Article

গৃহিণী থেকে সফল ফ্রিল্যান্সার সালমা সুলতানা

October 30, 2026

4 views

সংসার, সন্তান আর ঘরের নানা দায়িত্বের মধ্যেও নিজের একটি পরিচয় তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সালমা সুলতানা। হাতে থাকা কিছু টাকা কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগানো যায়—এমন ভাবনা থেকেই শুরু। ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ করতে গিয়ে একসময় জানতে পারেন, কোনো একটি দক্ষতা শেখার পেছনে বিনিয়োগ করলে সেই দক্ষতা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। কথাটি মনে ধরে যায় তাঁর। সিদ্ধান্ত নেন, একটি কাজ শিখবেন। এরপর ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে শুরু করেন।

আজ সালমার তিনজন স্থায়ী বিদেশি ক্লায়েন্ট। তাঁদের দুজন যুক্তরাষ্ট্রের এবং একজন নেদারল্যান্ডসের। স্থানীয়ভাবেও কিছু কাজ করেন। বর্তমানে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। তবে এই জায়গায় পৌঁছানোর পথটা সহজ ছিল না।

ফ্রিল্যান্সিং শেখার সময় সালমার দুই সন্তানই খুব ছোট ছিল। একজনের বয়স তিন বছরের একটু বেশি, অন্যজনের মাত্র তিন মাসের মতো। তাই তাঁর মনে ভয় ছিল—সংসার ও দুই সন্তান সামলে তিনি আদৌ পারবেন কি না।

এর ওপর অনেকের কাছ থেকে শুনতেন, ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল হতে প্রতিদিন ১৪–১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। কিন্তু ভয়কে পেছনে রেখে শেখা শুরু করেন তিনি। সন্তানরা ঘুমালে বা কিছুটা ব্যস্ত থাকলে নিজের কাজের জন্য সময় বের করতেন। কোনো দিন সন্তান অসুস্থ হলে কিংবা সংসারে বাড়তি কাজ থাকলে কাজ করা সম্ভব হতো না। তখন পরের সুযোগে কাজের ঘাটতি পূরণ করতেন।

শুরুতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন সালমা। কিন্তু সেখানে আশানুরূপভাবে শেখা বা এগিয়ে যাওয়া হয়নি। পরে এনটিভিতে বিখ্যাত ফ্রিল্যান্সার লিজার একটি নিউজ দেখে তাঁর কোর্স সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর সেই কোর্সে ভর্তি হন। সালমার ফ্রিল্যান্সিং যাত্রায় লিজার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর গাইডলাইন ও সাপোর্ট সিস্টেম কাজ শেখার পাশাপাশি ক্লায়েন্টের কাজ নেওয়ার আত্মবিশ্বাস তৈরি করে বলে জানান সালমা।

শেখার একটি পর্যায় শেষ করার পর বায়ার খোঁজা শুরু করেন সালমা। মাত্র দুই মাসের মধ্যেই প্রথম কাজ পান। যুক্তরাষ্ট্রের একজন ক্লায়েন্ট তাঁকে ১৫০ ডলারের একটি কাজ দেন। প্রথম উপার্জন তাঁর জন্য ছিল বিশেষ আনন্দের। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে প্রথমে পরিবারের সবাইকে উপহার দেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের মুখের আনন্দই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

সালমা মূলত ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র—সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং নিয়ে কাজ করেন। Instagram, Facebook, Twitter ও Pinterest নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি SEO নিয়েও কাজ করেন।

বর্তমানে তাঁর তিনজন স্থায়ী বিদেশি ক্লায়েন্ট—দুজন যুক্তরাষ্ট্রের এবং একজন নেদারল্যান্ডসের। শুরুতে আয় খুবই কম ছিল। ধীরে ধীরে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সুযোগও বাড়ে। এখন মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি।

সালমার মতে, গৃহিণী হওয়া মানেই নিজের কোনো দক্ষতা নেই—এমন ধারণা ঠিক নয়। সংসার ও সন্তান সামলানোও বড় দায়িত্ব। এর পাশাপাশি নিজের আগ্রহ অনুযায়ী নতুন কোনো দক্ষতা শেখার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। একজন মা যদি দিনে মাত্র দুই-তিন ঘণ্টা সময় পান, সেই সময়টুকুও নিয়মিত কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। শুরুতে আয় কম হলেও ধৈর্য ও নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

নতুনদের জন্য তাঁর পরামর্শ, একসঙ্গে অনেক কিছু শেখার চেষ্টা না করে একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা ভালোভাবে শেখা। পাশাপাশি সুন্দর প্রোফাইল ও পোর্টফোলিও তৈরি, নিয়মিত প্রস্তাব পাঠানো, ক্লায়েন্টের প্রয়োজন বোঝা এবং সময়মতো ভালো কাজ জমা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজের দক্ষতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে একটি ছোট টিম তৈরি করতে চান সালমা। অন্য নারীদের কাজ শেখানো এবং কাজের সুযোগ করে দেওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর।

নিজের আয় শুরু করার পর তাঁর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আত্মবিশ্বাসে। নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের উপার্জন থেকে কিছু করতে পারার অনুভূতি তাঁকে আত্মনির্ভর করেছে। কাজের পথে ব্যর্থতা, হতাশা কিংবা সংসারের চাপে কাজ করতে না পারার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। কিন্তু সেসব তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে।

সালমার গল্প তাই শুধু একজন নারীর ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল হওয়ার গল্প নয়; এটি সংসারের দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরি করার গল্প। তাঁর বিশ্বাস, শুরুটা ছোট হলেও নিজের ওপর বিশ্বাস, ধৈর্য ও নিয়মিত চেষ্টা থাকলে একজন নারীও ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় ও আত্মনির্ভরতা তৈরি করতে পারেন।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login