রক্তের অভাবে হাসপাতালে স্বজনদের ছোটাছুটি, পরিচিতজনদের কাছে ধরনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক পোস্ট—এমন দৃশ্য আমাদের দেশে নতুন নয়। জরুরি মুহূর্তে এক ব্যাগ রক্তের জন্য যখন দিশেহারা হয়ে পড়েন রোগীর স্বজনেরা, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়াতে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন সফটওয়্যার প্রকৌশলী রায়হান উদ্দিন ফরহাদ। তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ‘রক্তদাতা’ নামের একটি ওয়েবসাইট, যেখানে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় আশপাশের সম্ভাব্য রক্তদাতাদের।
ওয়েবসাইটটি চালুর প্রথম দিনেই মেলে উদ্যোগটির সার্থকতার একটি গল্প। অসুস্থ বাবার জন্য বি পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন ছিল মাসুমের। রক্তদাতা ওয়েবসাইটে খোঁজ করে একজনকে ফোন দিতেই তিনি রক্ত দিতে রাজি হন। পরে রক্তও দেন। মানুষের এমন সংকটের সময়ে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে রক্তদাতা ও রক্তপ্রার্থীর মধ্যে যোগাযোগের সেতু গড়ে তুলতেই রায়হানের এই উদ্যোগ।
রক্তের জন্য মানুষের হাহাকার থেকেই উদ্যোগ
রায়হান উদ্দিন ফরহাদ একটি আমেরিকান কোম্পানিতে জ্যেষ্ঠ সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে দূর থেকে কাজ করেন। পেশাগত কাজের পাশাপাশি প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর চিন্তা থেকেই তিনি তৈরি করেছেন এই ওয়েবসাইট।
রায়হান জানান, হাসপাতালে গেলেই বোঝা যায়, রক্তের প্রয়োজন কতটা জরুরি। বিশেষ করে গ্রাম থেকে চিকিৎসার জন্য শহরের হাসপাতালে আসা রোগীদের স্বজনদের অনেক সময় পরিচিত মানুষের অভাবে রক্তদাতা খুঁজতে বেগ পেতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েও সব সময় কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলে না। আবার রক্তের প্রয়োজনের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ প্রতারণার শিকার হন। মানুষের এমন অসহায় পরিস্থিতি দেখেই রক্তদাতা খোঁজার সহজ একটি ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবেন তিনি।
গত ১৮ অক্টোবর প্রাথমিকভাবে ওয়েবসাইটটি চালু করেন রায়হান। এরপর ব্যবহারকারীদের মতামত অনুযায়ী ধীরে ধীরে এতে যুক্ত করেন নতুন নতুন সুবিধা।
যেভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে রক্তদাতা
ধরা যাক, একজন রোগীর বি পজিটিভ রক্ত প্রয়োজন। এ জন্য রোগীর স্বজনকে প্রথমে রক্তদাতা ওয়েবসাইটের হোমপেজে যেতে হবে। সেখানে রক্তের গ্রুপ, জেলা ও থানা নির্বাচন করে সার্চ করলেই সংশ্লিষ্ট এলাকার তালিকাভুক্ত রক্তদাতাদের তথ্য পাওয়া যাবে। এরপর তাঁদের সঙ্গে ফোনে অথবা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা যাবে।
এ ছাড়া রয়েছে ‘অনুরোধ করুন’ নামের একটি সুবিধা। এর মাধ্যমে রোগীর নাম, রোগের বিবরণ, প্রয়োজনীয় রক্তের গ্রুপ, রক্ত লাগার তারিখ ও হাসপাতালের তথ্যসহ একটি অনুরোধ জমা দেওয়া যায়। ফোন নম্বর যাচাই করার পর ওয়েবসাইটটির উদ্যোক্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকার ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে একই রক্তের গ্রুপের তালিকাভুক্ত দাতাদের কাছে নোটিফিকেশন পাঠানো হয়।
রক্তের আবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ওয়েবসাইট থেকে পোস্টার ও ক্যাপশনও তৈরি করা যায়। পাশাপাশি আশপাশের সম্ভাব্য রক্তদাতাদের তালিকা পাওয়া যায়। অর্থাৎ, রক্তদাতার খোঁজে একের পর এক ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দেওয়ার পরিবর্তে একটি জায়গা থেকেই যোগাযোগের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন রক্তপ্রার্থী।
১৫ হাজার রক্তদাতার তথ্য
রায়হান জানান, ওয়েবসাইটটিতে ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার রক্তদাতার তথ্য যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাঁদের কাছে রক্তদাতাদের তথ্য পাঠিয়েছে। অনেকে আবার নিজেরাই ওয়েবসাইটের ‘রক্তদাতা হোন’ অপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে এবং ফোন নম্বর যাচাই করে নিবন্ধন করেছেন।
রক্তদাতাদের তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানানোর ব্যবস্থাও রেখেছেন তিনি। কোনো দাতা সাময়িকভাবে রক্ত দিতে না চাইলে ওয়েবসাইটে থাকা ‘আপনার তথ্য লুকান’ সুবিধা ব্যবহার করে নিজের তথ্য আড়াল করতে পারবেন। পরে আবার রক্তদানে প্রস্তুত হলে তালিকায় ফেরার সুযোগ থাকবে।
রক্তদাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। অভিযোগ যাচাই করে প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করে ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত করা এবং সেখান থেকে ব্লক করার কথা জানিয়েছেন রায়হান। তবে রক্তদাতাদের পরিচয় ও অভিযোগ যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর, তা নির্ভর করবে যথাযথ যাচাই এবং নিয়মিত তদারকির ওপর।
তিন দিনে প্রায় ৯০০ দাতার কাছে ফোন ও বার্তা
ওয়েবসাইটটির মাধ্যমে ঠিক কতজন রোগী রক্ত পেয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো নেই। তবে রায়হান জানিয়েছেন, সম্প্রতি তিনি প্রশাসনিক প্যানেলে এমন একটি সুবিধা যুক্ত করেছেন, যার মাধ্যমে রক্তদাতারা কতবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাচ্ছেন, তা দেখা যায়।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সুবিধা চালুর পর প্রথম তিন দিনেই প্রায় ৯০০ জন রক্তদাতা ফোন ও বার্তা পেয়েছেন। এ ছাড়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগীর জন্য রক্ত সংগ্রহ করতে পেরেছেন, এমন কয়েকজন তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন।
এ সংখ্যা অবশ্য কতজন রোগী শেষ পর্যন্ত রক্ত পেয়েছেন, তার সরাসরি হিসাব নয়। তবে রক্তপ্রার্থী ও সম্ভাব্য রক্তদাতার মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে ওয়েবসাইটটি ভূমিকা রাখছে কি না, তা বোঝার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
নিজের পকেটের টাকা, উদ্দেশ্য মানুষের উপকার
একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে চালু রাখার পাশাপাশি সেটিকে দ্রুতগতির ও ব্যবহারবান্ধব করে তোলার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত ব্যয়। ডোমেইন কেনা থেকে শুরু করে সার্ভারের খরচ—সবকিছুই নিজের পকেট থেকে বহন করছেন বলে জানিয়েছেন রায়হান।
তিনি বলেন, ওয়েবসাইটটি এমনভাবে তৈরি করতে চান, যাতে ব্যবহারকারীরা দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পান। এ জন্য নিয়মিত সার্ভার ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে তাঁকে। এই উদ্যোগ থেকে আয় করার পরিকল্পনা নেই তাঁর। কারও কাছ থেকে অনুদানও চাইতে চান না। তাঁর প্রত্যাশা, মানুষের রক্তের প্রয়োজন মেটাতে ওয়েবসাইটটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। নিজের এই উদ্যোগের পেছনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রায়হান বলেন, রক্তের অভাবে যেন কাউকে প্রাণ হারাতে না হয়—এটাই তাঁর চাওয়া।
প্রতারণা থেকে সুরক্ষা, রক্তদানে উৎসাহ
রক্তের প্রয়োজনের সময় প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা রক্তপ্রার্থীদের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ। রায়হানের উদ্যোগে তাই অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কেউ রক্ত দেওয়ার বিনিময়ে টাকা দাবি করলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করতে কোনো টাকা দিতে হয় না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তা। তবে রক্তদাতার তালিকায় নাম থাকলেই যে তিনি নির্দিষ্ট সময়ে রক্ত দিতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। রক্তপ্রার্থীদের তাই যোগাযোগ করে দাতার সম্মতি, প্রাপ্যতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
রক্তদানের বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রচারাভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে রায়হানের। তাঁর স্বপ্ন, ‘রক্তদাতা’ একসময় জাতীয় পর্যায়ের একটি রক্তদাতা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে আরও কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে চান তিনি, যাতে রক্তের প্রয়োজনীয়তার খবর দ্রুত সংশ্লিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছায়।
নিজেও দিয়েছেন তিনবার রক্ত
রক্তদাতার তথ্য সংগ্রহ ও যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরির পাশাপাশি নিজেও রক্ত দিয়েছেন রায়হান। এ পর্যন্ত তিনবার রক্তদান করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করতে তাঁর বক্তব্য, রক্তদান শুধু একজন অপরিচিত মানুষের জীবন বাঁচানোর সুযোগ নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও একটি উপায়। আজ কেউ স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ালে ভবিষ্যতে তাঁর নিজের পরিবারের কারও রক্তের প্রয়োজনেও অন্য একজন এগিয়ে আসতে পারেন।
প্রযুক্তির জগতে কাজ করলেও রায়হান তাঁর দক্ষতাকে মানুষের একটি বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগাতে চান। তাঁর তৈরি ওয়েবসাইট কত দূর এগোবে, তা নির্ভর করবে মানুষের অংশগ্রহণ, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও সেবার ধারাবাহিকতার ওপর। তবে উদ্যোগটির মূল ভাবনাটি সহজ—রক্তের প্রয়োজন হলে মানুষ যেন জানেন কোথায় খুঁজতে হবে, আর যাঁরা রক্ত দিতে আগ্রহী, তাঁদের কাছে যেন সেই খবর পৌঁছে যায়।
রক্তের প্রয়োজন কখন কার জীবনে দেখা দেবে, তা কেউ জানেন না। তাই রক্তদাতা খোঁজার এমন উদ্যোগে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়লে বিপদের সময়ে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগও বাড়তে পারে।