Post

স্বৈরতন্ত্রের সময়ে ফুটবল

September 23, 2026

101 views

১. অপারেশন কন্ডর

বিশ্বকাপের গল্পটা যখন থেকে শুরু হয়েছিল, মানে ১৯৩০ সালে, তখন থেকেই আর্জেন্টাইনরা নিজেদের এই ট্রফি জেতার অন্যতম দাবিদার বলে ভাবতে পছন্দ করত। মন্টেভেডিওর সেই বুধবারের বিকেলে প্রথমার্ধ শেষে আর্জেন্টিনা এগিয়ে ছিল ২-১ গোলে, বিশ্বকাপ হাতের মুঠোয় পুরে নিতে অপেক্ষা ছিল আর মাত্র ৪৫ মিনিটের। সেই অপেক্ষা পৌনে এক ঘণ্টা থেকে বেড়ে গিয়ে ঠেকে ৪৮ বছরে, মাঝে এক বিশ্বকাপ থেকে আরেকে লম্বা হতে থাকে দীর্ঘশ্বাসের দৈর্ঘ্য। মন্টেভেডিওর ফাইনালের প্রায় অর্ধশত বছর পরে এক টালমাটাল সময়ে এসে আরাধ্য সেই সোনালী কাপ আর্জেন্টিনার কাছে ধরা দেয়। এই গল্পটা সেই রক্তমাখা বিশ্বকাপের।       

উরুগুয়ের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের পরে দীর্ঘদিন কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পার হওয়া হয়নি আকাশী নীল-সাদাদের, তবু নিজেদের ফুটবল নিয়ে অহমটা ছিল। মাঝে ১৯৩৮-১৯৫৪ সময়কালে রাজনীতির মারপ্যাঁচে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা হয়নি, ফলে অহমেও কোন আঁচ আসেনি। নিজেদের সম্পর্কে তাদের ধারণাটা চুরমাচুর হয়ে যায় ১৯৫৮ বিশ্বকাপে, তবে আজ সে গল্প নয়।

তার চেয়ে বরং আমরা ১৯৭৮ বিশ্বকাপের ঠিক চার বছর আগে ফিরে যাই। পশ্চিম জার্মানিতে হওয়া সেই বিশ্বকাপের ট্রফিটা স্বাগতিকদের হাতে উঠলেও মানুষ তা মনে রাখবে ইয়োহান ক্রাইফের আর রাইনুস মিশেলসের টোটাল ফুটবলের জন্যে। একদম ফাইনালে গিয়ে পা হড়কালেও ডাচদের “টোটাল ফুটবল” খেলাটার খোলনলচেই পাল্টে দিয়েছিল। আজকের আধুনিক ফুটবল বলতে আমরা যা বুঝি বা দেখি, তার অনেকটাই এসেছে টোটাল ফুটবলের উপর ভর করেই।

সেই দুর্দম কমলা বাহিনীর কাছে নাকানি চুবানি খেয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই পত্রপাঠ বিদায় নিতে হয়েছিল আর্জেন্টিনা দলকে। তার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে আর্জেন্টিনার যে স্বভাবগত দম্ভ ছিল তা এতোটাই বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছিল যে ’৭৪ বিশ্বকাপের পরে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন সবকিছু ঢেলে সাজাতে বাধ্য হয়। এই পটভূমিতেই লা সেলেসিওনের কোচ হয়ে আসেন সিজার লুইস মেনোত্তি, যার ডাকনাম এল ফ্লাকো বা চিকন লোকটা। মেনোত্তি নাকি টোটাল ফুটবল আর বাম রাজনীতি দুটিকেই সমর্থন করতেন। এই দুই পরিচয় দেশের সামনে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে তার দলকে। সেই গল্প শুরু করার আগে, অপারেশন কন্ডরের কথা বলে আসা যাক।   

আমেরিকার অর্থায়নে দক্ষিণ আমেরিকার সব দক্ষিণপন্থী একনায়কেরা একসাথে হয়ে বামপন্থী দল আর তাদের সমর্থকদের রাজনৈতিক ভাবে দমন করার জন্যে এক ক্যাম্পেইন হাতে নেয়। অপারেশন কন্ডর সেই ক্যাম্পেইনের নাম। চিলির একনায়ক অগুস্তো পিনোশের সরকারের শুরু করা এই অপারেশন কন্ডর শেষ হয় আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসকের পতনের মধ্যে দিয়ে। আমেরিকার সরাসরি মদদে এই অপারেশন কন্ডরে চলত স্পাইদের দিয়ে চালানো গোপন অভিযান, গুম, নির্যাতন, হত্যা, এমনকি ক্যু। অপারেশন কন্ডরের কারণে প্রায় ৬০,০০০ মানুষ জীবন হারিয়েছে বলে ধারণা করা হয়, তার মধ্যে প্রায় ৯,০০০ শুধু আর্জেন্টিনাতেই।    

বিংশ শতকে যে কজন আর্জেন্টাইন বৈশ্বিক ভাবে পরিচিতি পেয়েছেন তাদের একজন হুয়ান ডমিঙ্গো পেরন, যিনি তিন দফায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পেরন জনপ্রিয় ছিলেন মূলত তার বামপন্থী শাসনব্যবস্থার জন্যে, ভক্তরা যাকে আদর করে ডাকে পেরোনিজম। শেষদিকে অবশ্য পেরন ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছিলেন, তবে তখন প্রেসিডেন্ট হয়ে খুব বেশি দিন দেশ শাসনের সুযোগ পাননি পেরন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার জীবনাবসান হয় জুলাই ১, ১৯৭৪ তারিখে;  ক্ষমতায় বসেন পেরনের দ্বিতীয় স্ত্রী ইসাবেল পেরন। বাম আর ডানপন্থীরা তখন লেগে আছে সহিংসতায়, ইসাবেল শক্ত হাতে দেশ সামলাতে পারছিলেন না। ফলাফল- ১৯৭৬ সালে আবার ক্যু, আবার মিলিটারি শাসন! এরমধ্যে দিয়ে শুরু হয় আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচাইতে নৃশংস মিলিটারি রেজিম, যা প্রায় ৩০,০০০ আর্জেন্টাইনের জীবন কেড়ে নেয়। শুরু হয় “দা ডার্টি ওয়ার”।     

সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসার আগেই আর্জেন্টিনাকে ১৯৭৮ বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ হিসেবে নির্বাচিত করেছিল ফিফা। দেশব্যাপী ততদিনে শুরু হয় গেছে অবকাঠামো উন্নয়নের অনেক কাজ। জান্তা রেজিম দ্রুতই বুঝে ফেলে যে আর্জেন্টিনার মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজন আসলে তাদের কাজকর্মকে বৈধতা দেয়ার একটা খুব ভালো উপায়, কারণ কে না জানে প্রোপাগান্ডার জন্যে বিশ্বকাপ চমৎকার একটা টুল। তবে ঝামেলাও ছিল, বামপন্থী মিলিশিয়ারা তখন হামলা করছে বিভিন্ন জায়গায়। অন্যদিকে জান্তা সরকার বিরোধীদেরকে ধরে এনে বন্দী করে রাখছে কারাগারে, হাজার হাজার মানুষ লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে, এদের অনেকেই আর ফিরে আসছে না কখনও। বিশ্বকাপ আয়োজন মানে সব দেশ আর মিডিয়ার নজর থাকবে আর্জেন্টিনার দিকে, জান্তা সরকারের জন্যে তা বুমেরাংও হতে পারে।      

আর্জেন্টিনার কাছে ফুটবল কি তা বোঝার একটা ভালো উপায় হচ্ছে এই ১৯৭৮ বিশ্বকাপটা। ইউরোপের নানা দেশে যখন কথা উঠছে বিশ্বকাপ বয়কটের, তখন সামরিক সরকার আর বিরোধী মিলিশিয়াদের মধ্যে সমঝোতা হচ্ছে যে টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময়ে বিরোধী মিলিশিয়ারা কোথাও হামলা চালাবে না, বিশেষত খেলোয়াড় আর সাংবাদিকদের ওপর। যা হয় হয়ে যাক, ফুটবলের ওপর আঁচ আসা চলবে না।

এবার তাহলে চোখ ফেরানো যাক, সেই ফুটবলের প্রতি, যা এক নোংরা যুদ্ধের দুইপক্ষকে কোথাও এক করে দিয়েছিল!   

২. মাঠের হিসেব নিকেশ

১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা দলটার রোস্টারের দিকে তাকালে এক বিশেষ তরুনের নাম আপনি খুঁজে পাবেন না, যিনি আর বছর আটেক পরেই আর্জেন্টিনাকে আরেকটি বিশ্বকাপ এনে দেবেন, যিনি ততদিনে হয়ে যাবেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। দলের দীর্ঘ তালিকাতে নাম ছিল না খোদ ডিয়েগো ম্যারাডোনার!

ম্যারাডোনার বদলে আকাশী নীল-সাদা শিবিরে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের জায়গা নেন ড্যানিয়েল ভেলেন্সিয়া আর নরবের্তো আলোনসো। আর্জেন্টিনার দল মুলত ছিল স্থানীয় লীগে খেলা খেলোয়াড়দের নিয়ে। স্থানীয় লীগের সাথে ইউরোপের লীগগুলোর মানের দিকে থেকে একদম আকাশ পাতাল পার্থক্য ছিল না তখন। শুধু ভ্যালেন্সিয়ায় খেলা মারিও কেম্পেস আর সেভিয়ার বের্তনি দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। মাত্রই পিচিচি ট্রফি জেতা মারিও কেম্পেস ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে!     

ম্যারাডোনাকে বাদ দিয়েও আর্জেন্টিনার দলটা বেশ ভারসাম্যপূর্ণই ছিল বলতে হবে। ক্যাপ্টেনের আর্ম ব্যান্ড ছিল ড্যানিয়েল পাসারেলার হাতে, যিনি দলের রক্ষণভাগের কাণ্ডারি ছিলেন। এমেরিকো গালেগো ছিলেন দলের মূল স্তম্ভ আর অসভালদো আর্দিলেস বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে দৌড়ে গেছেন পাগলা কুকুরের মত। আক্রমণ ভাগের মারিও কেম্পেসের সাথে ছিলেন বের্তনি আর লিওপোল্ড  লুকে। কেম্পেসের মতই লুকের ছিল ঝাঁকড়া চুল, আর ছিল পুরু গোঁফ, যেন বিটলসের জর্জ হ্যারিসন দৌড় বেড়াচ্ছেন মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে।   

রিভার প্লেটের মাঠেই আর্জেন্টিনা নিজেদের প্রথম পর্বের সব ম্যাচগুলো খেলেছিল। ৭৮ এর দলের অনেকেই খেলতেন রিভার প্লেটের হয়ে - পাসারেলা, গোলকিপার ফিল্লোল, স্ট্রাইকার লুকে আর মিডফিল্ডে নরবের্তো আলোনসো।   রাইট ব্যাক পজিশনে ছিলেন সান লরেঞ্জোতে খেলা অল্গুইন আর লেফটে ছিলেন সদ্যই বোকা জুনিয়র্স ছেড়ে আসা আলবের্তো টারানটিনি।  টোটাল ফুটবলের ভক্ত মেনোত্তি এই দলটাকে ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলিয়েছেন টুর্নামেন্ট জুড়ে। 

বিশ্বকাপের শুরুটা খারাপ হয়নি আর্জেন্টিনার। একসময়কার ইউরোপিয়ান পাওয়ার হাউজ হাঙ্গেরি ততদিনে তার জৌলুস হারিয়েছে। ম্যাগিয়ারদের ২-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করে আলবিসেলেস্তেরা। পরের ম্যাচে ফ্রান্সকেও একই স্কোরলাইনে হারায় স্বাগতিকেরা। স্টেজ মোটামুটি তৈরিই ছিল, যে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে যাবে আর্জেন্টিনা। গোলমালটা বাধে শেষ গ্রুপ ম্যাচে আগের বারের চ্যাম্পিয়ন ইতালির কাছে ১-০ গোলে হেরে বসায়। গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে দ্বিতীয় পর্বে  তাই আর্জেন্টিনা সঙ্গী হয় ব্রাজিল, পেরু আর পোল্যান্ডের। 

সেকেন্ড রাউন্ডে গ্রুপ “বি”র ম্যাচগুলো ছিল মেনদোজা আর রোজারিওতে। ফলে আর্জেন্টিনা দলকেও রাজধানীর চাকচিক্যের বাইরে চলে আসতে হয়েছিল। সেটা হয়ত শেষমেশ ভালোই হয়েছিল দলের জন্যে। দ্বিতীয় পর্বের জার্নিটা শুরু হয়েছিল রোজারিও সেন্ট্রালের মাঠে, পোল্যান্ডের বিপক্ষে। এল ম্যাটাডোর কেম্পেসের জন্যে রোজারিও সেন্ট্রালের স্টেডিয়াম ছিল ঘরের মাঠের মত, স্পেনে পাড়ি দেয়ার আগে রোজারিও সেন্ট্রালের হয়েই খেলতেন যে! পুরনো দিনের সেই ঝলক আবার দেখল রোজারিওর মাঠ, কেম্পেসের দুই গোলে দ্বিতীয় পর্বের শুরুটা পরিকল্পনামাফিকই হল।  তবে জয়টা অত সহজ ছিল না, পোলিশরা আশির দশকে বেশ শক্ত প্রতিপক্ষ ছিল। মনে রাখা ভালো যে, ১৯৭৪ এর বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থানটা পোল্যান্ডের ছিল। এই বিশ্বকাপেও গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ছিল পোলিশরা, তাও আবার আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানিকে পেছনে ফেলে!  

কেম্পেসের গোলে এগিয়ে গেলেও পোল্যান্ড গোল করেই ফেলেছিল। গোললাইন থেকে হাত দিয়ে ঘানার বিপক্ষে লুইস সুয়ারেজের (২০১০ বিশ্বকাপ) মত করে বল ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মারিও কেম্পেস। পেনাল্টি থেকে পোলিশরা গোল করতে ব্যর্থ হলে আর্জেন্টিনা নিজেদের লিড ধরে রাখে, সাথে ম্যাচের ভাগ্যও। লুইস সুয়ারেজ লাল কার্ড দেখলেও তখনকার হিসেবে মাঠ ছাড়তে হয়নি কেম্পেসকে। তবে তা পোল্যান্ডের জন্যে দুঃখই বয়ে এনেছে, ৭২ মিনিটে  আর্দিলেসের স্প্রিন্ট থেকে বল বক্সে পেয়ে গোল করতে ভুল করেননি কেম্পেস।

ব্রাজিলের সাথে টেক্কা দেয়াটা কঠিন হবে জানত আর্জেন্টিনার দল। নিজেদের পরের ম্যাচে সেলেসাওদের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা, যা ব্রাজিলে দা ব্যাটল অফ রোজারিও নামে পরিচিত। মেনোত্তি এই ম্যাচের আগ পর্যন্ত কেম্পেসকে ফরওয়ার্ড হিসেবেই খেলিয়েছেন, তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে লুক আর অর্তিজকে সামনে রেখে কেম্পেসকে মিডফিল্ডে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন।   

এদিকে ব্রাজিল রক্ষণাত্মক দল সাজিয়েছিল প্লেমেকার জিকো আর বিশ্বকাপ জয়ী রিভেলিনোকে ছাড়া। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দুপক্ষই যেন ঠিক করে নেমেছিল অন্য পক্ষকে শুধু জিততে দেয়া যাবে না। সুপারক্লাসিকোতে ফ্যানরা যেমন চোখ জুড়ানো ফুটবল দেখতে চায়, তার ছিটেফোঁটাও এই ম্যাচে ছিল না। ম্যাচ শুরুর চার সেকেন্ড পর থেকে শুরু হয় ফাউল, এই সিলসিলা চলে অনেক সময় জুড়ে।

অর্তিজ খেলার প্রথম ভাগেই অবিশ্বাস্য এক মিস করে বসেন, সেটা ছাড়া কোন দলই খুব ক্লিয়ার-কাট কোন সুযোগ পাচ্ছিল না। লুকের বেশ কয়েকটা দূরপাল্লার শুট জায়গা করে নেয় ব্রাজিলিয়ান কিপারের দু’হাতে। খুব বেশি রিস্ক না নিতে চাওয়ার দরুণ ম্যাড়ম্যাড়ে ম্যাচটা শেষ হয় গোলশূন্য ড্র হয়ে। এই ম্যাচের রেজাল্টে অবশ্য বেশি খুশি হওয়ার কথা ছিল আর্জেন্টিনার।

গ্রুপের শেষ ম্যাচে ঠিক হবে কে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফাইনালে। তবে আর্জেন্টিনার সুবিধাটা যেখানে সেটা হচ্ছে ব্রাজিল আর পোল্যান্ডের ম্যাচটা শুরু হবে আর্জেন্টিনা- পেরু ম্যাচের আগে। ফলে সন্ধ্যায় যখন আর্জেন্টিনা খেলতে নামবে, তাদের কাছে জানা থাকবে ঠিক কত গোলে জিতলে ফাইনালের টিকেট মিলবে। এই খেলার সময় নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে, তবে খেলার সময়গুলো টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই ঠিক করা ছিল।

আর্জেন্টিনার ম্যাচ শুরুর আগে জেনে যায় পেরুকে তাদের কয় গোলে হারাতে হবে। উত্তরটা হচ্ছে কমপক্ষে চার গোলের ব্যবধানে, কারণ মেন্দোজায় পোলিশদের ব্রাজিল হারিয়েছে ৩-০ গোলে। আর্জেন্টিনা – পেরুর ম্যাচে রেফারির বাঁশি বাজার সাথে সাথে শুরু হয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ম্যাচের।

খেলা শুরুর আগে প্রেসিডেন্ট ভিদেলা সৌজন্য বিনিময় করতে যান পেরুর খেলোয়াড়দের সাথে তাদের ড্রেসিং রুমে, সাথে ছিলেন বিতর্কিত আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট আর ভিদেলার বন্ধু হেনরি কিসিঞ্জার। সেই কক্ষে কি হয়েছিল তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে, অনেকে অভিযোগ করেন পেরুর খেলোয়াড়রা ঘুষ নেন ম্যাচ হেরে যাওয়ার জন্যে। যেটা কেউ অস্বীকার করে না সেটা হচ্ছে ভিদেলার এই সাক্ষাৎ কেউই প্রত্যাশা করেনি, নিদেনপক্ষে সেই দেখা করা পেরুর ওপর প্রভাব ফেলেছিল। পেরু ততদিনে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে, যারা আর্জেন্টিনা এসেছিল এর চেয়ে ভাল করার স্বপ্ন নিয়ে, ঝোলায় ছিল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা- উরুগুয়েকে টপকে ১৯৭৫ কোপা আমেরিকা জয়। তবে প্রত্যাশার পারদটা যত দ্রুত উঠেছিল, তার চেয়ে দ্রুততর গতিতে নেমেও যায় পেরুর।

সেই পেরুর ম্যাচের পর নানান থিওরি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল দুই দেশের সামরিক বাহিনী একটা সমঝোতায় পৌঁছেছিল (পেরুতেও তখন সামরিক বাহিনী ক্ষমতায়)। এই ধারণার একটা কারণ ছিল। আর্জেন্টিনা থেকে শয়ে শয়ে টন গম খাদ্য সাহায্য হিসেবে পাঠানো হয়েছিল পেরুতে, যদিও পেরুতে তখন কোন দুর্ভিক্ষ ছিল না বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগও হয়নি।

পেরুর সাথে আর্জেন্টিনার খেলার ফলাফলটা বরং বলে নেয়া যাক। ৬-০! আর্জেন্টিনার আকাশে বাতাসে তখন আনন্দ। আবার আর্জেন্টিনা ফাইনালে, এবার আর রিও দে লা প্লাতার অপর দিকে নয়, বরং নিজেদের মাটিতে, যেন ফুটবল ঈশ্বর আর্জেন্টিনার কপালে এই বিশ্বকাপ জেতা নির্ধারিত করেই রেখেছেন। এই আনন্দের হিল্লোল কি সব জায়গাতেই বইছিল? উত্তর হচ্ছে- না! কেন “না”, তা বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে মাথায় সাদা স্কার্ফ আর বিষণ্ণ চোখ নিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার কেন কিছু বুড়ো মহিলা জড়ো হচ্ছিল বুয়েনোস আইরসের কেন্দ্র- প্লাজা দে মায়োতে। 

৩. প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

যেসব নাগরিকেরা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল তাদেরকে গুম করার অভিযোগ ছিল মিলিটারি শাসনের বিরুদ্ধে। প্লাজা দে মায়োতে প্রতি বৃহস্পতিবার সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের সবার মা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতেন। ১৯৭৭ সালে প্রথম তেরো জন মা মাথায় সাদা স্কার্ফ পরে তাদের নিখোঁজ সন্তানদের জন্যে ন্যায় বিচার দাবি করেন, তাদের যেন ফিরিয়ে দেয়া হয়। 

বিশ্বকাপ চলার সময়েও সেই প্রতিবাদ চালু ছিল। এমনকি বলা হয় যে সুইডেনের কিছু খেলোয়াড় সেই পদযাত্রায় যোগ দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপ যাতে আর্জেন্টিনায় না হয় তার ব্যাপারেও সুইডেন বেশ সোচ্চার ছিল। পরবর্তীতে আমরা দেখব যে বিশ্বকাপকে একটা টুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে এসেছে বিভিন্ন সময়ে, সে আগ্রাসী রাশিয়া হোক, সমালোচিত কাতার বা ছাব্বিশের আমেরিকা।  

আর্জেন্টিনার নিজেদের খেলোয়াড়দের মধ্যেও এই রেজিম নিয়ে অস্বস্তি ছিল। ডিফেন্ডার আলবার্তো টারানটিনি নিজের দেশের রাষ্ট্রপতি ভিদেলার সাথে করমর্দনের আগে নাকি নিজের অণ্ডকোষ চেপে ধরেছিলেন, তাও পাসারেল্লার সাথে বাজি লেগে । অন্ততপক্ষে এমনটাই টারানটিনি দাবি করেছিলেন এল গ্রাফিকোকে ২০১২ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে। পেরুর বিপক্ষের সেই সমালোচিত ম্যাচে দ্বিতীয় গোলটি এসেছিল টারানটিনির কাছ থেকেই। গোল করেই ক্যামেরার সামনে চিৎকার করে কাউকে উদ্দেশ্য করে গালি দিয়ে বসেন।  

মোটকথা, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা জানতেন যে তাদের জয় এই অত্যাচারি রেজিম তার নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবে। আর্জেন্টিনার গোলকিপার উবালদো ফিলোল যেমন বলেন,

"অনেকের কাছেই ১৯৭৮ এর বিশ্বকাপ মানে হচ্ছে ৩০,০০০ মানুষের নিখোঁজ হওয়া। তবে আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে নিগ্রহ বা হত্যা করেনি। আমরা শুধু দেশের মানুষকে একটু আনন্দ দিতে সাহায্য করেছি, আর আমরা আর্জেন্টিনার রঙের সাহসের সাথে মান রেখেছি। আমি এর জন্যে লজ্জিত হতে পারি না।" 

আর্জেন্টিনার সামনে শুধু ছিল টোটাল ফুটবলের পোস্টার বয়রা। কিভাবে রুখে দিয়েছিল আর্জেন্টাইনরা অরেঞ্জ আর্মিদের?

৪. আমরা জিতে গেছি, আমরা জিতে গেছি

চার বছর পর আবার নেদারল্যান্ডের কাছে সুযোগ এসেছিল সোনালী ট্রফি ঘরে তোলার। ৭৪ বিশ্বকাপে ওদের প্রায় চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ধরেই নেয়া হয়েছিল, এমনকি ডাচরা নিজেরাও খুব সম্ভবত এমনটাই ভেবেছিল। ফাইনালে ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর কমলা জার্সি পড়ুয়াদের মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব চলে আসে, লোকে বলে যে ওরা দ্বিতীয় গোলটাই করতে ভুলে গিয়েছিল। খরগোশ আর কচ্ছপের গল্পে অনেক এগিয়ে থেকেও যেভাবে খরগোশ হেরে যায়, ঠিক সেভাবেই যেন পুরো টুর্নামেন্টে টোটাল ফুটবলের বিজ্ঞাপন হয়ে থাকা নেদারল্যান্ডস দল ফাইনালের শেষ ভাগে এসে খেই হারিয়ে ফেলে। চার বছর পরে আবার সুযোগ আসে, যা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় এই দলটার জন্যে আর আসবে না। তবে এবার নেদারল্যান্ডসের সামনে ছিল নিজেদের মাটিতে দুর্দান্ত খেলতে থাকা আর্জেন্টিনা দল। 

মেনোত্তি ফাইনালের একাদশে আবার ফিরিয়ে আনেন ছোটখাটো গড়নের অসভালদো আর্দিলেসকে। হল্যান্ড দলের টেকনিক্যাল দক্ষতা বিশ্বসেরা, হাপেলের পুরো দলটাই ছোট ছোট পাসে খেলতে পছন্দ করে, বল নিজেদের পজেশনে রাখতে পছন্দ করে, যেমনটা করতো পেপের বার্সা বা ম্যানচেস্টার সিটি। মেনোত্তি বুঝতে পেরেছিলেন যে ওদের সাথে এভাবে পাল্লা দেয়া যাবে না; বরং এমন কাউকে দরকার যে খুব দ্রুত গতির কিছু “রান” দিয়ে বিপক্ষে দলের জোনে ঢুকে পড়তে পারে এবং কেম্পেস বা লুকের সাথে কানেকশন করতে পারে। আর্দিলেসের কাজ ছিল সেটাই।

খেলা শুরু হতে দেরি হচ্ছিল। আর্জেন্টিনার ক্যাপ্টেন পাসারেলা বলে বসেন যে হল্যান্ডের খেলোয়াড় রেনে ফন দে কেরখফ হাতে যে কাস্ট পরে খেলতে চাচ্ছেন তা খুলে আসতে হবে, এছাড়া আর্জেন্টিনা দল মাঠে নামবে না! ইরানের ম্যাচে আঘাত পাওয়ার পর থেকেই অবশ্য রেনে এই কাস্ট পরেই খেলে আসছিলেন, এর আগে অন্য কোন দল অভিযোগ জানায় নি। মনে করা হয় রেফারি আর বিপক্ষ দলকে খানিকটা অপ্রস্তুত করার জন্যেই এই বুদ্ধি আঁটে আর্জেন্টিনা। খানিক বাদেই আর্জেন্টিনা রেনের হাতের কাস্ট রেখেই খেলা শুরু করতে রাজি হয়! 

আর্জেন্টিনার তুলনামূলক ডাইরেক্ট ফুটবল কাজে দিয়েছিল, এরই ফলাফল স্বরূপ প্রথম গোল আসে আর্দিলেসের ডিফেন্স চেরা রান, লুকের পাস আর  কেম্পেসের পা থেকেই। নেদারল্যান্ডস ম্যাচে ফিরে আসে দ্বিতীয়ার্ধে, তবে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাই বেশি প্রভাব রেখেছিল ম্যাচে। ১০৫ মিনিটে কেম্পেস এক অসাধারণ গোল করে দলকে এগিয়ে দেন, আর বের্তনির তৃতীয় গোল নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা প্রথম বারের মত বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে।

দর্শকরা বিশ্বকাপের ইউফোরিয়ায় মেতে ছিল, ঠিক যেমনটা জান্তা চেয়েছিল, অন্যদিকে মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম থেকে মাত্র এগারো ব্লক দুরেই নেভি মেকানিক্স স্কুলে (School of the Mechanics of the Navy) ছিল টর্চার সেল। এই স্কুলে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ এর মধ্যে ৫,০০০ কয়েদি ছিল যাদের মধ্যে মাত্র ১৫০ জন জানে বাঁচতে পেরেছিলেন। গ্রাসিয়েলা দালিও বেঁচে যাওয়াদের একজন ছিলেন।

গ্রাসিয়েলা দালিও, অন্য বন্দীদের মতই, বন্দীশালার অফিসের শেষ মাথায় সাদা কালো এক টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখার অনুমতি পেয়েছিলেন। “এল টিগ্রে বা বাঘ” নামে কুখ্যাত এদুয়ার্দো আকস্তা সেই বন্দীশালার হর্তাকর্তাদের একজন ছিলেন। লোকটা বন্দীদের নির্যাতন করতেন নির্দয়ভাবে! ফাইনালের বাঁশি বাজার সাথে সাথে  চিৎকার করে এল টিগ্রে দৌড়ে ঘরে ঢুকলেন, “আমরা জিতে গেছি, আমরা জিতে গেছি”। খানিকক্ষণের জন্যে বন্দিরাও যেন সেই আনন্দের স্রোতে ভেসে গেলেন। ফুটবল, নিদারুণ ভাবে, বন্দী আর নির্যাতনকারীদের এক করে দিয়েছিল।  

একটু পরেই, এক সৈনিক এসে কয়েকজন কয়েদীকে তৈরি হবার জন্যে তাগাদা দিয়ে গেলেন। মাঝে মাঝেই বন্দীদের জোর করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হত যাতে সহযোগী বা একই মতাদর্শের লোকজনকে ধরিয়ে দিতে পারে। এবারের ব্যাপারটা ভিন্ন, আর্জেন্টিনা যে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ জিতেছে!   

সবুজে একটা পিউজো গাড়িতে চড়ে প্রিফেক্ট হেক্টর ফেব্রেসের সাথে সেই যে কয়জন কয়েদি আর্জেন্টিনার জয় উৎযাপন দেখতে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন, গ্রাসিয়েলা তাদের মধ্যে একজন ছিলেন। জেল থেকে বেরিয়ে যেন আরেক ছোট জেলে এসে বসেছিলেন গ্রাসিয়েলা, নড়াচড়ার জো নেই। দম বন্ধ হয়ে আসছিল যেন। বলে কয়ে গাড়ির সানরুফ দিয়ে একনজর বাইরে তাকানোর অনুমতি মিলল।

গ্রাসিয়েলা অবাক হয়ে দেখলেন বাইরে হাজার হাজার মানুষ আনন্দ মিছিল করছে! মুহূর্তের জন্যে গ্রাসিয়েলার মনে হল চিৎকার করে সবাইকে জানিয়ে দেই যে এরা আমায় বন্দি করে রেখেছে, আবার সাথে সাথেই মনে হল সম্ভবত কেউ এই সময়ে আমার আর্তনাদ শুনবে না।

স্বৈরতন্ত্রের সময়ে এক রক্তমাখা বিশ্বকাপ জেতার উৎসবে চাপা পড়ে গিয়েছিল হাজারো আর্তনাদ আর গল্প, শুধু রয়ে গিয়েছিল ফুটবল।     

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Borhan Mahmud 1 month ago

    বাহ, পুরো ফুটবল হিস্ট্রি। এ ম্যাচটা নিয়ে পত্রিকাতেও পড়েছিলাম। আপনি অনেক বিস্তারিত লিখেছেন।

    • Dipta Majumder 1 month ago

      ধন্যবাদ ভাই!