ পথ ধরে হেঁটে চলল। রাতের লাল খামের সেই ভয়াল অন্ধকারকে পেছনে ফেলে তাদের সামনে তখন উন্মোচিত হচ্ছে এক নতুন, উজ্জ্বল ও নির্ভীক সকাল।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login