Article

৬৫ বছর বয়সেও সাইকেলের প্যাডেলে স্বপ্ন

October 31, 2026

13 views

পাড়ার সমবয়সী অনেকেই যখন অবসরে ঘরে বিশ্রাম নেন, তখন ৬৫ বছর বয়সী সৈয়দ শাহজাহান বেরিয়ে পড়েন সাইকেল নিয়ে। কখনো ৩০ কিলোমিটার, কখনো ৫০-৬০ কিলোমিটার, আবার কখনো ১০০ কিংবা ১২০ কিলোমিটার পেরিয়ে যান। এক দিনে সর্বোচ্চ ২৪০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়েছেন তিনি—খুলনা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত। বয়স তাঁর কাছে থেমে থাকার কারণ নয়; বরং নিয়মিত শরীরচর্চা, সাইক্লিং আর মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছাই যেন তাঁকে প্রতিদিন এগিয়ে নেয়।

খুলনার দিঘলিয়ার সেনহাটি গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ শাহজাহান। বর্তমানে নির্দিষ্ট কোনো পেশায় নেই, ঘরবাড়ি দেখাশোনাই তাঁর প্রধান কাজ। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা ও দৌড়ঝাঁপের প্রতি ছিল তাঁর আগ্রহ। যৌবনে খুলনার প্রথম বিভাগ ফুটবলেও খেলেছেন। সেই শরীরচর্চার অভ্যাস এখনো ধরে রেখেছেন।

সাইকেলের সঙ্গে শাহজাহানের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। ছোটবেলায় বাবার দেওয়া তিন চাকার বেবি সাইকেল রিকশা চালাতেন। বড় খালু ও বড় দুলাভাইয়ের সাইকেল নিয়ে স্বাভাবিক সাইকেল চালানোও শিখেছিলেন। তবে নিজের কোনো সাইকেল কখনো কেনা হয়নি। ষাট বছর পেরোনোর পর খুলনা সাইক্লিং কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর সাইক্লিংয়ের প্রতি তাঁর নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়।

শাহজাহানের সাইকেলযাত্রার শুরুটা ছিল পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘আলোর মিছিল’-এর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বন ও বন্যপ্রাণীর প্রতি তাঁর আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়। বাঘ সুরক্ষার জন্য সুন্দরবনের কালাবগীতে একটি সাইকেল র‍্যালির আয়োজন করা হলে নতুন সাইক্লিস্ট হিসেবে তাতে অংশ নেন তিনি। সেই যাত্রাই তাঁকে সাইকেল নিয়ে দূরের পথে বেরিয়ে পড়ার সাহস দেয়।

এরপর একে একে সাইকেলে ঘুরেছেন দেশের বিভিন্ন জেলা। সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, যশোর, গোপালগঞ্জসহ প্রায় ২০-২২টি জেলা ভ্রমণ করেছেন। সব রাইডের হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি বলে মোট দূরত্ব নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। তাঁর অনুমান, সব মিলিয়ে ৯-১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি সাইকেল চালিয়েছেন।

তাঁর রাইডের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খুলনা থেকে কুয়াকাটা যাত্রা। প্রায় ১৫-১৬ ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। তবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পেছনে কোনো প্রতিযোগিতার মানসিকতা নেই। নিজের আনন্দ, সুস্থ থাকা এবং পরিবেশের কথা মানুষকে জানানোর জন্যই তাঁর এই পথচলা।

দীর্ঘ সাইকেল ভ্রমণে নিজের খাবারের বিষয়েও সচেতন থাকেন শাহজাহান। সকালে কলা ও পানি খেয়ে রাইড শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর নাশতায় থাকে রুটি বা পরোটা ও ডাল, মাঝে মাঝে ডিম। দুপুরে ভাত, ডিম ও ডাল এবং রাতে সবজি, ডিম ও ডাল খান। সুযোগ হলে মুরগির মাংসও থাকে। দীর্ঘ রাইডে প্রায় প্রতি ২০ কিলোমিটার পরপর কলা, পানি ও স্যালাইন গ্রহণ করেন।

৬৫ বছর বয়সে এতটা পথ সাইকেল চালানোর রহস্য কী?

শাহজাহানের উত্তর খুব সহজ—ইচ্ছাশক্তি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা। তাঁর মতে, ছোটবেলা থেকে খেলাধুলা ও শরীরচর্চার অভ্যাস থাকলে বয়স বাড়লেও শরীরকে সচল রাখা সম্ভব। নিয়মিত সাইক্লিংয়ের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে হাইকিংও করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় হাইকিংয়ের অভিজ্ঞতা ৩৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া।

তবে শুধু নিজের শরীর ভালো রাখাই তাঁর লক্ষ্য নয়। সাইকেলকে তিনি সামাজিক ও পরিবেশ সচেতনতার একটি মাধ্যম হিসেবেও দেখেন। কার্বন দূষণ কমানো, সবুজ স্বদেশ এবং পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সাইকেল নিয়ে পথে বের হন। সাইকেল চালাতে গিয়ে কোথাও বৃক্ষরোপণ করেন, কোথাও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেন, আবার কোথাও প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেন। এ পর্যন্ত তাঁর হাতে লাগানো গাছের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ শতাধিক। খুলনা সদর ও আশপাশের উপজেলা ছাড়াও বাগেরহাট, যশোর ও নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায় গাছ লাগিয়েছেন।

শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের পাশেও দাঁড়িয়েছেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী। কয়েকজন ছিন্নমূল শিশুর লেখাপড়ার খরচ বহন করেছেন। কারও চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন, রমজান ও ঈদে বাজার করে দিয়েছেন, কিনে দিয়েছেন কাপড়। সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে। আলোর মিছিল, পরিচ্ছন্ন দিঘলিয়া, দিঘলিয়া উন্নয়ন সংস্থা, বিডি ক্লিন খুলনা, ভিবিডি খুলনা, ক্লিন আপ খুলনা, খুলনা ব্লাড ব্যাংক, সিইউসি, উইথ শি, রেড ক্রিসেন্ট, রঙমহল ও হ্যালো পিপলসের মতো সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।

এই পথচলায় পরিবারের ভূমিকাও কম নয়। পরিবারের সদস্যরা তাঁর কাজে বাধা দেন না। বরং সতর্ক হয়ে চলার পরামর্শ দেন। শাহজাহানের ভাষায়, পরিবারের এই সহযোগিতাই তাঁর জন্য আরেকটি ‘এনার্জি প্যাক’।

তাঁর সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি সুন্দরবনের কালাবগী যাত্রা। আবার সেই যাত্রাতেই রয়েছে কষ্টের স্মৃতিও। প্রথমবার সাইকেলে কালাবগী গিয়ে শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ফলে ফেরার পথে কিছুটা রাস্তা সাইকেল বাসে তুলে আনতে হয়েছিল।

৬৫ বছর বয়সেও কেন এমন ছুটে চলা—এ প্রশ্নের উত্তরও তাঁর জীবনের গল্পেই আছে। তিনি মনে করেন, বয়স শরীরের একটি হিসাব মাত্র; সচল থাকার ইচ্ছাটাই বড়। তাই তরুণদেরও নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, বই পড়া এবং সামাজিক কাজে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মোবাইল ফোনের ব্যবহার কমিয়ে মানুষের জন্য কিছু করার পরামর্শও তাঁর।

কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বা পুরস্কার পাওয়ার জন্য এসব করেন না শাহজাহান। নিজের আনন্দ ও দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁর পথচলা। তারপরও বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন। তাঁর কাছে সেগুলো পুরস্কারের চেয়ে মানুষের ভালোবাসার স্বীকৃতি।

আগামী দিনের স্বপ্নও বড়। সামর্থ্য ও সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা সাইকেলে ঘুরে দেখতে চান। পাশাপাশি চালিয়ে যেতে চান বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ।

সৈয়দ শাহজাহানের গল্পটি তাই শুধু একজন ৬৫ বছর বয়সী মানুষের সাইকেল চালানোর গল্প নয়। এটি নিজেকে সচল রাখার, বয়সকে অজুহাত না বানানোর এবং নিজের ভালো থাকার পাশাপাশি অন্যের জন্য কিছু করার গল্প। তাঁর সাইকেলের প্রতিটি প্যাডেল যেন বলে—জীবনের পথে চলার জন্য বয়স নয়, প্রয়োজন ইচ্ছা ও উদ্যম। আর সেই পথ যদি মানুষের ও প্রকৃতির কল্যাণের দিকে যায়, তাহলে পথচলাটাও হয়ে ওঠে আরও অর্থবহ।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login