১।
ফুটবলের সাথে কোন সম্পর্ক নেই এমন এক পরিবারে জন্ম হয়েছিল হুয়ান রোমান রিকেলমের, বাবা ছিলেন লোকাল গ্যাং মেম্বার, মা গৃহিণী। সান ফার্নান্দোতে রোমানের জন্ম হয়েছিল ২৪ জুন, ১৯৭৮, নিজেদের মাটিতে আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের ঠিক একদিন আগে। একদম যেন প্রথম থেকেই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে ছিল রোমানের গল্পটা।
সেই গল্পটা খুব চেনা একটা গল্প, গরীব আর অপরাধে জড়িত এক পরিবার থেকে একদম চূড়ায় ওঠার গল্প। গোলগাল বলটার সাথে গল্পটার অবশ্য শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের ভুবন বিখ্যাত একাডেমী, এল সেমিয়েরো থেকে, যার ডাকনাম তারাদের দোলনা। অনেক বছর আগে আরও এক বিখ্যাত আর্জেন্টাইনের বেড়ে ওঠাও এই সবুজ আঙিনায়। নামটা পরিচিত ঠেকতে পারে সবার কাছে- ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা!
সেই একাডেমীর সময় থেকেই রোমানের মধ্যে আর্জেন্টাইন ঈশ্বরের ছায়া দেখতে পেয়েছিল অনেকে, অযাচিত তুলনাটা তখন থেকেই শুরু হয়। এই তুলনার ব্যাগেজটা অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হয়েছে রোমানকে। রিকেলমের স্বভাবজাত পজিশনটা ছিল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের, আর্জেন্টাইনরা যেটাকে বলে এল এনগানচে। ম্যারাডোনা সেই পজিশনটাকেই নিজের করে নিয়েছিলেন বলেই কিনা সেই তুলনাটা না চাইতেও চলেই আসতো। রোমান তো আর ডিয়েগোর মত ঈশ্বর ছিলেন না- ছিলেন রক্ত মাংসের মানুষ। তাই তাকে নিজের গল্পটা নিজের মতই বলতে হয়েছিল।
রোমান আর ডিয়েগো- শুধু পজিশনেই এক- তাদের খেলবার ধরণটা একদমই আলাদা। ডিয়েগোর সাথে তুলনা যে কোন তরুণ ফুটবলারের জন্যে প্রশংসা অবশ্যই, তবে আর্জেন্টিনায় সেই তুলনা পাহাড় সমান চাপও নিয়ে আসতে পারে। ১৯৯৬ সালে ৮০০,০০০ ডলারের ট্যাগ নিয়ে তারাদের দোলনা থেকে বোকার মাঠে দৌড়াতে আসেন রোমান। এই বোকা জুনিয়র্সের মাঠ লা বম্বোনেরাতেই নিজের গল্পটা লিখবেন রোমান, বোকার কাছে হয়ে উঠবেন স্বয়ং ডিয়েগোর চেয়েও বড় কিছু!
২।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রিকেলমে হয়ে ওঠেন বোকার মধ্যমাঠের কাণ্ডারি। কি কি শিরোপা এই সময়ে বগলদাবা করেছিলেন রোমান, তা একটা গুগোল সার্চ করেই জেনে নেয়া যাবে, তাই সে সবে না গেলাম। রোমানের মতন আর্টিস্টের কাছে এসব শিরোপার অংক তুচ্ছ বলেই মনে হয়, তার চেয়ে বরং আমরা রোমান দ্যা আর্টিস্টকে নিয়েই গল্প করি।
রোমান যে ভাবে খেলাটাকে খেলতেন তাকে কিভাবে বর্ণনা করা যায়? ফুটবল রোমান্টিকেরা বলবে, যেন কেউ একটা কবিতা আবৃত্তি করছে, বা গান গাইছে। কোথাও যেন সুরের উঠানামা কাজ করে রোমানের খেলায়। গানের মতই নিজের দেয়া সুরে খেলার গতি কখনও বাড়ান, কখনও লাগাম চেপে ধরেন।
আম-আদমি অত সব ন্যাকামো বুঝতে চাইবে কেন। তবু দা ভিঞ্চির মোনালিসার মতন সাধারণ জনগণের স্মৃতির দেয়ালেও কিছু আর্ট পিস ঝোলানো থাকে। জশুয়া ল নামের এক সাংবাদিক মনে করেন রিকেলমের সেই পিস অব আর্টটি হচ্ছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে (জাপান, ২০০০) রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে তার খেলা। ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ হচ্ছে অধুনা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপের ভার্সন ১.০। সেই সময় থেকেই নাক উঁচু ইউরোপিয়ানদের কাছে এই টুর্নামেন্টকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হত। তবে আর্জেন্টাইনদের কাছে, এমনকি বলা চলে সাউথ আমেরিকানদের কাছে এটা অনেক বড় কিছু।
আরেকটা মুহূর্ত যা ফুটবল ভক্তদের চোখে লেগে আছে সেটা হচ্ছে কোপা লিবার্তাদোরেসের কোয়ার্টার ফাইনালে (২০০০) বোকার হয়ে চির প্রতিদ্বন্দ্বী রিভার প্লেটের মারিও ইয়েপেসকে নাটমেগ করা। সেই বছর বোকা যে কোপা লিবার্তাদোরেসের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তাতে রিকেলমের ভূমিকা ছিল অন্যতম।
আর সব প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের মতই, রিকেলমের কানে এসে পৌঁছায় ইউরোপের ডাক। এর মধ্যেই আকাশী-নীল জার্সিতে খেলা হয়ে গেছে রিকেলমের। তাই বার্সেলোনা যখন দরজায় কড়া নাড়ল, রিকেলমে না করতে পারলেন না। একরাশ স্বপ্ন নিয়ে রোমান এসে পৌঁছলেন বার্সার ন্যু ক্যাম্পে। ঠিক আসার আগেই অপরাধের জগত আবার ফিরে এল রোমানের জীবনে। অপহৃত ভাইকে ছাড়িয়ে আনতে হয় টাকার বিনিময়ে। ব্যাক্তিগত জীবনের এই ঘটনা হয়ত ইঙ্গিত দিচ্ছিল বার্সায় রোমানের সময় কেমন কাটবে।
৩।
বোকা থেকে ঠিক ডিয়েগো ম্যারাডোনার মত রিকেলমে আসলেন বার্সেলোনায়। আবার ঠিক ডিয়েগোর মতই তিনি বার্সায় সফল হতে পারেননি। ব্লাউগ্রানাদের জন্যে মাত্র এক সিজন খেলেছিলেন রিকেলমে। আসার পর থেকেই বার্সা কোচ লুই ফন গালের সাথে বনিবনা হয়নি। ফন গাল ম্যানেজমেন্টের কাছে চেয়েছিলেন অন্য খেলোয়াড়কে, তার বদলে রিকেলমেকে আনানোর ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ হয়নি ডাচ ম্যানের।
আর্জেন্টাইন ফ্যানদের লুই ফন গালকে না চেনার কোন কারণ নেই। বাইশের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডের কোচ ছিলেন। কোয়ার্টারের আগে, যা এখন ব্যাটল অব লুসাইল নামে খ্যাত, তার বক্তব্য তাতিয়ে দিয়েছিল পুরো আর্জেন্টিনা শিবিরকে। মেসি তো গোলের পরে গিয়ে দু’কানে হাতে রেখে করেছিলেন এক আইকনিক উৎযাপন। পাড় ভক্তরা জেনে থাকবেন যে এই উৎযাপনের ভঙ্গিমাটি আর কারও নয়, স্বয়ং রিকেলমের। অনেকে এও বলেন যে মেসি ফন গাল আর রিকেলমের ইতিহাসটা জানেন বলেই এই উৎযাপনটা করেছিলেন!
যদিও রিকেলমে নিজে ফন গালের ব্যাপারে বলেছিলেন, “Van Gaal told me I was the best in the world when we had the ball and when we didn’t it was like playing with a man less. He explained to me that he hadn’t been convinced about signing me, but I learnt a lot, his training sessions were marvellous.”
কেন বার্সায় থিতু হতে পারেননি রিকেলমে? অনেকে বলে বার্সার কাঠামোগত পরিবেশটা রিকেলমে মত শিল্পীদের জন্য ঠিক খাপে খাপ ছিল না, নিয়ম মেনে চলা যেখানে রোমানের মজ্জাগত কোন ব্যাপার ছিল না। আবার রিকেলমের মত প্লেয়ারদের যে স্বাধীনতাটা দরকার, সেটাও বার্সার মত বড় ক্লাবে পাওয়া অসম্ভব ছিল। সব মিলিয়ে না টেকাটাই নিয়তি ছিল, সেই নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে যায় ভিলারিয়ালে যেখানে রোমান চারা থেকে বৃক্ষে পরিণত হন।
ইয়েলো সাবমেরিনদের হয়েই ইউরোপের মঞ্চে নিজের সেরাটা দেখান রোমান। ম্যানুয়েল পেলিগ্রিনির মত কোচ, ডিয়েগো ফোরলান, সান্তি কায়োরলা, মারকোস সেনাদের মতন খেলায়ারদের সাথে পেয়ে রোমান নিজের সেরাটা বের করে আনেনে প্রথম বারের মতন। সে বছর (২০০৩) লা লিগায় ভিলারিয়াল দুর্দান্ত একটা মৌসুম কাটায়। পরের বছরের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ছিল সেই পর্যন্ত ভিলারিয়ালের ইতিহাসে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে ভাল ফলাফল। তবু শেষটা ভালো হয়নি সেই গল্পের। রোমানের পেনাল্টি মিসের সাথে সাথে আর্সেনালের কাছে সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়ে হয় ভিলারিয়ালকে। তবু ভিলারিয়াল ভক্তরা রোমানকে মনে রেখেছে নিজেদের একজন হিসেবে, তাদের কাছে যে একজন ইয়োলো সাবমেরিন গ্রেট!
৪।
ভিলারিয়ালে আসার সাড়ে তিন সিজন পরেই আবার সমস্যা দানা বাঁধতে শুরু করল রিকেলমের ফুটবল ক্যারিয়ারে। সমস্যার শুরুটা হল ভিলারিয়ালের ম্যানেজমেন্টের সাথে, রিকেলমে যেভাবে ক্লাবে থাকতে চান, কাজ করতে চান, তা মোটেই মিলছিল না বোর্ড রুমে বসে থাকা বসদের সাথে।
বসের সাথে ঝামেলা করে কার কবে চাকরি টিকেছে? ভিলারিয়াল থেকে তাই হাফ সিজনের জন্যে লোনে রিকেলমে চলে এলেন বোকায়- তার পুরনো ঠিকানায়। রোমানের ইউরোপের অধ্যায়টা তাই ছোট হয়ে এখানেই চুকল। পরের সিজনেই বোকা জুনিয়র্স পাকাপাকিভাবে রোমানকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসে।
রিকেলমে তারপর ২০১৪ অব্দি বোকায় খেলেছেন। নিজের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে বোকায় ঠিক ম্যারাডোনার মত কিংবদন্তীতে রূপ নেন, কারও কারও মতে ম্যারাডোনাকেও ছাপিয়ে যান বোকার ফ্যানদের কাছে। বোকায় খেললেও সমীহ আদায় করে নিয়েছেন সবার কাছ থেকে, এমনকি আগাগোড়া রিভার প্লেট ফ্যানদের কাছে থেকেও!
সব ভাল গল্পের মতই রোমানের গল্পের শেষটা গিয়ে ঠেকে শুরুতে। একজন সত্যিকারের রোম্যান্টিকের মতন রোমান নিজের শেষ ফুটবল সিজনটা কাটান আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের সাথে, তাও আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় লীগ স্তরে! মাঝে মাঝে ভাবি, রিকেলমে এখনও খেলতে থাকলে কি ভালোই না হত। মানলাম ফুটবল তার খোল নলচে বদলে ফেলেছে অনেকটাই। তীব্র গতি আর গেগেনপ্রেসিং এর যুগ এখন, আমাদের সময়ের মতই ফুটবল ডোপামিনের দাস। এ যুগে খেললে হয়ত রোমান মানিয়েই নিতে পারতেন না। গতি নেই, পায়ে বেশি সময় বল রাখেন- বলে মানুষ তাকে বাতিলের খাতাতেই ফেলে দিত। তবে কেন যেন মনে হয়, কেউ যদি সময় নিয়ে দেখত তবে রোমানের পায়ে জাদু ছাড়া কিছু দেখত না।
বোকার শহরে একা জাদুকর যিনি, সেই রোমান এখনও মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ইউটিউব ভিডিও, ফেসবুক- ইন্সটার রিল হয়ে। গ্রাসিয়াস, রোমান।