ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর থেকেই শেফালী বেগমের পড়াশোনা থমকে যায়। এরপর সংসার, সন্তান আর পরিবারের দায়িত্বে কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু মনের কোণে বইয়ের স্বপ্নটা তিনি কখনো মরতে দেননি। ৪৮ বছর বয়সে সেই স্বপ্নকেই আবার জাগিয়ে তোলেন। আর ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার এই নারী। তাঁর সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে।
মেধাবী ছাত্রী, থেমে গেল বিয়েতে
শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল মেধা আর সম্ভাবনায় ভরা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ভালো ফল করলেও পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে আর এগোনো হয়নি। ১৯৮৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুফাতো ভাই মজনুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, আর বিয়ের পর বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। তবু শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তিনি হারাননি।
সংসারের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি
সংসার ও সন্তান সামলানোর মধ্যেই ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন শেফালী। টানা দুই মেয়াদে, ২০২১ সাল পর্যন্ত, তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
পরিবারের উৎসাহে নতুন শুরু
স্বামী ও তিন সন্তানের উৎসাহে ২০২০ সালে আবার পড়ার টেবিলে ফেরেন তিনি। ভর্তি হন ডোমার উপজেলার গোমানতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে। বয়স আর সংসারের ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে ২০২৩ সালে জিপিএ ৪.২৯ নিয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০২৬ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে এইচএসসি দেন। মূল জিপিএ ছিল ৩.৯৬, চতুর্থ বিষয়সহ হয়েছে ৪.২১।
ছেলে এখন দক্ষিণ কোরিয়ায়
শেফালীর ছেলে আব্দুর রাজ শাফি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। মায়ের সাফল্যকে তিনি পরিবারের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলছেন। তাঁর মতে, মায়ের ত্যাগ, দোয়া ও অনুপ্রেরণাই আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। ছেলের চাওয়া, মা যেন এখানেই না থেমে স্নাতক শেষ করে আরও উচ্চশিক্ষা নেন।
শিক্ষকের চোখে
কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় জানান, এত দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী তিনি খুব কমই দেখেছেন। তাঁর মতে, শেফালী প্রমাণ করেছেন শিক্ষার কোনো বয়স নেই, ইচ্ছাশক্তিই আসল। এই সাফল্য অন্যদেরও নতুন স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।
শেফালীর নিজের কথা
শেফালী বলেন, বাবাকে হারানোর পর সংসারের টানাপোড়েনে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অথচ প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পরীক্ষাগুলোতে তিনি সবসময়ই মেধাবী ছিলেন। পরিস্থিতির কারণে পড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহেই আবার শুরু করেছেন।